Published : 17 Mar 2011, 08:45 AM
লিংক: শুরুর কিস্তি । কিস্তি ১০
(কিস্তি ১০-এর পর)
কাকার শেষের দিককার দিনগুলো একটা গৎবাঁধা নিয়মে চলত। নানাজনে বোহেমিয়ান বলে যে একটা অপবাদ তাঁর ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন, আদৌ কি তিনি তাই ছিলেন? তাঁর একটা লেখা পাঠ করলে দেখা যায় তিনি কতটুকু নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করতেন। তিনি লিখেছেন :
গান করছেন আহমদ ছফা
ছফা কাকার মৃত্যুর বছর দেড়েক আগে তাঁকে ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হয়েছিল। আমি যেতে চাইনি। তাঁকে একা রেখে চলে যাওয়াটা আমার জন্য খুবই কষ্টের ছিল। তিনি তো প্রায় সময় অসুস্থ থাকতেন। আমার মনে হত তিনি যে-কোন সময় দম বন্ধ হয়ে বিছানায় মরে পড়ে থাকবেন। আমি তাঁর অসুস্থতার কথা মনে করিয়ে দিলে তিনি বললেন, আমার মৃত্যুর সময় কোন আত্মীয়-স্বজনকে কাছে রাখতে চাই না। আমাকে কবরস্থ করারও দরকার নেই। আমি আমার মৃতদেহ হাসপাতালে দিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করে যাব।
তিনি আমাকে স্মরণ করিয়ে দিতেন, একটা বড় বৃক্ষের নিচে আরেকটা বড় বৃক্ষ জন্মায় না। তোমাকে বড় হতে হলে আমার কাছ থেকে দূরে চলে যেতে হবে। আমি অনুমান করছি, তুমি আমার প্রভাবে প্রভাবিত হচ্ছ। তাছাড়া আমার চেয়ে অনেক অল্প বয়সে তোমার বাবা মারা গেছেন। আমিও বেশিদিন বাঁচব না। আমি যখন মারা যাব ঢাকা শহরে তোমার পায়ের তলে মাটি থাকবে না, যেখানে তুমি ভর দিয়ে দাঁড়াতে পার। এখন থেকে তোমাকে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে হবে, যাতে বড় ধরনের বিপদেও তুমি ভেঙে না পড়।
ছফা কাকার কথা আমার মনে ধরেছিল এবং আমি কমলাপুরে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে থাকতে শুরু করেছিলাম। তার অর্থ এই নয় যে, আমি তাঁকে একেবারে ছেড়ে চলে গিয়েছি। আমি প্রতিদিন তাঁর খবরাখবর রাখতাম। সপ্তাহে কম করে হলেও দু' তিনদিন আমি তাঁর কাছে যেতাম। তাঁর সব ব্যাপারে আমাকে খোঁজ-খবর রাখতে হত এবং খোঁজ-খবর রাখার চেষ্টা করতাম।
ছফা কাকা মারা গিয়েছিলেন আটাশ জুলাই, দুই হাজার এক সালের এক বৃষ্টিঝরা দিনে। তাঁর মৃত্যুর আগে-পরের কিছু ঘটনার সাক্ষী আমাকে হতে হয়েছিল। দুর্ভাগ্য আর সৌভাগ্য যেটাই বলি, তাঁর মৃত্যুর দৃশ্যটিও আমাকে কাছে থেকে দেখতে হয়েছিল। মানুষের জন্ম যেমন জীবনের একটা অংশ, মৃত্যুও তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হওয়া উচিত। সুতরাং আমি নিজেকে উপস্থিত রেখেই ঘটনার পূর্বাপর ব্যাপারগুলো বয়ান করার চেষ্টা করছি।
ছফা কাকা যেদিন মারা যান তার আগে আমি অফিসের কাজে দু' মাসের জন্য উত্তরবঙ্গ গিয়েছিলাম। সময়টা ছিল জুন মাসের প্রথমদিক। মাঝখানে একবার ঢাকা এসেছিলাম, সেটা জুনের শেষের দিকে। ত্রিশে জুন ছিল ছফা কাকার জন্মদিন। ঢাকায় এসে আমি তাঁর জন্য কিছু কাপড়চোপর কিনেছিলাম। ভেবেছিলাম জন্মদিনে তাঁকে ওগুলো উপহার হিসেবে দেব এবং ওই দিনটা আমি তাঁর সঙ্গে কাটাব। কিন্তু সে সৌভাগ্য আমার হয়নি। তার আগে আমাকে আবার ঢাকা ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। আমি অফিস থেকে আমার ঘরে যাবার সময় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। আমি পারতপক্ষে তাঁর কাজে ব্যাঘাত ঘটে ওরকম কোন কর্ম করতাম না। তাই আমি বাইরে থেকে দরজা এমনভাবে খুললাম যাতে তিনি বুঝতে না পারেন। তার পরেও তিনি টের পেয়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, "কে?"
তখনও তিনি টেবিলে ঝুঁকে কী একটা বইয়ের প্রুফ দেখছিলেন। আমি সালাম দিয়ে এগিয়ে যেতে তিনি খাড়া হয়ে বসলেন। আমার একটা অভ্যাস ছিল আমি ক'দিনের জন্য ঢাকার বাইরে কোথাও যাবার জন্য মনস্থির করলে তাঁর পা ধরে সালাম করতাম এবং ফিরে এসে একই কায়দায় তাঁর পায়ের দিকে এগিয়ে যেতাম। তিনি আমাকে না করতেন না। আমার মনে হত তাঁর আশীর্বাদ বৃথা যেতে পারে না। সালাম করে বেরিয়ে যেতে তিনি বলতেন, ফি আমানিল্লাহ! ভাল থাকবে। আর ফিরে এলে বলতেন, বেটা, শরীর ভাল তো? আমি কিন্তু অস্থির হয়ে পড়েছিলাম। একটা ফোন করলে তো পারতে।
এবারও আমি তাঁর পায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি আমাকে বাধা দিয়ে বললেন, পা ছুঁয়ে সালাম করার সে যুগ আর নেই। তোমার সংবাদ বল।
আমি বললাম, ভালই তো ছিলাম। আপনি কেমন আছেন?
তিনি স্বভাবসিদ্ধ জবাব দিলেন, ভাল থাকার চেষ্টা করছি।
হঠাৎ তিনি কেশে উঠলেন। আমি বললাম, আপনার শরীর ভাল নেই।
তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, বুড়ো বয়সে এক-আধটু হয়। ওসব ছেড়ে দাও। তোমার কি বাইরে যেতে হবে?
আমি বললাম, জি।
কতদিনের জন্য?
মাসখানেক।
ঠিক আছে, ঘুরে এস। পথে কোথাও পানি খাবে না। বোতল কিনে নিয়ে যাবে। যেখানে থাক চিঠি লিখবে। গ্রামের মানুষকে বোঝার চেষ্টা করবে। আমি আজ বেশি কথা বলতে পারব না।
কথাগুলো তিনি এক নিশ্বাসে বলে গেলেন। পারতপক্ষে তাঁর সঙ্গে আমি বেশি কথা বলতাম না। এক সঙ্গে অনেকগুলো উপদেশ গ্রহণ করে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম। দু'দিন বাদে তাঁর জন্মদিন। সেদিন আমার থাকা হবে না। সেটা আমাকে খুব করে পীড়া দিতে থাকল। তাঁর জন্য যে কাপড় কিনলাম সেগুলোও দিলাম না। তাঁকে কিছু দিতে আমি ভয় পেতাম। তিনি সহজে কোন কিছু গ্রহণ করতে চাইতেন না। আর গ্রহণ করলেও তার আগে আমাকে হাজারটা তিরস্কার হজম করতে হত। তাই তাঁকে না বলাটা শ্রেয় মনে করেছিলাম। আমার মনে হল যেদিন কাপড়গুলো দেব সেদিনই যা শুনতে হয় শুনব।
পরের দিন আমি উত্তরবঙ্গ চলে গেলাম। সিডিউল অনুযায়ী এক মাসের বেশি সময় আমাকে থাকতে হবে। যেতে হবে গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রামে। থাকা, খাওয়া, পরা সমস্ত কিছুই একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে। তাছাড়া বর্ষা-বাদলের দিন। পথ-ঘাটের কথা চিন্তা করলে গা শিউরে উঠতে হয়। আমি ধরে নিলাম কাজ করতে এসেছি, কাজ করব। মামার বাড়িতে তো আর বেড়াতে আসিনি? সুতরাং দিনরাত কাজ করে একদিন আগেও যদি ঢাকায় চলে যেতে পারি সেটাই মঙ্গল। নির্দিষ্ট সময়ের আগে ঢাকায় গেলে হয়ত জিল্লুর স্যার (ড. হোসেন জিল্লুর রহমান) একটু রাগ করবেন। রাগ করলে করুন। আমি তো কাজে ফাঁকি দিচ্ছি না। তাছাড়া জিল্লুর স্যার আমাকে খুব স্নেহ করেন। তিনি যদি রাগ করেন তার উত্তাপ যে ক্ষীণ হবে সেটা আমার অন্তরিন্দ্রিয় বলে দিয়েছিল।
আমি নির্দিষ্ট সময়ের এক সপ্তাহ আগে কাজ করে চলে এলাম। আমি আমার ঘরে এলে রুমমেট শামীম বলল, ছফা কাকাকে ফোন করেছিলাম। তিনি অসুস্থ।
আমি অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, সিরিয়াস কিছু?
সে জবাব দিল, ওরকম কিছু বলেননি। পায়ে নাকি ব্যথা। হাঁটাহাঁটি করতে কষ্ট হয়।
আমি ধরে নিলাম, তাঁর অসুখের তো শেষ নেই, হয়ত এটা আরেকটা। অনেক অসুখ তো তিনি লুকিয়ে রাখেন। ব্যথা তো আর গোপন রাখা যায় না। তাই হতে পারে এটা তাঁর মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে।
পরের দিন আমি অফিসে গেলাম। জিল্লুর স্যারের সামনে পড়তে আমি ঘাবড়ে গেলাম। মনে হল এই বুঝি তিনি আমাকে নানা প্রশ্নবানে জর্জরিত করে ফেলবেন। কিন্তু না। আমি পুরো ব্যাপারটি তাঁকে বুঝিয়ে বলতে সক্ষম হলাম। তিনি আমাকে উল্টো অভিনন্দন জানালেন। মনে হল আমার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। এত কথা বলছি এ কারণে, আমি যদি এক সপ্তাহ সময় না বাঁচিয়ে ঢাকার বাইরে থেকে যেতাম তা হলে ছফা কাকাকে কখনও দেখতে পেতাম না। সারাজীবন আমাকে এ কষ্টটা দ্বিগুণ ভারে বয়ে বেড়াতে হত।
অফিসের কাজকর্ম বুঝিয়ে দিতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। বাইরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। অফিসে আসার সময় ছফা কাকার জন্য কেনা কাপড়গুলো আমি পলিথিনের ব্যাগে করে নিয়ে এসেছিলাম। ওগুলো হাতে করে আমি বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তায় নেমে কোনো দরদাম না করে একটা রিকশায় চেপে বসলাম। বাংলামটরে যখন ছফা কাকার বাড়িতে পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। দরজার বাইরে থেকে লোকজনের কথা শোনা যাচ্ছিল। তার মানে ভেতরে আরও লোক আছে। আমি কলিং বেল চাপলাম। সঙ্গে সঙ্গে ছফা কাকার কণ্ঠ ভেসে এল, "কে?"
এই 'কে' শব্দটা তিনি খুব তীক্ষ্ণ এবং জোরাল কণ্ঠে বলতেন। তাঁর এ-শব্দটা অপরিচিত কেউ শুনলে প্রাথমিকভাবে ধরে নেবেন তিনি খুব রেগে আছেন অথবা বিরক্ত হয়েছেন। আমিও প্রথম প্রথম তা-ই মনে করতাম। এসে দরজা খুলে দিল। চট্টগ্রামের 'নিপ্পন একাডেমি'র প্রধান নুরুল ইসলাম সাহেব এবং চন্দনাইশের আরও দুটো ছেলে সোফায় বসে কাকার কথা শুনছেন। হঠাৎ আমার উপস্থিতিতে তাঁদের আলাপে ছেদ পড়ল। এ তিনজনকে আমি আগে থেকে চিনতাম। তারপর ছফা কাকা তাঁদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ছেলে দুটো অনেকদিন ধরে ছফা কাকার পিছু লেগে আছে। তারা ছফা কাকাকে চন্দনাইশে নিয়ে গিয়ে একটা সম্বর্ধনা দিতে চায়। তিনিও রাজি হয়েছেন। কিন্তু গ্রামের বাড়িটা না বানানো পর্যন্ত তিনি যাবেন না। ওখানে গেলে তাঁর থাকাটা নিয়ে তিনি খুব দুশ্চিন্তায় ছিলেন।
ইদ্রিস আলির সঙ্গে আহমদ ছফা
আমি ছফা কাকার জন্য আনা কাপড়গুলো ব্যাগ থেকে বের করে টেবিলের ওপর রাখলাম। এ মুহূর্তে তাঁকে কিছু দেব সেটা ছিল তাঁর কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত। কাপড়গুলো দেখার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিদ্যুতের শক খাওয়ার মত আঁতকে উঠলেন। বললেন, এ কাপড় আমি নেব না, তুমি ফেরত দিয়ে এস।
আমি বললাম, একমাস আগে আপনার জন্মদিন উপলক্ষে কিনেছিলাম। আপনাকে দেয়ার সুযোগ হয়নি। এখন ফেরত দিলে দোকানদার নিতে চাইবে না।
অন্য কাউকে দিয়ে দাও। গলার তেজটা তাঁর বরাবরই থেকে গেছে।
আমি হেসে বললাম, আমার দেয়ার মত কেউ নেই। ইচ্ছে হলে আপনি কাউকে দিয়ে দিতে পারেন।
ছফা কাকা মেহমানদের দিকে তাকিয়ে কিছুটা নমনীয় হলেন। তারপর তাঁদের উদ্দেশে বললেন, আমার ভ্রাতুষ্পুত্রটি আমাকে এত কাপড়চোপর দিচ্ছে, আমি পরার সুযোগও পাইনে।
তিনি কাপড়গুলো ইদ্রিসকে রাখতে দিলেন। ইদ্রিস কাপড়গুলো নিয়ে গেলে আমিও তার পেছনে পেছনে গেলাম। ইদ্রিস বলল, কাপড়গুলো এনে ভালই করেছেন। কোত্থেইকা দুইডা ছেলে আইছিল। সাবে দুই-চাইরডা কাপড় রাইখা বেবাকডা দিয়া দিছে। আমার মন চায় নাই। কিন্তু সায়েবেরে বুঝাইব কেডা?
ইদ্রিস আমাকে নিয়ে গিয়ে অবশিষ্ট কাপড়গুলো দেখাল। সত্যি তা-ই। কিন্তু আমি একটু অবাক হইনি। এ ধরনের ঘটনা তিনি হামেশাই করতেন। সুতরাং এটা আর নতুন কী। একদিনও পরেননি এমন কাপড়ও আমি তাঁকে দিয়ে দিতে দেখেছি। বাড়িতে গেলে বিশাল ব্যাগে করে কাপড়চোপর নিয়ে যেতেন। সবই নিজের ব্যবহারের। এলাকার লোকজন নানা আবদার নিয়ে আসত। তিনি তাদের মধ্যে এসব কাপড়চোপর বিলিয়ে দিতেন। একবার দেখা গেল, কাপড়চোপর বিলি করতে করতে একজোড়া প্যান্ট-শার্ট এবং পরনের লুঙ্গিটা ছাড়া আর অবশিষ্ট কিছুই নেই। টাকা পয়সা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। গাড়ির ভাড়া বাবদ একজনের কাছ থেকে পাঁচ শ' টাকা ধার করেছেন। তিনি ঠিক করেছিলেন সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দেবেন। ওই রাতে এক লোক এসে ছফা কাকাকে তার পরনের ছেঁড়া লুঙ্গিখানা দেখাল। তার আবদার, যদি একখানা লুঙ্গির পয়সা যদি তিনি দেন তাহলে তার খুব উপকার হয়। সঙ্গে সঙ্গে ছফা কাকা আমার ওপর গেলেন খেপে। বললেন, হারামজাদা, তোরে বললাম ঘরে কোন লোক ঢুকতে দিবি না। বললাম, লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তাড়াতে। কথাগুলো বলার পর কাকা এক ধরনের নাকে কান্না কাঁদলেন। তিনি ধমক দিয়ে সকলকে ঘর থেকে বের করে দিলেন। লোকটিকে বললেন, বাইরে গিয়ে দাঁড়াও। সকলে বেরিয়ে এলে ছফা কাকা ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন। মিনিট পাঁচেক পর দরজা খুলে তিনি আমাকে ডাকলেন। ইতোমধ্যে ছফা কাকা বিছানার চাদরখানা শরীরে পেঁচিয়ে পরনের লুঙ্গিটা ছেড়ে নিয়েছেন। আমি এগিয়ে এলে তিনি আমাকে বললেন, এটা দিয়ে দাও। এরপর থেকে আর কাউকে যেন না দেখি।
ওসব কথা থাক। ইদ্রিস আমাকে এক কাপ চা করে দিল। আমি চা পান করছিলাম। এরই মধ্যে ইদ্রিস এসে বলল, আনোয়ার ভাই, সায়েব আপনের প্যান্ট পরব না।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ইদ্রিস আবার কী হয়েছে?
কিছু হয়নি। আপনের প্যান্টের কোমর ছোডো।
কী করে বুঝলে?
আগের প্যান্টের লগে মিলাইয়া দেখছি।
ইদ্রিস, তোমার ভুল হচ্ছে। দু'মাস আগেও এ মাপের প্যান্ট কিনেছি।
আপনে তো জানেন না, সায়েবের শরীর বাড়ে-কমে।
আমি তার কথা বিশ্বাস না করে আরেকটা প্যান্টের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করলাম। সত্যিই তা-ই। একেবারে তিন ইঞ্চি কম। অর্থাৎ তাঁর কোমর এখন আটত্রিশ। ইদ্রিসকে বললাম, রেখে দাও। কাকাকে বলে লাভ নেই। সকালে যখন পরবেন তখন নিজেই বলে দেবেন ক' ইঞ্চি লাগবে। তখন তুমি প্যান্টটা আমার ঘরে নিয়ে যেয়ো।
সাড়ে আটটার পরে গেলে আমাকে পাওয়া যাবে না, একথাও তাকে বলতে ভুল করলাম না।
মেহমানরা চলে যাবেন। ইদ্রিসের ডাক পড়ল। দরজা খুলে দিতে হবে। সে ছুটে গেলে আমিও তার পেছনে পেছনে গেলাম। মেহমানদের বিদায় দিয়ে ছফা কাকা আমাকে বসতে বললেন। আমি সোফায় বসে অপলক দৃষ্টিতে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তাঁর চোখ মুখ আগের চে' ফোলা ফোলা মনে হল। চোখের মণি দুটো কেমন ঘোলাটে। এরই মধ্যে তিনি একটা সিগারেট জ্বালালেন। আমি বললাম, শুনলাম আপনার শরীর ভাল নেই। বাস্তবেও তো তা-ই দেখাচ্ছে।
তিনি অ্যাসট্রেতে ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, একটুখানি তা-ই।
ডাক্তার দেখিয়েছেন?
কমিউনিটি হাসপাতালে ফোন করেছিলাম। কাল যাব।
তিনি হাসপাতালে যাবেন শুনে আমি মনে মনে খুশি হলাম। স্বভাবত তাঁকে এরকম কথা বলতে শোনা যায় না। হাসপাতাল, ডাক্তার, ওষুধ এসবের কথা বললে তিনি আগুনের মত জ্বলে উঠতেন। আজ নিজের থেকে যাবেন বলছেন এটাই আমার খুশির কারণ।
এত কথা বাড়ানো যাবে না। ছফা কাকা আমার শরীরের ওপর আগাগোড়া চোখ বুলোলেন। বললেন, গ্রামে কাজ করতে খুব কষ্ট হয়, তাই না?
আমি হেসে বললাম, একটু তো হয়ই। তবে মজাও আছে। বিচিত্র রকমের মানুষের সঙ্গে কথা বলা যায়, এটাও কম কী?
ঠিক বলেছ। সকলের বোঝা উচিত আমাদের শেকড়টা গ্রামে। ওটাকে বাদ দিয়ে সত্যিকার বিকাশ সম্ভব নয়।
এরই মধ্যে তিনি প্রসঙ্গ পাল্টালেন। সিগারেটটা জ্বলতে জ্বলতে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। কিন্তু ছাইটা ভেঙে পড়েনি। হয়ত এদিক সেদিক হলেই ভেঙে পড়বে। আমি বললাম, ছাইটা কাপড়ে পড়বে, একটু ঝেড়ে নিন।
তিনি মৃদু হাসলেন, জীবনে অনেক কিছু ছাড়লাম, কিন্তু সিগারেট ছাড়তে পারলাম না। আমার অনেকগুলো ব্যর্থতার মধ্যে এটাও একটা।
সিগারেট নিয়ে তাঁকে এধরনের কথা বলতে আর কখনও শুনিনি। তিনি অ্যাসট্রের মধ্যে অর্ধজ্বলা সিগারেটটা একেবারে গুঁড়িয়ে দিলেন। তারপর বললেন, ছেলে দুটো আমাকে চন্দনাইশে নিয়ে যেতে চায়। তারা চাইছে আমাকে সম্বর্ধনা দিতে।
সে তো অনেক শুনেছি। আপনি যাবেন যাবেন করেও তো যাচ্ছেন না।
যাই কী করে। বাড়িটা তো করা দরকার। জিল্লুর, ফরহাদ এঁরা যদি যেতে চান আমি তো তাঁদের বসতে দিতে পারব না। তার চাইতে বড় লজ্জা আর কী হতে পারে?
তিনি অনেকক্ষণ চুপ থাকলেন। তারপর কথা বলা আরম্ভ করলেন, তোমার দিকটা গুছিয়ে নাও। বর্ষার শেষেই গ্রামে যাবো। এরই মধ্যে যদি কিছু টাকা পেয়ে যাই এবং বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে ধার করে বাড়িটা করে ফেলব। গ্রামে আহমদ ছফার একটা বাড়ি থাকবে না সেটা কী করে হয়? রচনাবলি তৃতীয় খণ্ডটা অনেক দূর গুছিয়ে ফেলেছি। প্রবীণ বটের (একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা) একটা অডিও করার চেষ্টা চলছে। গানগুলো গাওয়ারও একটা ব্যবস্থা হচ্ছে। ওঙ্কারটা সিনেমার পর্দায় দেখা যাবে। এক সঙ্গে অনেকগুলো কাজ। তারপরে বুকের ভেতর একটা অসম্পূর্ণতা কাজ করছে।
আমি বললাম, আপনি জীবনীটা লিখতে আরম্ভ করুন। শরীরে না কুলোয় তো রেকর্ড করে রাখুন। আমি আস্তে আস্তে লিখে নেব।
সেটি মন্দ হয় না। আবার কী যেন ভেবে বললেন, জীবনীটা নিজের মত করে লিখব।
ডক্টর সলিমুল্লাহ খান তাঁর অলাতচক্র উপন্যাসের উপর পত্রিকায় একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন। তিনি আমাকে লেখাটির কথা মনে করিয়ে দিলেন। তখন তিনি খুবই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছিলেন। তিনি গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বললেন, সলিমুল্লাহ আমাকে বড় লেখক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সে আমাকে মীর মোশাররফ হোসেন এবং কাজী নজরুল ইসলামের কাতারে নিয়ে গেছে। লোকজন আমাকে এখন খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। এ ধরনের কথাবার্তা নিজের দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়। আমার তো মনে হয়, আমার আর পিছিয়ে যাবার পথ নেই।
পরদিন ছিল বিষ্যুদবার। আমি অফিসে গিয়ে ছফা কাকাকে ফোন করলাম। সকাল তখনও দশটা বাজেনি। আমার কণ্ঠ শুনতেই বলে উঠলেন, বেটা কী খবর? কোন দুঃসংবাদ?
আমি বললাম, না। এখন আপনার শরীর কেমন?
তিনি জবাব দিলেন, ভাল থাকার চেষ্টা করছি।
ভাল তো থাকতে হবে। ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন না?
বিকালে লোক আসবে তখন যাব।
আমি ফোন রেখে দিলাম। কিন্তু মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি কাজ করছিল। সেই সঙ্গে সন্দেহও। আসলে কি তিনি ডাক্তারের কাছে যাবেন? ডাক্তার, হাসপাতাল, ওষুধ–এগুলো তাঁর মুখে আমার কাছে কথার কথা মনে হত। কাজ করতে গিয়ে আমি স্থির থাকতে পারছিলাম না। আড়াইটা বাজে তিনি আমাকে ফোন করলেন। আমি ফোন ধরলে বললেন, বেটা, ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি।
কণ্ঠের মধ্যে একটা জোর শুনতে পেলাম। আমি বললাম, তা-ই নাকি? আমি আসব?
তোমার আসার দরকার নেই। আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য হাসপাতাল থেকে লোক এসেছে। তুমি বরং তোমার কাজ কর। তোমার কাপড়গুলো আমার পছন্দ হয়েছিল, কিন্তু ছোট হয়ে গেল। ওগুলো কি পাল্টানো যাবে?
এতদিন পর পাল্টিয়ে দেয়ার তো কোন প্রশ্নই আসে না। তথাপি বললাম, নিশ্চয় পাল্টানো যাবে।
তাহলে জামাটাও পাল্টিয়ে নিয়ো। চাইনিজ কাট এবং সাদা হলে ভাল হয়।
বাংলামটরের বাড়িতে যখন পৌঁছলাম ছফা কাকা তার আধা ঘণ্টা আগে হাসপাতালের উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে গেছেন। আমি ইদ্রিসের সাহায্য নিয়ে প্যান্টের মাপটা ঠিক করলাম। আগের কাপড়গুলো সঙ্গে নেয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম না। ইদ্রিসকে বললাম, ওগুলো কাকা না-দেখে-মতো সামলে রাখ।
আমি রিকশায় চেপে সোজা এলিফ্যান্ট রোডে চলে গেলাম। জামাটা দুয়েক দোকান ঘুরে কিনে ফেললাম বটে, কিন্তু প্যান্ট পছন্দ করা আমার জন্য এক কষ্টকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক সময় ব্যয় করার পর একটা প্যান্ট আমার মনে ধরল এবং কিনলামও। বাসায় এসে দেখলাম ছফা কাকা তখনও ফেরেননি। তিনি আসা পর্যন্ত আমাকে বসে থাকা ছাড়া কোন উপায় থাকল না। ইদ্রিসকে বললাম, আগের প্যান্টটা তুমি আমার ব্যাগে ঢুকিয়ে দাও। আর জামাটা নতুনগুলোর সঙ্গে রাখ।
সময়টা পার করার জন্য আমি ছাদে রাখা টবের পরিচর্যা আরম্ভ করে দিলাম। ইদ্রিস গাছগুলোতে পানি দিত, কিন্তু গাছগুলোর আরও যে কিছু করা দরকার সেটা সে করত না। যেমন, আগাছা সাফ করা, গোড়ার মাটি আলগা করা, মরা ডালপালা ছেটে দেয়া, সার দেয়া ওসব আমাকে করতে হত। কাকাও ওগুলো আমাকে দিয়ে করাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। আমি যখন কাজগুলো করছিলাম ইদ্রিসও আমাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এল। দু'জনে মিলে কাজগুলো করতে খুব আনন্দ পাচ্ছিলাম। আমাদের কাজ কিছু দূর এগুতেই কলিংবেল বেজে উঠল। কাজ ফেলে দু'জনেই এগিয়ে গেলাম। দরজা খুলতেই দেখলাম ছফা কাকা দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি এমনভাবে হাঁপাতে থাকলেন মনে হল নিশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। নিশ্বাসের সঙ্গে গলার ভেতর থেকে একটা কেরুত-কেরুত শব্দ বেরিয়ে আসছিল। হয়ত গলার ভেতরে কফ জমে আছে। এ ধরনের ঘটনা আমি বহুবার দেখেছি। রেলিং-এ ভর করে সিঁড়ি ভেঙে চারতলায় উঠে আসতে তাঁকে কম করে হলেও চারবার জিরিয়ে নিতে হত। ওই সময় একটা নিশ্বাস আরেকটা নিশ্বাসের নাগাল পেত না। আজকে তাঁর শরীরের অবস্থা আরও কাহিল মনে হল। তিনি একটা পলিথিনের ব্যাগে করে বেশ কিছু ওষুধ এনেছেন। ব্যাগটা ইদ্রিসের হাতে দিয়ে পা পা করে ঘরে ঢুকে খাটের ওপর গিয়ে বসলেন। তিনি খুবই ক্লান্ত, মুখে কোন কথা নেই। ইদ্রিস শরীর থেকে জামাটা টেনে বের করে নিল। জুতোজোড়া খুলে যথাস্থানে রাখল। তারপর লুঙ্গিটা বাড়িয়ে দিলে তিনি বসা অবস্থায় পরে নিলেন। কিন্তু প্যান্টটা খুলতে পারলেন না। সেটা হাঁটু অবধি নামিয়ে রাখলেন। ইদ্রিস সযত্নে পা থেকে তা বের করে নিল। আরও বহুবার তিনি অসুস্থ হয়েছেন, কিন্তু এভাবে কাপড় ছাড়তে সাহায্য লাগেনি। কাপড় ছাড়া শেষ হলে ছফা কাকা খাটের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন। তারপর হাত-পা ছেড়ে দিলে তাঁর শরীরখানা টান টান দেখাল এবং ভুঁড়িটা অস্বাভাবিক রকম ওঠানামা করতে থাকল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আমি এবং ইদ্রিস সরে দাঁড়ালাম। ভেতরে ভেতরে আমার একটা অস্থিরতা কাজ করছিল। ইদ্রিস ছাদ পরিষ্কার করতে গেলে গেল। আমি ঠায় আমার ঘরে দাঁড়িয়ে রইলাম। হঠাৎ ছফা কাকা গান গেয়ে উঠলেন:
আমার খবর হাওয়ার কাছে নিয়ো
বিশদ যদি জানতে চাহ
শিশিরে শুধায়ো।"
এ ঘটনা নতুন নয়। আগেই বলেছি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায়ও তিনি সুর করে গান করতেন। এটা ছিল কষ্টকে ভোলার এবং নিজেকে সহজ করার তাঁর একটা কৌশল। আমি পুনরায় তাঁর ঘরে গেলাম। তিনি উঠে বসেছেন। আমাকে দেখে তিনি শিশুসুলভ হেসে বললেন, বেটা, অনেক ওষুধ কিনে ফেললাম। সব টাকা শেষ হয়ে গেল।
আমি বললাম, ডাক্তার কী বলেছেন?
ডাক্তার তো অনেক কিছু বলেন। ওসব মেনে কি চলা যায়? শনিবার আবার যাব কথা দিয়েছি।
আমি কথা বাড়ালাম না। কেনা কাপড়গুলো তাঁকে দেখালাম। তিনি খুব খুশি হলেন। একটু বাড়তি তারিফ করলেন আমাকে খুশি করার জন্য। এত সুন্দর কাপড় বাংলাদেশে পাওয়া যায়?
আমি আমার অপারগতা প্রকাশ করে বললাম, আপনি যা-ই বলুন, আমি কাপড় পছন্দ করতে পারি না।
ওই সময় শেলফ থেকে একটা বই টেনে নিয়ে তিনি চেয়ার গিয়ে বসলেন। দেখলাম তাঁর মনের জোরটা অবাক করার মত। অথচ একটু আগে তিনি কথা বলতে পারেননি।
পরদিন ছিল শুক্রবার। অফিস বন্ধ। সকাল ন'টার দিকে একটা দোকানে গিয়ে কাকাকে ফোন করলাম। জিজ্ঞেস করলাম, শরীর কেমন?
তিনি জবাব দিলেন, ভাল। তোমার অস্থির হবার কারণ নেই। তুমি তোমার কাজ কর। বেশি জানতে চাইলে রেগে যাবেন সে ভয়ে আমি ফোন রেখে দিলাম। বিকেলবেলা একবার দেখা করতে যাব ভেবেছিলাম, ইচ্ছে করে আর গেলাম না।
শনিবারে অফিসে গিয়ে আবার ফোন করলাম। ইদ্রিস ফোন ধরল। জিজ্ঞেস করলাম, কাকার শরীর কেমন?
সে জবাব দিল, ভাল।
ওষুধ খেয়েছেন?
জি।
এখন কী করছেন?
শুয়ে আছেন। সায়েবকে দেব?
জেগে থাকলে দাও।
সঙ্গে সঙ্গে ছফা কাকার কণ্ঠ শুনতে পেলাম। কথাগুলো তেমন স্পষ্ট শোনা গেল না। শুধু এতটুকু বললেন, এখন কথা বলতে পারব না।
আমি বিরক্ত করলাম না।
দুপুরে খেয়ে এসে আমি আমার চেয়ারে বসলাম। তখন একটা বিশ বাজে। হঠাৎ ইদ্রিস ফোন করল। আমি কী ব্যাপার জিজ্ঞেস করতে সে বলল, সায়েব আপনাকে তাড়াতাড়ি আসতে বলেছেন।
জিজ্ঞেস করলাম, শরীর খারাপ?
সে জবাব দিল, হ।
আমি অফিস থেকে দ্রুত বেরিয়ে পড়লাম। যখন রিকশায় উঠলাম তখন মুষলধারে বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেছে। বৃষ্টির কারণে রাস্তা কিছুটা ফাঁকা। এ সুযোগে রিকশাওয়ালা আমাকে দশ মিনিটের মাথায় বাংলামটরের মোড়ে পৌঁছে দিল। বৃষ্টির বেগ তখনও কমেনি। আমার সঙ্গে ছাতা ছিল না। তাই এক দৌড়ে একেবারে বাড়ির গেটে গিয়ে থামলাম। ইতোমধ্যে আমি আধাভেজা হয়ে গেছি। ঘরে যখন ঢুকলাম আমি হাঁপিয়ে উঠেছি। ছফা কাকা শুয়ে আছেন। ইদ্রিস পাশে দাঁড়িয়ে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, শরীর কি খুব খারাপ?
তিনি সহজ গলায় জবাব দিলেন, তেমন না। তবে হাত-পা কেমন জানি ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।
তাঁর কথাগুলোর মধ্যে কোন জড়তা নেই। আমি তাঁর পাশে বসলাম। একটা হাত তুলে নিয়ে অনুভব করতে থাকলাম, আসলেই ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। আমি হাতের তালু দুটো ম্যাসেজ করে তাপ আনার চেষ্টা করলাম। কপালে বুকে হাত রাখলাম। হাতের শিরা পরখ করলাম। তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন না। আগে আমাকে কখনও তাঁর গায়ে হাত দিতে দিতেন না। এক সময় তিনি বলে উঠলেন, কমিউনিটি হাসপাতালে একটা ফোন কর।
আমি ফোন করতে গিয়ে বললাম, আমার তো নাম্বার জানা নেই।
কাকার স্মরণশক্তি ছিল অসাধারণ। অনেকের নাম্বার তিনি মুখস্থ বলতে পারতেন। তিনি স্মরণ থেকে একটা নাম্বার বললেন। আমি বললাম, এ নাম্বারটা এনগেইজড। আর কোনো নাম্বার আছে?
তিনি আরেকটা মুখস্থ নাম্বার বললেন। সঙ্গে সঙ্গে আমি সেটা লিখে ফেললাম। তারপর ডায়েল করতেই লাইন পেয়ে গেলাম। আমি কথা বলতে যাচ্ছিলাম, তখন ছফা কাকা বাধা দিয়ে আমার কাছ থেকে রিসিভার নিয়ে নিলেন। রিসিপশন থেকে হয়ত কেউ ধরেছে। তিনি ফোনটা ড. জামানকে দেয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। আর বললেন, শিগগির একজন ডাক্তার পাঠান।
তাঁর অবস্থা বিশেষ ভাল নয়। তিনি ফোন রেখে দিলেন। আমি পুনরায় তাঁর পাশে গিয়ে বসলাম। হাত দুটো আবার একইভাবে ম্যাসেজ করতে থাকলাম। ইদ্রিসকে বললাম, কাকা কিছু খেয়েছেন?
ইদ্রিস জবাব দিল, সকালে গোসল করে রুটি দিয়ে নাস্তা করেছেন। ঘণ্টাখানেক আগে জাম্বুরার রস খেয়েছেন।
আমি ছফা কাকাকে বললাম, দুধ দেব?
তিনি আহত কণ্ঠে বললেন, না। তুমি আরেকবার ফোন কর।
আমি পুনরায় ফোন করতে চেষ্টা করলাম এবং লাইনও পেয়ে গেলাম। ছফা কাকাকে রিসিভার দিতে তিনি বললেন, রণজিতকে দিন।
রণজিতের জন্য একটু অপেক্ষা করলেন। মনে হল রণজিতকে পাওয়া গেছে। তিনি বলতে থাকলেন, শোন রণজিত, আমি একটু বাদে মারা যাব। তুমি ডাক্তার সাহেবকে বলে একজন ডাক্তার নিয়ে এস।
ড. জামান হয়ত মিটিঙে আছেন এজন্য তাঁর সঙ্গে কথা বলা যাচ্ছে না। এদিকে ছফা কাকা রেগে আগুন। তিনি বারবার বলতে থাকলেন, তোমরা বুঝতে পারছ না, আমি একটু বাদে মারা যাচ্ছি। তোমরা না পারলে জবাব দাও।
ছফা কাকা ফোন রেখে দিলেন। ইদ্রিসকে বললেন, একটা লুঙ্গি দাও। ঘামে কাপড় ভিজে গেছে।
ইদ্রিস লুঙ্গি এনে দিল। ছফা কাকা কারও সাহায্য ছাড়া নিজে নিজে লুঙ্গিটা পাল্টিয়ে নিলেন। সকালের দিকে ইদ্রিসকে দিয়ে বিছানার চাদরটাও পাল্টিয়ে নিয়েছিলেন। তিনি আবার শুয়ে পড়লেন। হাবভাবে মনে হল না তিনি অসুস্থ। তবে তিনি বারবার ছটফট করছিলেন।
ইতোমধ্যে রমহতুল্লাহ নামে এক ভদ্রলোক এলেন। লোকটি কাকার বয়সের। বোধহয় কবিতা-টবিতা লেখেন। তিনি ঘরে ঢোকার আগেই ছফা ভাই, ছফা ভাই বলে চিৎকার আরম্ভ করে দিলেন। তাঁকে অনেক করে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, ছফা কাকা অসুস্থ। তিনি কথা বলতে পারবেন না। ভদ্রলোক নিজেকে আরও বেশি অসুস্থ বলে বয়ান করতে থাকলেন। তিনি হাত বাড়ালে ছফা কাকা হাত মেলালেন। তারপর শিশুসুলভ হেসে বললেন, আমি আজ কথা বলতে পারব না। আপনি আরেকদিন আসেন।
ভদ্রলোক তারপরেও বসে রইলেন। ছফা কাকা আমাকে বললেন, মাথায় পানি দাও।
ভদ্রলোক আমাকে পানি দিতে নিষেধ করলেন। বললেন, সারা শরীর এমনিতে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, পানি দিলে আরও ক্ষতি হবে। আমার মাথায়ও তা-ই ধরল। ইদ্রিস যে জলপট্টি দিয়েছিল সেটা এখনও ভেজা। আমি দ্বিতীয়বার পানি দেয়ার প্রয়োজন মনে করলাম না। ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে ছফা কাকাকে আরেকবার বিরক্ত করলেন। বললেন, ছফা ভাই আসি। আপনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। তারপর আসব। তিনি জোর করে হাত মেলালেন। ছফা কাকা একটুখানি হাসার চেষ্টা করলেন, দোয়া করবেন।
ভদ্রলোক চলে গেলে ছফা কাকা পাশ ফিরে শুলেন। ইতোমধ্যে রণজিত হন হন করে ওপরে চলে এল। সঙ্গে গাড়ির ড্রাইভার। রণজিতকে আমি আগে থেকে চিনতাম। কিন্তু কোনদিন কথা হয়নি। সে ঘরে ঢুকে ছফা কাকাকে বলল, স্যার, কষ্ট করে একটু উঠতে হবে। নিচে অ্যাম্বুলেন্স দাঁড় করিয়ে রেখেছি। আমি আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে এসেছি।
ছফা কাকা ছিলেন সব সময় এক কথার মানুষ। যেটা বলবেন সেটাই করবেন তিনি। তিনি মুখের ভাবটা বিকৃত করে বললেন, আমি হাসপাতালে যাব না। আমার যেটা প্রাণে চায় না সেটা আমি করি না, করব না। তোমাকে আমি বললাম ডাক্তার নিয়ে আসতে। তোমরা না পারলে আমি বাইর থেকে চেষ্টা করতাম। বুঝতে পারছ না, আমি একটু পরে মারা যাব।
রণজিত বিনীতভাবে বলল, স্যার, আপনাকে আমরা মরতে দিতে পারি না। আপনি কষ্ট করে জামাটা গায়ে দিন। আমরা কোলে করে আপনাকে নিচে নিয়ে যাব। আজকে বেবি আনিনি। জামান স্যার অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে দিয়েছেন।
ছফা কাকার রাগটা আস্তে আস্তে আরও ফুসতে থাকল। বললেন, আমি ইচ্ছে করলে হেঁটে যেতে পারি, কিন্তু যাব না। রণজিত তোমাকে আমি ভালবাসি। তুমি আমার ভাল চাও সেটাও আমি বুঝতে পারি। আজ আমি হাসপাতালে যাব না। কথা দিচ্ছি আগামীকাল যাব। তুমি একজন ডাক্তারের ব্যবস্থা কর।
রণজিত নাছোড়বান্দা। সে ছফা কাকাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবেই। বলল, স্যার, আপনি আজকে হাসপাতালে যাবেন বলেছিলেন। সে মতে একটা কেবিনও খালি করা আছে। আপনার অনেক শারীরিক পরীক্ষার দরকার। এখানে ডাক্তার এসে কিছু করতে পারবেন না। আমি কথা দিচ্ছি আপনাকে আবার বাসায় রেখে যাব।
এরই মধ্যে রণজিতের পীড়াপীড়িতে আমাকেও একবার অনুরোধ করতে হল। জানতাম, আমার কথায়ও কোন কাজ হবে না। তথাপি বললাম, চলুন না, আমি তো সঙ্গে যাচ্ছি। আবার না হয় নিয়ে আসব।
তিনি বললেন, আরে ধ্যুৎ তুমিও বিরক্ত করছ। আর কথা বলবে না।
রণজিতের অনুরোধের শেষ নেই। সে বলে চলল, আমি এসেছি যখন আপনাকে না নিয়ে যাব না। আপনি আমাকে যত গালাগালি করেন করেন। দেখুন, আনোয়ার ভাই মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
ছফা কাকা বিরক্তভরা কণ্ঠে বললেন, আনোয়ার, চেয়ারে রাখা টিশার্টটা রণজিতকে দিয়ে দাও।
রণজিত বলল, স্যার, আপনি না গেলে আমি কাপড় নেব না।
এবার ছফা কাকার রাগটা চরমে উঠল। বললেন, তুমি জান, ফাদার ক্লাউস আমাকে পঁয়ত্রিশ লক্ষ টাকা দিতে চেয়েছে? আমি তাঁর সঙ্গে কাজ করিনি। তুমি জান না, যেটা আমার প্রাণে চায় না সেটা আমি করি না। আজকেও করব না।
রণজিত বলল, এখানে ক্লাউসের কথা আসবে কেন? আমি তাঁর মত আপনাকে ব্যবহার করতে চাচ্ছি না।
ছফা কাকা বললেন, দেখ, একটু বাদে মারা যাচ্ছি।
কথাগুলোর মধ্যে কোনো জড়তা নেই। কোনো রকম ভণিতা নেই। অসুস্থতারও কোনো লক্ষণ নেই। মনে হবে আমরা সকলে মিলে একটা নাটকের রিহার্সেল করছি–এরকম কেউ ভাবলে তাকে দোষ দেয়ার কোনো কারণ থাকবে না। তার আগে আমি বহুবার আমি ছফা কাকাকে মুমূর্ষু অবস্থায় দেখেছি। যন্ত্রণায় কাতরাতে দেখেছি। ওই সময়টুকুতে আমাকে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ছুটোছুটি করতে হয়েছে। আজ এমন কিছু মনে হল না। সবার কাছে একটা কৌতুক ছাড়া কী মনে হতে পারে? আমি বললাম, কিছু তো খাননি, ইদ্রিসকে চারটে ভাত দিতে বলি?
তিনি বললেন, একটু পরে খাই।
বাড়াবাড়ি করার কোনো মানে হয় না। তিনি যেটাই বলবেন সেটাই সত্য, সেটাই ঠিক। একটুখানি পরে বললেন, পারলে একটু জাম্বুরার রস দাও।
আমি ইদ্রিসকে রস তৈরি করতে বললাম। রণজিত পাশের চেয়ারে চুপচাপ বসে আছে। ছফা কাকা পাশ ফিরে শুলেন। আমি ইদ্রিসকে সাহায্য করার জন্য রান্নাঘরে এগিয়ে গেলাম। সে জাম্বুরার দানা চিপে খানিকটে রস কাপে নিয়েছে। দ্রুত করার জন্য আমি তাকে তাগাদা দিতে থাকলাম। এমন সময় রণজিতের কণ্ঠ শুনতে পেলাম। সে বলল, আনোয়ার ভাই, দেখুন তো, স্যার এরকম আর কখনও করেছেন কি না।
আমি দ্রুত ছুটে এলাম। পেছনে পেছনে ইদ্রিসও। দেখলাম, ছফা কাকা চিত হয়ে হাত-পা ছেড়ে টানটান হয়ে শুয়ে আছেন। মুখটা হাঁ করা। একপাশে দাঁত নেই বলে ওপরের ঠোঁটটা কিছুটা নিচের দিকে ঝুলে পড়েছে। চোখ দুটো বড় বড় করে ছাদের দিকে তাকিয়ে। মণি দুটো একেবারে ঘোলাটে, কিছুটা উপরের দিকে উল্টে গেছে। আমি অনেকটা কান্নায় ভেঙে পড়লাম। ওই অবস্থায় পর পর দুটো হেঁচকি উঠল। আমি ইদ্রিসের সহায়তায় আরেকটা বালিশ দিয়ে মাথাটা একটু উঁচু করে দিলাম। এবার তাঁর মুখের হাঁ-টা আরও বড় দেখাল। শ্বাস-প্রশ্বাসের কোনো লক্ষণ প্রকাশ পেল না। ইদ্রিসের হাত থেকে কাপটা নিয়ে আমি পর পর দু' ফোঁটা জাম্বুরার রস তাঁর মুখে দিলাম। গলায় আটকে যেতে পারে ভয়ে বেশি ঢালার সাহস করতে পারলাম না। মনে হল রসটুকু গিলেছেন। কিন্তু কোন রকম সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। ইদ্রিসের সহায়তায় আবার একটা বালিশ নামিয়ে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে আবার দুটো হেঁচকি উঠল। তারপর সব নিথর হয়ে গেল।
রণজিতকে বললাম, ডাক্তার, ডাক্তার…
রণজিত বলল, দরকার নেই। চলুন আমরা নিচে অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যাই।
রণজিত, ইদ্রিস এবং আমি ছফা কাকাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিলাম। তিনি হাত-পা ছেড়ে দিয়েছেন। মুখ আগের মত হাঁ করে আছে। মানুষ মারা গেলে এত ভারি হয় আমি এই প্রথম জানলাম। ছোট সরু সিঁড়ি দিয়ে নামতে আমাদের ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। এরই মধ্যে আমাদের দু'বার জিরিয়ে নিতে হয়েছে। কোনো রকমে অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে তাঁর মাথাটা আমার কোলে ওপর রাখলাম। আমি বারবার তাঁর হাতের শিরা পরখ করতে থাকলাম। হ্যাঁ শিরা চলছে। ছফা কাকা মরতে পারেন না।
হাসপাতালের ইমার্জেন্সি রুমে যখন ঢোকালেন তখন প্রধান ডাক্তার থেকে আরম্ভ করে ছোট ডাক্তার সকলে ছুটে এলেন। তাঁরা সকলে চেষ্টা করলেন ছফা কাকার নিশ্বাস পুনরায় ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু পারলেন না। ড. জামান যখন নিরাশ হয়ে চেয়ারে এসে বসে পড়লেন তখন আমি বুঝে গেছি ছফা কাকা আর নেই।
ছফা কাকা বলতেন, আমি কখন মারা যাব বলতে পারব।
আমরা বলতাম, কখন মারা যাবেন।
তিনি হেসে বলতেন, বলতে তো পারতাম, কিন্তু সমস্যাটা করে জামান ভাই।
ছফা কাকা ঠিকই বলতে পেরেছিলেন কখন মারা যাবেন। ড. জামান তাঁর মৃত্যু ঠেকাতে পারেননি। তিনি পরাজিত সৈনিক। ছফা কাকা আজীবন বিজয়ী। মরণেও তিনি বিজয়ী থেকে গেলেন।
কথা বেশি বাড়াব না। ছফা কাকার মারা যাবার আধঘণ্টার মধ্যে তাঁর মৃত্যু-সংবাদ গোটা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। অল্প সময়ের ব্যবধানে ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল রাজনীতি, সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য এবং বিভিন্ন পেশার লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠেছিল। তখন অনেক তরুণ লেখক তাঁর মৃত্যু-শোকে দেয়ালে মাথা ঠুঁকে ঠুঁকে কাঁদছিলেন।
ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে ছফা কাকার লাশ রাত আটটা পর্যন্ত ছিল। তারপর লাশ নিয়ে রাখা হয়েছিল বারডেম হাসপাতালের হিমাগারে। বন্ধু-বান্ধবরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পরের দিন মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে। কিন্তু তাঁদের সে ইচ্ছা পূরণ হয়নি। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যান আহাদ চৌধুরী প্রশ্ন তুলেছিলেন আহমদ ছফা কোথায় মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। তার প্রশ্নে ছফা কাকার বন্ধু-বান্ধবেরা ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। তাঁরা আহাদ চৌধুরীর সঙ্গে কোনো রকম বিতর্কে জড়াতে চাইলেন না। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, আহাদ চৌধুরীর কাছে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চাওয়া মানে ছফা কাকাকে ছোট করা। তাঁরা আহাদ চৌধুরীর এ অপমানজনক প্রশ্নের নীরব প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন ছফা কাকাকে শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানের পাশে সাধারণ কবরস্থানে দাফন করে। ওই সময়ে কোথায় কী ঘটছে আমি কিছুই জানতাম না। আমার মনের অবস্থা এত খারাপ ছিল যে কেউ আমাকে কোন কিছু জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি। পরে শুনেছিলাম ছফা কাকাকে যে কবরে দাফন করা হয়েছে তার জন্য কর্তৃপক্ষকে ঘুষ দিতে হয়েছিল। বড়ই অপমানজনক কথা! একটি জাতির জন্য এর চেয়ে বড় লজ্জা আর কী হতে পারে! এইসব ঘটনা আমি যদি ওই সময়ে জানতাম, তাঁর লাশ গ্রামে নিয়ে দাফন করতাম, নয়তো মেডিকেলে দান করে দিতাম।
…….
বিদেশী পোশাকে ছফা
…….
ছফা কাকা মারা গিয়েছিলেন দুই হাজার এক সালের আটাশ জুলাই। সেদিন ছিল শনিবার। আগেই বলেছি কাকার লাশ বারডেমে হিমাগারে রাখা ছিল। পরের দিন রবিবার বিকেলবেলা তাঁর লাশ বারডেম থেকে প্রথম নেয়া হয় বাংলামটরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুল শিল্পী সুলতান পাঠশালায়। ওখান থেকে শাহবাগের আজিজ মার্কেটের দোতলায় যে ঘরটিতে তিনি বসতেন তার সামনে। তারপর নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে। সেখানে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। গোধূলি লগ্নে কাকার লাশ রাখা হয় টিএসসি ভবনে। এখানে আপামর জনসাধারণ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হন। হাজার হাজার মানুষের সমাবেশ হয়েছিল সেখানে। দীর্ঘ লাইন ছিল, কিন্তু তার শেষ কোথায় ছিল আমি বলতে পারব না। সকলের হাতে একেবারে না-হলেও একটা করে ফুল ছিল। নিমিষের মধ্যে ছফা কাকার লাশ ফুলে ফুলে ঢেকে গিয়েছিল। মানুষের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন শেষ হলে তাঁর লাশ গাড়িতে করে নেয়া হয় মিরপুর কবরস্থানে। গাড়িটি এনেছিলেন আবদুল হক সাহেব। ওই গাড়িতে তিনিও ছিলেন। ছিলাম আমি এবং আমার আত্মীয়-স্বজন। কবরস্থানে আরও অনেকে গিয়েছিলেন নিজেদের গাড়ি ব্যবহার করে। এ মুহূর্তে সকলের নাম করতে না পারলেও ডক্টর হোসেন জিল্লুর রহমান, ডক্টর আহমেদ কামাল, কবি ফরহাদ মজহারের দণ্ডায়মান থাকার কথা মনে পড়ছে।
যৌবনে বক্তৃতারত ছফা
কাকাকে যখন মিরপুর কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয় তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে। আকাশে ঘন কালো মেঘ ছিল। বৃষ্টির বেগ কমে আসলেও গুড়ি গুড়ি পড়ছিল। ঘুটঘুটে আঁধার রাত। বোধকরি তখন বিদ্যুৎ ছিল না। একটা হ্যাজাক বাতি ছিল আমাদের ভরসা। লাশের সঙ্গে আমাকে কবরে নামতে হয়েছিল। সঙ্গে ছিলেন আমার দুয়েকজন আত্মীয়। কারা ছিলেন এখন মনে করতে পারছি না। জীবনে এই প্রথম কারও লাশ নিয়ে আমাকে কবরে নামতে হল। তাও আবার আমার প্রিয় কাকার লাশ হাতে নিয়ে। আমি কি কখনও ভেবেছিলাম এমন একটি কর্ম আমাকে করতে হবে? হায়রে আমার নিয়তি, তুমি কত নিষ্ঠুর!
ছফা কাকার মৃত্যুর পর পত্র-পত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি হয়েছিল। বাংলা-সাহিত্যে অন্য কোন কবি-সাহিত্যিকের বেলায় এত বেশি লেখালেখি হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। সমাজ এবং মানুষের মনে কতটুকু স্থান দখল করে নিতে পারলে এমন ঘটনা ঘটা সম্ভব ছফা কাকাই তাঁর জ্বলন্ত প্রমাণ।
যতই দিন যাচ্ছে ছফা কাকার জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। সম্প্রতি তাঁকে নিয়ে নানাজন গবেষণাকর্মও করছেন। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর রচনা পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করেছে এটা আমাদের জন্য আরেক সুসংবাদ। জীবদ্দশায় তিনি কোনো বড় মাপের পুরস্কার না পেলেও সরকার মরণোত্তর একুশে পদক দিয়ে তাঁকে সম্মানিত করেছে, তাতে করে জাতির লজ্জা কিছুটা হলেও লাঘব হয়েছে।
কাকা একটা কথা বলতেন, আমার নির্দিষ্ট কোনো পরিবার নেই। গোটা বিশ্বের মানুষ আমার পরিবারের সদস্য। তাদের জন্যই আমাকে কাজ করতে হবে। তাদের মাঝেই আমাকে বেঁচে থাকতে হবে। কথাগুলো তাঁর মুখের কথা ছিল না, অন্তরের কথা। তার প্রতিধ্বনি শুনতে পেয়েছিলাম পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ উপন্যাসে–'সকলে আমার মধ্যে আছে, আমি সকলের মধ্যে রয়েছি।'
(শেষ)
—–
…….
ফেব্রুয়ারি ২০১০-এ খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি থেকে নূরুল আনোয়ারের ছফামৃত প্রকাশিত হয়েছে। আর্টস-এ প্রকাশিত লেখার অংশের বাইরে এ বইয়ে আছে সলিমুল্লাহ খান-এর ভূমিকা ও নূরুল আনোয়ার-এর প্রাক-কথন। এ ছাড়া পরিশিষ্ট অংশে আছে আহমদ ছফার গ্রন্থপঞ্জি, আহমদ ছফার শিক্ষা সংক্রান্ত তথ্য, আহমদ ছফার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠন এবং কর্মসূচির সংশ্লিষ্টতা সংক্রান্ত তথ্য, আহমদ ছফার প্রাপ্ত পুরস্কার, আহমদ ছফার বিদেশ ভ্রমণ, বংশ লতিকা ও ২৪ পৃষ্ঠার আলোকিচত্র । প্রচ্ছদ, মোবারক হোসেন লিটন । মূল্য ২৫০ টাকা। ফোন: 7173196.
…….
—-
ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts