Published : 02 Aug 2026, 08:56 AM
তিন দশক আগে ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা গুলিস্তানে যে পাতালপথ বা আন্ডারপাস নির্মিত হয়েছিল তা এখন মোবাইল মেরামতের বাজারে পরিণত হয়েছে।
নিরাপদ পারাপারের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল এ স্থাপনা। তবে বর্তমানে স্যাঁতসেঁতে, ঘিঞ্জি পথটি দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারেন না পথচারীরা। এর মধ্যে অগ্নিঝুঁকি বিবেচনায় স্থাপনাটিকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ফায়ার সার্ভিস।
গেল সপ্তাহে সরেজমিনে দেখা যায়, সারি সারি মোবাইল মেরামতের দোকানে পুরো পাতালপথজুড়ে চলছে বাণিজ্যিক কার্যক্রম। হাঁটার জন্য নির্ধারিত পথের বড় অংশই দোকানিরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। দোকানের সামনে মেরামতের ডেস্ক, চেয়ার ও সরঞ্জাম রেখে সরু করে ফেলা হয়েছে পথ।
এ পাতালপথে মোট আটটি ফটক রয়েছে, এর মধ্যে ১ নম্বর পথ দিয়ে মার্কেট সমিতি অফিস, নাট্যমঞ্চ ও বঙ্গভবনে যাওয়া যায়। ২ নম্বর ফটক দিয়ে আহাদ পুলিশ বক্স ও নবাবপুর মার্কেট, ৩ নম্বর ফটক দিয়ে ট্রেড সেন্টার ও শপিং কমপ্লেক্স এবং ৪ নম্বর ফটক দিয়ে গোলাপ শাহ্ মাজার ও নগর ভবনে যাওয়া যায়।
এছাড়া ৫ নম্বর ফটক দিয়ে গোলাপ শাহ্ মাজার ও রাজধানী হোটেল, ৬ নম্বর দিয়ে বায়তুল মোকাররম মসজিদ, ৭ নম্বর ফটক দিয়ে মাওলানা ভাসানী স্টেডিয়াম ও বায়তুল মোকাররম মসজিদ এবং ৮ নম্বর ফটক দিয়ে বঙ্গভবন, রাজউক ও মতিঝিলের দিকে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
পাতালপথের প্রায় প্রতিটি প্রবেশমুখেই ভাসমান দোকান চোখে পড়ল। কেউ ডিম, কেউ দই, কেউ ছোলা-মুড়িসহ হরেক রকমের খাবার বিক্রি করছেন। ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ময়লা-আবর্জনা।
প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য মোট আটটি ফটক থাকলেও ভেতরে পথচারীদের জন্য স্বস্তিকর কোনো পরিবেশ নেই। কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (সেন্ট্রাল এসি) পুরোপুরি নষ্ট না হলেও প্রায় অকার্যকর।
বিএম ইলেকট্রিকসের কর্মী রাজিব বলেন, “যতটুকু চলে, সেটা এমনিতে বোঝা সম্ভব না। বাইরে থেকে এলেও প্রায় একই রকম তাপমাত্রা মনে হয়। কিন্তু এগুলো না চললে বোঝা যায়, কতটা ভয়াবহ গরম।”
ঢাকা সিটি করপোরেশনের (বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ) অধীনে ১৯৯৭ সালে এ পাতালপথটি চালু হয়েছিল। শুরুতে ১০ ফুট চওড়া পথের দুই পাশে ৯০ থেকে ১০০ বর্গফুটের দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ১০৪টি।
কয়েকজন ব্যবসায়ী স্বীকার করেন, শুরুর দিকে এ পথ দিয়ে পথচারীরাই চলাচল করতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে মার্কেট জমে ওঠায় পথচারীর জায়গা দখল করে নিয়েছেন দোকানিরা।
পথচারীদের অস্বস্তি, হয়রানি
পাতালপথটিতে ঢুকলেই ক্রেতা ভেবে ডাকাডাকি শুরু করেন দোকানিরা। পথ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ হাঁকডাক চলতেই থাকে।
পথচারী সোহেল রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলছিলেন, “আমার দরকার লাগলে আমি নিজেই তো দোকানে ঢুকব।
“রাস্তা পার হওয়ার জন্য হয়তো এক গেট দিয়ে ঢুকলাম, তারা একদম শুরু থেকেই ডাকা শুরু করে, অন্য গেট দিয়ে বের না হওয়া পর্যন্ত ডাকতেই থাকে। বিষয়টি খুবই বিরক্তিকর।”
দোকানের ভিড় আর হট্টগোলে ত্যক্ত-বিরক্ত পথচারী সামাদ আলী বললেন, “দোকানের গ্যাঞ্জামে কোনদিকে ঢুইকা কোনদিকে বাইর হমু, বুঝি না। এর লাইগা রাস্তা ধইরাই হাঁডি।”
নারী পথচারীদের অনেকেই নিরাপত্তাহীনতা ও হয়রানির আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।
রেজোয়ানা রহমান নামের এক বেসরকারি চাকুরে বলেন, “সম্ভব হলে সবসময় এটা (আন্ডারপাস) এড়িয়ে যাই। ভেতরে অনেক সময় ভবঘুরে লোকজন দাঁড়িয়ে থাকে, কেউ কেউ বিশ্রীভাবে তাকিয়ে থাকে। অস্বস্তি লাগে খুব।”
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাবরিনা শারমিন বলেন, “সঙ্গে পরিচিত কেউ থাকলে আন্ডারপাস ব্যবহার করি। একা হলে ভয় লাগে।
“অনেক সময় সিঁড়িতে বখাটে টাইপের ছেলেদের অকারণে বসে থাকতে বা সিগারেট ফুঁকতে দেখি।”
ভিড় ঠেলে পার হতে গিয়ে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগও করেছেন একাধিক নারী।
রাবেয়া রৌশান নামের এক পথচারী বলেন, “হাঁটার সময় দুপাশের দোকানের সামনে ভিড় করে থাকা লোকজন ইচ্ছা করেই খুব বাজেভাবে গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করে। আর নেশাখোরদের যন্ত্রণা তো আছেই!”
পথচারীদের বেশিরভাগই উপরের সড়কই ব্যবহার করেন বলে ভাষ্য গুলিস্তান এলাকার হকার সবুর আলীর।
তার কথায়, “খুব কম মানুষই মাটির নিচের রাস্তা দিয়া যাতায়াত করে। অনেকে জানেও না। সবাই উপরের রাস্তাই ব্যবহার করে।”
‘চোরাই মোবাইলের আখড়া’
পাতালপথটি চোরাই মোবাইল বাজার বলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে চুরি ও ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোনের আইএমইআই নম্বর পরিবর্তন করে পুনরায় বিক্রি করা সেখানকার একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগ পাতাল মার্কেট লাগোয়া একটি দোকানে অভিযান চালিয়ে আইএমইআই নম্বর পরিবর্তনের সফটওয়্যার, দুটি ল্যাপটপ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, ১৬টি মোবাইল ফোন ও নগদ অর্থসহ একজনকে গ্রেপ্তার করে।
তখন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, চুরি হওয়া ফোন সংগ্রহ করে আইএমইআই নম্বর পরিবর্তনের মাধ্যমে পুনরায় বিক্রি করা হতো।
তবে এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই বলে দাবি করলেন সেখানকার এক দোকানির।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এসব ভুয়া। দু-একটা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের এসব অপবাদ দেওয়ার অধিকার আপনাদের কে দিল?
“পুলিশ দুইটা লোক ধরে, আর আপনারা (মিডিয়া) আমাদের সবাইকে চোর বানিয়ে দেন। পারলে প্রমাণ করেন যে আমরা চুরির মোবাইল বেচি।”
তবে ভিন্ন কথা উঠে এল সেবা নিতে আসা গ্রাহকদের কথায়।
মোবাইল ফোনের ডিসপ্লে পাল্টাতে আসা বেসরকারি চাকুরে এস এম আকাশ রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চোরাই ফোন এখানে বিক্রি হয়, তা জানি। কিন্তু চোরাই ফোন কিনতে আপনার-আমার মতো ভদ্রলোকেরাও এখানে আসে। তাহলে আপনি আটকাবেন কী করে?”
একই ধরনের কথা ঝরল পথচারী আব্দুস সালামের কণ্ঠেও।
তার ভাষায়, “এইডা তো চোরাই মোবাইলের আখড়া! আর চোরাই মার্কেটে চোর-ছ্যাঁচড় থাকবই। পরিবেশও নষ্ট হইবো, এইডাই স্বাভাবিক।”
মার্কেটের বাইরে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্য দুর্জয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা যে পথচারী পারাপারের জন্য বানানো, সেটা আপনার থেকে আমি প্রথম জানলাম। আমি এইটুকুই জানি যে, যাদের মোবাইল সারানোর প্রয়োজন হয়, তারাই কেবল এখানে আসে।
“কেবল রাস্তা পার হওয়ার উদ্দেশ্যে পথচারীরা এই স্থাপনা ব্যবহার করছেন, সেরকম শুনিনি বা খেয়াল করিনি কোনোদিন।”
সন্ধ্যার পর পাতালপথে নারীদের হয়রানি, বখাটেদের উৎপাত আর চোরাই মোবাইল বেচাকেনার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যেসব এলাকায় অপরাধ বেশি সংঘটিত হয় বা অপরাধপ্রবণ বলে আমরা বিবেচনা করি, সেসব জায়গায় আমরা নিয়মিতভাবেই অভিযান পরিচালনা করে থাকি।”
তবে এই পাতালপথের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ‘স্পট ডিউটি’ বা আলাদা নজরদারির ব্যবস্থা নেই জানিয়ে এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “সেখানে নির্দিষ্ট কোনো প্রোগ্রামের জন্য আলাদা ডিউটি দেওয়া বা আলাদা কোনো প্রতিষ্ঠানের কাজ করার সুযোগ নেই।
“ওই এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় বলেই আলাদা করে একটি পুলিশ বক্স রাখা হয়েছে।”
ফায়ার সার্ভিসের চোখে
পুরো মার্কেটে আলো ও বাতাস চলাচলের জন্য সিঁড়ি থেকে নিচে নামার মুখে ১০ ফুট বাই ৬ ফুট আকারের মাত্র দুটি জানালা সদৃশ খোলা অংশ রয়েছে। এছাড়া পুরো আন্ডারপাসে ধোঁয়া বের হওয়ার বিকল্প কোনো বায়ুনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই। অগ্নিকাণ্ড ঘটলে ধোঁয়া বের হওয়া কিংবা ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের বিকল্পভাবে ভেতরে প্রবেশের সুযোগও নেই।
এমন পরিস্থিতিতে অগ্নিঝুঁকির কথা জানিয়ে বিভিন্ন সময় নোটিস দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। ২০২১ সালেও মার্কেটটি পরিদর্শন করে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল। বঙ্গবাজারে অগ্নিকাণ্ডের পর ২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল পুনরায় জরিপ শেষে ফায়ার সার্ভিস ঢাকা বিভাগের জোন-১-এর তৎকালীন উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মদ বজলুর রশিদ এটিকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করেন।
সে সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “মার্কেটের নিচে পানির কোনো উৎস বা রিজার্ভার নেই। আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের ঢোকার পথটিও খুবই সংকীর্ণ।
“এছাড়া ফায়ার ডিটেক্টর ও অ্যালার্ম সিস্টেম নেই। কিছু অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র (ফায়ার এক্সটিংগুইশার) থাকলেও সেগুলো পুরোপুরি কার্যকর নয়।”
এই মার্কেটের অগ্নিঝুঁকির বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের উপপরিচালক (মিডিয়া) শাহজাহান শিকদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "উন্নত দেশগুলোতে আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেটের সঙ্গে উন্নত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাও থাকে। বাংলাদেশে আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট নির্মাণে আগ্রহ দেখা গেলেও সেই মানের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি।”
তিনি বলেন, “ওখানে ঢুকলে দেখবেন কোনো ভেন্টিলেশন নেই। দুর্ঘটনা ঘটলে ধোঁয়ার ঘনত্ব অনেক বেড়ে যাবে।
“তাপ বের হতে পারবে না, ফলে তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যাবে এবং মানুষের জীবন বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।”
ফায়ার সার্ভিসের এ কর্মকর্তা বলেন, সাধারণভাবে এ ধরনের স্থাপনায় হাইড্র্যান্ট পয়েন্ট, হোসরিল ব্যবস্থা, স্প্রিংকলার সিস্টেম, স্মোক ডিটেকশন ও অটো অ্যালার্ম সিস্টেম থাকা প্রয়োজন। ফায়ার সেফটি প্লান গ্রহণ করে সেটির শর্ত বাস্তবায়ন করার কথা থাকলেও এই মার্কেট নির্মাণের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি।
শাহজাহান শিকদার বলেন, “আমি বা ফায়ার সার্ভিস আগুন নেভাতে যাব, কর্মীরা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করবেন। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে, সেখানে যারা ব্যবসা করছেন কিংবা যারা রাস্তা পার হওয়ার জন্যে ব্যবহার করেন— তাদেরই।
“এই বোধ যদি সবার মধ্যে তৈরি করা যায়, তাহলে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে।”
সরেজমিনে মার্কেটজুড়ে ২২টি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দেখা গেছে, যেগুলোর মেয়াদ ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত।
তবে ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরের বলছে, পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে কেবল এই সামান্য সংখ্যক যন্ত্র অগ্নিঝুঁকি রোধে মোটেও যথেষ্ট নয়।
কী বলছে মার্কেট সমিতি
ভেতরের চরম অব্যবস্থাপনার ছবি তুলতে শুরু করলে এ প্রতিবেদককে কয়েকজন ব্যবসায়ী বাধা দেন। গুলিস্তান স্কয়ার পাতাল সড়ক মার্কেট সমিতির সভাপতি মো. টিটুর বক্তব্য নিতে তার দোকান ‘ফাতেমা ইলেকট্রনিক্স’-এ একাধিকবার গিয়ে কর্মীদের বৈরী আচরণের মুখে পড়তে হয়।
আর সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও শাহিন গোল্ডের মালিক মো. শাহীন পারিবারিক শোকে থাকায় তার বক্তব্যও জানা সম্ভব হয়নি।
সমিতির অফিস সহকারী আব্দুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ১৯৯৭ সালে যখন মার্কেট চালু হয়, তখন সিটি করপোরেশন ২-৩ মাসের জন্য সিকিউরিটি গার্ডের ব্যবস্থা করেছিল।
“কিন্তু তারা ঠিকঠাক দায়িত্ব পালন না করায় সিটি করপোরেশন তাদের প্রত্যাহার করে এবং পরবর্তীতে মার্কেট সমিতির পক্ষ থেকে ১০ জন সিকিউরিটি গার্ড রাখা হয়, যারা শিফট মেনে মার্কেটে দায়িত্ব পালন করেন। অগ্নিঝুঁকি বিবেচনায় রেখে আমরা নিজেরাই মার্কেটে ২০-২২ টি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ব্যবস্থা করেছি।”
তবে আব্দুর রহমান মানছেন যে, অগ্নি নিরাপত্তায় যে ধরনের ব্যবস্থা থাকা উচিত, তার বেশির ভাগই সেখানে নেই।
সিটি করপোরেশনের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মার্কেটের বেশিরভাগ দোকানই ১০০ স্কয়ার ফিট, তবে ২-৪ টি দোকানের এর চেয়েও ছোট। সিটি করপোরেশন ভাড়া বাবদ টাকা নেওয়া ছাড়া আর কোনো দায়িত্বই নেয় না। ১০৪ টি দোকানের প্রতি দোকান থেকে আনুষঙ্গিক খরচসহ গড়ে ৪-৫ হাজার টাকা ভাড়া দেওয়া হয় সিটি করপোরেশনকে।
সমিতির অফিস সহকারী আব্দুর রহমান বলেন, “আমরা প্রতি বর্গফুটের জন্য নির্ধারিত ২৬ টাকা হারে ভাড়া দেই সিটি করপোরেশনকে।”
তিনি বলেন, মার্কেটের এসি ১৯৯৭ সালে লাগানোর বছর দুয়েক পরেই নষ্ট হয়ে যায়, তারপর মার্কেট সমিতির পক্ষ থেকে নতুন করে এসি লাগানো হয়। এছাড়াও সিলিংয়ের অগ্নিরোধী জিপসাম বোর্ড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সিটি করপোরেশন থেকে কোনো উদ্যোগ না থাকায় পরবর্তীতে মার্কেট সমিতি উদ্যোগী হয়ে এই জিপসাম বোর্ড পরিবর্তন করে।
আব্দুর রহমান বলেন, সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অগ্নিঝুঁকিসহ বিভিন্ন সমস্যার ব্যাপারে সিটি করপোরেশনকে মার্কেটের ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে কয়েক দফা চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে কয়েক দফা মিটিং ও হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার পর বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়।
তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া না হলেও ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার আন্ডারপাসটির ব্যাপারে তদন্ত করা হয়েছে এবং অগ্নিঝুঁকির বিষয়ে তাদের সতর্ক করা হয়েছে।
আব্দুর রহমান বলেন, মার্কেটে যে ধরনের উপকরণ নিয়ে কাজ করা হয়, তার বেশিরভাগই খুবই দাহ্য। তাই বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কা সবসময় থেকেই যায়।
তিনি দাবি করেন, সাধারণ মানুষ দোকানের দখলদারত্ব এবং গ্রাহক ভিড়ের কারণে এ পাতালপথ ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না, এটি একেবারেই ভুল ধারণা।
“প্রতিদিনই হাজার হাজার মানুষ এই আন্ডারপাস ব্যবহার করে।”
এ মার্কেট পথচারীদের কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই বলেও দাবি করেন সমিতির অফিস সহকারী আব্দুর রহমান।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতিদিন রাত ৮টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত আন্ডারপাসটি বন্ধ রাখা হয়।
“মার্কেটের নিয়মিত উন্নয়নের পাশাপাশি মসজিদ ও শৌচাগারও মার্কেট সমিতির পক্ষ থেকেই নির্মাণ করা হয়েছে। এতোবড় একটা মার্কেট, মসজিদ আর বাথরুম চলবে কীভাবে? সিটি করপোরেশন ওই মাসিক ভাড়া তোলা ছাড়া আর কিছুই করে না এই মার্কেটের জন্য “
‘সবই অবৈধ, তবু ওভারলুক’
পাতালপথটির অব্যবস্থাপনার বিষয়ে জানতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সম্পত্তি, রাজস্ব ও কর বিভাগসহ একাধিক দপ্তরে ১০-১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কথা বলতে রাজি হননি।
তাদের কেউ বলছেন, “নতুন এসেছি”; কেউ আবার বলেন, “এ বিষয়ে আমি জানি না।”
দুই যুগের বেশি সময় ধরে ডিএসসিসিতে কর্মরত এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখানে অনুমোদিত কোনো মার্কেট সমিতি নেই। কাজেই সমিতির নামে তারা যা-ই করবে, তার সবই অবৈধ।
“তারা সিটি করপোরেশনের জায়গায় ওয়াশরুম, অফিস, মসজিদসহ যেসব স্থাপনা তৈরি করেছে, তার সবই অবৈধ। তবে অনেক সময় যেসব বিষয় খুব বেশি সমস্যার সৃষ্টি করে না, সেগুলো আমরা ওভারলুক করি।”
তবে অগ্নিঝুঁকি ও পাতালপথে পথচারীদের হাঁটার জায়গা দখল করার বিষয়টি নজরে আছে জানিয়ে তিনি বলেন, “ইতোমধ্যে আমরা সংশ্লিষ্ট বিভাগে প্রতিবেদন দিয়েছি। খুব শিগগিরই অভিযান পরিচালিত হবে এবং অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
পথচারীদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, “অনিরাপত্তা সেখানে আছে, সেটা সত্যি। সেখানে চোরাই মোবাইল বিক্রির মতো বিভিন্ন অবৈধ কার্যক্রম পরিচালিত হয়, সেটা আমরাও জেনেছি।
“কিন্তু এই দোকানগুলো না থাকলে আন্ডারপাসটি আরও আগেই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ত। অতীতে চরম নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আন্ডারপাস আমরা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছি, সেরকম নজির আছে।”
তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা মাসিক ৪-৫ হাজার টাকা ভাড়া দিলেও ১৯৯৭ সালে যখন এই আন্ডারপাস নির্মিত হয়, তখন তারা প্রত্যেকে কমবেশি সাড়ে ৭ লাখ টাকা ‘সালামি’ দিয়ে দোকানগুলোর বরাদ্দ নিয়েছিলেন।
‘সালামি’ বলতে তিনি কী বুঝিয়েছেন, তা স্পষ্ট করতে রাজি হননি এ কর্মকর্তা।
প্রায় ৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ পাতালপথের উদ্দেশ্য ছিল ব্যস্ততম গুলিস্তান মোড়ে পথচারীদের নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করা; কিন্তু কালক্রমে এটি ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেটে রূপান্তরিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ডিএসসির ওই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, “চাইলে সবই করা সম্ভব। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় অনেক সহজ বিষয়ও বাস্তবায়ন করা অসম্ভব।”
‘অবৈধ অর্থনীতি ও নীরব বৈধতা’
গুলিস্তান আন্ডারপাসের এ কাঠামোগত বিশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা সংকট নিয়ে বহু বছর ধরেই কথা বলে আসছেন নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “পাবলিকের হাঁটার স্পেসগুলোতে দোকান দেওয়া হয়েছে। তবে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা যে বলেছেন, ‘দোকানগুলো থাকার কারণে জায়গাটা কিছুটা নিরাপদ’—এই কথার আংশিক সত্যতা আছে।
“কারণ সেখানে করপোরেশন বা ডিএমপি যেহেতু কোনো নিরাপত্তা দেয় না, তাই দোকান থাকার কারণে কিছুটা নিরাপত্তা তৈরি হয়। কিন্তু তাই বলে এই দোকানগুলো এভাবেই থাকার কথা নয়। ধরুন, তিনটি দোকান থাকলে নিরাপদ হতো বা মানুষের আনাগোনায় কিছুটা সেফটি থাকত।
“কিন্তু এখানে তো লাইনের পর লাইন দোকান দেওয়া হয়েছে। এর স্কেল বা মাত্রা এবং বৈধতার বিষয়টি এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “আমাদের এখানে স্কেলটা একেবারেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এই যে সালামির কথা বলা হচ্ছে, সেটা মূলত চাঁদাবাজিকে নির্দেশ করে।
“এই টাকাগুলো তো রাষ্ট্র পাচ্ছে না। পরিস্থিতি এমন বিশৃঙ্খল হয়ে গেছে এবং দোকানের সংখ্যা এত বেড়েছে যে এই ভিড় এখন উল্টো এক ধরনের উপদ্রব এবং নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। নারীদের জন্য এত মানুষের ভিড় ঠেলে যাতায়াত করা বেশ কঠিন।”
চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাব প্রসঙ্গে এ নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, এই যে অব্যবস্থাপনায় সব চলছে, এর পেছনে প্রতি মাসে ব্যবসায়ীদের মাসোহারা দিতে হয়। ক্ষমতাসীন দলের লোকজন এখান থেকে ভাগ নেয়—এমন কথা প্রতিনিয়ত শোনা যায়।
“এই পেছনের বিষয়গুলো সমাধান করতে না পারলে পথচারীবান্ধব ফুটপাত বা আন্ডারপাস—কোনোটিই অর্জন করা সম্ভব হবে না।”
মার্কেট সমিতির নামে ‘দখলদারিত্ব’ চললেও সিটি করপোরেশন নীরব ভূমিকায় রয়েছে মন্তব্য করে আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “মার্কেট সমিতির যেহেতু বৈধতা নেই, তাদের এসব স্থাপনা দখলদারিত্বের নামান্তর। সিটি করপোরেশনও পুরো বিষয়টিতে একধরনের নীরব বৈধতা দিয়ে যাচ্ছে।
“তাদের যে এনফোর্সমেন্ট, গভর্ন্যান্স ও মনিটরিংয়ের কাজ—সেটি না করে তারা একের পর এক এগুলোর বৈধতা দিয়ে যাচ্ছে। সিটি করপোরেশনের উচিত আন্ডারপাসগুলোর জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করে সেই অনুযায়ী পরিচালনা করা।”
কর্তৃপক্ষের নির্লিপ্ততা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “সরকার বা মন্ত্রী বদলালেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। সরকার সবকিছু জানার পরও বিস্ময়করভাবে নীরব।”
সামগ্রিক অব্যবস্থাপনার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখানে আগে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ফলপ্রসূ হয়নি।
“দু-একদিনের মধ্যে আমি আপনাদের (সাংবাদিক) সাথে নিয়ে আন্ডারপাসটি পরিদর্শনে আবার যাব। সবকিছু দেখে-বুঝে তারপর প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করব।”