বুদ্ধদেব বসু-জীবনানন্দ দাশ : সম্পর্কের দুর্বোধ্য রসায়ন
১৯৩০-এর দশকে একদল তরুণ কবি পশ্চিমের কাব্যধারার অনুপ্রেরণায় আধুনিক কবিতা সম্পর্কে নিজস্ব ধারণাকে সঙ্গী করে রবীন্দ্রনাথের প্রভাববলয়ের বাইরে বেরিয়ে এলেন– এঁদের মুখপত্র ছিল 'কবিতা' পত্রিকা। এই সাময়িকীর মাধ্যমেই বাংলা ভাষায় গদ্যকবিতার আবির্ভাব ও বিকাশ। সে-সময় কবিতা ও কবিতাভবন প্রকাশনা ছিল এই সাময়িকীর সঙ্গে জড়িত তরুণ কবিদের মিলনক্ষেত্র। আশ্বিন ১৩৪২ থেকে চৈত্র ১৩৬৭ কালপর্বে মোট ৩৪৫ জন কবির কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল কবিতা পত্রিকায়, এ কারণে, ১৯৩৫ থেকে ১৯৬০–কবিতা পত্রিকার ২৫ বছরকে বাংলা সাহিত্যের পরিণত আধুনিক কবিতার পর্ব বলে ধারণা করা হয়। বস্তুত বাংলা কবিতায় আধুনিক কবিতার সমস্ত যুগলক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে এ সময়টাতেই। সত্য যে, রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কবিতায় গুরুত্বপূর্ণ কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ এবং বুদ্ধদেব বসুর পারস্পরিক সম্পর্ক প্রথম থেকেই নিবিড় ছিল। 'আমাদের আধুনিক কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ সবচেয়ে নির্জন, সবচেয়ে স্বতন্ত্র'– এই অভিধা দেবার সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধদেব কর্তৃক কবি জীবনানন্দকে পৃষ্ঠপোষকতা দান, বিদ্রুপ থেকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসা এসবকিছু এখন ইতিহাস। কবিতার প্রতি তাঁর আকৈশোর অনুরাগ থেকে বুদ্ধদেব বসু খুঁজে নেন জীবনানন্দকে– পরে তাঁর সম্পাদিত প্রগতি, কবিতা এবং বৈশাখীতে জীবনানন্দের অসংখ্য কবিতা প্রকাশিত হয়। তাঁদের প্রথম দেখা- বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন–
জীবনানন্দকে আমি প্রথম দেখেছিলাম ঢাকায়, তাঁর বিবাহ-সন্ধ্যায় উপস্থিত ছিলাম ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজে, যুক্ত ছিলাম 'ধূসর পাণ্ডুলিপি' পর্যায় থেকে তাঁর মৃত্যুকাল পর্যন্ত তাঁর কবি জীবনের সঙ্গে- কিন্তু তাঁর সঙ্গে কোনো ব্যক্তিগত সম্বন্ধ আমি স্থাপন করতে পারিনি, অন্য কেউ পেরেছিলেন বলেও জানি না।
সত্যি বলতে, ব্যক্তিগত সম্বন্ধ স্থাপিত না হলেও একটা সাহিত্যিক জোড়ের বিষয় দু'জনার মধ্যে ছিল। বুদ্ধদেব বসু দময়ন্তী উৎসর্গ করেন সমর সেন ও জীবনানন্দ দাশকে আর জীবনানন্দ ধূসর পাণ্ডুলিপি উৎসর্গ করেন বুদ্ধদেব বসুকে। বুদ্ধদেবের কঙ্কাবতী কাব্যগ্রন্থটি নিয়ে জীবনানন্দ লিখেছিলেন, 'বুদ্ধদেব বসুর কবিহৃদয়ের আভার থেকে কঙ্কাবতীর জন্ম হয়েছে। বুদ্ধদেব অনেকদিন থেকে কবিতা লিখছেন। কঙ্কাবতী ছাড়া কবিতার বই আগেও আরও প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এই বইটির ভিতরেই রইল তাঁর কবিযশ; এর রস পান ক'রে বুঝতে পারলাম আধুনিক বাংলা সাহিত্যে তিনি একজন প্রধান কবি; প্রধানদের ভিতর অন্যতম; তাঁর কঙ্কাবতী অবশ্যম্ভাবী পিপাসা জাগিয়ে গভীর পরিতৃপ্তি-কুহক নিয়ে এসেছে।" মূলত জীবনানন্দের 'নীলিমা' কবিতাটি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের কল্লোল পত্রিকায় ছাপা হলে তাঁর কবিতার শক্তির দিক চোখে পড়ে বুদ্ধদেব বসুর, তখনই তিনি জোর দিয়ে তাঁকে প্রগতিতে লিখতে বলেন। প্রগতিতে ৬২টি, কবিতায় ৯৭টি, কবিতা ভবন বার্ষিকী বৈশাখীতে ৩টি মিলিয়ে বুদ্ধদেবের সম্পাদিত পত্রিকাগুলোতেই জীবনানন্দের মোট ১১৪টি কবিতা প্রকাশিত হয়।
জীবনানন্দ দাশ এবং বুদ্ধদেব বসু –বাংলা সাহিত্যে এ দুজনের বিভা অনির্বাণ। এই দুই প্রতিভাবান ব্যক্তির মধ্যে একদিকে যেমন নিবিড় নৈকট্য দেখা যায়, একই সঙ্গে চোখে প'ড়ে পরষ্পরের দুস্তর ব্যবধানও। বুদ্ধদেবের কর্মস্পৃহা ছিল বিপুল, সঙ্গে ছিল সুঠাম পারিবারিক পরিবেশ। সাহিত্যের নানাদিকে তাঁর কীর্তি ছিল চোখ ধাঁধিয়ে দেবার মত। শিবনারায়ণ রায় যথার্থ বলেছেন– 'রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা ভাষায় বুদ্ধদেবের মতো এত বহুমুখী এবং নিয়ত গতিশীল প্রতিভা আর একটিও দেখতে পাই না।' তবে তাঁর প্রতিভার প্রতি কোনোরকম অসম্মান না করেই বলা যায়, তিনি পশ্চিমা সাহিত্য দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কবিতা রচনা করেছেন, তবে প্রথম দিকের কবিতায় রবীন্দ্রনাথের স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়। অবশ্য বিষয়বস্তু ও শৈলীর কথা বিবেচনা করলে প্রখ্যাত পশ্চিমা কবিদের প্রভাব তাঁর ওপর স্পষ্ট যাদের মধ্যে বোদলেয়ারের কথা সর্বাগ্রে উল্লেখ করতে হয়। এছাড়াও এজরা পাউন্ড, উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস, রিলকে ও টি এস এলিয়টের প্রভাবও বুদ্ধদেবের ওপর আছে। জীবনানন্দ দাশও এক্ষেত্রে বলেছেন– 'বাংলা সাহিত্যে যা নেই অথবা শীর্ণভাবে রয়েছে সেই সব প্রাণ ও পরিসরের থেকে রশ্মি পেতে হলে ইয়োরোপীয় সাহিত্য ছাড়া আমাদের অন্য কোনো আলোভূমি নেই।' লেখক হিসেবে বুদ্ধদেব বসু ছিলেন খুঁতখুঁতে এবং কারিগরি দিক দিয়ে নিজের রচনাকে নিখুঁত করে তোলার ওপর জোর দিতেন বেশি। কবিতা রচনায় তিনি বেশির ভাগ সময় মুক্তছন্দে লিখেছেন, ছন্দের ওপর তাঁর দখল ছিল অসাধারণ। কবিতার অনুবাদক হিসেবে তাঁর কাজগুলো একেবারে সামনের দিকে। শুধু নিজের লেখা নয়, ২০ শতকের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ মেধাদের চিহ্নিত করার অদ্ভুত এক ক্ষমতা দেখিয়েছিলেন তিনি। গদ্যরচনার ক্ষেত্রেও নিজস্ব একটি ধারা সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর উপন্যাসগুলো একুশ শতকের বিচারেও আধুনিক বলে বিবেচিত। সমঝদার সাহিত্য সমালোচনার যে শৈলী তিনি নির্মাণ করেছিলেন সেটি আজও অতুলনীয়। জীবনের শেষ পর্বে রচিত গদ্য নাটকগুলোতে নিজস্ব একটি কাব্যশৈলী সৃজন করেছিলেন বুদ্ধদেব। আর জীবনানন্দ ছিলেন জাগতিক বিষয়ে নিস্পৃহ, অন্তরালবাসী, সংসার-পলাতক মানুষ। কবিতা নিয়ে তিনি ক্রমশ নিশ্চেতনার স্তরে উন্নীত হয়েছেন; তাঁর উপলব্ধিগুলো ছিল প্রতীকধর্মী। মোটের ওপর নান্দনিকতার সংজ্ঞা অনুসরণ করলে শিল্পের দুটি রূপ সামনে আসে– ভাব ও রূপ– এই ভাবটি মূলত মতাদর্শগত। প্রকৃতপ্রস্তাবে সাহিত্যের কোনো মতবাদের সঙ্গে জীবনানন্দের সমিল খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁর কবিতা নিজ গুণেই সর্বজনস্বীকৃত যা বুদ্ধদেব বসুর বিবেচনায় : 'জীবনানন্দর পূর্বপুরুষকে বাংলাদেশে বা ভারতবর্ষে খুঁজে পাওয়া যাবে না'।
রবার্ট ফ্রষ্টের The Road Not Taken কবিতার মত ছিল জীবনানন্দের পথ–
Two roads diverged in a yellow wood,
And sorry I could not travel both
And be one traveler, long I stood
And looked down one as far as I could
To where it bent in the undergrowth;
এই কবিতার শেষ তিনটি চরণ–
Two roads diverged in a wood, and I—
I took the one less traveled by,
And that has made all the difference.
একদিন এক হলুদ বনে কবির সামনে ছিল দুটি পথ, যে পথগুলো ছিল দু'দিকে বিস্তৃত, অনেকটাই দূরত্বসঞ্চারী। এটা তো ঠিক, একজন পথচারী কখনো একসঙ্গে দুটো পথ বেছে নিতে পারে না। ফ্রস্টও পারেন নি। তাই তিনি বহুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে ভেবে দেখছিলেন দৃষ্টি কতদূরে যায়। তার মনে হতে থাকে, একটি পথ কোথায় বেঁকে গেছে, কোন বনের নিচে? অন্য পথ, সেও চমৎকার, তার মনে হল–হয়তো এই পথটিই চলার জন্য উপযুক্ত হবে। তিনি বেছে নিলেন ঘাসে ঢাকা নতুন পথ, যে পথে লোকজন কম আসা-যাওয়া করেছে। যদিও দুটো পথের পার্থক্য ছিল সামান্য তবু অনেক দিন পর কবি অনুভব করলেন, নতুন পথটিই ঘটিয়ে দিয়েছে সব তফাৎ।
যদিও ফ্রস্ট নয়, জীবনানন্দ কী স্বতন্ত্র কবিতা লিখছেন? জীবনানন্দের কবিতাকে কেবল ভালো-লাগা মুগ্ধতা থেকে নয় বরং দার্শনিক ভিতের ওপর দাঁড় করানো হয়েছিল যে কবির লেখায় সেই সঞ্জয় ভট্টাচার্য এক আলাপে একবার শেলি-কীটস-হুইটম্যান-ইয়েটস-রিলকে-এলিয়ট-ডিলান টমাস পর্যন্ত কবিদের সঙ্গে জীবনানন্দের কবিতার আত্মীয়তা রয়েছে বলে উল্লেখ করেছিলেন, জীবনানন্দ এই কথায় মৃদুস্বরে সংশয় জাগিয়ে জানতে চেয়েছেন : একজন সচেতন কবিকে এতজন অগ্রজ বা সমসাময়িক কবি একই সঙ্গে কবি প্রভাবান্বিত করতে পারে কি না। সঞ্জয় সেদিন এই কথায় রেগে গিয়ে উত্তর করেন–'আপনি এঁদের বংশপরম্পরার।' যদিও জীবনানন্দ স্বতন্ত্র কবিতা লিখছেন কিনা এ মীমাংসা বুদ্ধদেব বসু অনেক আগেই আশ্বিন ১৩৩৫-এ মাসিক প্রগতির একটি সংখ্যায় ক'রে গেছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, সংস্কৃত শব্দ এড়িয়ে শুধু দেশজ শব্দ ব্যবহার করে কীভাবে কবি নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছেন।
উপরে উদ্ধৃত The Road Not Taken-এর নতুন পথ অনুসরণ করা মানুষটির মতোই যেন ছিলেন জীবনানন্দ দাশ, যা কালের ব্যবধানে অনেকটাই স্পষ্ট। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালক-এর পর পূর্বসুরিদের প্রভাব কাটিয়ে তিনি যে পথ ধরেছিলেন সেটি শুধু ভিন্ন পথ ছিল না, সেটিই ছিল সঠিক পথ। জীবনানন্দের কবিতার নিজস্বতার বিষয়টি অনুধাবন করে বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন, 'তিনিই আমাদের মধ্যে একমাত্র, আযৌবন চেষ্টাহীনভাবে রবীন্দ্রনাথকে এড়িয়ে যেতে পেরেছেন।' যদিও জীবনানন্দ দাশ বিকাশ প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত বইতে দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় এর বাইরে দাঁড়িয়ে বলেছেন–'অবশ্য জীবনানন্দ স্বয়ং নিজেকে অতখানি রবীন্দ্রবিহীন বলে মনে করতেন না, রবীন্দ্রবিদ্রোহী বলেও নন। তাঁর রবীন্দ্রনানুগতি ছিল সূক্ষ্ণ–'দুর্বল বিদ্রোহের অভিমানে আমি আমার পূর্ববর্তী বড় কবিকে ডিঙিয়ে গেলাম অকাব্যের জঞ্জালের ভিতর।"
তলস্তয় একবার বলেছিলেন, জন্ম মানে ঘুমিয়ে পড়া; তারপর এই জীবন জুড়ে যা কিছু ঘটে তা সব স্বপ্ন। মৃত্যু মানে ঘুম থেকে জাগা। কথাটি হয়ত সবার জীবনে প্রযোজ্য নয়, এটি দৃষ্টান্তরূপে গণ্য হয়েছে কারো কারো জীবনে যারা নতুন পথে হেঁটেছেন। জীবনানন্দ দাশ ক্রমাগত ভিন্ন পথ ধরে অগ্রসর হয়েছেন, বুদ্ধদেব বসু সংলগ্ন হয়ে জীবনানন্দের কাজগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দান করেছেন। বুদ্ধদেব বসুই প্রথম জীবনানন্দের কবিতার অন্তর্নিহিত ভাব ও লক্ষণ বিচার করে তার শ্রেণীগত বিশেষত্ব নির্ণয় করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বুদ্ধদেবের মতে, 'জীবনানন্দ ছিলেন ব্যক্তি-জীবনে নিতান্তই বাঙালি, কিন্তু ক্রমশ ধরা পড়ছে যে বাংলা ভাষায় অন্য কোনো কবি তাঁর মতো 'য়োরোপীয়' নন'। জীবনানন্দকে নিয়ে এমন অনেক সৃজনমূলক অনুধাবন বুদ্ধদেবের রয়েছে। বুদ্ধদেব বসু বুঝেছিলেন, জীবনানন্দের স্বভাব না বুঝলে তাঁর কবিতা বোঝা সম্ভব নয়। যেভাবে নানা প্রবন্ধ এবং অসংখ্য সাহিত্যিক আলোচনায় তিনি জীবনানন্দ দাশ যে কতটা মহৎ কবি এর সপক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন সেভাবে জীবনানন্দের ভক্তমণ্ডলী বা সমালোচক–কোনো পক্ষই তাঁর জীবদ্দশায় প্রথম দিকে তাঁকে নিয়ে খাঁটি কথাগুলো বলেননি– সত্যি বলতে, বুদ্ধদেব বসুই ভক্তিবোধ আর সারস্বত চিন্তার মিশেল দিয়ে জীবনানন্দ সম্পর্কে আমৃত্যু সরব থেকেছেন। যদিও সময়ের ব্যবধানে দু'জনার সম্পর্ক একরকম থাকেনি। বুদ্ধদেব বসু কবিতার আশ্বিন ১৩৫৩ এর সম্পাদকীয়তে জীবনানন্দের সাম্প্রতিক কবিতার প্রতি বিশেষ উৎসাহ না দেখিয়ে লিখেছিলেন, 'আর শুধু নবীনদের কথাই বা বলি কেন। যাঁরা প্রবীণ, আমাদের আধুনিক সাহিত্যে অগ্রগণ্য তাঁরাই অনেকে সংক্রমিত, উদভ্রান্ত, ধর্মচ্যুত। জীবনানন্দ দাশ কী লিখছেন আজকাল?''
জীবনানন্দের তখনকার কবিতা দুর্বোধ্য ব'লে আপত্তি ছিল না বুদ্ধদেবের, কবিতায় সুরহীনতা নিয়েই ছিল আপত্তি, তিনি অনুভব করেছিলেন কবিতাগুলো বিস্বাদ হয়ে যাচ্ছে।
জীবনানন্দের বনলতা সেন-এর পরের পর্যায়ের কবিতা নিয়ে নানা রকম ব্যাখ্যা রয়েছে। তাঁর কবিতা যে ক্রমশ দুর্বোধ্য হয়ে যাচ্ছে এ নিয়ে ইতি-নেতি সেসব আলোচনার তুলনা হয়ত অন্য পরিসরে করা যাবে, কিন্তু সারাজীবন জীবনানন্দকে নিয়ে লড়াই করা, তাঁর অধিকাংশ কবিতা প্রকাশ করা, বিদ্রুপের জবাব দেয়া, ধূসর পাণ্ডুলিপি প্রকাশের জন্য পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানো ইত্যাদি কারণে–অবশ্য মূলত সাহিত্য পাঠের স্বতঃস্ফূর্ত সংস্কার থেকে জীবনানন্দের কবিতা নিয়ে বুদ্ধদেবের মনে যে মাপকাঠি তৈরি হয়েছিল সেসবের আলোকেই ঐ লেখাটির শরীর তৈরি হয়েছিল। সত্য এই–মহাপৃথিবী কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পর বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দের কবিতা সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন, এই বিষয়টি জীবনানন্দকে হতাশ করেছিল, যার নমুনা পাওয়া যায় ১৯৪৬ সালে জনৈক প্রভাকর সেনকে লেখা একটি চিঠিতে। জীবনানন্দ সাধারণত সংক্ষিপ্ত এবং দরকারি কথায় ভরপুর চিঠিপত্রের যোগাযোগে অভ্যস্ত ছিলেন, কিন্তু প্রভাকর সেনকে তিনি একটু দীর্ঘ আর বিস্তারিত চিঠিই লিখেছিলেন, সেখানে এক জায়গায় বলা আছে, বুদ্ধদেব বসু কীভাবে তাঁর বিচারশক্তির এবং হৃদয়বৃত্তির মহিমায় জীবনানন্দের কবিতার জন্য বড় স্থান রেখেছিলেন, সেটি প্রগতিতে যেমন, পরে কবিতা পত্রিকার প্রথম দিকেও। জীবনানন্দ যেন ভাঙা মন নিয়ে প্রভাকরকে জানালেন– বনলতা সেন এর পরের পর্বের কবিতা নিয়ে বুদ্ধদেব যে মতামত রেখেছেন– জীবনানন্দের কবিতা ক্রমশ পরিচিত পৃথিবীর বাইরে চলে গিয়েছে, এটি নিশ্চয়ই কবিকে হতাশ করেছিল। কারণ পরের পরষ্পরায় তাঁদের দুজনার সম্পর্কটি আর আগের রসায়নে থাকেনি। তবে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল: দুই কবির কেউই যখন আর পৃথিবীতে বেঁচে নেই সেই কালপর্বে। ২০০৪ সালে জীবনানন্দের মূল পাণ্ডুলিপি থেকে ভূমেন্দ্র গুহ'র সম্পাদনা ও গৌতম মিত্রের সম্পাদনা-সহায়তায় প্রতিক্ষণ পাবলিকেশনস প্রাইভেট লিমিটেড-কলকাতা থেকে সফলতা-নিষ্ফলতা নামে জীবনানন্দের একটি উপন্যাস প্রকাশিত হল। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে, জীবনানন্দের মৃত্যুর পরই মূলত তাঁর গল্প-উপন্যাসগুলোর কথা জানা যায় এবং দেখা যায় গল্প-উপন্যাসগুলোতে তলস্তয়-দস্তয়েভস্কির মত জীবনানন্দও তাঁর আত্মচরিত ছড়িয়ে দিয়েছেন। ভূমেন্দ্র গুহ জানিয়েছেন–অনুমিত হয় যে এই উপন্যাসটির রচনাকাল ১৯৩২ সাল। সফলতা-নিষ্ফলতায় বুদ্ধদেব বসুকে কেন্দ্রীয় চরিত্র করে মনের বিপুল ঘৃণাকে উগড়ে, কলম দিয়ে প্রায় এফোঁড়-ওফোঁড় করে তাঁর যে প্রতিমূর্তি রচিত হল সেটি ছিল খল চরিত্রের মত। এটি পড়ে মনে হয়, জীবনানন্দ যেন বমনের ভারমুক্তির তাড়নাতে উপন্যাসটি লিখেছেন।
উপন্যাসের চরিত্র নিখিল (জীবনানন্দ) আর বাণেশ্বর (বুদ্ধদেব বসু)। নিখিলের মন সুস্থির নয়, কবি হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েও যেন পান নি, যদিও স্বীয় প্রতিভা নিয়ে তার কোন সংশয় ছিল না। এমন একদিন ছিল যখন এই বাণেশ্বর একটি কাগজ চালাতেন, নিখিল একটি কবিতা লিখে পাঠালে তিন পৃষ্ঠা মন্তব্য লিখে তাকে জানাতেন। বাণেশ্বরের মতো ডিভোশন নিয়ে কেউ তার কবিতা পড়ে দেখেনি, বাণেশ্বর তাকে যথেষ্ট আস্কারা দিয়েছে, যে-ঋণ নিখিল কখনো ভুলতে পারবে না, এসব কথা নিখিল ভাবে। এর পাশাপাশি নিজের সম্পর্কে নিখিল যেটি কল্পনা করে– লেখালেখিতে সিরিয়াস কিছুর বাইরে তার দ্বারা বটতলার সাহিত্য হবে না, যদিও লেখালেখি করে সেই অর্থে কোনো প্রাপ্তিই তার ঘটেনি। বিপরীতে বাণেশ্বর চলায়-বলায়-লেখায় সবকিছুতে সফল, চারদিকে যেন একটা আসর জমিয়ে ফেলেছে। মান যা-ই হোক, তার লেখা হিট, কোনো ফার্স্ট ইয়ারের মেয়ে একটা গল্প লিখে তার নাম না দিয়ে বাণেশ্বরের নাম সই করে দিলে সকালে শোনা যাবে বাণেশ্বরের শেষ গল্পটা সেরা। আলাপের ছলে বাণেশ্বর জানায়–কবিতা লিখে লাভ নেই, বরং গল্প-উপন্যাস লিখলে অর্থাগম হতে পারে, কারণ বাণেশ্বর নিজেও তা করছে। বাণেশ্বর বলে–'একজন নামজাদা নভেলিস্ট না হলে নামজাদা কবিও হওয়া যায় না। নভেল লিখতে আরম্ভ করুন।' মেয়েদের সম্পর্কে বাণেশ্বরের ধারণা বেশ নিচু। কথাবার্তার মধ্যে দেখা যায় বিদগ্ধ, দার্শনিক চিন্তায় ভরপুর বাণেশ্বর যে বাড়িতে থাকে সেটি বেশ পরিপাটি– সেখানে সোফা আছে, রয়েছে বুকশেলফ, জানালায় পর্দা এইসব। বিপরীতে নিজের সুপ্ত উচ্চাশা নিয়ে নিখিল থাকে সস্তার মেসে। ভাইয়ের টাকায় কলকাতায় তার একলার দিন অতিবাহিত হয়, পরিবার থাকে অন্যত্র। বাণেশ্বরকে নিখিল কেবল পর্যবেক্ষণই করে যায়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার সঙ্গে আলাপ করে। বাণেশ্বর শিশির ভাদুড়ির কাছে ঘোরাঘুরি করছে নাটক গছিয়ে দিয়ে টাকার থলি পাবার আশায়। একসময় চাকরি করলেও বেকার নিখিলের মনে বাণেশ্বরকে নিয়ে টানোপোড়েন, ঘৃণা, ঈর্ষা ও সন্দেহ পাকাতে থাকে। নিখিল আর বাণেশ্বরের আলাপে এটিও স্পষ্ট হয়, তারা বিশ্বসাহিত্য নিয়ে হালনাগাদ সব তথ্য রাখে। নিখিলের মনে হয় বাণেশ্বর যেন সবাইকে দাবড়ে বেড়াচ্ছে। বাণেশ্বরের আছে রবীন্দ্রনাথের সার্টিফিকেট ইত্যাদি ইত্যাদি। বাণেশ্বরের আড়ালে বুদ্ধদেবের অংশটুকু ছাড়াও উপন্যাসে শঙ্কর চরিত্রটির মধ্যে প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ছায়া দেখা যায়, যদিও এই চরিত্রটি উপন্যাসে বেশ গৌণ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এরা দুজনই প্রথমদিকে একসঙ্গে কালি-কলম পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জীবনানন্দ কালি-কলম-এ কবিতা লিখেছেন, যদিও তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতায় এই পত্রিকায় প্রকাশিত কোনো কবিতা গ্রহণ করা হয়নি। সফলতা-নিষ্ফলতা সংলাপ আদান-প্রদানে শেষ হয়ে যায়, কিন্তু বইটি প্রকাশিত হবার পর এর পাঠ-প্রতিক্রিয়া হল তুমুলভাবে এবং নানা দিক থেকে। এসব আলোচনার মধ্যে একজনের কথা উল্লেখ করতে হয়– উপন্যাসটা পড়ে যিনি সাড়ে আটশ পৃষ্ঠার একটি আখ্যান রচনা করেছিলেন, তার নাম কেতকী কুশারী ডাইসন, গ্রন্থটির নাম–তিসিডোর। তিসিডোর-এ সফলতা-নিষ্ফলতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনায় কেতকী দেখিয়েছেন- কীভাবে জীবনানন্দ নানা শ্লেষ আর কটুবাক্যে ভরপুর বর্ণনার মাধ্যমে বাণেশ্বরের আড়ালে বুদ্ধদেবের একটি হামবড়া, আত্মরতিপরায়ণ রূপ–যা মূলত অতিরঞ্জিত ছিল–নির্মাণ করেছেন। বুদ্ধদেব বসু শুধু সাহিত্যিক হিসাবে নয়, বরং তাঁর পড়াশোনা, বিদ্যাবুদ্ধি, চিন্তাচেতনা দিয়ে প্রমাণ করেছেন তিনি কত সম্ভাবনাময় ছিলেন। সম্ভাবনা জাগিয়েই নয় এগুলোকে বাস্তবায়নেও তিনি ছিলেন সদাব্যাপৃত। অথচ কৃতঘ্নতার কষাঘাতে মানসিক ভারসাম্য হারানোর মত জীবনানন্দ দাশ বুদ্ধদেব বসুর মতো একজন উদার প্রকৃতির, সুসংগঠক, বন্ধুবৎসল, হাসিখুশি, নির্বিরোধ মানুষকে নিয়ে এমন নেতিবাচক একটি উপন্যাস লিখে যে উদাহরণ তৈরি করেছেন এটা বিস্ময়কর। এ প্রসঙ্গে কেতকী লিখেছেন–
এই ফিকশনাল কাহিনীর ভিতরে আমরা যদি ঐতিহাসিক জীবনানন্দ আর ঐতিহাসিক বুদ্ধদেবের অন্বেষণে ছুঁচ হয়ে ঢুকি, তা হলে ফাল হয়ে বেরিয়ে আমাদের বলতেই হবে যে বুদ্ধদেবের প্রতি জীবনানন্দ অবিশ্বাস্য রকমের অবিচার করেছেন।
উপন্যাসের একজায়গায় জীবনানন্দ বাণেশ্বর চরিত্রটিকে কুকুরের সঙ্গে তুলনা করেন- এ অংশটুকু প্রসঙ্গে কেতকী লিখেছেন–'বাণেশ্বর বুদ্ধদেবের ছায়ায় আঁকা এই কথা জানার পর আমি প্রথম যেদিন 'নাক সিটকে শৌখিন কুকুরের মত হাসতে লাগল' এই লাইনটি পড়ছিলাম, সেদিন আমার চোখ দিয়ে জল ঝরছিলো।' বাণেশ্বর নামটি বার্ণাড শ'এর সঙ্গে মিলিয়ে ব্যঙ্গ করে রাখা হয়েছে বলেও কেতকী জানান।
বুদ্ধদেব বসুর জ্যেষ্ঠ কন্যা মীনাক্ষী দত্ত উপন্যাসটি প্রসঙ্গে লিখেছেন–
বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত 'আধুনিক বাংলা কবিতা'য় জীবনানন্দর উনিশটি কবিতা, যেখানে রবীন্দ্রনাথের ষোলোটি এবং পঞ্চকবির কারওরই ষোলোটির বেশি নয়। আজীবন বাবা ছিলেন জীবনানন্দর পরম সুহৃদ ও উগ্র প্রচারক। যখন বুদ্ধদেব প্রতিটি সুযোগে, প্রবল উৎসাহে জীবনানন্দর 'মার্কেটিং' করছেন, তখন বাবার কাছে বিপুলভাবে ঋণী হওয়ার কারণে তাঁর পুঞ্জীভূত ক্রোধ ও ক্ষোভ জীবনানন্দ তাঁর খাতার কানে কানে বলেছেন। তাঁর একটি উপন্যাসের চরিত্র (স্পষ্টতই জীবনানন্দর অলটার ইগো) তরুণ অধ্যাপক ও সাহিত্যরথী বুদ্ধদেব বসুকে ব্যঙ্গ করেছেন তাঁর 'সাফল্য'কে প্রায় স্থূলতা বলে চিত্রিত করেছেন।
জীবনানন্দ দাশ এবং বুদ্ধদেব বসুর পারস্পরিক সুসম্পর্ক এবং নৈকট্যকে উড়িয়ে দেবার সুযোগ নেই। কিন্তু সফলতা-নিষ্ফলতা এ অনুধাবনের ওপর প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে ঝুলছে। কীর্তিমান এই দুই মানুষের তিরোধানের এতদিন পর এখন আর নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই বাস্তব জীবনের নিখিল (জীবনানন্দ) বাস্তবের বাণেশ্বরের (বুদ্ধদেব) প্রতি সত্যিই এতটা অসূয়া পোষণ করতেন কিনা। বা করে থাকলেও কী ছিল তার অন্তর্গুঢ় কারণ। পৃথিবীর আরো অনেক হিরন্ময় রহস্যের মতো জীবনানন্দ-বুদ্ধদেবের প্রকৃত সম্পর্কও অনতিক্রম্য এক অজ্ঞেয়তার আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকবে, সে সম্ভাবনাই বেশি।
