সেই ‘নীল-ইস্পাত’ ফলাটি বর্ষীয়ান বোর্হেস আর বিশ্বজগতের মাঝখানে শুয়ে থাকা অন্ধত্ব যদি না-হয় তাহলে আর কী?
Published : 23 Mar 2025, 05:06 PM
অনুবাদ: মুনযির
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হান কাঙের মোট আটটি উপন্যাসের মধ্যে এটি পঞ্চম, তবে ইংরেজিতে প্রকাশের হিশেবে চতুর্থ। ২০১১ সালে কোরীয় ভাষায় প্রকাশিত হওয়ার পরে ২০২৩ সালে এর ইংরেজি অনুবাদ আত্মপ্রকাশ করে। এই প্রথমবার হান কাঙের একাকী ইংরেজি অনুবাদক ডেবোরা স্মিথ তরুণ এক কোরীয় অনুবাদক এমিলি ইয়ে ওয়ানের সাথে যুগলবন্দি রচনা করেছেন, যা, আশা করা যায়, তাঁর অনুবাদের মর্মগ্রাহিতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে, অনুবাদে মূল পাঠের সাংস্কৃতিক দ্যোতনা যেন আরও নিপুণ অক্ষরে ফুটে ওঠে তা নিশ্চিত করেছে, এবং অনুবাদকের স্বভাবসুলভ বিচ্যুতিপ্রবণতা থেকে অনূদিত পাঠটিকে আরও সজাগ ও-সুযোগ্যভাবে রক্ষা করার চেষ্টা করেছে। বাংলা অনুবাদটি যেহেতু এই ইংরেজি অনুবাদের মারফত মূল কোরীয় উপন্যাসটির রূপ-রস- ও গন্ধ বাংলাভাষী পাঠকের সংবেদনশক্তির নিকট নিবেদন করছে তাই এ-তথ্যটুকু উৎসাহব্যঞ্জক, সন্দেহ নেই।
১
অন্তিম ইচ্ছে হিশেবে বোর্হেস অনুরোধ জানিয়েছিলেন এই সমাধিলিপির: ‘সে তরোয়াল হাতে নিলো, আর সেই নগ্ন ধাতুখণ্ডটিকে শুইয়ে দিলো তাদের দু’জনের মাঝখানে’। সাতাশি বছর বয়সে বোর্হেসের মৃত্যুর দু’মাস আগে যিনি তাঁকে বিয়ে করেছিলেন তাঁর সেই রূপসী, কমবয়সি স্ত্রী ও সাহিত্যসচিব মারিয়া কদোমাকে তিনি কথাটি বলে গিয়েছিলেন। নিজের প্রয়াণ-স্থান হিশেবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন জেনিভাকে। নিজের যৌবন তিনি এই নগরীতেই কাটিয়েছিলেন এবং এখানেই তিনি সমাহিত হতে চেয়েছিলেন।
একজন গবেষক সেই সমাধিলিপিকে ‘নীল-ইস্পাত প্রতীক’ বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর কাছে, বোর্হেসের রচনাকর্মের তাৎপর্য উদঘাটনের চাবিকাঠি হচ্ছে এই তরবারির ফলার চিত্রকল্প---যে-ছুরি বোর্হেসের শৈলীকে সাহিত্যের প্রথাগত বাস্তববাদ থেকে আলাদা করে—অথচ আমার কাছে একে মনে হয়েছিলো অত্যন্ত নীরব ও নিভৃত কোনো স্বীকারোক্তি।
কোনো-এক নর্স বীরগাথার উদ্ধৃতি ছিলো পঙক্তিটি। একজন পুরুষ ও একজন নারীর বাসর-রাতে (যে-রাত, বীরগাথা মোতাবেক, একসাথে কাটানো তাদের শেষ রাতও হতে যাচ্ছিলো) তাদের দু’জনের মাঝখানে একটি তরোয়াল রাখা হয়েছিলো এবং ভোর অবধি সেটি সেখানেই রেখে দেওয়া হলো। সেই ‘নীল-ইস্পাত’ ফলাটি বর্ষীয়ান বোর্হেস আর বিশ্বজগতের মাঝখানে শুয়ে থাকা অন্ধত্ব যদি না-হয় তাহলে আর কী?
আমি সুইজারল্যান্ডে গেলেও জেনিভা দেখতে যাইনি। নিজের চোখে তাঁর কবর দেখার তীব্র কোনো বাসনা আমার ছিলো না। তার বদলে, আমি সন্ত গলের পাঠাগার দেখে বেড়িয়েছিলাম, যে-পাঠাগার দেখতে পেলে তাঁর উচ্ছ্বাস ফুরোতোই না (সহস্র বছর পুরাতন পাঠাগারের মেঝেকে সুরক্ষিত রাখার স্বার্থে দর্শনার্থীদেরকে ফেল্ট কাপড়ের যে-চপ্পল পরতে দেওয়া হতো তার খসখসে ভাবটি আজও পায়ে টের পাই), লিসনের ঘাট থেকে চড়েছিলাম একটা নৌকায় আর সন্ধ্যা অবধি বরফ-ঢাকা আল্পসের কতো উপত্যকার মাঝ দিয়ে জলে ভেসে বেড়িয়েছিলাম।
আমি কোনো ছবি তুলিনি। দৃশ্যগুলো কেবল আমার দু’চোখেই ধরা ছিলো। তাছাড়া, শব্দ, ঘ্রাণ ও স্পর্শের যেসব অনুভব ক্যামেরা ধরে রাখতে পারে না, সেসবের ছাপ পড়েছিলো আমার দু’কানে, নাকে, চেহারায় আর দু’হাতে। আমার আর বিশ্বজগতের মাঝখানে তখনো কোনো ছুরি ঠাঁই পায়নি, কাজেই তখনকার মতো এইটুকুই যথেষ্ট ছিলো।
২
নৈঃশব্দ্য
মহিলাটি তার বুকের সামনে দুই হাত জোড়ে। ভুরু কুঁচকে ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে তাকায়।
‘জোর গলায় পড়ুন দেখি,’ পুরু কাচের, রুপালি বেড়ের চশমা-পরা লোকটি মৃদু হাসি নিয়ে বলেন।
মহিলার ঠোঁটজোড়া কাঁপুনি দিয়ে ওঠে। সে তার জিভের ডগা ছুঁইয়ে নিজের অধর ভিজিয়ে নেয়। বুকের সামনে তার হাত দু’টি আলগোছে অস্থির হয়ে আছে। সে মুখ খুলে আবার বন্ধ করে নেয়। শ্বাস আটকে রেখে গভীরভাবে ছাড়ে নিশ্বাস। লোকটি ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে পিছিয়ে এসে ধৈর্যসহকারে আবার তাকে পড়তে বলেন।
মহিলার চোখের পাতা থিত্থির করে ওঠে। পতঙ্গের পাখাজোড়ার চট করে পরস্পর ঘষা খেয়ে নেওয়ার মতো। মহিলা দু’চোখ বুজে ফ্যালে, আবার খোলে। চোখ মেলে তাকানোর মুহূর্তে তার যেন মনে আশা থাকে নিজেকে দেখতে পাবে অন্য কোথাও।
শাদা খড়ির গুঁড়োয় ময়দামাখা হয়ে যাওয়া আঙুলে লোকটি তাঁর চশমা আরেক বার ঠিকঠাক করে নেন।
‘দেখি, পড়ুন না জোর গলায়।’
মহিলার পরনে উঁচু-গলার একটা কালো সোয়েটার ও কালো ট্রাউজার্স। নিজের চেয়ারের ওপরে যে-জ্যাকেট সে ঝুলিয়েছে সেটা কালো রঙের, আর তার কালো কাপড়ের থলেতে যে-স্কার্ফ সে ভরে রেখেছে সেটা বোনা হয়েছে কালো উল দিয়ে। ওই ঘনঘোর পোশাক-পরিচ্ছদ, যেসব দেখলে মনে হয় মাত্রই সে কোনো শেষকৃত্যানুষ্ঠান থেকে এসেছে, সেসবের ওপরকার চেহারাটি তার শীর্ণ ও রুগ্ণ, কোনো একরকম মৃৎভাস্কর্যের লম্বাটে নাকমুখের মতো।
সে এমন একজন নারী যে তরুণীও নয় আবার তেমন সুন্দরীও নয়। তার চোখ দু’টিতে বুদ্ধিদীপ্ত ভাব রয়েছে, কিন্তু চোখের পাতার অনবরত বিক্ষেপের ফলে সেটা ঠাহর করা কঠিন হয়। তার পিঠ ও কাঁধ পাকাপাকিভাবে কুঁকড়ে রয়েছে, যেন নিজের কালো পোশাকের ভেতরে সে আশ্রয় নিতে চাইছে, এবং তার আঙুলের নখগুলো বাড়াবাড়ি রকমে ছেঁটে রাখা আছে। তার বাঁ-কবজি জুড়ে রয়েছে মখমলের একটি গাঢ় নীলাভ লাল রঙের চুল-বাঁধুনি, তার একরঙা কায়ায় বর্ণিলতার একাকী ছোঁয়া।
‘সবাই এটি একসাথে পড়ি, চলুন।’ লোকটি আর সেই মহিলার জন্যে অপেক্ষা করতে পারেন না। তাঁর নজর তিনি সরিয়ে নেন মহিলার সারিতেই বসা খোকা-মুখো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, একটা থামের আবডালে অর্ধেক আড়াল হয়ে থাকা এক মাঝবয়সি লোক আর জানালার ধারে নিজের চেয়ারে গা-এলিয়ে-বসা সুঠামদেহী তরুণের ওপরে।
“এমোস, হিমেতেরোস। ‘আমার’, ‘আমাদের’।” তিন ছাত্র পড়ে, তাদের গলা নিচু ও লাজুক। “সোস, হুমেতেরোস। ‘তোমার’, ‘তোমাদের’।”
ব্ল্যাকবোর্ডের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে দেখে মনে হয় পঁয়ত্রিশ থেকে ঊনত্রিশের মধ্যে হবে তাঁর বয়স। গড়নে তিনি হালকা-পাতলা, দু’চোখের ওপরে তাঁর ডাগর ডাগর হরকতের মতো ভুরু আর নাকের গোড়ায় গভীর খাত। তাঁর মুখের চারপাশে খেলে যায় চেপে রাখা ভাবাবেগের ক্ষীণ স্মিতহাসি। তাঁর গাঢ় বাদামি কডুরয় জ্যাকেটের দুই কনুইয়ের ধারে হালকা বাদামি রঙের চামড়ার পট্টি লাগানো রয়েছে। হাতা কিছুটা খাটো হওয়ায় তাঁর কবজি বেরিয়ে আছে। তাঁর বাঁ-চোখের পাতার প্রান্ত থেকে মুখের কশ পর্যন্ত সরু আবছা এক বক্ররেখা হয়ে চলে যাওয়া কাটাদাগটির দিকে সেই মহিলাটি চোখ তুলে তাকায়। তাদের প্রথম পাঠের দিনেই এই কাটাদাগ চোখে পড়ায় তার মনে হয়েছিলো একদা গড়িয়ে পড়া অশ্রুর প্রবাহপথের চিহ্ন।
চশমার পুরু, ফ্যাকাশে সবুজ কাচের পেছনে লোকটার দুই চোখ স্থির হয়ে আছে মহিলার কুলুপ-আঁটা মুখের দিকে। হাসিখানি উবে যায়। তাঁর মুখোভাব আড়ষ্ট হয়ে ওঠে। ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে ফিরে তিনি ধাঁই ধাঁই করে প্রাচীন গ্রিকে ছোট্ট একটি বাক্য লিখে ফেলেন। হরকত বসানোর ফুরসত পাওয়ার আগেই টুস করে খড়িটা অর্ধেক হয়ে দু’টো টুকরোই মেঝেতে পড়ে যায়।
****
গত বছরের বসন্তের শেষ দিকে, সেই মহিলা নিজেই দাঁড়িয়ে ছিলো একটি ব্ল্যাকবোর্ডের ধারে, খড়ি-গুঁড়ো লাগা একটি হাত ওতে ঠেকিয়ে রেখে। মিনিট খানেক পার হয়ে যাওয়ার পরেও সে যখন পরবর্তী শব্দটা মুখ দিয়ে বের করতে পারলো না, তখন তার ছাত্র-ছাত্রীরা যার যার আসনে নড়াচড়া আর নিজেদের মধ্যে ফিসফাস শুরু করে দিয়েছিলো। ভীষণ চোখ পাকিয়ে সে না দেখলো ছাত্র-ছাত্রীদেরকে, না ওপরের ছাত, না জানালা, না তার সামনের শূন্য বায়ু।
“আপনি ঠিক আছেন, সংসেংনিম?” ক্লাশের একেবারে সামনের সারিতে বসা কোঁকড়া চুল ও মিষ্টি চোখের মেয়েটি জিগেস করলো। মহিলাটি জোর করে একটু হাসতে চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু তার ফলে অল্প ক্ষণের জন্যে চোখের পাতা দু’টোই যা-একটু তিরিতিরিয়ে উঠলো। আকম্পমান ঠোঁট দু’টো একসাথে শক্ত করে চেপে রেখে তার জিভ ও কণ্ঠের চাইতে গহিনতর কোথাও থেকে সে নিজেকেই বিড়বিড় করে শোনালো: ওটা ফিরে এসেছে।
সংখ্যায় চল্লিশের চেয়ে ক’জন বেশি যে-ছাত্রছাত্রী ছিলো সেখানে তারা একে অন্যের দিকে ভুরু উঁচিয়ে তাকালো। উনি করছেনটা কী? বহু প্রশ্নের ফিসফিসানি ছড়িয়ে পড়লো ডেস্ক থেকে ডেস্কে। একমাত্র যে কাজের সামর্থ্য তার ছিলো তা হচ্ছে চুপচাপ শ্রেণিকক্ষ থেকে হেঁটে বেরিয়ে যাওয়া। কষ্টেসৃষ্টে, কাজটা সে করে ফেলেছিলো। বাইরের করিডোরে তার পা রাখা মাত্রই, চাপাস্বরের ফিসফিসানিগুলো হয়ে উঠেছিলো কোলাহলময়, যেন লাউডস্পিকারের মাধ্যমে বিবর্ধিত, গিলে নিয়েছিলো পাথরের মেঝেতে তার জুতার তোলা আওয়াজকে।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পরে মহিলাটি প্রথমে এক গ্রন্থপ্রকাশকের চাকুরি করেছিলো এবং তারপর ছয় বছরের কিছুটা বেশি সময় ধরে কাজ করেছিলো একটি সম্পাদনা ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানে; এবং তার পরে প্রায় সাত বছর সে কাটিয়ে দিয়েছিলো রাজধানীর ও এর আশেপাশের কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয় আর একটি মাধ্যমিক কলা-বিদ্যালয়ে সাহিত্য পড়িয়ে। পুরোদস্তুর কবিতার তিনটি সংকলন তৈরি করেছিলো সে, যেগুলো তিন-চার বছর পরে-পরে প্রকাশিত হয়েছিলো, এবং টানা কয়েক বছর পাক্ষিক এক সাহিত্যসমালোচনা পত্রিকায় একটি কলাম লিখেছিলো। এখনো শিরোনাম ঠিক করা হয়নি এমন একটি সংস্কৃতি বিষয়ক প্রকাশিতব্য সাময়িকপত্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিশেবে সম্প্রতি সে প্রতি বুধবার বিকেলে সম্পাদকীয় সভায় যোগ দিচ্ছিলো।
ওটা যখন ফিরে এসেইছিলো, তাহলে এ-সব কিছু পরিত্যাগ করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিলো না।
এমন কিছু ঘটতে পারে তার কোনো আভাসই পাওয়া যায়নি, আর এমনটা ঘটার কোনো কারণও ছিলো না।
অবশ্য, এ-কথা সত্যি যে, ছয় মাস আগেই সে তার মা-কে হারিয়েছিলো, আরও কয়েক বছর আগে হয়েছিলো বিবাহবিচ্ছেদ, শেষমেশ হারিয়েছিলো তার আট বছর বয়সের ছেলেটার অভিভাবকত্ব, আদালতে আদালতে দীর্ঘ কাল ধরে চলা লড়াইয়ের পরে প্রাক্তন স্বামীর বাড়িতে তার ছেলের গিয়ে ওঠার পাঁচ মাসের মাথায় দেখা দিচ্ছিলো ওটা। ছেলের চলে যাওয়ার পরে অনিদ্রার জন্যে সপ্তাহে একবার করে ধূসর চুলের যে-মনোচিকিৎসকের কাছে সে গিয়েছিলো তিনি বুঝতে পারলেন না কেন সে এমন স্পষ্ট সব কারণকে অস্বীকার করছে।
না, টেবিলের ওপরে ফেলে রাখা ফাঁকা কাগজে সে লিখেছিলো। ব্যাপারটা অতো সহজসরল নয়।
সেটা ছিলো তাদের শেষ বৈঠক। লেখালেখির মাধ্যমে চালানো মনোচিকিৎসায় অনেকটা সময় লেগে যেতো, আর ভুল বোঝাবোঝির ঢের অবকাশ তো থাকতোই। মনোচিকিৎসকের কাছ থেকে একজন বাক- ও ভাষা-চিকিৎসকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব পেয়ে সবিনয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলো মহিলা। সবচেয়ে বড় কথা হলো এমন ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার মতো অর্থের জোগান তার ছিলো না।
****
ছোটোবেলায় মহিলাটি ‘সত্যিকার মেধাবী’ ছিলো বলেই মনে হতো—যে-ব্যাপারটা তার মা নিজের কর্কট-চিকিৎসার অন্তিম বছরটায় সুযোগ পেলেই তাকে মনে করিয়ে দিতেন। যেন মৃত্যুর আগে এই একটি বিষয় একদম পরিষ্কার করে যাওয়ার তাড়না ছিলো তাঁর।
ভাষার কথা বললে, ওই তকমা সত্যিও হতে পারে। চার বছরের মধ্যে, কারো পড়ানো ছাড়াই, হাঙ্গুল তার ভালোই রপ্ত হয়ে গিয়েছিলো। স্বর-ব্যঞ্জনের কিছুই না জেনে, সে গোটা গোটা একক রূপে অক্ষরগুলো মুখস্ত করে ফেলেছিলো। যে-বছর তার বয়স ছয় হলো, তার বড়ো ভাই তাকে সে-বছর হাঙ্গুলের কাঠামো নিয়ে তার শিক্ষক যা বলেছিলো তোতাপাখির মতো তেমনই একটা ব্যাখ্যা দিলো। শুনতে শুনতে সবকিছুই তার কাছে ধোঁয়াটে ঠেকেছিলো, তারপরেও বসন্তের শুরুর দিককার সেদিন সারা বিকেলটা সে স্বর-ব্যঞ্জনের ভাবনায় মগ্ন থেকে উঠানে উবু হয়ে বসে কাটিয়ে দিয়েছিলো। সেসময়ই সে ‘না’, 나 শব্দটি আর ‘নি’, 니 শব্দটি উচ্চারণের বেলায় ব্যবহৃত ㄴ ধ্বনির মধ্যকার সূক্ষ্ম তফাত আবিষ্কার করেছিলো; এরপর সে উপলব্ধি করেছিলো যে, ㅅ -এর ধ্বনিরূপ ‘সি’, 시 -এর চাইতে ‘সা’ 사 -এ আলাদা শোনায়। মনে মনে যৌগিক স্বরের সম্ভাব্য সকল রকমফের জড়ো করতে গিয়ে তার ঠাহর হলো যে, একমাত্র যেটির অস্তিত্ব তার ভাষায় নেই সেটি হচ্ছে ওইㅣ, ‘ই’ যার পরে যুক্ত হয় ㅡ , ‘ইউ’, যে-জন্যে সেটি লেখার কোনো উপায় নেই।
ওইসব এলেবেলে আবিষ্কার তার জন্যে ছিলো এতোটাই তরতাজা রকমের উত্তেজনাকর ও বিস্ময়কর যে, তিরিশ বছরেরও বেশি কাল পরে মনোচিকিৎসক যখন তাকে তার সবচাইতে জীবন্ত স্মৃতি নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন তখন তার মনে যা এসেছিলো তা আর কিছু নয়—সেই দিন উঠানে ভেঙে পড়েছিলো ঝকঝকে যে-রোদ্দুর। তার পিঠে, ঘাড়ে পড়া বাড়ন্ত তাপ। কাঠি দিয়ে মাটিতে দাগ কেটে আঁকা তার হরফগুলো। ভারি আলতোভাবে সমবেত ধ্বনিমূলগুলোর আশ্চর্য প্রতিশ্রুতি।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা আরম্ভ করার পরে, সে তার ডায়েরির পেছনে শব্দমালা টুকে রাখতে শুরু করেছিলো। উদ্দেশ্য বা অনুষঙ্গ ছাড়াই, স্রেফ তার ওপরে গভীর প্রভাব ফেলা কতোগুলো শব্দের একটি তালিকা; সেসবের মধ্যে যেটি ছিলো তার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান সেটি হলো 숲। কাগজের পৃষ্ঠায়, এই একক্ষরবিশিষ্ট শব্দটি দেখতে পুরনো এক প্যাগোডার মতো লাগতো : ㅍ , ভিত্তি, ㅜ, মূল কাঠামো, ㅅঊর্ধ্বাংশ। এ-শব্দ উচ্চারণের সময় যে-অনুভূতি হতো সেটি তার পছন্দের ছিলো : ㅅ – ㅜ – ㅍ , সু-প, প্রথমে ঠোঁট কুঁচকে গোল করার, আর তারপর ধীরে, সাবধানে বাতাস ছাড়ার, আর তারপর ঠোঁট দু’টো বন্ধ করার অনুভূতি। নৈঃশব্দ্যের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হওয়া একটি শব্দ। যাতে উচ্চারণ, অর্থ ও গড়ন সবই নিশ্চলতায় মোড়ানো ছিলো সেই শব্দে মজে গিয়ে সে লিখেছিলো : 숲. 숲. অরণ্য।
(ক্রমশ)