১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

কেতকী কুশারী ডাইসন: বাংলা ভাষার এক বিশ্বনাগরিকের বিদায়

আমরা নিশ্চিত জানি, দুই ভাষা, দুই দেশ ও দুই সংস্কৃতির মধ্যে যে-জীবন তিনি এতকাল ধরে নির্মাণ করেছেন, মৃত্যুর পরও তার দরজা খোলা থাকবে সবদেশের পাঠকের জন্য। কেতকী আর লিখবেন না, কিন্তু তাঁর লেখা আমাদের সঙ্গে কথা বলতে থাকবে। তাঁরই একটি বইয়ের নাম ধার করে বলা যায়—লেখায়, চিন্তায় ও প্রশ্নে তিনি যে ভাবনার ভাস্কর্য নির্মাণ করে গেলেন, তার মধ্যেই কেতকী কুশারী ডাইসন থেকে যাবেন।

লীনা দিলরুবা

Published : 14 Sep 2026, 12:16 AM

Updated : 17 Sep 2026, 02:59 AM

একজন লেখকের দেশ কোথায়? যে-ভূখণ্ডে তাঁর জন্ম, সেটিই কি তাঁর দেশ? যে-দেশে তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় কাটান, সেটি, নাকি শেষ পর্যন্ত লেখকের প্রকৃত দেশ হয়ে ওঠে তাঁর ভাষা?

কেতকী কুশারী ডাইসনের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে ভাবলে এই প্রশ্নটি বার বার মনে আসে। তাঁর জন্ম বাংলায়, পড়াশোনা কলকাতায়, পরে উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়েছিলেন অক্সফোর্ডে, তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে ইংল্যান্ডে। কিন্তু এই বিচিত্র ভূগোলের মাঝখানে বাংলা ভাষার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনো ছিন্ন হয়নি। বরং দূরত্ব সাহায্য করেছে বাংলাকে অন্যভাবে দেখতে। দেশ থেকে দূরে গিয়ে তিনি দেশকে হারাননি; তৈরি করেছিলেন নিজের আরেকটি দেশ—ভাষার মাধ্যমে। 

দুদিন আগে, ১১ সেপ্টেম্বর, দুই ভাষা আর দুই ভূগোলের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে কেতকী কুশারী ডাইসন চলে গেলেন তাঁর শেষ যাত্রায়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক—তাঁর পরিচয়ের তালিকা দীর্ঘ। কিন্তু এই পরিচয়গুলোর কোনোটিই একা তাঁকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করে না। সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিচয়—তিনি ছিলেন দুই ভাষা, দুই সংস্কৃতি এবং একাধিক ভূগোলের মধ্যে অবিরাম যাতায়াতকারী একজন লেখক। ছিয়াশি বছর নিঃসন্দেহে একটি পরিণত জীবন। তবু কিছু মানুষের মৃত্যু বয়সের হিসাব মেনে সহজে গ্রহণ করা যায় না। কেতকী কুশারী ডাইসনের মৃত্যুও তেমন। মনে হয়, তাঁর আরও কিছু বলার ছিল, আরও কিছু প্রশ্ন তোলার ছিল, আরও কিছু লেখা বাকি ছিল। যে মানুষটি এত দীর্ঘকাল শব্দ, চিন্তা ও অনুসন্ধানের মধ্যে জীবন্ত ছিলেন, তাঁর হঠাৎ না-থাকাকে শুধু ‘পরিণত বয়সের মৃত্যু’ বলে মনকে বোঝানো কঠিন। মৃত্যু বয়সের হিসাব জানে, শোক বোধহয় জানে না!

কেতকীর জন্ম ১৯৪০ সালে কলকাতায়, যদিও শৈশবের স্মৃতির একটি অংশ জড়িয়ে ছিল পূর্ববঙ্গের মেহেরপুরের সঙ্গে। 

‘প্রবাস’ বাংলা সাহিত্যের কাছে নতুন কোনো ভূগোল নয়। নানা সময়ে বহু বাঙালি লেখক দেশ থেকে দূরে থেকেছেন, ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে বসে লিখেছেন নিজের দেশ, মানুষ ও স্মৃতির কথা। কেতকীর কাছে প্রবাসের অভিজ্ঞতা কিছুটা জটিল। নতুন দেশে বসবাস, নতুন সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, ভাষার টানাপোড়েন এবং একজন নারী হিসেবে নিজের জায়গা খুঁজে নেওয়া, সবই তাঁর প্রবাসজীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। তাঁর নোটন নোটন পায়রাগুলি উপন্যাসে কেতকী ব্রিটেনে অভিবাসী জীবনের বাস্তবতা, বিশেষ করে নারীর একাকিত্ব, সম্পর্কের সংকট, সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব এবং নিজের পরিচয় ও স্বাধীনতা খুঁজে পাওয়ার লড়াইকে তুলে ধরেছেন। 

বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ ছিল। তিনি কাব্যচর্চাও করেছেন। তাঁর কবিতায় দেশান্তর, প্রকৃতি, শরীর, সম্পর্ক ও স্মৃতি যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা।  গবেষক কেতকীর খ্যাতি এত বেশি যে কখনো কখনো তাঁর কবিসত্তা এর আড়ালে পড়ে যায়। অথচ সবীজ পৃথিবী, জলের করিডোর ধরে, কথা বলতে দাও-এর মতো রচনার দিকে তাকালে বোঝা যায়, তাঁর বৌদ্ধিক অনুসন্ধান এবং কবিসত্তা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। গবেষণায় যে মানুষটি ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া সূত্র খুঁজেছেন, কবিতায় তিনিই খুঁজেছেন মানুষ, স্মৃতি ও অস্তিত্বের সূক্ষ্ম সংযোগ।

কেতকী কুশারী ডাইসনের প্রবন্ধগ্রন্থ চলন্ত নির্মাণ তাঁর মননের ব্যাপ্তি বোঝার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। বইটির বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি দর্শন, মানবতাবাদ, সাহিত্য, প্রযুক্তি, নারী, প্রকৃতি ও সভ্যতার নানা প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। 

‘মানুষ কি সব কিছুর মাত্রা?’ প্রবন্ধে কেতকী ফিরে গেছেন প্রোতাগোরাসের প্রাচীন সেই বিখ্যাত ধারণায়—‘মানুষই সব কিছুর মাত্রা’। সেখান থেকে সক্রেটিস, প্লেটো, মার্কস হয়ে আধুনিক মানবতাবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে তাঁর অনুসন্ধান। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সহজ—আমরা যখন ‘মানুষ’ বলি, তখন আসলে কাকে বোঝাই? ইতিহাসের দীর্ঘ সময় ধরে এই সর্বজনীন ‘মানুষ’-এর আড়ালে কি আসলে পুরুষ, বিশেষ কোনো শ্রেণি কিংবা ক্ষমতাবান কোনো জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাকেই আদর্শ বলে ধরে নেওয়া হয়নি? নারী এবং সমাজের প্রান্তে থাকা মানুষের অভিজ্ঞতা তাহলে কোথায়? কেতকী এখানেই মানবতাবাদের প্রচলিত ধারণাকে নারীবাদী ও বহুত্ববাদী প্রশ্নের সামনে দাঁড় করান। তবে তিনি মানবতাবাদকে বাতিল করেন না; বরং তার সীমানা প্রসারিত করতে চান। তাঁর কাছে মানুষ প্রকৃতির অধিপতি নয়, প্রকৃতিরই অংশ। ফলে অন্য প্রাণী, উদ্ভিদ ও সমগ্র প্রকৃতিজগতের অস্তিত্বকে শুধু মানুষের প্রয়োজন দিয়ে বিচার করা যায় না। মানুষ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষই বিশ্বের একমাত্র মাপকাঠি নয়—এই বিনয়ী মানবতাবাদের দিকেই তাঁর চিন্তা এগোয়।

চলন্ত নির্মাণ-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা শিবনারায়ণ রায়ের রবীন্দ্র-বিচারকে ঘিরে কেতকীর তর্ক। শিবনারায়ণ রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বসাহিত্যের প্রথম সারির কবি বলে স্বীকার করেও তাঁর সাহিত্যকে প্রশ্নহীনভাবে মহিমান্বিত করেননি। রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানে ট্র্যাজিক বোধ ও অস্তিত্বসংকটের গভীরতা, উপন্যাসের চরিত্রসৃষ্টি কিংবা নাটকের সাফল্য—নানা জায়গায় তিনি কঠোর প্রশ্ন তুলেছেন এবং তুলনার জন্য সামনে এনেছেন গ্যেটে, শেক্সপিয়র ও ইউরোপীয় সাহিত্য-সংগীতের ঐতিহ্য। কেতকীর আপত্তি রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করায় নয়; তাঁর আপত্তি সেই সমালোচনার মানদণ্ডে। কেন ইউরোপীয় ট্র্যাজেডি বা ইউরোপীয় সাহিত্যবোধই বিশ্বসাহিত্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি হবে? রবীন্দ্রনাথের প্রেম, মৃত্যু, নিঃসঙ্গতা, বেদনা কিংবা অস্তিত্ববোধের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভাষা রয়েছে; তাকে ফাউস্ট বা শেক্সপিয়রের ছাঁচে বিচার করলে সেই স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে যেতে পারে। নারীচরিত্রের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন তোলেন কেতকী—ভিন্ন সমাজ ও ইতিহাসের নারীকে একই সাংস্কৃতিক মাপকাঠিতে মাপা কতটা যুক্তিসংগত? এই তর্কটির মধ্যে কেতকীর বৌদ্ধিক চরিত্র যেন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিবনারায়ণ যেমন গভীর শ্রদ্ধা রেখেও রবীন্দ্রনাথকে প্রশ্ন করেছেন, কেতকীও তেমনি শিবনারায়ণের প্রতি শ্রদ্ধা অক্ষুণ্ণ রেখেই তাঁর বিচারপদ্ধতিকে প্রশ্ন করেছেন। এই প্রশ্ন করার স্বাধীনতাই কেতকীর মননের অন্যতম শক্তি।

আরেকটি প্রবন্ধে তিনি শচীন্দ্রনন্দন বসুর ‘প্রাযুক্তিক সমাজে মানুষ’ প্রবন্ধটির সমালোচনামূলক পাঠ করেছেন। প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা মানুষকে বিচ্ছিন্ন, যন্ত্রনির্ভর ও ক্রমশ অমানবিক করে তুলছে—বসুর এই আশঙ্কাকে কেতকী একেবারে উড়িয়ে দেননি। কিন্তু তাঁর মনে হয়েছে, প্রযুক্তিকে কেবল বিপদ হিসেবে দেখলে বাস্তবতার অর্ধেকটাই দেখা হয়। প্রযুক্তি মানুষের শ্রম কমিয়েছে, যোগাযোগের পরিসর বাড়িয়েছে, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবন বদলে দিয়েছে; বিশেষ করে নারীর ক্ষেত্রে ঘরের শ্রম থেকে মুক্তি, শিক্ষা, কাজ এবং বৃহত্তর সামাজিক পরিসরে অংশগ্রহণের নতুন সুযোগও তৈরি করেছে। তাই তাঁর প্রশ্ন প্রযুক্তি ভালো না মন্দ—এত সরল নয়। আসল প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তি কার হাতে, কোন সামাজিক ব্যবস্থায় এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা, ভোগবাদ, পরিবেশের ক্ষতি ও মানুষের বিচ্ছিন্নতার বিপদ সম্পর্কেও সচেতন। আবার তার বিপরীতে প্রযুক্তিহীন অতীতকে কোনো হারানো স্বর্গ হিসেবে দেখতেও অস্বীকার করেন; কারণ সেই অতীতেও ছিল দারিদ্র্য, বৈষম্য, নিপীড়ন এবং নারীর অধীনতা।

কেতকীর সাহিত্যজীবনের একটি বড় ভূখণ্ড ‘রবীন্দ্রনাথ’। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাঙালির আবেগের অভাব নেই। কিন্তু আবেগের প্রাচুর্য কখনো কখনো অনুসন্ধানের জায়গাটি ছোট করে দেয়। কেতকী সেখানে অন্য পথ নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাছে ছিলেন অনুসন্ধানের এক উন্মুক্ত ভূখণ্ড। এই অনুসন্ধান একসময় রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার দিকেও বিস্তৃত হয়। সুশোভন অধিকারীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি রচনা করেন প্রায় আটশ পৃষ্ঠার-রঙের রবীন্দ্রনাথ। 

বইতে আমরা দেখি, রবীন্দ্রনাথকে আমরা তাঁর কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে যতটা চিনি, তাঁর ছবির মধ্য দিয়ে হয়তো ততটা দেখি না। অথচ জীবনের শেষ পর্বে এসে তিনি রঙ, রেখা ও আকৃতির যে সম্পূর্ণ নতুন জগৎ নির্মাণ করেছিলেন, তারও ছিল নিজস্ব ভাষা। সেটি কখনো রহস্যময়, কখনো অন্ধকার, কখনো আদিম, আবার কখনো আশ্চর্য আধুনিক হয়ে উঠেছিল। সহ- সম্পাদকের  সঙ্গে কেতকীর অনুসন্ধান ছিল—এই রেখার উৎস কোথায়? রবীন্দ্রনাথের অদ্ভুত মুখাবয়ব, মানুষ ও প্রাণীর মধ্যবর্তী রহস্যময় অবয়ব, অচেনা পাখি, কাল্পনিক জীব কিংবা আলো-অন্ধকারের বিন্যাসের পেছনে কি ছিল তাঁর বিস্তৃত পাঠ, ভ্রমণ, শিল্পদর্শন এবং পৃথিবীর নানা সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়ের কোনো দৃশ্যস্মৃতি? 

এই প্রশ্ন করার মধ্যেই কেতকীর গবেষণাপদ্ধতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। তিনি সাহিত্যকে শুধু সাহিত্যের মধ্যে রেখে দেখতেন না। সাহিত্য, শিল্প, ইতিহাস, জীবনী, বিজ্ঞান—প্রয়োজনে সবকিছুকে পাশাপাশি বসিয়ে একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেন। সুশোভন অধিকারীর সঙ্গে রঙের রবীন্দ্রনাথ-এও এই কৌতূহল দেখা যায়। রবীন্দ্রসাহিত্যে রঙের ব্যবহার, দৃষ্টিবোধ এবং সম্ভাব্য বর্ণদৃষ্টির প্রশ্নকে তিনি সাহিত্য ও বিজ্ঞানের সংযোগস্থলে নিয়ে গিয়েছিলেন। 

নিজের গবেষণা সম্পর্কেও তাঁর সতর্কতা ছিল লক্ষণীয়। কোনো অনুমানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার বদলে তিনি তথ্য, দলিল ও তুলনার ওপর নিজের বক্তব্য দাঁড় করাতে চেয়েছেন। যেখানে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই, সেখানে অনিশ্চয়তাকে অনিশ্চয়তা হিসেবেই রেখে দিয়েছেন। গবেষকের এই বৌদ্ধিক সততা তাঁর কাজের একটি বড় শক্তি।

তাঁর রবীন্দ্রনাথ ও ভিকতোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে বইটি শুধু দুই ব্যক্তির সম্পর্কের অনুসন্ধান নয়। এর ভেতরে আছে পূর্ব ও পশ্চিমের মুখোমুখি হওয়ার ইতিহাস, আকর্ষণ ও দূরত্ব, ভাষা ও সংস্কৃতির ব্যবধান এবং একজন বিশ্বকবিকে তাঁর আন্তর্জাতিক বৌদ্ধিক পরিসরের মধ্যে নতুন করে বোঝার চেষ্টা। 

ভিকতোরিয়া ওকাম্পোকে ঘিরে রবীন্দ্রনাথের জীবনের যে-অধ্যায় দীর্ঘদিন কৌতূহল, অনুমান কিংবা রোমান্টিক গল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, কেতকী তাকে গবেষণার বিষয়ে পরিণত করেছিলেন। চিঠি, দলিল, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে তিনি সেই সম্পর্কের দিকে তাকিয়েছেন। তাঁর অনুসন্ধানের বিশেষত্ব এখানেই—তিনি রবীন্দ্রনাথকে মানুষ, লেখক এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক বৌদ্ধিক জগতের একজন অংশগ্রহণকারী হিসেবে দেখতে চেয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কেতকীর কাজ গবেষণাতেই থেমে থাকেনি; তিনি তাঁর কবিতা ও গান ইংরেজিতে অনুবাদও করেছেন। I Won’t Let You Go: Selected Poems of Rabindranath Tagore তাঁর উল্লেখযোগ্য অনুবাদগ্রন্থ। রবীন্দ্রনাথের ভাষা, আবেগ ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গকে ইংরেজি পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই কাজেও কেতকী হয়ে উঠেছিলেন বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষার মধ্যে এক সেতু।

কেতকী কুশারী ডাইসনের লেখকসত্তার সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্তগুলোর একটি সম্ভবত তিসিডোর। প্রায় সাড়ে আটশ পৃষ্ঠার এই বইকে উপন্যাস বললে যেমন পুরোটা বলা হয় না, গবেষণাগ্রন্থ বললেও নয়। কথাসাহিত্য, সাহিত্যসমালোচনা, স্মৃতি, জীবনী, দলিল, সামাজিক ইতিহাস ও ভ্রমণ—সব মিলিয়ে বইটি প্রচলিত ঘরানার সীমানার মাঝখানে নিজের জন্য আলাদা একটি জায়গা তৈরি করেছে।

তিসিডোর-এর প্রধান চরিত্র জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু। জীবনানন্দের উপন্যাস সফলতা-নিষ্ফলতাকে কেন্দ্র করে কেতকী এই গ্রন্থে দীর্ঘ আলোচনায় প্রবেশ করেন। ওই রচনার বাণেশ্বর চরিত্রের মধ্যে বুদ্ধদেব বসুর ছায়া কতখানি, জীবনানন্দ সেখানে বুদ্ধদেবকে কী চোখে দেখেছেন—এই প্রশ্ন থেকে অনুসন্ধানের শুরু হয়। কিন্তু সেখান থেকে আলোচনা ক্রমশ ছড়িয়ে যায় দুই কবির ব্যক্তিত্ব, পারস্পরিক সম্পর্ক, বাংলা আধুনিকতার ইতিহাস এবং একজন সাহিত্যিকের ব্যক্তিজীবন ও সৃষ্টিজীবনের জটিল সম্পর্কের দিকে।

এখানে কেতকী দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাসক্ত গবেষক থাকেন না। বুদ্ধদেব বসুর পরিবারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার স্মৃতি আছে, নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার বিষয় আছে, নানান তর্ক আছে। ফলে জীবনানন্দকে নিয়ে তাঁর পাঠ বিতর্কও তৈরি করেছে। কেউ কেউ মনে করেছেন, সফলতা-নিষ্ফলতার কাল্পনিক চরিত্রকে বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে অতিরিক্তভাবে মিলিয়ে দেখে তিনি জীবনানন্দের প্রতি কঠোর হয়েছেন। কিন্তু এই বিতর্কও কেতকীর লেখকসত্তার একটি দিক স্পষ্ট করে—তিনি নিরাপদ বিষয়ে নিরাপদ কথা বলে সরে যাওয়ার লেখক ছিলেন না।

আবার তিসিডোর শুধু জীবনানন্দ-বুদ্ধদেবের বইও নয়। সেখানে বিংশ শতকের ব্রিটিশ মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের জীবন এসেছে, বাস্তব চিঠিপত্র ও স্মৃতির সূত্র ধরে ইংরেজ নারীদের জীবনসংগ্রাম এসেছে, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ইতিহাস এসেছে, বিশ্বরাজনীতি এসেছে; শেষদিকে ভেনিস এসে যোগ করেছে ভ্রমণের আরেকটি স্তর। এত বিচিত্র উপাদান একই বইয়ে কেন? উত্তরটি সম্ভবত কেতকীর লেখার প্রকৃতির মধ্যেই আছে। তাঁর কাছে সাহিত্য কখনো বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ ছিল না। একটি কবিতা থেকে একজন কবির জীবন, সেখান থেকে তাঁর সময়; একটি চিঠি থেকে একজন নারীর ব্যক্তিগত ইতিহাস, সেখান থেকে একটি সমাজ—তিনি ক্রমাগত একটির সঙ্গে অন্যটির যোগসূত্র খুঁজেছেন। তাঁর গবেষণাতেও এই স্বভাব, কথাসাহিত্যেও। তিসিডোর তাই নির্বিতর্ক বই নয়; বরং প্রবলভাবে তর্কযোগ্য বই। এবং সম্ভবত তার গুরুত্বও সেখানে। এত বড় পরিসরে উপন্যাসের কাঠামোর মধ্যে গবেষণা, সাহিত্যসমালোচনা, স্মৃতিকথা, সামাজিক ইতিহাস ও ভ্রমণকে পাশাপাশি বসানোর ঝুঁকি নেওয়া বাংলা সাহিত্যে খুব সাধারণ ঘটনা নয়। কেতকীর সমগ্র লেখকজীবনের প্রতীক হিসেবেও তাই তিসিডোরকে দেখা যায়। তিনি নিজেই তো সারাজীবন বিভিন্ন সীমানার মাঝখানে দাঁড়িয়েছিলেন—বাংলা ও ইংরেজি, ভারত ও ব্রিটেন, সাহিত্য ও গবেষণা, ব্যক্তিগত স্মৃতি ও ইতিহাস। তাঁর এই বইটিও কোনো একটি ঘরের মধ্যে থাকতে চায়নি।

অনুবাদেও তিনি মূলত একই কাজ করেছেন—দুই পৃথিবীর মধ্যে যাতায়াত। অনুবাদকে আমরা প্রায়ই এক ভাষার লেখা আরেক ভাষায় পৌঁছে দেওয়া হিসেবে দেখি। কিন্তু ভালো অনুবাদ তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। সেখানে একটি সংস্কৃতি আরেকটি সংস্কৃতির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। একটি ভাষার স্মৃতি, ইতিহাস, দুঃখ ও সামাজিক ইঙ্গিত অন্য ভাষায় নতুন আশ্রয় খোঁজে। এই কাজের জন্য শুধু দুটি ভাষা জানা যথেষ্ট নয়; দুই ভাষার মানুষ ও সংস্কৃতিকেও জানতে হয়। কেতকীর কাছে অনুবাদ তাই শুধু শব্দের অর্থ স্থানান্তর ছিল না। ভাষার ধ্বনি, সংস্কৃতি ও ভূগোলকেও যতটা সম্ভব সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা ছিল। বাংলা সাহিত্যকে তিনি ইংরেজিভাষী পাঠকের দিকে নিয়ে গেছেন, আবার পশ্চিমের সাহিত্য ও বৌদ্ধিক জগতের সঙ্গে বাংলাভাষী পাঠকের সংলাপের পথও খুলে দিয়েছেন। তাঁর নিজের জীবনটিকেও কখনো কখনো একটি দীর্ঘ অনুবাদ বলে মনে হয়—বাংলা থেকে ইংরেজি, ইংরেজি থেকে বাংলা; দেশ থেকে প্রবাস, প্রবাস থেকে আবার স্মৃতির দেশে।

তবে কেতকীকে শুধু প্রবাসী লেখক, রবীন্দ্র-গবেষক কিংবা অনুবাদক হিসেবে দেখলে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়, সেটি তাঁর নারীসত্তা। একজন শিক্ষিত বাঙালি নারী যখন গত শতকের ষাট ও সত্তরের দশকে নিজের পরিচয়, প্রেম, দাম্পত্য, শরীর, পেশা, সন্তান, লেখালেখি এবং স্বাধীনতার প্রশ্ন নিয়ে কথা বলেন, সেই কথার সামাজিক অভিঘাত আজকের মতো ছিল না। কেতকীর লেখায় নারী কোনো বিমূর্ত প্রতীক নয়। সে সংসার করে, সন্তান জন্ম দেয়, ভালোবাসে, ক্লান্ত হয়, নিজের শরীরকে অনুভব করে, প্রশ্ন করে এবং নিজের বৌদ্ধিক অস্তিত্বের জায়গা দাবি করে।

এখানেও তাঁর প্রবাসজীবন গুরুত্বপূর্ণ। দেশান্তর মানুষকে শুধু স্বাধীনতা দেয় না; নতুন ধরনের নিঃসঙ্গতাও তৈরি করে। বিশেষ করে একজন নারীর জন্য ঘর, পরিবার, সন্তান, পেশা ও সৃষ্টিশীলতার মধ্যে ভারসাম্যের প্রশ্ন প্রবাসে অন্য মাত্রা পায়। কেতকী এই জীবনকে বাইরে থেকে দেখেননি, এর ভেতর দিয়ে গেছেন। সম্ভবত এই কারণেই তাঁর লেখায় ব্যক্তিগত জীবন আর বৌদ্ধিক জীবনকে সম্পূর্ণ আলাদা করা যায় না। আমাদের সাহিত্যিক সংস্কৃতিতে আমরা প্রায়ই একদিকে ‘মহৎ সাহিত্য’ আর অন্যদিকে সংসারের ‘তুচ্ছ’ দৈনন্দিনতাকে রেখে একটি কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করি। কেতকীর কাজ মনে করিয়ে দেয়, রান্নাঘর, সন্তান, শরীর, প্রেম, অভিবাসন, পেশা, ভাষা—এসবের মধ্য দিয়েই তো একজন মানুষের চিন্তার পৃথিবী তৈরি হয়। জীবনকে বাদ দিয়ে সাহিত্য কোথায়?

এখন, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে আমরা কোথায় রাখব—এই প্রশ্নটিও তাই সহজ নয়। তিনি কি কেবল ভারতীয় বাঙালি লেখক, বা ব্রিটিশ-বাঙালি লেখক, বা প্রবাসী লেখক, বা বাংলা ডায়াস্পোরার লেখক? বস্তুতপক্ষে, এই সবকটি পরিচয়ই সত্য, আবার কোনো একটিই যথেষ্ট সত্য নয়। 

রাষ্ট্রের মানচিত্র মানুষের পরিচয়কে যতটা পরিষ্কারভাবে ভাগ করে, সাহিত্য ততটা করে না। একটি পাসপোর্ট বলতে পারে একজন মানুষ কোন রাষ্ট্রের নাগরিক, কিন্তু একটি কবিতা কোন দেশের নাগরিক—তার উত্তর এত সহজ নয়। অক্সফোর্ডে বসে বাংলায় লেখা একটি কবিতার দেশ কোথায়? ইংল্যান্ডে সংসার করতে করতে যে-নারী রবীন্দ্রনাথ ও ভিকতোরিয়া ওকাম্পোর সম্পর্কের সূত্র খুঁজছেন, তাঁর বৌদ্ধিক ভূগোল কোন মানচিত্রে আঁকা হবে? সম্ভবত কেতকী কুশারী ডাইসনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য এখানেই। তিনি আমাদের পরিচয়ের সরল সমীকরণে অস্বস্তি তৈরি করেন।

তিনি দেখিয়েছেন, প্রবাস মানেই নির্বাসন নয়। দেশ থেকে দূরে থাকা মানেই দেশের বাইরে চলে যাওয়া নয়। দূরত্ব কখনো কখনো দেশকে নতুন করে দেখতে শেখায়। একইভাবে মাতৃভাষার মধ্যে বাস করার জন্য মাতৃভূমির ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে থাকা জরুরি নয়। কেতকীর জীবন আমাদের আরেকটি কথাও বলে—মানুষের একটিমাত্র দেশ থাকতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। জন্মের একটি দেশ থাকে, বসবাসের আরেকটি, স্মৃতির আরেকটি। আর লেখকের জন্য থাকে ভাষার দেশ। কেতকী কুশারী ডাইসন দীর্ঘ জীবন কাটিয়েছেন ইংল্যান্ডে। কিন্তু বাংলা ভাষার দরজাটি কখনো বন্ধ করেননি। বরং সেই দরজা দিয়ে দুই দিকেই হেঁটেছেন—কখনো বাংলা থেকে পৃথিবীর দিকে, কখনো পৃথিবী থেকে বাংলার দিকে।

১১ সেপ্টেম্বর থেমে গেল কেতকী কুশারী ডাইসনের দীর্ঘ জীবনযাত্রা। কিন্তু একজন লেখকের যাত্রা কি মৃত্যুতেই শেষ হয়? মানুষটি চলে গেলেন, রয়ে গেল তাঁর কবিতা, কথাসাহিত্য, প্রবন্ধ, গবেষণা ও অনুবাদের বিস্তৃত জগৎ। রয়ে গেল তাঁর তর্ক, তাঁর প্রশ্ন, তাঁর নিরন্তর অনুসন্ধান। আমরা নিশ্চিত জানি, দুই ভাষা, দুই দেশ ও দুই সংস্কৃতির মধ্যে যে-জীবন তিনি এতকাল ধরে নির্মাণ করেছেন, মৃত্যুর পরও তার দরজা খোলা থাকবে সবদেশের পাঠকের জন্য। কেতকী আর লিখবেন না, কিন্তু তাঁর লেখা আমাদের সঙ্গে কথা বলতে থাকবে। তাঁরই একটি বইয়ের নাম ধার করে বলা যায়—লেখায়, চিন্তায় ও প্রশ্নে তিনি যে ভাবনার ভাস্কর্য  নির্মাণ করে গেলেন, তার মধ্যেই কেতকী কুশারী ডাইসন থেকে যাবেন।