ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা’র মগন গহন ঘুমের ঘোরে

সনৎকুমার সাহাসনৎকুমার সাহা
Published : 24 July 2022, 00:36 AM
Updated : 24 July 2022, 00:36 AM

অনুবাদ ও কিছু প্রাসঙ্গিক কথা: সনৎকুমার সাহা

ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা (১৮৯৮-১৯৩৬) স্পেনে বিশ শতকের কবিদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নাম। স্বল্পায়ু জীবন। মৃত্যুতেও রহস্যের মহিমা। প্রতিভার স্ফূরণ ঘটে তাঁর কৈশোরেই। মাধ্যমিকের ছাত্র যখন তখনই স্পেনে স্থাপত্য ও শিল্পের নিদর্শন সব চাক্ষুষ দেখে প্রেরণা খোঁজেন; লোক-গানের মাধুর্যে ডুবে যান। শিল্পকলার সব শাখাতেই ছিল তাঁর সাবলীল বিচরণ। অল্প বয়সেই বামপন্থার দিকে ঝোঁকেন। পরাবাস্তবের মিশেল কবিতাকে তাঁর অন্য মাত্রায় সার্থক ফুটিয়ে তোলে। ১৯৩১-এ স্পেনের প্রজাতান্ত্রিক সরকার তাঁর কীর্তিকলায় উৎসাহ জোগাতে শুরু করে। কিন্তু তারই অনুসরণে রক্তময়ী গৃহযুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র তাঁকে তাদের লক্ষ্যবস্তু করে। ১৯৩৬-এ এক রহস্যাবৃত পরিবেশে তারা তাঁকে খুন করে। ইংরেজি অনুবাদে এই কবিতার শিরোনাম Somnambule Ballad--অনুবাদক স্টিফেন স্পেন্ডার ও জে.এল.গিল। ওটাকে সামনে রেখে এই বাংলা রূপান্তর।

মগন গহন ঘুমের ঘোরে

সবুজ! কত চাই তোমাকে সবুজ!

সবুজ হওয়া! সবুজ ডালপালা!

জাহাজ সমুদ্রে ভাসা, আর-

পাহাড়ে পাহাড়ে ঘোড়া।

ঝুলবারান্দায় স্বপ্নাতুরা সে

মধ্যাঙ্গে ছায়ার প্রহরা,

ত্বক-চুল সবুজ-সবুজ,

আর চোখ রূপোলি শীতল।

সুবজ! কত চাই তোমাকে সবুজ!

যাযাবরী চাঁদের আলোয়,

সব কিছু তাকে দেখে--

সে তার কিছুই জানেনা।

সবুজ! কত চাই তোমাকে সবুজ!

শাদা রংয়ের বিশাল তারাগুলো

অন্ধকারের মাছ ফুঁড়ে এসে

ভোরের দরজা খোলে।

ডুমুরের গাছ বাতাসের গায়ে

ঘষে দেয় ডালের শিরিষ,

আর পাহাড় এক ছিচকে বেড়াল

আঁচড়ে দেয় শিকড়-বাকল।

কিন্তু কার আসা? কোথা থেকে আসা?

অপেক্ষা তার ঝুলবারান্দায়,

সবুজ ত্বক, সবুজ কেশদাম

দেখে স্বপ্ন মত্ত সমুদ্রের।

-বন্ধু! আমার ঘোড়ার বদলে

চাই তোমার বসতবাড়ি,

জিনের বদলে চাই আয়না,

আর আলোয়ন, ছুরির বদলে।

আমি তো এসেছি বন্ধু রক্তে

ভেজা, কাবরার গিরিপথ দিয়ে।

--যদি পারতাম বিনিময়ে

হতাম নিশ্চয় রাজি।

কিন্তু আমি তো আমি নই,

আর এ আমার বাড়ি, নয় আমার।

--বন্ধু, মরতে চাই আমি

নিশ্চিন্তে আপন শয্যায়

ইস্তিরি করা, যদি সম্ভব হয়,

হল্যান্ডের মোলায়েম চাদর বিছানো।

দেখতে পাওনা তুমি বুক

থেকে গলা এই ক্ষতটা আমার?

--শাদা ওই তোমার জামাতে

তিনশ কালো গোলাপের ছাপ

চুঁয়ে পড়ে ঝাঁঝালো রক্ত-

তোমার আপন পোশাকে।

কিন্তু আমি আর আমি নই

আমার বাড়িও আর নয় আমার।

--অন্তত একবার শুধু

আমাকে উঠতে দাও সিঁড়ির মাথায়:

দয়া করো, আসতে দাও

সিঁড়ির ওই সবুজ মাথায়।

ওরা যে চাঁদের পথ, চূঁড়াতে

জলের শব্দে প্রতিধ্বনি বাজে ।

সিঁড়ির ওপর ধাপ লক্ষ্য করে

দু’বন্ধু এবার চলে।

পেছনে ফেলে ফেলে তাজা

রক্তছাপ, আর, অশ্রুভেজা পথ।

চিনের লন্ঠনবাতি কাঁপছিল

ছাদের ওপর। হাজার তাম্বুরা

বেজে চলেছিল ভেঙে শান্তি ভোরের ।

সবুজ! কত চাই তোমাকে সবুজ!

সবুজ হাওয়া! সবুজ ডালপালা!

বন্ধু দু’জন ওপরে ওঠে--

বায়ু বয়ে চলে অবিরাম।

মুখে রেখে যায় অদ্ভুত এক স্বাদ--

তেতো, কষাটে, - যেন

মিষ্টি তুলসি মেশা ।

বন্ধু! আমায় বল, কোথায়

সে মেয়ে, তোমার ক্রুদ্ধ নারী?

কতবার সে পথ চেয়ে ছিল

তোমার অপেক্ষায়? শান্ত মুখ,

কালো চোখ, ঝুলবারান্দা-সবুজ!

বেদের মেয়ে দুলে ওঠে--

পেছনে জলাধার।

সবুজ বরণ, সবুজ চুল,

শীতল হিম চোখ, জলের সামনে

তাকে দোলা দেয় চাঁদ

লম্বা তুষার ঝুলনায়।

ক্ষুদ্র চতুষ্কোণে রাত

ঘন হয়ে আসে।

মাতাল প্রহরীদল

দরজায় টোকা দেয়।

সবুজ! কত চাই তোমাকে সুবজ!

সবুজ হাওয়া! সবুজ ডালপালা!

জাহাজ সমুদ্রে ভাসা, আর--

পাহাড়ে-পাহাড়ে ঘোড়া।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক