Published : 09 Jul 2025, 12:26 AM
কর্মচারীদের আন্দোলনের মুখে সরকারি চাকরি অধ্যাদেশ সংশোধনের যে প্রক্রিয়া সরকার শুরু করেছে সেটির সম্ভাব্য পরিবর্তনের বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এসেছে কর্মচারী ইউনিয়নের নেতাদের কাছ থেকে।
সচিবালয়ে বিভিন্ন স্তরের কর্মচারী নেতারা বলেন, অধ্যাদেশ সংশোধনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর কর্মচারীদের ক্ষোভ অনেকাংশে কমেছে।
তবে উপদেষ্টা পরিষদে অধ্যাদেশের সংশোধনের খসড়ার নীতিগত অনুমোদন হলেও তা প্রকাশিত না হওয়ায় তাদের কেউ কেউ নির্ভার হতে পারছেন না। সরকারের তরফে নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে সম্ভাব্য সংশোধনের বিষয়ে তাদের আশ্বস্ত করায় তারা আন্দোলন থেকে বিরত থাকছেন। এখন তারা অপেক্ষা করছেন সংশোধনের গেজেট প্রকাশের।
মঙ্গলবার আন্দোলনের প্রথম সারিতে থাকা নেতারা বলেন, সংশোধনের খসড়া প্রকাশ করা না হলেও কী কী সংশোধন আনা হচ্ছে সেসব বিষয়ে তাদের ধারণা দেওয়া হয়েছে। আলোচিত এই সরকারি চাকরি অধ্যাদেশে থাকা ‘অনানুগত্য’ শব্দটির অস্পষ্টতা দূর করার পাশাপাশি বিচার-শাস্তির প্রক্রিয়ায়ও কিছুটা ‘স্বস্তি' আনা হবে বলে সরকারের তরফে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে।
সচিবালয়ে কর্মচারীরা দুটি মোর্চায় ভাগ হয়ে থাকলেও অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবেই আন্দোলন করেছিলেন।
বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা কর্মচারী ঐক্য পরিষদের একাংশের মহাসচিব মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উপদেষ্টা মহোদয়দের (আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল) সঙ্গে কথা বলে আমাদের উদ্বেগের জায়গা অনেকটা দূর হয়েছে। আমাদেরকে সংশোধিত অধ্যাদেশের একটি খসড়াও দেখানো হয়েছে। কিন্তু সেটা আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট আকারে প্রকাশ করার আগ পর্যন্ত স্বস্তি প্রকাশ করার কারণ নেই। গেজেট আসলে আমরা তা দেখে অনুভূতি জানাব।”
কর্মচারীদের আরেক অংশের সভাপতি বাদিউল কবীর বলেন, “অনানুগত্যের যে ব্যাপারটা সেখানে যুক্ত ছিল সেটা নিয়েই আমাদের বেশি আপত্তি ছিল। সেই শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে বলে আমরা শুনেছি। আশা করছি চলতি সপ্তাহের মধ্যেই গেজেট প্রকাশ হবে।”
কর্মচারীদের আন্দোলনে সক্রিয় আরেক নেতা সোহরাব হোসেন বলেন, “আইন মন্ত্রণালয়ে সরকারি চাকরি অধ্যাদেশের একটি সংশোধনী চূড়ান্ত হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। সেকারণে আন্দোলন স্তিমিত আছে। সংশোধনী প্রকাশে বিলম্ব হলে হয়তো কর্মচারীরা আবার আন্দোলনে নামবে।”
গত ২৫ মে সরকারি চাকরি আইন ২০১৮তে বেশ কিছু সংশোধনী এনে সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এই আইনকে নিপীড়নমূলক আখ্যায়িত করে একমাস ধরে সচিবালয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ করেছেন কর্মচারীরা। পরে নিজেদের মধ্যে সংঘাতে জড়িয়ে আন্দোলন থেমে যায়। পাশাপাশি সরকারও এই অধ্যাদেশ সংশোধনের উদ্যোগ নেয়।
সম্ভাব্য সংশোধনের বিষয়ে যা জেনেছেন নেতারা
আলোচিত যে অধ্যাদেশ ঘিরে আন্দোলনমুখর হয়ে ওঠে সচিবালয় সেই অধ্যাদেশের ৩৭ক ধারায় আচরণ ও দণ্ড সংক্রান্ত বিধানে বলা হয়েছে, “যদি কোনো সরকারি কর্মচারী এমন কোনো কার্যে লিপ্ত হন যাহা অনানুগত্যের শামিল বা যাহা অন্য কোনো সরকারি কর্মচারীর মধ্যে অনানুগত্য সৃষ্টি করে বা শৃঙ্খলা বিঘ্ন করে বা কর্তব্য সম্পাদনে বাধার সৃষ্টি করে।”
এজন্য দণ্ডের বিধান রাখা হয় অধ্যাদেশে। ‘অনানুগত্য’ শব্দটি নিয়েই কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ভয় ও আতঙ্কর কাজ করছিল। তারা আশঙ্কা করে আসছিলেন, এই আইন ব্যবহার করে ঊর্ধ্বতনরা কারও বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হলে সেটা ‘অসদাচরণ’ গণ্য করে শাস্তি বা হয়রানি করার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি নারী অধস্তনদের চাপে ফেলে অবৈধ সুবিধা আদায় করার চেষ্টা করবেন।
কর্মচারী ইউনয়নের নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় অনানুষ্ঠানিকভাবে সংশোধনের সম্ভাব্য খসড়ার কিছু অংশ তুলে ধরে আইন উপদেষ্টা তাদের আশ্বস্ত করেছেন এক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার।
এক্ষেত্রে ধারাটিতে সম্ভাব্য যে বদল আনার কথা তাদের বলা হয়েছে তা হল - “যদি কোনো সরকারি কর্মচারী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বৈধ আদেশ অমান্য করেন, আইনসংগত কারণ ছাড়া সরকারের আদেশ, পরিপত্র এবং নির্দেশ অমান্য করেন বা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করেন কিংবা অন্যদের প্ররোচিত করেন তাহলে তা ‘গুরুতর অসদাচরণ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ’ হবে।”
নেতারা বলছেন, নতুন অধ্যাদেশে ‘অনানুগত্য’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে এবং ’অসদাচরণ’ শব্দটির সঙ্গে ‘গুরুতর’ শব্দটি যোগ করা হচ্ছে বলে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে।
কর্মচারী ইউনিয়নের অন্যতম নেতা নজরুল ইসলাম বলেন, “আইন উপদেষ্টার সঙ্গে সবশেষ বৈঠকে আমরা আশ্বস্ত হয়েছি যে- ‘অনানুগত্য’ শব্দটি রহিত করা হচ্ছে। অচিরেই এই বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হবে বলে আমাদেরকে আইন মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে।”
অধ্যাদেশের বাকি ধারাগুলোয় তেমন বদল আসবে না বলে কর্মচারীদের বলা হয়েছে।
শান্তির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য যেসব পরিবর্তন আনার আলোচনা শোনা যাচ্ছে তা হল- চাকরি থেকে ‘অপসারণের’ পরিবর্তে ’বাধ্যতামূলক অবসর’।
তবে ‘নিম্নপদ বা নিম্নবেতন গ্রেডে অবনমিতকরণ ও চাকরি হইতে বরখাস্ত’- এই দুটি বিষয় অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে।
মীমাংসা বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু সংশোধন আনার বিষয়েও নেতারা জানতে পেরেছেন।
এর মধ্যে রয়েছে, কারণ দর্শানোর পর শাস্তি দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলে ’তিন দিনের মধ্যে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন’, যা বর্তমান অধ্যাদেশে ছিল না। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রধান নিজেই শাস্তি দিতে পারছেন। সাত দিন সময়ে দিয়েই দণ্ড আরোপের বিধান বর্তমানে বলবৎ রয়েছে।
অধ্যাদেশের খসড়া সংশোধনীতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিতে একজন নারী সদস্য রাখার বাধ্যবাধকতা রাখা হচ্ছে, যা আগে ছিল না। পাশাপাশি আগের মতোই তদন্ত কমিটির রায়ের বিরুদ্ধে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে আপিল করার বিধান থাকছে।
কর্মচারী নেতাদের সঙ্গে সংশোধন নিয়ে আলোচনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফোন করা হলেও আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সাড়া মেলেনি।
নতুন সংশোধনের খসড়ার সম্ভাব্য পরিবর্তনগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে এবং কাজ কতদূর এগোল তা জানতে আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব হাফিজ আহমেদ চৌধুরী এবং অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মহিউদ্দিনকে ফোন করা হলেও তারা ধরেননি।
সরকারি চাকরি আইন সংশোধন হচ্ছে, অধ্যাদেশের খসড়া অনুমোদন
সরকারি চাকরি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা, কী পদক্ষেপ নেবে সরকার?
সরকারি চাকরি অধ্যাদেশ 'পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে': আইন উপদেষ্টা
বিক্ষোভের মধ্যেই সরকারি চাকরি আইন সংশোধনের অধ্যাদেশ জারি
সচিবালয়ের কর্মচারীরা বললেন, অধ্যাদেশ বাতিল না হলে আন্দোলন চলবেই