Published : 28 Nov 2025, 11:43 PM
চলতি বছর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত গুগলের কাছে কনটেন্ট সরানোর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে যে অনুরোধ করা হয়েছে, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়।
সরকারের সমালোচনামূলক কনটেন্ট সরানোর জন্য গুগলকে অনুরোধ করার যে খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে তাও নাকচ করা হয়েছে। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছে সরকার।
শুক্রবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “সরকার বাংলাদেশের নাগরিকদের এই নিশ্চয়তা দিচ্ছে যে, ‘মিসইনফরমেশন, প্রোপাগান্ডা এবং মিসইনফরমেশন’–কেন্দ্রিক চরিত্রহননের বাইরে দেশের কোনো পত্রিকার নিউজ, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত পোস্ট, ভিডিও কনটেন্ট, রিলস, অনলাইনে প্রকাশিত আর্টিকেল, অভ্যন্তরীণ কোনো সমালোচকের রাজনৈতিক সমালোচনামূলক কোনো কনটেন্ট সরাতে সরকার কোনো প্ল্যাটফর্মকে অনুরোধ করেনি।”
এদিন দেশের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সরকার এ বছরের প্রথম ছয় মাসে গুগলের কাছে কনটেন্ট সরানোর ২৭৯টি অনুরোধ করেছে, তার মধ্যে ১৮১টি ছিল সরকারের সমালোচনামূলক কনটেন্ট। গুগলের তরফে সরকারের এই অনুরোধে সাড়া কমই দেখা যাচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় বলেছে, “মিসইনফরমেশন, প্রোপাগান্ডা এবং মিসইনফরমেশন–কেন্দ্রিক বেআইনি মানহানিকর তথ্য দিয়ে কারো চরিত্রহননের চেষ্টা সংক্রান্ত তথ্য অপসারণের অনুরোধ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো এবং জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির মাধ্যমে বিটিআরসিতে যায়।”
বর্তমান সরকার সামাজিক মাধ্যম নিয়ন্ত্রণে বিগত আওয়ামী লীগের ‘সিআরআই’ বা এ জাতীয় কোনো ‘বট বাহিনী’ পরিচালনা করে না তুলে ধরে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “বিটিআরসি বা এনটিএমসিসহ বাংলাদেশের কোনো এজেন্সি বা সংস্থা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের কন্টেন্ট ডাউন করার ক্ষমতা রাখে না, সেজন্য যেকোনো অনুরোধ সোশ্যাল মিডিয়া ও টেক প্ল্যাটফর্মকে জানাতে হয়।”
সরকার বলছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে গুগলের ট্রান্সপারেন্সি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে মোট ২৭৯টি অনুরোধ যায়। এটা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২২ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালে পাঠানো ছয় মাসের মোট সংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম। সে সময় ৮৬৭টি অনুরোধ পাঠানো হয়েছিল।
গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে, বাংলাদেশ অনুরোধ করেছে মাত্র ১৫৩টি, যা আওয়ামী লীগ আমলের সর্বোচ্চ অনুরোধ সংখ্যার সাড়ে পাঁচ ভাগের একভাগ। আর আওয়ামী লীগের আমলে ২০২৩ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে সর্বনিম্ন অনুরোধের অর্ধেকেরও কম, সে সময় অনুরোধ করা হয়েছিল ৫৯১টি।
গত বছরের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকার আগের সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করেছে। সে অধ্যাদেশের ৮ ধারায় বলা হয়েছে, জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মগুলোকে কনটেন্ট ব্লক করার অনুরোধ করতে পারে।
আগের আইনেও এ বিধান ছিল। তবে বর্তমান সরকার এর সঙ্গে যা যুক্ত করেছে, তা হল-কোনো কনটেন্ট ব্লক করা হলে স্বচ্ছতার স্বার্থে সরকার সকল ব্লক হওয়া কনটেন্টের তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের তুলনায় বর্তমান সরকার এত কম সংখ্যক অনুরোধ পাঠাচ্ছে, যা ‘উল্লেখযোগ্য’ নয়।
“গুগলের ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী ৬৫ শতাংশ অনুরোধ হচ্ছে ‘Not enough information’ ক্যাটাগরিতে, অর্থাৎ এসব বিষয় বিশেষ উদ্দেশ্যপূর্ণ ছিল না।”
সরকার বলছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়কালে বাংলাদেশ ভেতর ও বাইরে থেকে এক ‘অনাকাঙ্ক্ষিতহারে মিস-ইনফরমেশন ক্যাম্পেইনের’ শিকার হয়।
“প্রতিবেশী দেশের মিডিয়া থেকে ক্রমাগত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মিস-ইনফরমেশন ও প্রোপাগান্ডা ক্যাম্পেইন শুরু হয়। সরকারকে এসবের বিরুদ্ধে বেশকিছু রিপোর্ট প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গুগলকে দিতে হয়েছে।
“পাশাপাশি এসময়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষিদ্ধ হয় এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিটি) জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানুষ খুনের বিচার শুরু হলে আওয়ামী লীগ সাইবার স্পেইসে ক্রমাগত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এবং সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমাগত মিস-ইনফো ক্যাম্পেইনসহ সন্ত্রাসের আহবান শুরু করে।”
দেশের সাইবার স্পেইসকে নিরাপদ রাখা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা, ধর্মীয়, জাতিগত এবং নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোকে অনলাইনে ও অফলাইনে সুরক্ষা দান সরকারের দৈনিক দায়িত্বের অংশ, এক কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “যেহেতু সোশ্যাল মিডিয়া এবং সাইবার স্পেইস দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম উপাদান হয়ে উঠেছে, তাই বিশ্বের সব দেশের মতই বাংলাদেশ সরকারকে এখানে নীতিগত কারণে কিছু রিপোর্ট করতে হয়।
“পাশাপাশি সরকার অনলাইন জুয়া এবং গ্যাম্বলিং সংক্রান্ত কিছু ‘টেক-ডাউন’ অনুরোধও করেছে।”
সরকার বলছে, “যেহেতু গুগলের স্বচ্ছতা রিপোর্টে ‘মিস ইনফরমেশন, প্রোপাগান্ডা এবং ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন’ বিষয়ক আলাদা কোনো ক্যাটাগরি নেই, এসব রিপোর্ট সরকারের সমালোচনা ক্যাটাগরিতে দেখানো হয়েছে।”
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন নিয়ে ‘হতাশা’ প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর বলছে, “বাংলা ও ইংরেজিতে এ সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশের পূর্বে সরকারের ব্যাখ্যা কিংবা বক্তব্য চাওয়া হয়নি। প্রকৃত সত্যকে আড়াল করে এরকম চাঞ্চল্যকর সংবাদ প্রকাশের হীনম্মন্য প্রবণতা, সমাজের স্থিতিশীলতা বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যাহীন খণ্ডিত সংবাদ প্রকাশ, কোনোভাবেই দায়িত্বশীল মিডিয়ার ভূমিকা হতে পারে না।”
চলতে বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে ‘অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী’ বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর বলেছে, শতাধিক বড় আন্দোলন হয়েছে, বেশকিছু ‘মব’ হয়েছে, মাজার ভাঙ্গাসহ সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটেছে।
“বিশেষকরে গণপিটুনিতে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে কয়েকটি। বছরের শুরুতে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছিল, যার সাথে সরকারের একটি স্বাস্থ্য কার্ড বিতরণ কার্যক্রমও সম্পর্কিত ছিল।”
এই সময়ে বাংলাদেশ বিভিন্ন ধরনের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে তুলে ধরে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “অন্যদিকে, রাজনৈতিক অঙ্গনেও ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং প্রতিশোধের প্রবণতা দেখা গেছে। ফলে সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় সরকার প্ল্যাটফর্মগুলোকে সরকারি দায়িত্বশীল রিপোর্ট করেছে।”
আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে প্রকাশিত সূচকে দেশের বাক স্বাধীনতা ও ইন্টারনেট সূচকের ‘অসামান্য অগ্রগতি’ লক্ষ্য করা গেছে দাবি করে সরকার বলছে, বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের বাক স্বাধীনতা ও ইন্টারনেট সূচকের ‘অগ্রগতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে’।