Published : 27 Sep 2025, 12:42 PM
সৈয়দ হক পড়তে গেলে মনে হয় চলে গেছি যেন এক কাঙ্ক্ষিত হলিডে ক্যানভাসে। তাঁর গদ্য-পদ্য- প্রবন্ধ-নাটক-সিনেমা-আলেখ্য সব নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা অনবদ্য। এসব শিল্পকর্মের পেলব ফুলটি যেন ঠিক গাছ থেকে টান মেরে কানে গোঁজা নয়। তা অত্যন্ত নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ে কলমের ডগা অথবা নিদ্রাহীন রাতের কি বোর্ডের আঁকে ফ্রিলিগ্রির সূক্ষ কাজে তৈরী। তাঁর কাজে দৃশ্যের অতিরেকে আমেজ ভেসে আসে, বাতাসে দেখা যায় চরিত্রের অন্তেষ্টিক্রিয়া কিংবা চুম্বন।
‘নূরলদীনের সারা জীবন’-এর পর থেকেই তাঁর কথা মনে হলে মাথায় কোন সমতল ভূমের ছবি আসেনি, এসেছে কেবলই উচ্চভূমি। এত মেধা ও এত সক্ষমতা সৈয়দ হকের যে দেখেছি আমাদের দেশেরই সাহিত্য জগতের কী এক ব্যাপক উচ্চতা। দেখেছি গথিক গীর্জার অলংকৃত রূপ। যেন অর্গানিক গ্রামীণ ঝোঁপের মধ্যে গোখরো মাথায় মনি নিয়ে দর্পভরে ফণা তুলে আছে। তাঁর কথা মনে হলে আমার কাছে তাঁকে মানুষের লাহান লাগে না। এত তাঁর বিভা, এত তাঁর লেখার শক্তি। যেন তিনি নানা রঙ, মাপ, ওজনের প্লাস্টিক, পাথর, প্রবাল, পানসি নৌকা, জাহাজের ইস্পাত, মদের পেয়ালা, সবই একসংগে শিল্পের দাঁতে কুচুরমুচুর করে আঠা দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিতে পারেন।
সম্ভবত ১৯৮৭/৮৮ সালের কথা।আমি বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘জীবন এখন যেমন’ নামে ধারাবাহিক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান করতাম। বন্ধু ও মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ প্রযোজিত সে ধারাবাহিক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানটি করতাম প্রবল ভালবাসায়। তাতে থাকতো ঢাকার জীবনের উপর বিচিত্রা সহকর্মী চিন্ময় মুৎসুদ্দির রিপোর্ট, দেশী ফ্যাশনের ক্যাটওয়াক ও পোশাকের প্রতিযোগিতা এবং ‘অন্যজন’ নামে একটি কুইজ পর্ব। একবার সেখানেই সৈয়দ হক ও তাঁর একমাত্র দুহিতা বিদিতা হক অতিথি ছিলেন। বিদিতা তখন উঠতি তরুণী। হক ভাই দর্শকের আড়ালে। কিন্তু তাঁর এই অচেনা কন্যাকে ২০টি প্রশ্নের মাধ্যমে প্রতিযোগীরা সেই পেছনের ব্যক্তিত্বকে সনাক্ত করতে পারেন কিনা সেটাই কথা। প্রশ্নের উত্তরে বিদিতা কেবল হ্যাঁ কিংবা না বলতে পারবে। বলতে হবে তিনি কোন বিখ্যাত ব্যক্তির কন্যা। মাত্র দু’টি প্রশ্নে অতিথি নারী নয়, পুরুষ এবং তিনি শিল্পকলা জগতের কেউ এটি নির্ধারিত হয়ে গেল। এরপর আর থামা থামি নেই। পরের কোন প্রশ্নের উত্তরে বিদিতা হ্যাঁ ছাড়া না বলতে পারেন নি। প্রশ্নগুলো ছিল তিনি কি কবিতা লেখেন? গান লেখেন? ছোটগল্প,? নাটক? কাব্যনাট্য? অনুবাদ? চিত্রনাট্য? কলাম? তারপর, ছবি আঁকেন কি? ভাষ্কর্য? প্রবন্ধ! সেই হ্যাঁ চলতেই থাকে। এর সব উত্তর হ্যাঁ... হ্যাঁ আর হ্যাঁ। শেষ হ্যাঁ ছিল, তিনি টিভি উপস্থাপনা করেন কিনা... হলভরা মানুষ করতালিতে অতঃপর আড়ালের অতি কাঙ্ক্ষিত বিরল প্রতিভাধর বেরিয়ে এলেন। আমাদের সামনের দর্শকরা দাঁড়িয়ে পড়েন। প্রদর্শণ করেন তাদের সম্মান।
বাংলা কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, কলাম, অনুবাদ, নাটক, চিত্রনাট্য এমন কি ছবি আঁকা ও স্থাপত্য কোন কিছুই তো বাদ রাখেন নি তিনি। বাংলাদেশের শিল্পের মাঠে তিনি ছিলেন এমন এক চাষী যে যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই ফলেছে সোনাদানা জহরত। সৈয়দ শামসুল হক উল্লিখিত কোনোটাই আধাখেঁচড়া ভাবে করেন নি। সবি করেছেন পূর্ণাঙ্গ মনোযোগের সঙ্গে। তিনি ছিলেন পোশাকে স্মার্ট, ফ্যাশন দূরস্থ ও তরুণ, আহারে আধুনিক, শব্দে নতুন এবং একই সঙ্গে কিংবদন্তী। আমাদের দেশের শিল্পাঙ্গনে এমন ব্যক্তিত্ব দুর্লভ।
অভিনিবেশ সহকারে হক-সাহিত্য পাঠে গুহা ভেঙে উঠে আসে প্রবল আলো। সিরামিক হারায় মসৃণতা, হয়ে ওঠে দানাদার আর পারিজাত হয়ে উঠে পক্ষী। যা কিছু স্পর্শের তাও হয়ে যায় দৃশ্যের। যা কিছু দৃশ্যের তাতেও পাওয়া যায় সুগন্ধ।
আশির দশকের শেষে, কবি রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, রবিউল হুসাইন ও বেলাল চৌধুরী এঁদের উদ্যোগে পদাবলী নামে একটি কবিতা সংগঠন হল। আমি তখন উঠতি কবি। আমাদের সংগঠনে আছেন হক ভাই, সাইয়ীদ আতিকুল্লাহ, শামসুর রহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ সহ স্বনামধন্য আরও কেউ কেউ। সেবার হবে দর্শনীর বিনিময়ে কবিকন্ঠে কবিতাপাঠ। সেটাই ছিল প্রথম টিকিট কেটে কবিতা শুনতে আসার অনুষ্ঠান। প্রবেশ পথে আমি ও দিলারা হাফিজ বোটানিক্যাল গার্ডেনের গোলাপ ও ফ্লায়ার দিতে দিতে দেখি ঢাকা শহরের সাংবাদিক ও সাহিত্যামোদীদের ভিড় লেগে গেছে। ভেতরে মঞ্চে পোডিয়ামের পেছন থেকে ধোঁয়া আসছে, সাউন্ড সিস্টেমে সেতার। অনুষ্ঠান শুরু হবার মাত্র দশ মিনিট বাকি। বাইরে থেকেও উত্তেজনায় ঘেমে আমি ঘাড় থেকে ফেলে দিয়েছি লাল চাকমা শাল। গ্রীন রুমে উঁকি দিয়ে ঘাবড়ে গেলাম। নির্মলেন্দু গুণ, সাইয়ীদ আতিকুল্লাহ, রুবি রহমান, বেলাল চৌধুরী সব কবিই নার্ভাস। কেউ পানি খাচ্ছেন, নিজের কবিতা হাতে নিয়ে পড়তে পড়তে ফানা হয়ে যাচ্ছেন, কেউ কেউ পায়চারী করছেন। ওদের স্বভাবসিদ্ধ রসিকতাও বন্ধ! কেবল মাত্র হক ভাই জিন্স পরে এক কোনায় বসে মৃদু হেসে পা দোলাচ্ছেন। যেন স্নান সেরে ফুরফুরে চিত্তে বোটের ডেকে এসে চা’র অর্ডার করেছেন।এমনি ছিল তাঁর টিভি অনুষ্ঠানগুলোও।
তাঁর সৃষ্ট কাব্য 'পরানের গহীন ভেতর' এবং 'বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা' পাগল করেছে কবিতা প্রেমিদের। 'নুরলদিনের সারাজীবন' এবং 'পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়'-এ মাটি ফুঁড়ে উঠে এসেছে বাংলাদেশের অতীতের আঘাত বর্তমানের বর্জ্য ও ভবিষ্যতের আশা ভাবনা ও আকাঙ্ক্ষা। সবই হৃদয় খন্ড করে রক্ত ঝড়িয়ে লিখেছেন। কিন্তু তাঁর হৃৎকলমের টানে যেন পাঠকের কলিজার থোড় ধরে টান দিতো। সে কলাম জমা দিতে দিতে আসতেন আমাদের পত্রিকা, সাপ্তাহিক বিচিত্রায়। পত্রিকার কিংবদন্তী সম্পাদক শাহাদত চৌধুরীর কক্ষে যখন তিনি আসতেন শাহাদত ভাই আমাদের এই একদল “উদীয়মান সাংবাদিকদের” ডেকে নিতেন। আমরা তাঁদের কথোপকথনে যোগ দিতাম কি দিতাম না সেটা বড় কথা ছিলো না। যেতে যেতে শাচৌ বলতেন, ' মন দিয়ে শুনবে হক ভাইর শব্দ চয়ন। দেখো শব্দগুলো জিহবা থেকে ফেলে দেবার আগে কিভাবে রোল করেন।’ হকভাই একটাও ইংরাজী শব্দ ব্যবহার না করে কী রকম চমৎকারভাবে সব কথা বলে যান।
একদিন এরকম একটি আড্ডায়ই কথা হচ্ছিল বিদেশী ভাষার ব্যবহার নিয়ে। কে একজন হক ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন, ' আচ্ছা হক ভাই, একজন মানুষ বাংলায় কথা বলতে বলতে হঠাৎ বলে ওঠে, নিকাল যাও হিয়াসে অথবা গেট আউট! এটা কেন করে?' যেন ভাষার ডাক্তার এসেছেন বিচিত্রায়। হক ভাই তখন বলেছিলেন, ‘মানুষ এটা অজ্ঞাতসারেই করে। যখন এক রকমের ভাষায় একটা মনো-টোনের সৃষ্টি হয়, তখন হঠাৎ এই বিদেশী ভাষা ব্যবহারে বক্তা তা ভেঙে দেন। নিজের সামাজিক অবস্থানের উপরে উঠিয়ে নেন। ব্যপারটা এত স্বাভাবিকভাবে ঘটে যে তা লক্ষ্য করার উপায় নেই, কিন্তু উদ্দেশ্য চরিতার্থ হয়।’ আরেকবার বাংলা একাডেমীতে পশ্চিমবঙ্গের ভাষার সঙ্গে বাংলাদেশের ভাষার ভিন্নতা বলতে গিয়ে বলছিলেন, ‘আমরা যখন একুশ বা একাত্তর বলি তা কিন্তু সংখ্যা বোঝায় না, বোঝায় ইতিহাস- পরিচিতি এইসব’।
সৈয়দ শামসুল হক এদেশে চলচ্চিত্রের সূচনা পর্বে সাংবাদিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও চলচ্চিত্র জগতের সাথে নিজেকে অষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নেন। করেন অনেক তথ্যচিত্র ও চিত্রনাট্য রচনা, পরিচালনা এমনকি সঙ্গীত রচনাও।‘এমন মজা হয় না, গায়ে সোনার গয়না, বুবুমনির বিয়ে হবে বাজবে কত বাজনা।’ শুনলে আমি চলে যাই আমার কৈশোরের শহর জামালপুর। সাহিত্যের জগতের তিনি শুধু সব্যসাচী নন ছিলেন এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব।
ব্যক্তিগত জীবনে যেভাবে নিয়ম নিষ্ঠা মানতেন তাতে তাঁর কিন্তু চলে যাবার কথা ছিলো না। আশি বছরেও তরুণ প্রাণ ও কর্মক্ষমতায় ছিল তাঁর পূর্ণ যৌবন। সে দেখায় এবং লেখায় তাই বিরিয়ানীর টেবিলে এসে যায় তরল পিনাকোলাডা, লিপ্সটিকের লালে স্ট্রবেরীর মধুর নির্যাস, গানে ভেসে আসে টেরাকোটা। মূর্ত হয়ে ওঠে জীবনের অন্তেষ্টিক্রিয়া কিংবা চুম্বন।