Published : 02 Sep 2026, 04:14 PM
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সিদ্ধান্ত তার নিজের ওপরই নির্ভর করছে বলে মনে করেন ঢাকায় ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে দুই পক্ষের উদ্দেশ্য ‘জনগণকেন্দ্রিক’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ভারতীয় হাই কমিশনার।
গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জিতে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল নরেন্দ্র মোদীর সরকার।
এছাড়া সেপ্টেম্বরে নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনেও বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
তবে গত ৫ অগাস্ট দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বক্তব্য দেওয়ার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল ঢাকা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের আলোচনার মধ্যে এ ঘটনায় দিল্লিকে ‘কূটনৈতিক অনুকূল পরিবেশ’ তৈরিসহ দুটি শর্ত দেয় ঢাকা।
সফরের ক্ষেত্রে ঢাকার সিদ্ধান্তের আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যার আসামিদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলেছে ঢাকা।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বাংলাদেশ ছাড়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য নয়াদিল্লির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানায় ঢাকা।
ভারত বলে আসছে, বাংলাদেশের অনুরোধ তারা ‘যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায়’ পর্যালোচনা করছে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য বর্তমান পরিবেশ অনুকূল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, “এটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একজন অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও জনবান্ধব ব্যক্তি। তাই বিষয়টি আমরা মনে করি, বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত।
“আর বন্ধুত্বের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কী কী করা হবে বা এজেন্ডা কী হবে—এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, উভয় পক্ষের উদ্দেশ্যই জনকল্যাণমুখী। আর যখন উদ্দেশ্য জনকল্যাণমুখী থাকে, তখন কাজও এগিয়ে যাবে।”
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরুর অগ্রগতি নিয়ে আরেক প্রশ্নে ভারতীয় হাই কমিশনার বলেন, “গণতন্ত্রে আলোচনার কোনো শেষ নেই। যদি আলোচনা শেষ হয়ে যায়, তাহলে ওইটা গণতন্ত্র না।”
আলোচনাকে নদীর প্রবাহের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, গঙ্গা ও পদ্মার মতো আলোচনা চলতেই থাকবে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এই আলোচনা থেমে থাকার সুযোগ নেই।
দুই দেশের সংসদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে তুলে ধরে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, তিনি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের কাছে বাংলাদেশ ও ভারতের সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি ‘ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপ’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
তিনি বলেন, দলীয় বিভাজনের বাইরে গিয়ে দুই দেশের সংসদ সদস্যরা এই কাঠামোয় একসঙ্গে কাজ করতে পারেন।
রাজনীতি নিজস্ব গতিতে চলবে মন্তব্য করে ভারতীয় হাই কশিনার বলেন, সংসদ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে। সেই জায়গা থেকে দুই দেশের সংসদের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ানো সম্ভব।
স্পিকার এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন তুলে ধরে তিনি বলেন, দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগকে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রেও এ সংসদীয় উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার পক্ষ থেকে বাংলাদেশের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে ভারত সফরের আমন্ত্রণও জানান হাই কমিশনার।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বুধবার সকালে ওম বিড়লার সঙ্গে তার কথা হয়েছে। বাংলাদেশে আসার কথা জানালে তিনি বাংলাদেশের স্পিকারকে শুভেচ্ছা পৌঁছে দিতে বলেন।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে ভারতীয় সংসদ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ওম বিড়লা।
বৈঠকে সংসদের কার্যক্রম ডিজিটাল করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, তিনি ভারতের সংসদের ডিজিটাইজেশনবিষয়ক একটি কমিটির চেয়ারম্যান। ভারতের সংসদের লাইব্রেরিসহ পুরোনো সংসদীয় নথি ডিজিটাল করা হয়েছে।
সংসদ সদস্যরা স্মার্টফোনে অধিবেশনের কার্যসূচিসহ প্রয়োজনীয় নথি দেখতে পারেন। তবে যারা কাগজ ব্যবহার করতে চান, তাদের জন্য সেই ব্যবস্থাও রয়েছে, বলেন তিনি।
ভারতীয় হাই কমিশনার বলেন, ভারতের সংসদের পুরোনো অধিবেশন এবং বিভিন্ন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যও ডিজিটাল ব্যবস্থায় খুঁজে পাওয়া যায়।
স্পিকারের সঙ্গে বৈঠকে ক্রীড়া বিষয়েও আলোচনা হওয়ার কথা বলেছেন দীনেশ ত্রিবেদী।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের ক্রীড়া অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, চুনি গোস্বামী থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ক্রিকেট পর্যন্ত নানা বিষয় নিয়ে তাদের কথা হয়েছে।
জাতীয় সংসদ ভবনের স্থাপত্য ও পরিবেশেরও প্রশংসা করেন ভারতের হাইকমিশনার।
‘পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়েই প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর’
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের সঙ্গে ভারতীয় হাই কমিশনারের বৈঠকের পর সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতকে বাংলাদেশ উপেক্ষা করবে না। ভারতও বাংলাদেশকে উপেক্ষা করে না।
তিনি বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী, তাদের সময় মিলিয়ে যে সময়টা সুবিধাজনক হবে এবং এটা পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে যখন ভালো হবে, ঠিক তখনই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান ভারত ভিজিট করবেন।”
চিফ হুইপ বলেছেন, “ভারত সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি নেই। ভারতের দিক থেকেও আপত্তি থাকার কথা নয়।”
তবে সফরের জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “কেউ যদি ঠিক করে দেয় যে এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আসতে হবে, নতুবা নয়, কিন্তু নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে আমার সময় না থাকলে আমি যাব কী করে? সেটাতে কেউ সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। এটা স্বাধীন দেশ।”
চিফ হুইপ বলেন, “আমাদের বন্ধুদের তরফে যদি কোনো শর্ত আরোপ করা হয়, সেটা আমাদের ভালোভাবে নেওয়াটা একটু কষ্টের ব্যাপার হয়ে যায়।”
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির কথা বলেছেন।
বাংলাদেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে মর্যাদা, সম্মান ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্যের কথাও তুলে ধরেন নূরুল ইসলাম।
তিন বলেন, “ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। আমরা কোনো প্রতিবেশীকে উপেক্ষা করি না।”
চিফ হুইপ বলেন, বাংলাদেশের এক ইঞ্চি মাটিও যেন অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার না হয়, সেটি সরকারের অবস্থান।
একইভাবে অন্য কোনো প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ডও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে না, এমন প্রত্যাশার কথা বলেন তিনি।
ক্ষমতাচ্যুত সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তির ভারতে অবস্থানের প্রসঙ্গও তোলেন বিএনপির এই নেতা।
তার অভিযোগ, “গত ১৭ বছরে নিপীড়ন, নির্যাতন, লুটপাট, গুম ও খুনে জড়িত অনেকেই ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।”
গণতন্ত্র, অর্থনীতি, মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে রয়েছে, তাদের আশ্রয় না দিতে ভারতের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
নূরুল ইসলাম বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত কাউকে ভারত আশ্রয় বা প্রশ্রয় দেবে না বলে তারা প্রত্যাশা করেন।
গত ১৭ বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের ভূমিকারও সমালোচনা করেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, ভারত নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দাবি করে এবং বাংলাদেশও সেটি বিশ্বাস করে।
“গত ১৭ বছর ধরে আমাদের দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। এ দেশে মানুষের মানবাধিকার বলতে কিছুই ছিল না। ভারত একবারও কথা বলে নাই। সে দুঃখ আমাদের আছে এবং অনেক দিন ধরে থাকবে।”
এই অসন্তোষ দূর করার দায়িত্ব মূলত ভারতের বলে মন্তব্য করেন তিনি।
চিফ হুইপ বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও বাড়বে। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের মর্যাদার ভিত্তিতে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মধ্যে পানিবণ্টনের সমস্যাকে ‘বড় সমস্যা’ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
নূরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ভাটির দেশ হওয়ায় উজানের পানি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা হচ্ছে। পানির অভাবে বাংলাদেশকে পানি সংরক্ষণের জন্য বড় প্রকল্প নেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে।
এ সমস্যা সমাধানে ভারত এগিয়ে আসবে বলে প্রত্যাশা করেন নূরুল ইসলাম।
সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া এবং বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি নিহত হওয়ার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে চিফ হুইপ বলেন, “আমরা বলি ভারত আমাদের বন্ধু, ভারতও বলে আমরা তাদের বন্ধু। কিন্তু তারা বেড়া দিয়েছে আমাদের উপরে।
“আমাদের মানুষ যখন মারা যায়, আমরা কষ্ট পাই। সে হিন্দু কি মুসলমান, যে মানুষই হোক, বাংলাদেশে বসবাস করে।”
সীমান্তের বিষয়গুলো ভারত মানবিকভাবে বিবেচনা করলে দুই দেশের অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে বলে মন্তব্য করেন চিফ হুইপ।