Published : 27 Aug 2026, 09:35 PM
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারমূলক অধ্যাদেশগুলোর কয়েকটির কার্যকারিতা হারানোর পর এখন আলাদা আলাদা বিল আনার প্রতিবাদে জাতীয় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল উত্থাপনের আগে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, তারা ‘খণ্ডিত’ সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হতে চান না।
পূর্ণাঙ্গ সংস্কার এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে তাদের অবস্থান বহাল থাকবে।
বৃহস্পতিবার রাত ৮টা ৬ মিনিটের দিকে বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। পরে তারা সাংবাদিকদের সামনে তাদের অবস্থান তুলে ধরেন।
রাষ্ট্রসংস্কারে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গেল ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট হয়েছে।
গণভোটের রায় অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে শুরুতে ধাক্কা খায় বিরোধী দল। তারা সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সরকারির দল শুধু সংসদ সদস্যের শপথ নেয়।
পরবর্তীতে সংবিধানের সংস্কার পরিষদ গঠন না করে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। এ সংক্রান্ত প্রস্তাব পাসের দিন সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিল বিরোধী দল।
বৃহস্পতিবার ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বৈঠকে বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব নিষ্পত্তির পর আইন প্রণয়ন কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেন শফিকুর রহমান।
তিনি জুলাই সনদ, সংবিধান সংস্কার পরিষদ, সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোর পরিণতি নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেন।
শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা যেহেতু এই আলোচনায়, বৃহৎ স্বার্থে আমরা পুরা সংস্কার চাই, আমরা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন চাই এবং আমরা এইভাবে খণ্ডিত কোনো প্রক্রিয়ার অংশ হতে চাই না, এইজন্য আমরা এখন আর এই আলোচনায়, আমরা অংশগ্রহণ করব না।”
তিনি বলেন, “এই পর্বে আমরা সংসদ থেকে বিদায় নিচ্ছি। আমরা আবার ওয়াকআউট করছি। আমরা আবার ওয়াকআউট করছি, আমরা আবার যখন উপযুক্ত, তখন ইনশাআল্লাহ আমরা আসব, অংশগ্রহণ করব, জনগণের পক্ষে কথা বলব।”
বিশেষ অধিবেশন না ডাকায় ক্ষোভ
দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাস, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংসদের বিশেষ অধিবেশন চেয়ে আগে দেওয়া চিঠির প্রসঙ্গ তুলে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তৎকালীন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সরাসরি কথা বলার পাশাপাশি একটি চিঠিও দিয়েছিলেন। তার অনুলিপি স্পিকার ও প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু তার কোনো উত্তর পাননি বলে অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, “বলেছিলাম যে এই সংসদটা আমাদের জাতীয় সকল কর্মকাণ্ডের মূল ভার যে দাবি রাখে, এই ধরনের একটা স্পর্শকাতর সময়ে সংসদের একটা বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করার জন্য।”
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, দ্রব্যমূল্য এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সেই অধিবেশন চাওয়া হয়েছিল, বলেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, “একদিকে মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না, লোডশেডিংয়ের জ্বালা, অন্যদিকে ভুতুড়ে বিল। এর কোনো সদুত্তর নাই। গ্যাসেরও তীব্র সংকট দেখা দিল।”
জ্বালানি সংকটের কারণে বিপুল সংখ্যক কারখানার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে কত কারখানা বন্ধ হয়েছে, সে বিষয়ে বিভিন্ন সংখ্যা পাওয়া যাচ্ছে তুলে ধরে তিনি বলেন, “কেউ ৭০০ বলছে, কেউ ৯০০ বলছে, কেউ ৯৫টা বলতেছে, হোয়াটএভার মেবি; কিন্তু বোঝা যাচ্ছে যে বিপুল সংখ্যক কারখানার ওপরে এর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।”
‘চব্বিশের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সংসদ’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে তারা ‘গতানুগতিক’ সংসদ হিসেবে দেখেননি।
তিনি বলেন, “এটা ভিন্নধর্মী একটা সংসদ এবং চব্বিশের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটা সংসদ। আশা ছিল যে সংসদের সূচনা থেকেই আমরা একটা ফ্রেশ স্টার্ট করতে পারব দেশের জন্য, জাতির জন্য।”
কিন্তু সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট হওয়ার পরও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, বলেন তিনি।
শফিকুর রহমানের দাবি, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, সরকারি ও বিরোধী উভয় পক্ষই গণভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়েছিল।
“কিন্তু এইটা যখন বাস্তবায়িত হল না, জনগণের মধ্যে একটা আতঙ্ক, একটা অনিশ্চয়তা, একটা সন্দেহ দেখা দিল।”
সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকার বিষয়টি নিয়ে প্রথম অধিবেশন থেকেই বিরোধ ছিল। ১৫ মার্চ সংসদে এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন শফিকুর রহমান। পরে ৩১ মার্চ তার মুলতবি প্রস্তাবের ওপর প্রায় তিন ঘণ্টা আলোচনা হয়। পরদিন ‘প্রতিকার না পাওয়ার’ অভিযোগ তুলে বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশের প্রসঙ্গও তোলেন শফিকুর রহমান।
তিনি অভিযোগ করেন, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক অধ্যাদেশের কয়েকটি কার্যকারিতা হারাতে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন, নির্বাচন কমিশন-এ মূল জায়গাগুলো, যেগুলো ঠিক না হলে ফ্যাসিবাদ থেকে এই দেশ এবং সমাজ মুক্তি পাবে না, সেগুলোই বাতিল করে দেওয়া হল।”
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩ অধ্যাদেশ পর্যালোচনায় সংসদের বিশেষ কমিটি ৯৮টি হুবহু এবং ১৫টি সংশোধন করে আইনে পরিণত করার সুপারিশ করেছিল। ১৬টি অধ্যাদেশ আরও যাচাই করে নতুন বিল হিসেবে আনার সুপারিশ করা হয়। আরও সাতটি অধ্যাদেশ রহিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
১০ এপ্রিল পর্যন্ত ছয় দিনে ৯১টি বিল পাস করে মোট ১২০টি অধ্যাদেশের সাংবিধানিক নিষ্পত্তি করে সংসদ। ওই সময় ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারানোর পথে যায়। এর মধ্যে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশও ছিল।
মানবাধিকার কমিশন নিয়ে আগেও বিরোধ
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নতুন বিল উত্থাপনের বিরোধিতার পেছনে আগের অধ্যাদেশ বাতিলের ঘটনাও তুলে ধরেন বিরোধীদলীয় নেতা।
গত ৯ এপ্রিল বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন আবার কার্যকর করার বিল পাস হয়েছিল। সরকার তখন বলেছিল, আরও যাচাই-বাছাই করে মানবাধিকার কমিশনের জন্য শক্তিশালী আইন আনা হবে।
অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার পর সেই আইনের অধীনে নিয়োগ পাওয়া মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও চার সদস্য নিজেদের ‘বিদায়ের’ কথা জানিয়ে খোলা চিঠি দিয়েছিলেন।
এরপর ১০ অগাস্ট মন্ত্রিসভা নতুন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়া অনুমোদন করে।
গুমবিরোধী আইন নিয়েও আপত্তি
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলও বৃহস্পতিবার উত্থাপনের কার্যসূচিতে রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের অগাস্টে গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রেখে অধ্যাদেশের খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয়। পরে ওই বছরের ডিসেম্বরে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশের গেজেট হয়।
কিন্তু ত্রয়োদশ সংসদ বসার পর সেটিও সরাসরি আইনে পরিণত হয়নি।
গত ৫ এপ্রিল জামায়াতের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিনকাসেম আরমান সংসদে ওই অধ্যাদেশ আগে আইনে পরিণত করে পরে প্রয়োজন হলে সংশোধনের দাবি জানিয়েছিলেন।
আইনমন্ত্রী তখন আরও যাচাই করে ‘যুগোপযোগী’ বিল আনার আশ্বাস দেন।
পরবর্তী খসড়া তৈরির সময় মতামত দেওয়ার জন্য মাত্র একদিন সময় দেওয়ায় টিআইবিও সমালোচনা করেছিল।
বৃহস্পতিবার সরকারি বিল উত্থাপন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিরোধীদলীয় নেতা।
শফিকুর রহমান বলেন, “আজকের দিনটা হল বৃহস্পতিবার। আমাদের কনসেনসাস অনুযায়ী এই দিনটা হচ্ছে বেসরকারি দিবস। বেসরকারি দিবসে সরকারি বিল আসে কি না এটা আমার জানা নেই।”
তিনি বলেন, মন্ত্রী ছাড়া সরকারি ও বিরোধী উভয় দলের সংসদ সদস্যই বেসরকারি সদস্য হিসেবে বিল আনতে পারেন।
তার অভিযোগ, বেসরকারি সদস্যদের বেশ কিছু বিল অপেক্ষমাণ থাকার পরও সেগুলো না এনে সরকারি বিল উত্থাপন করায় তাদের ‘অধিকার ক্ষুণ্ণ’ হয়েছে।
সংবিধান সংশোধন কমিটি
সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের অংশ না নেওয়ার বিষয়টিও ব্যাখ্যা করেন শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, তাদের বারবার সংসদের ভেতরে ও বাইরে ওই কমিটিতে যোগ দিতে বলা হয়েছে।
কিন্তু বিরোধী দল সংবিধান ‘সংশোধন’ নয়, গণভোটের রায় অনুযায়ী ‘সংস্কার পরিষদ’ চেয়েছে।
তিনি দাবি করেন, প্রথমে সংসদে যে কমিটি পাস হয় তার নাম ছিল ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি’। পরে নামের সঙ্গে ‘বিশেষ’ শব্দ যুক্ত করা হলেও সেটি সংসদ থেকে পাস করা হয়নি।
সরকার গত ২৯ এপ্রিল সংবিধান সংশোধনে ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটির প্রস্তাব দেয়। বিরোধী দল তখন ‘ধারণাগত পার্থক্যের’ কথা বলে নাম দেওয়া থেকে বিরত থাকে।
পরে ১৩ জুলাই কমিটি গঠনের প্রস্তাব পাসের সময় গণভোটের রায় ‘বাইপাস’ করার অভিযোগ তুলে বিরোধী দল ওয়াকআউট করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত ওই কমিটির প্রথম বৈঠক হয় ৪ অগাস্ট। বিরোধী দল সেখানে অংশ নেয়নি।
‘মূল সংস্কারের দাবি চাপা দেওয়া হচ্ছে’
শফিকুর রহমানের অভিযোগ, বিচ্ছিন্নভাবে এসব বিল এনে পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের মূল দাবি চাপা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, “এইসব কিছুতে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে সংসদকে ঠেলে একতরফাভাবে, একপেশে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।”
তার ভাষ্য, “আমরা আশঙ্কা করছি যে এর মাধ্যমে সংস্কারের যে মূল দাবি, সেটাকেই চাপা দেওয়া হয়। তো আমরা সেই চাপা দেওয়ার পক্ষে নাই।”
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তাদের অবস্থান পূর্ণাঙ্গ সংস্কার এবং গণভোটের রায়ের বাস্তবায়নের পক্ষে।
এরপর তিনি ওয়াকআউটের ঘোষণা দেন।