২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

জেগে ওঠে নিহত হৃদয় ও অন্যান্য কবিতা

বিরহ কী আসলে আগুন? পুড়লে তবে ছাই কোথা যায়? একসময় ফিরে আসে উৎসমূলে, নিজভূমে, আপ্না ঠিকানায়।

জেগে ওঠে নিহত হৃদয় ও অন্যান্য কবিতা
চিত্রকর্ম: রেমেদিওস বারো

হাসান হাফিজ হাসান হাফিজ

Published : 01 May 2026, 09:10 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:31 PM

চলো, দোঁহে উড়ে যাই

মৃত্যু বেশি দূরে নয়। বুঝতে পারি, এই তো কাছেই।

ঘুমঘোরে কখনো কী ছায়া ভাসে দেখতে পাই তাকে?

আবছাআধো অস্তিত্ব কেমন। অশরীরী, অচেনা, জান্তব।

ছিন্ন আলগা লতাতন্তু, মায়াবী অধ্যাস। রুগ্ন ও ভঙ্গুর।

এই বসুধার ওমে হালকাপলকা স্মৃতিরেণু রেখে যাই কিছু।

নিরাসক্ত ধুলোময়লা উদরস্থ করবেই যাবতীয় সুগন্ধসকল।

কারো মনে পড়বে না পরিত্যক্ত ঝরাপাতা কষ্টে ছিল কত!

গোপন অশ্রুত কোনো দীর্ঘশ্বাস, গুমহওয়া স্বজনের স্মৃতিরেশ

বিশ্বাস টলিয়ে দেয়, মানবিকতার চিহ্ন রেশ বলে কিছু নাই-

মৃত্যু এতে বিচলিত নয় মোটে, জন্মান্ধ সে, নিরেট প্রস্তর। 

মরণ মূলত এক অনিবার্য বাস্তবতা। অদৃষ্ট ও অলঙ্ঘ্য নিয়তি। 

মর্মছেঁড়া অনুতাপ কোনো কাজে লাগে না সে প্রত্যাশাও ভুল।

কড়া নাড়বে যখন তখন। যেতে হবে, পিছুটান অগ্রাহ্য করেই।

এসো হে আসন্ন তবে, দোঁহে উড়ি অতিদূর অনন্তআলোকে... 

জেগে ওঠে নিহত হৃদয়

যখন হঠাৎ দেখা,

চুলের সুরভি আর বকুলের ঘ্রাণ

মিলে মিশে একাকার

আনন্দে তখন ইচ্ছে হয় মরে যেতে।

মরণ তো ওই এলোচুলে

হাতের ছোঁয়ায় আলতো শিহরণ

কীরকম অন্ধতায় মাতাল মাতাল।

আকস্মিক দেখা হলে 

থেমে থাকে ভাষা, শব্দ কী নিঝুম

চার চোখে তৃষ্ণা কী অপার,

সেই গাঙে স্বতঃস্ফূর্ত নিমজ্জন

ভালোবাসা এলায়িত সমর্পণ

বুকের ভিতরে কান্না গুমরে ওঠা

ছলকে ওঠে স্বপ্নের ঝিলিক

স্মৃতিরেণু গেঁথে যায় নিহত হৃদয়ে।

নিভৃত আকুতি

বহুদিন নির্বাসনে ছিলে তুমি

দয়িতা কবিতা

জীবিকাযাপনে ক্লিষ্ট দাসের জীবনে

তোমার নিভৃত চর্চা করবার মত

এক টুকরো এক চিলতে পরিমাণ

অবসর মেলেনি, মেলেনি।

বহুদিন পর ফিরে ডাকছি তোমাকে

অভিমান ভোলো

মুখখানি তোলো

অক্ষরে ও চিত্রকল্পে চিতার আগুনে

ফুটে ওঠো

জ্বলে ওঠো

আমাকে পোড়াও

মননের বুক পিঠ

শৈল্পিক চাবুকে

রক্তঝর্না বইয়ে দাও

কম্পিত ও দ্বিধান্বিত হয়ো না হয়ো না

তোমার আক্রোশে

তোমার আগ্নেয় শাপে

প্রতিক্রিয়াশীলতার, শোষণের, অন্ধতার,

ক্ষুদ্রতার, নারী নিগ্রহের 

যাবতীয় খড়কুটো ছাই হয়ে যাক

ভস্ম ও নিথর হয়ে যাক!

পড়ে থাক বিস্মৃতি ধুলোয়

অদৃশ্য নিয়ম

এই মেঘ এই অগ্নি

লতাগুল্ম তোমরা তো জানো

আপোসের অনিবার্য পরিণতি

কী হয় কী হতে পারে!

মেঘের ভেতরে আছে জলকণা

বিদ্যুতের স্পর্শে নেই ভয়

আগুনের শুদ্ধতায় নিজেকে পুড়িয়ে

ইচ্ছেমত আত্মমেঘে নিজেকে উড়িয়ে 

নিচতা ক্ষুদ্রতা লোভ

জয় করা যায়,

মনুষ্যজীবন তাতে সার্থকতা পায়

প্রকৃত সাফল্য তা-ই

চরিতার্থ হতে পারে আকাঙ্ক্ষা পুলক

লতাগুল্মে অরণ্যে রয়েছে

ধ্যানীমৌন তপস্যার অগ্নিবীজ

তার তেজে অশুভ ও অন্ধকার

সুনিশ্চিত পরাভূত হবে

প্রকৃতির এমনই নিয়ম! 

জোড়াপংক্তি ভাঙাচোরা

১.

ভরাগাঙ মরাগাঙ কোনো গাঙে যার হয় না ঠাঁই-

তার জন্যে কে বিলাপ করবে আর? যার কিচ্ছু নাই?

২.

বিরহ কী আসলে আগুন? পুড়লে তবে ছাই কোথা যায়?

একসময় ফিরে আসে উৎসমূলে, নিজভূমে, আপ্না ঠিকানায়।

৩.

রে অন্ধ পাতক, তুই, শ্রমণের ভিক্ষাপাত্রে উপেক্ষার দানা

মুষ্টিভরে দিয়ে পাপ স্খালনের চেষ্টা কর, নাই বিঘ্ন মানা

৪.

কলঙ্কের ভাগটুকু একলা তুমি কেন নেবে, আমাকেও দিয়ো

বিনিময়ে অভাগার ভালোমন্দ অর্জনের সব শুষে নিয়ো।

৫.

নদীর স্রোতে দেখেছিলাম ও দরদি তোমার মুখচ্ছবি

নাওবিহনে বিরহগাঙ কীভাবে পার হবে তোমার কবি?