১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ও পূরবী বসু: সাহিত্য ও জীবনের সহযাত্রী

তাঁদের মধ্যে সংঘাত ছিল, মতপার্থক্য ছিল, টানাপোড়েন ছিল, তবু দুজনেরই নিজস্ব পৃথিবীও ছিল। তাঁরা পাশাপাশি থেকেছেন, আবার নিজেদের মতোও থেকেছেন। এটাই সম্ভবত ‘যৌথজীবন’ শব্দটির সবচেয়ে গভীর অর্থ। যৌথ মানে এক হয়ে যাওয়া নয়। যৌথ মানে দুটি স্বতন্ত্র নদীর পাশাপাশি প্রবাহিত হওয়া। কোথাও তারা মিশবে, কোথাও দূরে সরে যাবে, কোথাও আবার একই ভূখণ্ডকে দুই দিক থেকে ছুঁয়ে যাবে।

লীনা দিলরুবা

Published : 03 Sep 2026, 05:06 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:54 AM

পূরবী বসু ও জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত—বাংলা সাহিত্যের দুই স্বতন্ত্র সৃজনশীল সত্তা, অথচ জীবন ও সাহিত্যে তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাঁদের সম্পর্ক শুধু দাম্পত্যের নয়, এক দীর্ঘ বৌদ্ধিক ও সাহিত্যিক সহযাত্রারও। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেবের বাড়িতে পরিচয় থেকে প্রেম, তারপর বিবাহ। এই ব্যক্তিগত ইতিহাসের পেছনে ছিল ষাটের দশকের এক উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। পরবর্তী জীবনে লেখালেখির ক্ষেত্রে দুজনই নিজস্ব সাহিত্যভাষা ও চিন্তার স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রেখেছেন। 

জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের জন্ম ১৯৩৯ সালে। ফলে তাঁর শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের সঙ্গে উপমহাদেশের একাধিক ঐতিহাসিক ভাঙন প্রায় সমান্তরালভাবে এগিয়েছে। ঔপনিবেশিকতার শেষ সময়, দেশভাগ, সাম্প্রদায়িকতা, পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামো, ভাষা আন্দোলন, ষাটের দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ। এগুলো তাঁর কাছে পরে বই পড়ে জানা ইতিহাস নয়; তাঁর প্রজন্মের মানুষের জীবনের ভেতর দিয়েই সেই সব ইতিহাস অতিক্রম করেছে।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের গল্পে যেমন ইতিহাস, স্মৃতি ও মানুষের অস্তিত্বসংকট প্রবল, তেমনি পূরবী বসুর লেখায় সমাজ, নারীজীবন ও মানবিকতার গভীর অনুসন্ধান দেখা যায়। তাই তাঁদের একসঙ্গে ভাবলে দাম্পত্যের পাশাপাশি দুই স্বাধীন লেখকসত্তার পারস্পরিক সম্মান, সংলাপ ও দীর্ঘ সৃজনশীল সহাবস্থানের কথাও মনে পড়ে।

তাঁদের দীর্ঘ দাম্পত্যজীবনের, একই সঙ্গে মানুষ জ্যোতিপ্রকাশ দত্তেরও, এক অন্তরঙ্গ মানচিত্র এঁকেছেন পূরবী বসু তাঁর ‘আমাদের যৌথজীবন’ লেখায়। ২০০৯ সালে প্রকাশিত এই গদ্যটি আমার বিশেষ প্রিয়, কয়েকবারই এটি নিয়ে লিখতে চেয়েছি। কেন যেন হয়ে ওঠেনি। 

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত আমার প্রিয় কথাসাহিত্যিকদের একজন। তাঁর গল্প আর জীবন নিয়ে লেখা ছোট ছোট গদ্য পড়তে পড়তে আমার ভেতরে মানুষটির একটি প্রতিকৃতি ধীরে ধীরে নির্মিত হয়েছিল। তিনি যেন কিছুটা নিঃসঙ্গ, কিছুটা অন্তর্মুখী, কিছুটা স্মৃতি ও ইতিহাসে আক্রান্ত, আবার একই সঙ্গে গভীরভাবে জীবনলগ্ন। কিন্তু পূরবী বসুর এই একটি লেখা পড়ে মনে হলো, বাইরে থেকে বিচ্ছিন্ন সূত্র ধরে যে মানুষটিকে আমি বুঝতে চেয়েছিলাম, তাঁর সমগ্র জীবনের মানচিত্রটি যেন পূরবী একবারেই খুলে দিয়েছেন। দীর্ঘ দাম্পত্যের নিবিড় সাহচর্য থেকে পূরবী বসু দেখেছেন এমন এক জ্যোতিপ্রকাশকে, যাঁকে শুধু তাঁর গল্প কিংবা জীবনী দিয়ে সম্পূর্ণ জানা সম্ভব নয়। সেখানে লেখক জ্যোতিপ্রকাশের পাশে আছেন মানুষ জ্যোতিপ্রকাশ। তাঁর বেড়ে ওঠা, ক্ষত, নিঃসঙ্গতা, স্বপ্ন, অভিমান, ভালোবাসা, সাফল্য, ব্যর্থতা, প্রবাসজীবন ও প্রত্যাবর্তনও। মনে হয়, পূরবী বসু স্বামীর জীবনকথা লেখেননি শুধু, দীর্ঘকাল পাশাপাশি হেঁটে যে মানুষটিকে নিজের জীবনের আলো-অন্ধকারে চিনেছেন, তাঁর একটি পূর্ণাঙ্গ গদ্য-প্রতিকৃতি এঁকেছেন। আমার পাঠে টুকরো টুকরো হয়ে নির্মিত জ্যোতিপ্রকাশ সেখানে এসে যেন হঠাৎ একজন সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠেন।

জ্যোতিপ্রকাশের কয়েকটি লেখার কাছে একটু ফিরে যেতে চাই। ‘সময় ভোলে না কিছু’ নামে জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের আত্মজৈবনিক একটি গ্রন্থ আছে। সেখানে তিনি বিশটি রচনায় তাঁর জীবনকে তুলে ধরেছেন। তাঁর শৈশবের গল্পগুলো পড়তে পড়তে মনে হয়, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত আসলে নিজের আত্মজীবনী লিখছেন না; তিনি ফিরে যাচ্ছেন স্মৃতির এমন এক ভূগোলে, যেখানে মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার রেখে যাওয়া দৃশ্যগুলো যায় না। 

এই স্মৃতির সবচেয়ে গভীরে আছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ছায়া। যুদ্ধকে তিনি ইতিহাসের বই থেকে দেখেননি; দেখেছেন গ্রামের এক শিশুর চোখ দিয়ে। যুদ্ধ তাঁর কাছে কামান-বন্দুকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল না, বরং ছিল আতঙ্কের অস্পষ্ট কিছু চিহ্ন। তিনি দেখেছেন বেকার হয়ে যাওয়া গ্রামের যুবকদের, রাতের ট্রেনে উঠে বসা তাঁর মামাদের, সাতচল্লিশের দেশভাগের অভিঘাত, গ্রামের পথে গোলযোগের আশঙ্কা নিয়ে ছুটে চলা মানুষদের। বড় ইতিহাস এভাবেই তাঁর ব্যক্তিগত ইতিহাসে ঢুকে পড়ে। দেশভাগ বা যুদ্ধের মতো বিশাল ঘটনা শিশুমনে কোনো রাজনৈতিক ভাষ্য হয়ে আসে না; আসে বিচ্ছিন্ন ছবি, মানুষের মুখ, চলে যাওয়া, ফিরে আসা এবং অনিশ্চয়তা হয়ে।

কিন্তু এই লেখার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অংশ সম্ভবত মায়ের স্মৃতি। মায়ের মৃত্যু তাঁর শৈশবের সমস্ত স্মৃতিকে যেন নতুন করে রং দিয়েছে। অসুস্থ মায়ের জন্য গ্রামের মানুষ বগুড়ার বড় ডাক্তার আনতে যায়; চিকিৎসা হয়; তবু মা বাঁচেন না। এরপর মৃত মায়ের শরীর ঘিরে দুই শিশুর যে অভিজ্ঞতা—মাকে জড়িয়ে কান্না, গ্রামের মানুষের জড়ো হওয়া, বাড়ি থেকে নদীর পাড়ে শ্মশানের ধোঁয়া দেখা, এসব কোনো নাটকীয় ভাষায় লেখা হয়নি। বরং সংযমের কারণেই তা আরও গভীরভাবে আঘাত করে। 

বাবার স্মৃতিতেও আছে একই রকম অনুচ্চারিত বিষাদ। প্রবেশিকা পরীক্ষার পর বাবার সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা কিংবা গৃহশিক্ষকের পাশে বসে খবরের কাগজ বিলি করা, এসবই সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবনের ছবি। অথচ এই সাধারণতার নিচে ছিল অভাব, অনিশ্চয়তা এবং বেঁচে থাকার কঠিন হিসাব। 

আর আছে শৈশবের কিছু শরীরী স্মৃতি—নিষ্পাপ, অথচ পরবর্তী বয়স থেকে ফিরে দেখলে কিছুটা অস্বস্তিকর। কিশোর বয়সের খেলা, কৌতূহল, শরীর সম্পর্কে অজ্ঞতা। এসবও তিনি বাদ দেননি। এখানেই লেখাটির সততা। আত্মজীবনীতে মানুষ সাধারণত নিজের একটি গ্রহণযোগ্য প্রতিকৃতি নির্মাণ করতে চায়; জ্যোতিপ্রকাশ যেন তার উল্টো পথে হাঁটেন। তিনি নিজের স্মৃতিকে নৈতিকতার আদালতে দাঁড় করান না, আবার মহিমান্বিতও করেন না। তিনি যেন শুধু বলেন, এই ঘটনাগুলোও ছিল; এগুলো বাদ দিলে আমার শৈশবের গল্পটি সম্পূর্ণ হয় না। ফলে তাঁর শৈশব কেবল নিষ্পাপ সৌন্দর্যের কোনো রোমান্টিক কাল নয়; সেখানে নিষ্পাপতা, ভয়, কৌতূহল, লজ্জা, মৃত্যু এবং অপরাধবোধ পাশাপাশি আছে।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্তকে বাংলা কথাসাহিত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ গল্পকার বললে কথাটি সত্য বলা হয়, কিন্তু সম্পূর্ণ সত্য বলা হয় না। তাঁকে বোঝার জন্য তাঁর গল্পের বিষয়বস্তু জানাই যথেষ্ট নয়; বরং দেখতে হয় তিনি বাস্তবতাকে কীভাবে সাহিত্যের বাস্তবতায় রূপান্তরিত করেন। কারণ তাঁর কাছে গল্প কেবল ঘটনা বলার মাধ্যম নয়, বরং মানুষের অস্তিত্বের ওপর ইতিহাস, সমাজ, স্মৃতি ও সময় যে অদৃশ্য প্রভাব ফেলে, তার ভাষিক ও নান্দনিক অনুসন্ধান। এই জায়গাতেই ষাটের দশকের বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর স্বাতন্ত্র্য।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের কিছু গল্পের কথা কখনো ভুলব না। তাঁর ভাষা কখনো কখনো প্রতীক ও সংকেতে এমনভাবে ভরে ওঠে যে, অনুভূতিও সেখানে দৃশ্যের রূপ নেয়। ‘পরমাত্মীয়’ গল্পটি শুরু হয়েছে এভাবে, ‘এখন সেই আশ্চর্য বৃষ্টি নেমেছে শ্রীমন্ত। এত ধূসরতার পরে। যার জন্যে আমি উন্মুখ প্রতীক্ষায় ছিলাম। এবং তাই উৎফুল্ল হয়ে উঠলাম। তুমি সে কথা জানতে। আমি ভেবেছিলাম, আমার মতো তুমিও অমনি প্রফুল্ল হবে এবং আমার আনন্দের সঙ্গী হয়ে আমায় তৃপ্ত করবে। অথচ শ্রীমন্ত, তুমি এখন আশ্চর্য রকম নীরব হয়ে আছ, তোমাকে ব্যথিত দেখাচ্ছে--যেন কাঁদতে পারলেই এখন খুশি হও তুমি।

খানিকক্ষণ আগে আমি যখন এই ঘরে ঢুকলাম--তুমি আগে থেকেই বসে ছিলে, তোমার দৃষ্টি আমায় কোমল গাঢ় আশ্লেষে আবদ্ধ করল, শ্রীমন্ত। অথচ তারপরে, তুমি সেই দৃষ্টিকে ভাঙলে, ছড়ালে, কণায় কণায় আমার সঙ্গে ছড়িয়ে দিলে আর সেই অজস্র কণা তোমার দু'চোখে আকুল হয়ে থিরথির করে কাঁপতে লাগল।

আমি ক্লান্ত ছিলাম? অথবা সেই আতপ্ত ধূসরতা আমায় আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, আমি তখন চোখ তুলে চাইতে পারছিলাম না, কেননা আমার দৃষ্টিকে মুগ্ধ এবং বিভ্রান্ত করার কোনো উপকরণ তখন কোথায়ও ছিল না। তাই তুমি তখন অমন নরম, অমন কোমল হয়েছিলে। কিন্তু এখন শ্রীমন্ত, এই বৃষ্টির মুহূর্তে তুমি অমন আকুল, অমন ব্যথিত হলে কেন? আসলে, তুমি আমায় দুর্বল ভাবছ। দুর্বল এবং ভীরু। ভীরু এবং আর্ত। আমায় করুণা করছ তুমি।’

জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ভাষার অসাধারণত্ব এখানেই। তিনি অনুভূতিকে প্রায় দৃশ্যমান করে তোলেন। ‘আশ্চর্য বৃষ্টি’, ‘আতপ্ত ধূসরতা’ কিংবা দৃষ্টিকে ‘কণায় কণায়’ ভেঙে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো বাক্যে প্রকৃতি ও অনুভব একাকার হয়ে যায়। বৃষ্টি, ধূসরতা, দৃষ্টি, নীরবতা—সবই তখন প্রতীক ও সংকেত। তাঁর গদ্য তাই গল্প বলতে বলতে অনায়াসে কবিতার কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

‘কেষ্টযাত্রা’ আরেকটি উল্লেখযোগ্য গল্প। খুব সাধারণ একটি ঘটনার ভেতর দিয়ে এটি দারিদ্র্য, পিতৃত্ব এবং মানুষের মর্যাদাবোধের অসাধারণ গল্প হয়ে উঠেছে। গল্পের কেন্দ্রে কেষ্টবাবু ও তাঁর ছেলে সুখেন। ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করাতে হবে, অথচ কেষ্টবাবুর হাতে প্রয়োজনীয় টাকা নেই। পুরোনো পরিচিত অমূল্য ডাক্তারের কাছে পাওনা টাকা আদায় করতে তিনি সুখেনকে নিয়ে শহরের পথে বের হন। এই সামান্য পাওনাটুকুই তাঁর কাছে তখন ছেলের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ডাক্তার টাকা দিতে টালবাহানা করেন; অপেক্ষা বাড়ে, রাত নামে, ফেরার পথ অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত কেষ্টবাবুর এই যাত্রা আর নিছক টাকা আদায়ের যাত্রা থাকে না; হয়ে ওঠে একজন অসহায় বাবার সন্তানের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠার গল্প।

গল্পটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক কেষ্টবাবুর চরিত্র। তিনি দরিদ্র, কিন্তু আত্মসম্মানহীন নন। তাঁর অভাবকে লেখক করুণার বস্তু করেননি। নিজের পাওনা চাইতেও তাঁর সংকোচ ও অপমানবোধ আছে, অথচ ছেলের স্কুলে ভর্তি হওয়ার প্রশ্নে সেই সংকোচ অতিক্রম করা ছাড়া তাঁর উপায় নেই। সুখেনকে তিনি সাহস দেন, পথ দেখান, আগলে রাখেন; কিন্তু পাঠক বুঝতে পারে, ছেলের চেয়েও বেশি অনিশ্চিত ও আতঙ্কিত মানুষটি আসলে বাবা নিজেই। সন্তানের সামনে নিজের ভয় গোপন করার এই চেষ্টাই কেষ্টবাবুকে গভীর মানবিকতা দিয়েছে।

সুখেনের শিশুচোখ দিয়েই বাবার অসহায়তা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। অন্যদিকে অমূল্য ডাক্তারের উদাসীনতা গল্পটিকে ব্যক্তিগত অভাবের সীমানা ছাড়িয়ে শ্রেণিগত বাস্তবতার দিকে নিয়ে যায়। যার হাতে টাকা আছে, তার কাছে সামান্য কয়েকটি টাকা তুচ্ছ; অথচ কেষ্টবাবুর কাছে সেই টাকাই সন্তানের স্কুলে ভর্তি হওয়া না-হওয়ার ব্যবধান।

‘কেষ্টযাত্রা’ নামটিও তাই অর্থবহ। বাইরে থেকে এটি কেষ্টবাবুর এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার কাহিনি, কিন্তু ভেতরে এটি দারিদ্র্যের গোলকধাঁধায় একজন নিম্নবিত্ত মানুষের যাত্রা। তাঁর গন্তব্য যেন বারবার সরে যায়। জ্যোতিপ্রকাশ কোথাও বলে দেন না কেষ্টবাবু অসহায় কিংবা সন্তানের প্রতি তাঁর ভালোবাসা গভীর। টাকা চাওয়ার ইতস্তততা, ট্রেন ধরার উদ্বেগ, অন্ধকারে ছেলেকে কাছে রাখা—এই ছোট ছোট আচরণের মধ্য দিয়েই সব প্রকাশিত হয়। এই সংযমই গল্পটিকে আবেগপ্রবণ না করে মর্মস্পর্শী করেছে। শেষ পর্যন্ত কেষ্টবাবুর যাত্রা তাই এক ব্যক্তির যাত্রা থাকে না; হয়ে ওঠে অসংখ্য দরিদ্র বাবার জীবনের প্রতীকী যাত্রা।

‘আমাদের যৌথজীবন’ লেখাটিতে পূরবী বসু এই শক্তিমান কথাসাহিত্যিককে তাঁদের দাম্পত্যজীবনের স্মৃতিচারণার মাধ্যমে চেনাতে চেষ্টা করেছেন। এ শুধু জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত নামের একজন লেখককে তাঁর জীবনসঙ্গিনীর চোখ দিয়ে দেখার লেখা নয়; এ এক আশ্চর্য জীবন-আখ্যান। সেই ইতিহাসে যেমন আলো আছে, তেমনি আছে ছায়া। এবং সম্ভবত ছায়াগুলোর কারণেই আলোটুকু এত সত্য, এত মানবিক। আছে গভীর স্বীকারোক্তি। দীর্ঘ এই যৌথজীবনের ব্যক্তিগত টানাপোড়েনের কথাও পূরবী আড়াল করেননি। নিজের জীবনের কিছু সম্পর্ক ও আবেগের কথাও বলেছেন অকপটে; পাশাপাশি বলেছেন, জ্যোতিপ্রকাশ কী গভীর উদারতায় সেই জটিল সময়গুলো সামলেছেন । 

পূরবী বসুর লেখাটির শুরুতেই একটি ছোট মেয়ে এবং একটি বইয়ের গল্প আছে। মুন্সীগঞ্জের স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়া মেয়েটি পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়ছে—এমন এক সময়ে তার হাতে আসে জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ‘কুসুম’। গল্পটি তার মনে এত গভীরভাবে ঢুকে যায় যে, বহু বছর পরও সে ভুলতে পারে না। কী আশ্চর্য, তখন সে জানে না, এই বইটির লেখকই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ অধ্যায়ের সহযাত্রী হয়ে উঠবেন।

জীবন কখনো কখনো ভবিষ্যতের মানুষের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় তার নাম না জানিয়েই। আমরা তখন তাকে চিনতে পারি না। একটি বই, একটি গান, একটি রাস্তা, একটি শহর কিংবা কারও বলা সামান্য একটি বাক্যের মধ্যে হয়তো ভবিষ্যতের কোনো জীবন অপেক্ষা করে থাকে। পূরবী বসুর জীবনে ‘কুসুম’ যেন তেমনই এক পূর্বাভাস। 

পূরবী বসুর লেখাটির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই—তিনি জ্যোতিপ্রকাশ দত্তকে কোনো কিংবদন্তির আসনে বসিয়ে লেখেননি। একজন প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকের পাশে দাঁড়িয়ে কেবল মুগ্ধ জীবনসঙ্গিনীর স্মৃতিচারণ করেননি।। বরং তিনি মানুষটিকে দেখেছেন তাঁর আলো-অন্ধকার, সাফল্য-ব্যর্থতা, শক্তি-দুর্বলতা, অভিমান-উদারতা—সবকিছুর মধ্য দিয়ে। এই নিরপেক্ষ দৃষ্টিই লেখাটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।

তিনি জ্যোতিপ্রকাশের মেধার কথা বলেছেন, পরিশ্রমের কথা বলেছেন, সাহিত্যের প্রতি তাঁর নিবেদনের কথা বলেছেন, তাঁর বন্ধুবৃত্ত, তাঁর লেখকসত্তা, তাঁর সিনেমা দেখা, গৃহস্থালি কাজে সাহায্য করা, তাঁর অসামান্য পাঠ ও সাংস্কৃতিক পরিসরের কথাও বলেছেন। আবার কোথাও কোথাও তাঁর রাগ, জেদ, কিংবা আচরণে আহত হওয়ার কথাও আড়াল করেননি। এই অকপটতার কারণেই ‘আমাদের যৌথজীবন’ কোনো প্রশস্তিপত্র হয়ে ওঠেনি, হয়ে উঠেছে জীবনের দলিল।

অন্যদিকে, পূরবী বসু নিজের পরিচয়কে জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের পরিচয়ের নিচে চাপা দেননি। তিনি তাঁর নিজের জীবনকেও সমান স্বরে লিখেছেন। তাঁর পড়াশোনা, বিদেশযাত্রা, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, কাজ, নিজের লেখালেখি—সবই এই যৌথজীবনের অংশ। যেন তিনি খুব স্বাভাবিকভাবেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য জানিয়ে দেন—ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর রূপ সেই ভালোবাসা, যেখানে একজনের আলো অন্যজনকে অন্ধকার করে দেয় না।

আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে দাম্পত্যের একটি একমাত্রিক ছবি তৈরি করা হয়েছে। বিশেষত নারীর ক্ষেত্রে ভালো স্ত্রী হওয়ার অর্থ যেন নিজের স্বপ্ন, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, পেশা, ব্যক্তিসত্তার কিছু অংশ বিসর্জন দেওয়া। অথচ পূরবী-জ্যোতিপ্রকাশের জীবন অন্য একটি সম্ভাবনার কথা বলে। তাঁদের মধ্যে সংঘাত ছিল, মতপার্থক্য ছিল, টানাপোড়েন ছিল, তবু দুজনেরই নিজস্ব পৃথিবীও ছিল। তাঁরা পাশাপাশি থেকেছেন, আবার নিজেদের মতোও থেকেছেন।

এটাই সম্ভবত ‘যৌথজীবন’ শব্দটির সবচেয়ে গভীর অর্থ। যৌথ মানে এক হয়ে যাওয়া নয়। যৌথ মানে দুটি স্বতন্ত্র নদীর পাশাপাশি প্রবাহিত হওয়া। কোথাও তারা মিশবে, কোথাও দূরে সরে যাবে, কোথাও আবার একই ভূখণ্ডকে দুই দিক থেকে ছুঁয়ে যাবে।

লেখাটিতে বিদেশজীবনের অংশগুলোও নাড়া দেবার মতো। বাইরে থেকে প্রবাস জীবনকে প্রায়ই সাফল্যের গল্প মনে হয়। উচ্চশিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া, লোভনীয় চাকরি করা, নতুন দেশ, নতুন সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে যেন ঝকঝকে এক ছবি। কিন্তু সেই ছবির পেছনেও যে অনিশ্চয়তা, অর্থকষ্ট, কাজের চাপ, সন্তান পালনের দায়িত্ব, নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং সবচেয়ে বেশি শিকড় থেকে দূরে থাকার এক ধরনের নিঃসঙ্গতা থাকে, সেসব পূরবী গভীরভাবে তুলে ধরেছেন। 

‘আমাদের যৌথজীবন’-এর মধ্যে প্রেমের চেয়েও বড় কিছু আছে। সেটি হল, সহযাত্রা। প্রেমের শুরুতে মানুষ পরস্পরের দিকে তাকায়। দীর্ঘ জীবনের প্রেমে মানুষ একসময় একই দিকে তাকাতে শেখে। মাঝখানে অবশ্য অসংখ্যবার মুখ ফিরিয়ে নেয়, ঝগড়া করে, আহত হয়, দূরে সরে যায়, আবার ফিরে আসে। 

পূরবী বসুর গদ্যে আত্মমুগ্ধতা নেই। বরং কোথাও কোথাও আছে নিজের জীবনকে দূর থেকে দেখার বিস্ময়, এতগুলো বছর সত্যিই কেটে গেল! যে মেয়েটি মুন্সীগঞ্জে বসে ‘কুসুম’ পড়েছিল, সে কী করে একদিন সেই লেখকের জীবনসঙ্গী হয়ে পৃথিবীর এত পথ হেঁটে এল? জীবনের এই অদ্ভুত কৌতুকের সামনে মানুষ শেষ পর্যন্ত দর্শকই হয়ে যায়।

এই লেখাটি পড়ে আমাদের নিজের জীবন নিয়েও ভাবতে হয়। আমাদের প্রত্যেকেরই তো একটি ‘যৌথজীবন’ আছে, শুধু স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে নয়। বাবা-মা, ভাইবোন, সন্তান, বন্ধু, প্রেমিক, সহকর্মী...কত মানুষের জীবন এসে আমাদের জীবনের মধ্যে বাস করে। আমরা যাকে ‘আমার জীবন’ বলি, সেটি আদৌ শুধু আমার নয়। তার মধ্যে কত মানুষের হাসি, কান্না, বাক্য, স্পর্শ, প্রত্যাখ্যান, অভিমান জমে আছে। মানুষ আসলে অন্য মানুষের স্মৃতি নিয়েই নিজের পরিচয় নির্মাণ করে। যেমন পূরবী করেছেন।