আমরা তো নমশূদ্র, গেয়ো যোগী ভিখ পায়না

শিমুল সালাহ্উদ্দিন
Published : 14 Jan 2021, 02:11 PM
Updated : 14 Jan 2021, 02:11 PM

শিরোনামের উদ্ধৃতিটি ঊনবিংশ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব শুরুর প্রাক্কালে আক্ষেপ করে বলছিলেন উৎসব পরিচালক আহমেদ মুজতবা জামাল। ১৬ জানুয়ারি থেকে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীর পাঁচটি ভেন্যুতে দেখানো হবে ৭৩টি দেশের ২২৬টি চলচ্চিত্র। করোনাকালে মাস্ক পরে সামাজিক দুরত্ব মেনেই দর্শকদের সিনেমা উপভোগের আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন উৎসব পরিচালক।নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে উৎসবের প্রস্তুতি, করোনাকালে কেন উৎসব, বাজেট, সূচি আর চলচ্চিত্রের নানা সাম্প্রতিক ইস্যু উঠে এসেছে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উৎসব পরিচালক আহমেদ মুজতবা জামালের সাথে কবি ও সাংবাদিক শিমুল সালাহ্উদ্দিন এর আলাপচারিতায়। রেকর্ডকৃত আলাপটি শ্রুতিলিখনে সহায়তা করেছেন রিয়াদাব তামিমজসীম উদ্দীন জোহা

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শোভন ভাই, অভিনন্দন,উনিশতম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হতে যাচ্ছে আপনাদের রেইনবো ফিল্ম সোসাইটির আয়োজনে। এই বছরের উৎসবে ভিন্ন বা আলাদা কী থাকছে? 

আহমেদ মুজতবা জামাল: মুজিববর্ষে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আমরা এবারের উৎসবটা ডেডিকেট করেছি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি। আমরা একটা স্পেশাল সেগমেন্ট আয়োজন করেছি যেটাকে বলা হচ্ছে, "লিজেন্ডারি লিডার'স হু চেইনজড দ্য ওয়ার্ল্ড"—যেখানে আমরা মহামতী লেনিন, মহাত্মা গান্ধী তারপরে মার্শাল টিটো, ফিদেল কাস্ত্রো,ইয়াসির আরাফাত,চে গুয়েভরা এবং সবচেয়ে বড় কথা বঙ্গবন্ধুর উপরে যে নির্মিত একমাত্র ছবি, ওশিমার, সেই ছবিটাও আমরা দেখাচ্ছি। "ফাদার অব দ্য নেশন" বানাতে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন ওশিমা। বঙ্গবন্ধুর ইন্টারভিউ আছে এ সিনেমায়, সেই সেগমেন্টগুলোও আমরা রাখছি। এটা একটা বড় ব্যপার যে, মুজিববর্ষে একটা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল যে হওয়ার কথা ছিলো সেই কমিটির সদস্য আমি কিন্ত সেই ফেস্টিভ্যালটা আলটিমেটলি হয়নাই এবং আই ওয়াজ ইনচার্জ অব দিজ ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, কিন্ত মুজিববর্ষে  সেটা আয়োজন করা যায় নাই। 

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মানে সেটা কি করোনার কারনে?

আহমেদ মুজতবা জামাল: করোনার কারনে। কিন্ত আমরা ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল' উই আর লাকি এনাফ, আমরা আমাদের ফেস্টিভ্যাল কন্টিনিউ করতেছি।

এটা হলো প্রথম ব্যপার এবং দ্বিতীয় কাকতালীয়ভাবে সত্যজিৎ রায়েরও জন্মশতবার্ষিকী ওই ২০২১, মানে এ বছর। আমরা উনার একটা রেট্রোস্পেকটিভ করতেছি, মানে ট্রিবিউট সেকশনে যদিও উনার ছবি দেখাচ্ছি এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর ছবি এবং এই যে লিজেন্ডারি ট্রিবিউট সেকশন, সত্যজিৎ রায়ের ছবি এ দুটো ছবিই আমরা শিল্পকলা একাডেমির নন্দন থিয়েটারে দেখাচ্ছি ফার্স্ট টাইম ঢাকা ফেস্টিভ্যাল এর ৩০বছরের ইতিহাসে প্রথম আমরা,ওপেন ফর অল। আমরা এটা একদম দর্শকদের জন্য ফ্রি রেখেছি, আমরা সত্যজিৎ রায়ের তিনটা ছবি দেখাবো; আর ছয়দিন আমরা দেখাবো, বঙ্গবন্ধুর সেগমেন্টের ছবি। এইভাবে আমরা জিনিসটাকে সাজিয়েছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মোট কয়দিনের উৎসব হচ্ছে?

আহমেদ মুজতবা জামাল: ১৬ থেকে ২৪ জানুয়ারি। নয়দিন। ৭৩টি দেশের ২১৬টি ছবি। ৭৩টি দেশ পার্টিসিপেট করতেছে… .২২৬, টু টুয়েন্টি সিক্স চলচিত্র প্রদর্শিত হবে এবং সত্যজিৎ রায়ের যে আমরা সেমিনার করবো কুড়ি তারিখে, সেখানে শর্মিলা ঠাকুর এবং ধৃতিমান চ্যাটার্জি তারা পার্টিসিপেট করবেন অনলাইনে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালের ঐতিহ্য দীর্ঘ সময়ের এবং এমন একটা সময় ছিল যখন এদেশের তরুণরা একমাত্র বিদেশি ছবি দেখা মানেই  মনে করতো যে, ফিল্মফেস্টিভ্যাল হবে, তখন আমরা নানা দেশের ছবি দেখবো, সারাদিন ধরে দেখবো…

আহমেদ মুজতবা জামাল: নাই, সেই সময় নাই, এখন এখানে শর্টফিল্ম অ্যাওয়ার্ড এর ফেস্টিভ্যালও হয়। ফলে পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি দেখার রেওয়াজ আর নাই কিন্তু! 

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিন্ত এখন যে সময়, টরেন্ট আর নেটফ্লিক্সের যুগ।আমরা চাইলেই আসলে যেকোনো ছবি দেখতে পারি। হ্যাঁ, এই সময়ে এইভাবে এরকম মান্ধাতার আমলের স্ক্রিনিং ফিল্মফেস্টিভালের আয়োজনের যৌক্তিকতা থাকছে কি না! 

আহমেদ মুজতবা জামাল: আসলে ব্যপারটা হলো এরকম যে প্রতিটি জিনিসেরই চাহিদা থাকবে… ই বুক এখন অনেক প্রচলিত, আমি কি ফিজিক্যাল বুক তাই বলে বন্ধ করে দিব?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: একদমই না

আহমেদ মুজতবা জামাল: আমি অনলাইনে ক্লাস নিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, তাই বলে কি আমি পাঠশালা বন্ধ করে দিব? আমি কি আমার উত্তরটা দিতে পারছি এর মধ্যে? (হাসি) এই উৎসবটায় আমি মনে করি যে, মানুষকে বেরিয়ে আসতে হবে। এটাকে ফেইস করতে হবে। মাস্ক পরে সোশ্যাল ডিসটেন্স মেইন্টেইন করে। আমি বলছি যে সাইকিক পেশেন্ট হয়ে যাচ্ছে মানুষ। সন্ত্রাস বেড়ে যাচ্ছে ঘরে নানান ধরনের অকারেন্স ঘটছে। এগুলো থেকে মানুষের একটা রিফ্রেশমেন্ট দরকার এবং মানুষের সংস্কৃতির চর্চার সাথে তার একটা, বন্ধনটা যাতে অটুট থাকে। এই ধরনের আয়োজন বা বইমেলা কিংবা নাট্যেৎসব বা নাটক এই সবকিছুরই প্রয়োজনীয়তা আছে, খেলাধুলা সবকিছুরই প্রয়োজনীয়তা আছে। এই প্যানডেমিক এর মধ্যে মানুষ সাইকিক পেশেন্ট হয়ে যাচ্ছে। তাদেরকে আরও বেশি করে অন্যান্য কিছুর সাথে ইনভলবড রাখাটা অনেক বেশি জরুরি। আইসোলেশনে মানুষ, ম্যাক্সিমাম লোকজন মানসিক যে জায়গাগুলোতে প্রচণ্ড আঘাত নিয়ে নিজের সাথেই লড়াই করছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমি এর মধ্যে কয়েকটা গণমাধ্যমের সংবাদ দেখেছি এবং আমি নিজেই যখন গণমাধ্যমে কাজ করেছি মানে তখনও আমরা উৎসবের সংবাদ সম্মেলনের আগে থেকেই আসলে এ উৎসব, এ ফেস্টিভালের খবর আমরা স্পেশালি দিতাম। আর কালচার, এন্টারটেইনমেন্টের যারা আছেন সবসময়ই দিত কারণ এটা এমন একটা উৎসব যার জন্য আসলে সারা বছর অপেক্ষা করা হয়। অনেকরকম সেন্সরের মধ্যে দিয়ে, নীতিমালা দিয়ে চলেও তো সারা দুনিয়ার সিনেমা দেখার একটা সুযোগ এই ফিল্ম ফেস্টিভ্যালটা তৈরি করে। ফলে এ দেশের এ শহরের ঋদ্ধজনের আগ্রহ থাকে, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। আপনি এবার বলেছেন যে স্বাস্থ্যবিধি  মেনে মাস্ক পরে সকলে আসবে। আপনারা এবার এই ফিল্ম ফেস্টিভালের প্রচারণা কিভাবে করছেন? মানে প্রচারণার জায়গাটা আপনাদের দিক থেকে কেমন? মানে এর আগে যেমন আমরা দেখতাম যে রাস্তায় হোর্ডিং থাকতেছে অনেক আগে থেকেই। ভেন্যুগুলো নিয়ে একধরনের র‌্যালি বা আলাদা কিছু থাকতেছে।

আহমেদ মুজতবা জামাল: আমরা এই সবকিছুই আমরা করতেছি। ইনফ্যাক্ট আমরা আমাদের ফেইসবুক প্রচারণা কিংবা আমাদের টেলিভিশনে প্রমোশন চালানো। সেগুলো সবই চলছে। একাত্তর, চ্যানেল আই এবং দূরন্ত টেলিভিশনে আমাদের প্রমোশন কিন্ত চলতেছে বেশ অনেকদিন ধরে। তারপর নিউজ কিন্ত বেশ অনেক পত্রিকায় এসেছে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা আমাদের পেইজগুলোতে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি। ডেকোরেশনগুলো আগামী দুই থেকে তিনদিনের মধ্যেই লেগে যাবে। আমাদের জায়গা যা ছিলে আমরা গত অন্যান্য বারের তুলনায় খুব একটা ডিফারেন্স আমি দেখছি না। মানে মোটামুটি আমরা সবকিছুই করার চেষ্টা করতেছি। এবার আমরা যেটা করবো আমরা অডিটোরিয়ামে একটা সিট বন্ধ রেখে পরের সিটে বসাবো। আমরা সিটগুলোকে ক্রস দিয়ে আমরা লাল পোস্টার ছাঁপিয়ে একটা সিটকে আমরা ব্লক করে দিবো আরকি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শোভন ভাই আমি জানতে চাই যে, এইযে সংবাদ সম্মেলন হবে, প্রত্যেক বছর স্পন্সররাও তো আপনাদের নিয়মিত স্পন্সর করে, এবার যারা করোনার দোহাই দিচ্ছে। এই জায়গাটা যদি বলেন, তাহলে এইবারের উৎসবের ফান্ডিংটা কিভাবে করছেন আপনারা?

আহমেদ মুজতবা জামাল: একটা অবস্থানে আছি। আগ্নেয়গিরির পাশে দাঁড়ায়া আছি আমি। গত বছর অর্থ মন্ত্রণালয় আমাদের বরাদ্দ দিয়েছিল ৭০ লাখ,এবার তারা বরাদ্দ দিয়েছে ১০ লাখ। আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে যে বরাদ্দ পেয়েছিলাম, এবার সেটা পাই নাই, কম পাচ্ছি। আর সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের যা দিয়েছিলো তার থেকে একটু বেশি…মানে খুবই কম…মানে এগুলো আসলে মেনশনেবল না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরটা অবশ্য ঠিক আছে। সেটা একধরনের একটা সাপোর্ট। কিন্ত সেগুলোর কোনো জায়গা থেকে কোনো ফান্ডিং নাই। 

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তাহলে কেমনে চলবে?

আহমেদ মুজতবা জামাল: এখন আমাদের ডিপোজিট থাকবে হয়তো ২০-২৫ লাখ টাকা। একরকম কিছু একটা হতে পারে।এরকমই দাঁড়াচ্ছে আলটিমেটলি। আমরা চেষ্টা করতেছি। হাতে পায়ে ধরছি একজনের (হাসি)। কিন্ত কাঁৎ হয়না,কেউ পাত্তা দেয়না আমাদের ফেস্টিভ্যালকে।কেউ কাউন্ট করে নারে ভাই।এটা আসল সত্যি কথা, রিয়েলিটি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এইরকম একটা ফেস্টিভ্যাল যা দীর্ঘ সময় ধরে চলতেছে, যার একটা ঐতিহ্য আছে তাকে যখন একটা দেশ পাত্তা দেয়না ফেস্টিভ্যাল ডিরেক্টর হিসেবে আপনি এই সময়ে ২০২১ সালে বসে বলতেছেন এইভাবে। সরকারের দিক থেকে আপনি দুই তিনটা মন্ত্রনালয়ের কথা বললেন।মানে এই আওয়াজটা কি আপনারা তুলছেন কি না? আপনারা বললেন যে ফেসবুক বা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারণা করতেছেন। সেসব মাধ্যমে এই আওয়াজটা কি আপনারা তুলেছেন? আমার তো চোখে পড়ে নাই। 

আহমেদ মুজতবা জামাল: টেল ইউ ফ্রাঙ্কলি, আমরা তো আবেদন সব জায়গাতেই করি। সবজায়গাতেই আমরা করে আসতেছি।ফরেন মিনিস্ট্রি আমাদেরকে স্ট্রং সাপোর্ট করতেছে বিকজ অব দ্য ফরেন স্টেটমেন্ট, ফরেন অ্যাফেয়ার্স প্লাস ফরেন সেক্রেটরি,ফরেন মিনিস্টার প্রত্যেকেই এ ব্যাপারগুলো নিয়ে অ্যালার্ট। সেটা ঠিক আছে, আমি বলতে চাচ্ছি যেটা যে, আসলে আমাদের ফিল্ম ফেস্টিভ্যালটা প্রায়োরিটির মধ্যে পড়ে না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তাহলে ওই প্রায়োরিটির দিকে প্রায়োরিটির লিস্টটা পড়লোনা কেনো বলে আপনি মনে করেন?

আহমেদ মুজতবা জামাল: আমি জানিনা। সমালোচনার জায়গা আছে অবশ্যই যে, আমার ব্যর্থতা। অ্যাজ আ ফেস্টিভ্যাল ডিরেক্টর আমি তাদেরকে সেই জায়গাটায় এনগেইজ করতে পারি নাই। আই অ্যাম নট টু মেনশন দ্য নেইমস। আমি কোনো স্পেসিফিক কোনো জায়গার নাম আমি নিবো না—তবে আমি এটা বলতে চাই যে, আমি ব্যর্থ এই দিক দিয়ে। কিন্ত আমার যে আয়োজন আছে, আমি যে আয়োজন যেটা করতেছি সে একই আয়োজন কোনো সরকারের পক্ষ থেকে দপ্তর বা কেউ যদি আয়োজন করতো আমাদের থেকে ডাবল মানে তিন ডাবল পেতো বাজেট। আমাদের বাজেট দুই কোটি টাকা। দুই কোটি কুড়ি লাখ টাকা বাজেট থাকে অন্যান্য বার। এইবার এক কোটি ছাব্বিশ লাখে আমাদের বাজেট নামিয়ে এনেছি। তার আমি পেয়েছি হলো ঊনসত্তর-সত্তর এরকম।তো আমার প্রায় ৫০ এর মতো আমার প্রায় বাকি থাকতেছে। তারপরেও কাট করতেছি, কী কী ছাঁটা যায়, কী কী ছাঁটলে পরে জিনিসটা করা যায়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অবস্থা তো ভয়াবহ।ইয়েশিমের গুজেলপিনার এর সাথে কথা বলছিলাম।বিভিন্ন রকম বিদেশি ডিরেক্টরদের সাথে আমি কথা বলেছিলাম।এবার তো বিদেশি অতিথিরাই নাই।

আহমেদ মুজতবা জামাল: নাই। ওইটার জন্য এক কোটি টাকা আমার স্ট্রেইটওয়ে লাগতেছেনা। আমার ওই যে টিকেট, থাকা-খাওয়া ইত্যাদি বাদ হয়ে গেছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আচ্ছা। এখানকার ফিল্মমেকারদের কারা কারা আসলে থাকতেছে?কাদের কাদের ছবি থাকতেছে? ইয়াংদের একটা অভিযোগ আছে। আজকে একটি দৈনিকে  দেখবেন যে, ৫-৬ জন ইয়াং ফিল্মমেকারের একটা রিভিউ ছাপা হয়েছে যে,তারা করোনার মধ্যে ব্যস্ত ছিলে, স্ক্রিপ্ট করেছে, সারা বছর তারা কাজ করবে এরকম… আমি তাদের কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, ঢাকার ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল শুরু হচ্ছে আপনাদের কোনো সিনেমা দেখাচ্ছে কিনা। যে শর্ট ফিল্ম আপনারা বানান… ইন্টারন্যাশনালি আপনারা এক্লেইমড হয়েছেন। তাদের ৪ জনের মধ্যে ৩ জনই বললেন যে, তাদের সাথে কোনো যোগাযোগ আপনারা করেননি।

আহমেদ মুজতবা জামাল: একই প্রশ্ন যদি আমি তাদেরকে করি… আপনি তাদেরকে বলেন যে, ওরা যে কান ফেস্টিভ্যাল বা বার্লিন ফেস্টিভ্যাল,ভেনিস ফেস্টিভ্যাল যখন ফিল্ম সাবমিট করে- তারাই কি যোগাযোগ করেন নাকি ফেস্টিভ্যাল কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করেছিল?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তারা যোগাযোগ করেছিলে।

আহমেদ মুজতবা জামাল: তাহলে এখানে এটা কি মানে যে আমাদেরই যোগাযোগ করতে হবে!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই আহ্বান কি আপনারা করেছিলেন কিনা।উদ্দেশ্য…. এই প্রশ্নটা করার উদ্দেশ্য হলো, আমাদের দেশের ইয়াং ফিল্মমেকাররা কেন নাই! 

আহমেদ মুজতবা জামাল: আমাদের বাংলাদেশের ৩৭ টা ছবি দেখাচ্ছি। হোয়াট ডু ইউ মিন বাই- এই ফোর অর ফাইভ পিপল কি বললো না বললো। আমাদের শর্ট সেকশনে ৬৮টা ছবি রয়েছে। তা এই লোকগুলো যদি যায়… তো এই ৪-৫ জন যারা- তারা বিদেশি ফেস্টিভালে দেয়, আমাদের ফেস্টিভালে দেয়না। যাদের নাম আসছে… দুই একটা ছবি চাইছি আমরা, তারা দেয় নাই আমাদের ফেস্টিভালে। আর এদের দু একজন আছে যে তারা আমাদের ফেস্টিভ্যাল থেকে ছবি উইথড্রো করে নিয়ে গেছে। কোন প্রজেকশন বেটার না বলে উইথড্রো করে নিয়ে গেছে। দেয়ার আর মেনি থিংকস…  এইগুলো সবকিছু বলা যায় না। 

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শোভন ভাই, উই নিড আ বেটার ফিল্মিং কালচার, তাইতো? আপনাদের স্লোগানও বেটার ফিল্ম, বেটার অডিয়েন্স বেটার সোসাইটি! 

আহমেদ মুজতবা জামাল: হ্যাঁ, হানড্রেড পার্সেন্ট। কথা হলো যে. আমি যদি বলি যে ন্যাশন্যাল মিউজিয়াম,পাবলিক লাইব্রেরি আমার ভেন্যু। আমি যদি ওখানটায় ডলবি ডিজিটাল প্রজেকশন চাই, সম্ভব?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তাহলে তো হবে না।

আহমেদ মুজতবা জামাল: তো এখন আমাদের এখান থেকে ওই যাদের ইন্টারভিউ ছাপা হয়েছে তার মধ্যে একজন আমাদের ফেস্টিভ্যাল থেকে ছবি উইথড্রো করে নিয়ে গেছে। সে তো ব্ল্যাকলিস্টে আছে। কোনোদিনই তো তার ছবি আমরা দেখাতে যাবো না। আর অন্যান্য ছবি কয়েকটা "নোনাজলেরকাব্য" চাওয়া হয়েছিলে। ফেস্টিভালে দেয় নাই ছবিটা। আচ্ছা… মোটামুটি তো সবাই জানে, কে জানেনা- প্রত্যেকেই জানে। এভ্রিবডি নোজ অ্যাবাউট ঢাকা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। ঢাকা ফেস্টিভালের সাবমিশন ডেট কবে, এটা অন্য কোনও ফেস্টিভালে দেখান হলে… বাংলাদেশের কোনো ফেস্টিভালে দেখানো ছবি আমরা এখানে দেখাতে পারিনা… সবাই জানে।তারপরেও তো আমাদের এই ফিল্ম মেকারদের নিয়ে ঢাকা ক্লাবে আমরা সেদিন মিটিং করলাম, গেট টুগেদার করলাম। কেন করলাম… লোকাল ফিল্ম মেকারদের সাথে বসলাম, ক্লাবে বসলাম। বসে তাদের আর কি কি দরকার, কিভাবে কি হবে না হবে- তাদের প্রেজেন্ট করবো কিভাবে। সবকিছুই আমরা করেছি এবং আমরা এটাও বলছি যে, আমরা প্রয়োজন মনে করতেছি যে, বাংলাদেশ ফিল্ম মেকারদের সাথে আমাদের আরো ইন্টারেকশন হওয়া দরকার। তাদেরকে আরো এট্রাক্ট করা দরকার। সেটার জন্যই আমরা একটা দীর্ঘ মিটিং করেছি… অনেক সাকসেসফুল একটা মিটিং হয়েছে। সবাই একসাথে আমরা কথা বললাম- অনেককিছু বললাম।প্রত্যেককে আবার প্রেস কনফারেন্সে ডেকেছি। আমরা বলেছি তোমরা প্রেস কনফারেন্সে আসো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তার মানে আপনি বলতেছেন যে, আপনাদের দিক থেকে আসলে আপত্তির জায়গা নেই- আপনাদের দিক থেকে দরজা খোলা।কিন্ত অনেকে আসছেনা।

আহমেদ মুজতবা জামাল: হানড্রেড পার্সেন্ট। বামুন ঠাকুররা নমশূদ্রদের ঘরে আসেনা (হাসি)। মুশকিল হলো এটা। স্থানীয় ফিল্মমেকাররা আমাদের নমশূদ্র মনে করে। 

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি, ঢাকা ফিল্ম ফেস্টিভালের তো নমশূদ্র হওয়ার কারণ নাই।

আহমেদ মুজতবা জামাল: আমরা নমশূদ্র…আমরা যে নমশূদ্র রে ভাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি কেন এটা বলতেছেন?

আহমেদ মুজতবা জামাল: ওই হাওড়া ফেস্টিভ্যাল, ওই গোবিন্দগঞ্জ ফেস্টিভ্যাল-ওই সমস্ত জায়গায় ছবি দিয়ে ফেইসবুক ফাটিয়ে ফেলে দেয়। অমুক জায়গায় ছবি দেখানো হয়েছে। ঢাকা ফেস্টিভ্যাল পারতেছে না। ঢাকা ফেস্টিভ্যাল আবার বাইরের লোকজন… আবার তারাই এটারে একনোলেজ করে।ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফেস্টিভ্যাল হিসেবে ঢাকা ফেস্টিভালের যে রেপুটেশন আছে, কেউ যাকনা ইন্ডিয়াতে-যেয়ে জিজ্ঞেস করুক কিংবা ইরানে যেয়ে জিজ্ঞেস করুক বা শ্রীলংকাতে যেয়ে জিজ্ঞেস করুক….বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে জিজ্ঞেস করুক-হোয়াটএভার ঢাকা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ইজ।সাংহাই ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল কিংবা নরওয়ে ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল-ইটালিয়ান বিভিন্ন ফেস্টিভ্যাল আছে, অফিসিয়ালি দে আর পার্টনার অব ঢাকা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে আছে এবং এটা একটা ঐতিহ্যবাহী বিশাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। আমি আপনার কাছে প্রশ্ন আমার-আপনি এই যে ঊনিশতম বারের মতো হচ্ছে এই ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল? গত ২৯ বছর ধরে হচ্ছে- ৯২ সাল থেকে, আর রেইনবো চালাচ্ছেন ৭৭ সাল থেকে। ৪৫ বছর ধরে প্রায়, এই দীর্ঘ সময় আমাদের চলচিত্র সংস্কৃতিতে এই ফিল্ম ফেস্টিভালের অবদান কী বলে আপনি মনে করেন?

আহমেদ মুজতবা জামাল: আসলে প্রত্যেককটা জিনিসের যে অবদান এইটা চোখে দেখা যায়না- প্রত্যেকটা জিনিসের একটা চলমান প্রক্রিয়া। মানুষকে যেমন প্র্যাকটিস করে, একজন খেলোয়াড়কে যেমন রেগুলার প্র্যাকটিসের মধ্যে ফিরতে হয়, একজন শিক্ষার্থীকে যেমন প্রাইমারি স্কুল থেকে তার শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত যেমন তাকে শিখতে হয়- ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল বা নাট্যচর্চা বা সাহিত্যচর্চা সবকিছুই… এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। এটা চলতেই থাকবে। বইমেলা যেমন একটা চলমান প্রক্রিয়া। এগুলো কোনোকিছু বলা যায়না যে, আমি এই কয়েকটা ইভেন্টের মাধ্যমে কী আমি অ্যাচিভ করলাম- এটা একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে… একটা লেয়ার পড়তে থাকে একটা সমাজের মধ্যে। এটা একটা ডেভেলাপ করতে পারে। একটা আনসিন জিনিস।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মূল্যবোধের জায়গায় একটা পরিবর্তন করতে থাকে।

আহমেদ মুজতবা জামাল: ডেফিনেটলি। স্লোলি স্লোলি ইমপ্যাক্টটা ওই জায়গায় একটু অফহোল্ড করে এবং ইয়াংদের ইন্সপায়ার করে। আমাদের প্রচুর ভলান্টিয়াররা তারা এখন ওয়ার্ল্ড ক্লাস ফিল্মমেকার বাংলাদেশের। অনেকেই তারা স্বীকারও করে, আমাদের জুরিও ছিলে। মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী আমাদের ভলান্টিয়ার ছিলে। আবু শাহেদ ইমন আমাদের ভলান্টিয়ার ছিলে। গণ্ডির ডিরেক্টর আরেফিন আমাদের ভলান্টিয়ার ছিল।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এগুলো তো… এগুলো তো প্রত্যক্ষ অর্জন বলা যাইতে পারে।

আহমেদ মুজতবা জামাল: আমি… আমি অর্জন বলতে চাচ্ছি না ঢাকা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালকে। আমি বলছি যে, এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। বলা যাবে না যে, এর জন্য হইছে, না… ইটস নট দ্যাট- তাদের শিক্ষাগত দিক, তাদের আগ্রহ, তাদের জায়গা থেকে তারা ফিল্ম মেকার হইছে। ঘটনাচক্রে তারা আমাদের ভলান্টিয়ার হিসেবেও কাজ করেছেন প্রথম জীবনে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এবার ফিল্ম ফেস্টিভালের সব ছবিগুলো দেখতে হলে আসলে কী করতে হবে?

আহমেদ মুজতবা জামাল: আমাদের একটি গাইডলাইন যেটা পাঠিয়েছি তোমাকে ই- মেইলে ওর মধ্যে ডিটেইলস আছে, আমাদের ওয়েব সাইটেও আছে। সকাল ১০টার সময় ইয়াং বাচ্চাদের জন্য পাবলিক লাইব্রেরিতে যে স্ক্রিনটা হবে সেখানে বাচ্চারা তার প্যারেন্টস নিয়ে আসতে পারবে, ফ্রি। কোনো রকম টিকিট নাই, অর সকাল ১০টায় একটা, ৩টায় জাতীয় জাদুঘর ও পাবলিক লাইব্রেরিতে যে কোনো স্টুডেন্টস মাস্টার্স হোক পিএইচডি হোক তার আইডি কার্ড দিয়ে সে ভিতরে যেতে পারবে, দেখতে পারবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ছবি দেখারফিকতধরাহয়েছে?

আহমেদ মুজতবা জামাল: ফ্রি ফ্রি একদম ফ্রি। আইডি কার্ড দিয়ে ফ্রি। আর সকাল ১০টায় বাচ্চারা, ইয়াং কিডস মানে বাচ্চাদের জন্য, তাদের প্যারেন্টসদের নিয়ে আসলে, প্যারেন্টস-রাও দেখতে পারবে বাচ্চাদের সাথে।বিকাল পাঁচটা ও সন্ধা সাতটায় ওই জায়গাটায় একটা টিকিট লাগবে। ৫০ টাকার টিকেট। এটা যে কেউ আসলে পারবে। কিন্তু আবার সুফিয়া কামাল সকাল থেকে যেটা হবে, সেটা ফ্রি। শিল্পকলা একাডেমির সংগীত চিত্রশালায় ফ্রি। তারপর নন্দন থিয়েটারে ফ্রি। সো মাক্সিমাম ফ্রি। শুধু জাতীয় জাদুঘর ও পাবলিক লাইব্রেরিতে যে বিকাল ৫টা ও ৭টায় দুটো শো হবে ওইটার টিকেট রেখেছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হ্যাঁ,  ওইটার ভাড়া অনেক বেশি।

আহমেদ মুজতবা জামাল: আমি ৭ লক্ষ টাকার শুধু আমি ভেন্যু ভাড়া দিচ্ছি রে ভাই। আমার টিকেট থেকে সব মিলিয়ে ৫০ হাজার টাকা আসবে! 

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তা নিয়েও সন্দেহ আছে।

আহমেদ মুজতবা জামাল: সেটাই তো বললাম, সব মিলিয়ে আমার হয়ত ৫০ হাজার টাকা আসবে। আমি ৭ লক্ষ টাকার উপর অডিট রুম ভাড়া দিচ্ছি ন্যাশনাল মিউজিয়াম আর পাবলিক লাইব্রেরিতে। সেটা আবার ৫০ শতাংশ করে দিছে। কালচার মিনিস্ট্রি আমার ৫০ শতাংশ করে দিছে, না হলে তো আমি ১৪ লক্ষ টাকা দিতাম আমি, ১৫ লক্ষ টাকা দিতাম আমি ভাড়া।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: একটা ঝামেলা ছিল, আপনাদের উৎসব নিয়ে যেটা হলো সব সময় আপনারা বলেছেন ব্যাপারটা নিয়ে, এবং আমার মনে আছে,  তিন বা চার বছর আগে আই ওয়াজ ইন পাবলিক লাইব্রেরি, সম্ভবত, ওয়ান অব ইন্টারন্যাশনাল ডিরেক্টর ওয়াজ স্ক্রিমিং অ্যান্ড ক্রায়িং, যে তার কোন সিন কেটে ফেলে দেওয়া হয়েছে, এবং এই সেন্সর, হ্যাঁ নুডিটি, এখনো কি সেন্সর নিয়ে এই জটিলতাগুলো আছে কিনা?

আহমেদ মুজতবা জামাল: আছে, আজকেও ৫টা ছবির রিভিউ আসছে, সেসবের কোন কোন অংশ কেটে দেওয়া হইতেছে, সেন্সর অনেক কিছুই করে, সেন্সর, এটা আমাকে মানতেই হবে, বাংলাদেশ সেন্সর রুল, আই ক্যান্ট হেল্প ইট, খুব আশ্চর্যজনক ঘটনা হলো টেলিভিশন ফ্রি, হ্যাঁ, আমার আকাশ ফ্রি…

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিন্তু আমার, আমার এই জায়গাতে এই কথাটা বলতে চাই…

আহমেদ মুজতবা জামাল: আমার আকাশ ফ্রি, তারপর আবার আমার যে কি ওই যে এখন… ওয়েব সিরিজের নামে যে কি হইছে সে দেখছি অথচ এই ১০০জন, ১০জন বা ৫০জন সিনেমা দেখবে তার জন্য সেন্সরের করাত, সেন্সর বোর্ড বা সেন্সর রুলস ভয়ংকর বাঘের মত আছে, কিন্তু ওইগুলির জন্য কোন সেন্সর নেই, কিচ্ছু নেই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটা নিয়ে আপনাদের বক্তব্য নেই কোন?

আহমেদ মুজতবা জামাল: আমার বক্তব্য! আমার এগুলো বলেও লাভ নেই কোন, কিন্তু এটা বলে লাভ নেই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিন্তু এটা তো বলতে হবে, আমি ওই দৃশ্য দেখে আমার মনে হয়েছে, এজ এ জার্নালিস্ট, আমার মনে আছে— আমার সৃষ্টি,আমি একটা সিনেমা বানাইছি যখন আমার সেটার প্রদর্শন হচ্ছে, আমি সেটার সামনের সীটে বসে আই এম ক্রায়িং। ইটস নট ডান শোভন ভাই! 

আহমেদ মুজতবা জামাল: কিন্তু এখানে কথা আছে তো একটা, আমি বলে দেই, প্রত্যেকটা ফিল্ম মেকার কে কিন্তু বলা আছে, আমাদের রুলস এ বলা আছে, যে আমাদের বাংলাদেশের প্রতিটা ছবি ফ্লিম সেন্সর বোর্ডে পাঠানো হবে, এবং সেন্সর বোর্ড কিন্তু নুডুটি, সেক্সসিয়ালিজম এবং লেসবিয়ান, গে এলজিবিটি ইস্যু দে ডোন্ট এলাউ। তুমি যদি ছবি সাবমিট করো ইটস মিনস, ইউ আর এগ্রিড টু ডিলিট অল দিস সিন। আমি তো আমার ছবি সাবমিট করছি জাইন্যা শুইন্যা, এখন আমি তো ট্রাই করে লাভ নেই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিন্তু সেন্সরের প্রক্রিয়া, আমি বলতে চাচ্ছি ধরেন প্রক্রিয়াটা নিয়ে, যে সময় নেয়, আপনারা সিনেমা জমা দিলেন যেই সময় নেই দেখা গেল যে, উৎসব চলে আসছে, সিনেমা দেখাই শেষ করে নাই ওরা।

আহমেদ মুজতবা জামাল: ওইটা হয় এরকম, আমার ছবি মোটামুটি সব দেখা শেষ। এখন আমাদের ৫ টা ছবি যেটা ওরা রিমার্ক্স করেছে সেটা এডিট করে দেওয়ার পরে তারপর আমরা সার্টিফিকেটটা পাবো। সেন্সর বোর্ড এমনি আমাদের কোঅপারেশান করেছে, কিন্তু সেন্সরের রুলস এর যে ব্যাপারটা আছে, আমি বলছি যে এইটা কাইন্ড অব ডাবল স্ট্যান্ডার্ড পলিসি বাংলাদেশে। আমার আকাশ যখন ফ্রি, আমি যখন ইউটিউব বিভিন্নভাবে বাংলাদেশে প্রতিদিন রাতে ১ কোটি বা ১০ কোটি লোক তারা নুডিটি দেখতেছে, পর্ন দেখতেছে, আর আমি মাত্র দেড়শ- দুইশ জন লোকের বা পাঁচশ জন একটা সিনেমা দেখবে তার জন্য আমি সেন্সরের নামে আমি অস্থির হয়ে গেলাম। সার্চ আডাবল স্ট্যান্ডার্ড! মানে এগুলো কারে বোঝাবো!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হুমম, তা ঠিক।

আহমেদ মুজতবা জামাল: কাউরে বলার মত কেউ আছে? কারো ঘটে কি এই জিনিসগুলো ঢুকবে? লাভ নেই তো । চিল্লায়ে লাভ নেই, তাই আমার কাজ করা,ফেস্টিভ্যাল করা করতে থাকি বাবা অ্যাক্টিভিস্ট যারা আছে তারা এগুলো নিয়ে চিল্লাচিল্লি করুক, হৈ হুল্লোড় করুক, আমি এগুলো করে লাভ নেই, আমি বাবা  ফেস্টিভ্যালটা করলে হয়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: শোভন ভাই, ১৯ তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব সফল হোক সেটা আমরা চাই। মানে সর্বতভাবে সফল হোক সেটা আমরা চাই। এই যে উৎসবটা, এই উৎসবটা সফল করতে হলে আপনি জাতির ক সাপোর্ট চান আসলে? মানে যারা ফিল্ম পছন্দ করেন তাদের কাছ থেকে কী সাপোর্ট-টা আপনি চান?

আহমেদ মুজতবা জামাল: আমরা একটা ফিল্ম সেন্টার চাই, যেখানে আমরা পার্মানেন্টলি ফিল্ম ফেস্টিভলের ভেন্যু হিসেবে পাবো, আমাদের ওই স্ক্রিনিং টেনশান থাকবে না, আমাদের ফ্যাসিলিটিসজগুলো থাকবে, যেখানে ৪টা- ৫টা থিয়েটার থাকবে এবং ওপেন স্পেস থাকবে, ওপেন স্পেস, মাইন্ড ইট… ইউ নিড স্পেস লাইক এ পাবলিক লাইব্রেরি, ইউ নিড স্পেস লাইক শিল্পকলা একাডেমী। আমাদের ওইরকম একটা স্পেসসহ আমাদের একটা কমপ্লেক্স দরকার যেখানে…।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ফিল্ম কমপ্লেক্স?

আহমেদ মুজতবা জামাল: হ্যাঁ, যেখানে ৪টা-৫টা থিয়েটার থাকবে এবং ডিজিটাল স্ক্রিনিং অল কাইন্ড অব স্ক্রিনিং এর ফ্যাসিলিটি থাকবে। এইটাই আমার চাওয়া। তাইলে আটোমেটিক আমাদের ফেসটিভেল কোয়ালিটি আরো হাই হবে। অফ কোর্স তার জন্য ফান্ডিং দরকার, ফরেন ডেলিগেটস এর থাকা-খাওয়ার ব্যাপার, আসা-যাওয়ার ব্যাপার, এবং ফরেন ডেলিগেটস একটা ফেস্টিভ্যাল এর পার্টস, এটা ছাড়া, ফেস্টিভ্যাল আসলে ঠিক মত করা যায় না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অনেক ধন্যবাদ, শোভন ভাই, আমি একটা প্রশ্ন ভুলে গেছিলাম, সেটা হলো যে আপনি কি আসলে মানে আপনি অনেক দিন ধরে নেতৃত্বে আছেন, মানে উৎসবটা সফলভাবে আয়োজিত হচ্ছে, আপনার পরবর্তী নেতৃত্ব কি আপনি তৈরি করছেন? বা তারা কি বা আপনার সাথে যারা কাজ করছেন তারা কি পরবর্তী সময়ে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে?

আহমেদ মুজতবা জামাল: কম, মৃত্যুবরণ করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। কারণটা হলো যে আমি বলি, আমি যে সময়টা দেই এটার পেছনে, টোয়েন্টি ফোর আওয়ার্স।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: টোয়েন্টি ফোর সেভেন।

আহমেদ মুজতবা জামাল: একদম টোয়েন্টি ফোর সেভেন, ওকে? আমি সকাল থেকে ঘুমাই, বা রাতে ঘুমাই, যতকিছু করি সারাক্ষণ আমার মাথার মাঝে কাজ করতে থাকে আমি কি করবো না করবো, কী করবো, কার সাথে যোগাযোগ করবো, কাকে ফোন করবো, কাকে দিয়ে কী করবো, এই জিনিসগুলোর প্ল্যানিংটা আমার অলওয়েজ চলতে থাকে। প্রতিবছর আমাদের এখানে, আমাদের ১২ থেকে ১৫ জন লোক সারা বছরব্যাপী কাজ করে, আমাদের বাৎসরিক ৩৫ লক্ষ টাকা স্টাবলিশমেন্ট কস্ট আছে ফেস্টিভ্যাল এর, ঢাকা ফেস্টিভ্যাল এর বিলিভ মি, আমাদের অফিসের স্যালারি এই ইকুয়েপমেন্ট ইত্যাদি সবকিছু বা আমাদের ফরেন যেই প্রোগ্রামার রা আছেন বাইরের তাদের কে পেমেন্ট করতে হয় আবার অনেক রকমের ব্যাপার আছে। তো এরকম ৩০/৩৫ লক্ষ টাকা আমাদের এক্সপেন্ডিচার আছে। তো আমার স্যালারি দেড় লক্ষ টাকা আমার কমিটি ঠিক করে দিছিল, গত সাত বছর হয়ে গেছে; আমি আজ পর্যন্ত সেই স্যালারি আমি ১ মাসেরও তুলতে পারি নাই, কারণ সেই ঢাকা ফেস্টিভ্যাল এর সেই টাকা আসে নাই। তা আমি চলি কিভাবে? আমি- 'আই বিকাম সাঁওতাল অলমোস্ট', আমার ওয়াইফ চাকরি করে, আমি সাঁওতাল পুরুষ যেভাবে থাকে, আমি অলমোস্ট ওইরকম একটা ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছি। ফেস্টিভ্যালটাকে আমি ট্রিট করি- ইটস লাইক মাই বেবি, আমার দুইটা মেয়ে আর ফেস্টিভ্যাল আমার আরেকটা মেয়ে, আমি এটাকে লালন-পালন করি আমার সন্তানের মত করে। আমি যখন আরেকজনকে এখানটায় নিয়ে আসবো, যে নাকি আমার দায়িত্বটা নিবে- তার প্রথম চিন্তা কিন্তু তার ফ্যামিলি, তার সংসার, তার থাকা খাওয়া, তার বাড়িভাড়া, তার ইত্যাদি ব্যাপার আছে। আমি যেদিন বিছানায় পড়ে যাবো, সেদিন ফেস্টিভ্যাল ডেড হয়ে যাবে, তাদের পক্ষে এই সময়টা দেওয়া সম্ভব না, আমি যদি পারতাম , আমি বলি, আমি পারতাম, আমি যদি ১০ জন ১৫ জন ছেলেকে অ্যাপয়েন্ট করতে পারতাম, যাদের বেতন নিশ্চিত, যার ইনক্রিমেন্ট নিশ্চিত, যার গ্রাচুয়েটি নিশ্চিত, যার প্রোভিডেন্ট ফান্ড নিশ্চিত, যার লিভিং নিশ্চিত, যে নাকি এখানে রিটায়ারমেন্ট এর পর পেনশান পাওয়ার নিশ্চিত করতে পারবো, তার চাকরির নিশ্চয়তা দিতে পারবো, ক্যারিয়ার বিল্ড আপ করতে পারবে, তখন অটোমেটিক একজন কেন, আমি ২৫ জন, ৫০ জন- আমি সাকসেসর তৈরি করে যেতে পারবো। আমার তো সেই স্ট্রাকচার নেই, আমার তো নুন আনতে পানতা ফুরায়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তারমানে আপনাকে যদি আমরা হারাই আমরা আসলে এই ফেস্টিভ্যাল হারাচ্ছি?

আহমেদ মুজতবা জামাল: হানড্রেড পার্সেন্ট। বিকজ শর্ট ফ্লিম করা আমাদের কত আগে শুরু হয়েছিল, আমাদের থেকে ৩ বছর আগে, আমরা বিরানব্বইতে ফেস্টিভ্যাল শুরু করলাম। ওরা ৮৭/৮৮ এ প্রথম ফেস্টিভ্যাল করলো,সেকেন্ড ফেস্টিভ্যাল করলো নব্বইতে, তারপর যেয়ে বিরানব্বইতে আমরা ঢাকা ফেস্টিভ্যাল করলাম, কিন্তু যে বিষয়টা হলো যে শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালটা আজকের, এটা কিন্তু একটা জাতীয় পর্যায়ে একধরনের সাপোর্ট অনেকের অনেক রকম ছিল, কিন্তু আজকে তাদের অবস্থা দেখেন, কারন প্রতি বছর তাদের চেঞ্জিং বা ইত্যাদি করতে করতে তাদের যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে,আমরা কিন্তু এই ফেস্টিভ্যালকে একটা অবস্থান দাঁড় করিয়েছি; মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কিন্তু দুইবার উদ্বোধন করেছেন, মাননীয় রাষ্ট্রপতি একবার উদ্বোধন করেছেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি আমরা পেয়েছি, ওই সম্মানের জায়গাটা আমরা পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রী আমাদেরকে, উনি আসছেন, উনি এসে আমাদেরকে চাইছি যা চাইছি, তাই দিছেন, ২০ লক্ষ টাকা চাইছিলাম, ২০ লক্ষ টাকা দিছেন। কিন্তু প্রশ্ন সেটা না, প্রধানমন্ত্রীকে সব সময় পাওয়া যায় না, বা যা চাই তা বলাও বা করা যায় না; কিন্তু আমি যখন এইটাকে নিশ্চিত করতে পারবো যখন আমার একটা ফান্ড থাকবে, পার্মানেন্ট ফান্ড থাকবে, পার্মানেন্ট অফিস থাকবে, সবকিছু থাকবে, তখন কিন্তু আমি এই জিনিসটা বিল্ড আপ করতে পারবো, এই নেসেসিটিটা, আমি আগেই বলেছি কিন্তু, ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল তার যে নেসেসিটি, এটা আমি রিচ করাইতে পারি নাই, যাদের কাছে এই জিনিসটা পৌঁছানোর দরকার, তথ্য মন্ত্রণালয় কি আমাকে কেয়ার করে? থোড়াই কেয়ার করে! আমার কি কোন মূল্য আছে সেই জায়গাতে? নাই।

কনসার্নড জায়গাগুলোতে কি এটার মূল্যায়ন হয়? নাই। করে না তারা। মফিদুল হক, শাহরিয়ার আলম মানে প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, তারপরে ম হামিদ, জালাল আহমেদ, মোকাম্মেল হোসেন, শফিকুর রহমান, সামিয়া জামান, নাজমুল হাসান কলিমুল্লাহ, এরা আমার ফেস্টিভ্যাল এর টিম। আর রেইনবো ফিল্ম সোসাইটির একটা বিশাল বড় টিম আছে যেখানে আমাদের ভলান্টিয়ার আছে, আমাদের মিজান আছে, আমাদের সুজন আছে, আমাদের ওই যে সৌরভ আছে, এরকম আমার টিম আছে, আমার টিমগুলো হার্ড, ডে-নাইট তারা পরিশ্রম করে। তারা যে পরিমাণ পরিশ্রম করে, তারা যেভাবে আমার সাথে আছে, আমি এদেরকে ধরে রাখি, আমি এদের আমার সন্তানের মত আমি এদের লালন পালন করি। দশ পনের হাজার করে, পনের হাজার, কুড়ি হাজার করে স্যালারি দেই এক এক জনরে। এর থেকে যে পরিশ্রম করে তারা সারাবছরব্যাপী এই জায়গাটাতে।  বানী সমাদ্দার, ও প্রচণ্ড পরিশ্রম করে, ইতি একটা মেয়ে আছে, ও এই লাইনে যে কি পরিশ্রম করে, ইউ হ্যাভ নো আইডিয়া। আমার টিম আছে, আমি এই টিমটাকেই দাঁড় করাতে পারতাম, আমি এই টিমটাকে নিয়েই আমি সাকসেসর বানায়ে রেখে যেতে পারতাম, আমি যদি শেষ স্ট্রাকচারটা রেখে যেতে পারি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমি বুঝতে পারছি।

আহমেদ মুজতবা জামাল: সেটি কি সম্ভব? সেটা কি আমাকে দিবে? এই রাষ্ট্র কি সেই জায়গাটা আমাকে দিবে? বা কোন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেই জায়গাটা আমাকে দিবে? আমাকে সে রকম সহযোগিতা দিবে, আমি একটা পার্মানেন্ট একটাই করে যাইতে পারবো? সেটা তো নাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: নিশ্চয় সেটা হওয়া উচিত, এবং আমরা আমাদের এই আলাপ, এই আলাপটা ঠিক জায়গায় পৌঁছাবে সেই আশা আমরা করি, অনেক ধন্যবাদ আপনাকে শোভন ভাই, থ্যাংক ইউ…।

আহমেদ মুজতবা জামাল: মাই প্লেজার, শিমুল।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক