Published : 05 Jan 2026, 05:48 PM
১.
চিন্তার কী ডানা আছে? কেন তারা এতোটাই বহুপ্রজ? মগজের
কোটি শাখা প্রশাখায় উড়তে থাকে মিহিরেণু দিগন্তচারিতা
আয়ুষ্কাল ছিঁড়েখুঁড়ে ছাই করে, এইমতো আগ্রাসী ক্ষুধার বুঝি
তুলনা বা সীমারেখা নেই শুধু বেড়ে চলে সংহার-পিপাসা
২.
কেউ নেই চরাচরে, প্রতিধ্বনি ফিরে ফিরে চোট খায় পাথরে পাথরে
শূন্যতায় বালিয়াড়ি মাথা তোলে, মহাজাগতিক তৃষ্ণা বিবশ করুণ
এই প্রান্তরের মধ্যে নির্বাসিত কঙ্কালকাঠামো হয়ে পড়ে আছি একা
আকাশে বৈরাগী চাঁদ বিদ্রুপের লীলালাস্যে ভরপুর আলোকবঞ্চিত
৩.
ছাইভস্ম যেখানে যতোটা নাগালে পাই সাগ্রহে তা নেড়েচেড়ে দেখি
রতন কোথায় তার দিকদিশা উদ্দিশের চিহ্নছাপ কিছুমাত্র নেই
আছে মরীচিকা ধোঁয়া, ধন্দলাগা দংশনের বিব্রত বীজাণু ক্ষতপুঁজ
তাই হয়তো শাপগ্রস্ত নিয়তির মধ্যে লেখা খোদিত ও খণ্ডনের নয়
৪.
সমুদ্রের স্বাদগন্ধ, আমিষলবণ সবই বিদ্যমান মানুষের দেহে
তারপরও কেন যে সমুদ্রে যাওয়া নির্ণয় কঠিন সেই যৌক্তিকতা
মানুষের বুকেই তো পাথুরে শিলার স্থিতি পর্বতের কঠিনতা দৃঢ়
সমুদ্র ও পাহাড়ের সান্নিধ্যের সন্দর্শন আপাতত স্থগিত রেখেছি
৫.
রাতের নক্ষত্র সবই দিনের আলোর মধ্যে লুকোনো রয়েছে
আবিষ্কার করতে হলে ঝানু চোখ, পরিচ্ছন্ন মন থাকতে হয়,
সামনে আরও কাঁটাভরা পথশ্রান্তি বিভ্রমেরও মায়ামেদুরতা
হারানো দিনের দুঃখ সুখস্মৃতি অন্তঃস্রোতে আজও বহমান
৬.
ভিতরে ভিতরে ফাঁপা বহিরঙ্গে চাকচিক্য মোহ লোভাতুর
ঘুরিয়ে পুড়িয়ে মারে বৃথা ক্ষোভ বাদ বিসংবাদ
তারপরও আসক্তির অন্ধটান সাবলীল চুম্বক নিয়মে
আষ্টেপৃষ্ঠে আকর্ষণ জ্বলুনি ঘর্ষণ তুমি এমনই জীবন?
৭.
এতো মিথষ্ক্রিয়া হার্দ্য ভালোবাসা বিনিময় কেন তারপরও
দীঘল দূরত্ব আর মনোলগ্ন ব্যবধান কমতে চায় না কেন
ভালোবাসা তাহলে কী অলীক ধারণা কিছু? অশরীরী?
প্রশ্নঘায়ে জর্জরিত ক্ষরণপিয়াসী মন একাবোকা হৃদয়জমিন
৮.
বঞ্চনা লাঞ্ছনা আর অপ্রেমের সুধাভাণ্ডে যতোটা মদিরা
সবটুকু পান করে শিল্পবিষ থিতু হতে পারি না কোথাও
প্রজ্ঞার প্রচ্ছদে ঘুণ অশিল্প আন্ধারই তবে শেষতক জয়ী?
জীবন প্রকৃতপক্ষে কিছু নয়? বিবর্ণ সে একা পোড়ো বাড়ি?
মুখোশ কেন প্রিয়
মানুষ কেন যে এতো ভালোবাসে মুখোশের ছদ্মবেশ,
তালাশ তদন্ত করে সদুত্তর পাওয়া যায় না তার।
রোঁয়া ওঠা ক্ষুদ্রস্বার্থ বুদবুদ মানুষের প্রিয় কেন হয়
ছন্দচ্যুতি স্বাভাবিক নিয়মের জান্তব লংঘন তার
কেন কাম্য, সে রহস্য থেকে যায় অজ্ঞাত আঁধারে, একে
শনাক্ত চিহ্নিত করা সাধ্য নয় কারও, মুখোশের
মধ্যে আছে প্রতারণা, ভীতিবাষ্প কৌশলের অপচ্ছায়া--
কুৎসা নিন্দা চর্চা করে নিজেকে খর্বিত করে কী যে মোক্ষ
কী যে প্রাপ্তি তার কোনও কিনারা বা কার্যসূত্র নেই
কামে লোভে জিঘাংসার হীন পুঁজে স্বস্তি নেই কোনও
জেনে বুঝে তাও কেন আদিমতা হৃদয়নিভৃতে পুষে রাখা
মানুষের পশুজন্ম, ধিকৃত বিলাসচিন্তা অবদমনের
এই লোল তুচ্ছ প্রাপ্তি দেখে চোখ বিষাদিত পরাভূত
মানুষের ক্ষুদ্রতা ও নিচত্বের বুঝি কোনও তুলনাই নেই!
নৈরাশায় তমসায় ফিনকি দেয়া এক চিলতে আলোভ্রূণ--
দগ্ধ আর বিস্তারিত হিংসাবিষে হানাহানি রক্তপাতই আছে!
ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে
এই জগতের শক্ত বাঁধন আলগা হবে
ছিঁড়বে জানি
মহাশূন্যে মিলাবে সে
এক নিমেষে
ঠেকিয়ে দেওয়ার শক্তি যে নেই
মানছি মানি
দুঃখ সুখের পরন-কথার ঘটবে ইতি
পড়বে যে ছেদ,
জেনেও কেন ভান করো হে না জানবার
ভান কি ভালো?
প্রবঞ্চনার মধ্যে আছে লোভের মিশেল
কলুষ কালো!
দেনা-পাওনার দীন তামাদি ঝুটঝামেলায়
সময় খরচ
করতে করতে ভাঙতে ভাঙতে এতোটা পথ
একলা পাড়ি
মৃত্যু বাড়ি
পথের হদিশ গৎ আলাপে
জানার কষ্ট আছেই জানি, না জানাটাই
সুখের ছিল
বুকের মধ্যে জীবন-পাথর তৃষ্ণাচুমুক
লুকিয়ে রাখি
প্রায়ান্ধকার সন্ধ্যাবেলা
অঙ্গে মাখি
ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরছে জীবন সংবেদনা
পতন রোধে
সব ধরনের চেষ্টা বিফল, দুষ্ট ক্ষতের
সত্তা ছুঁয়ে
দীর্ঘশ্বাসের বুনন দেখি ভাঙন দেখি
কোন্টা খাঁটি কোন্টা মেকি
দেখতে দেখতে
দেখতে দেখতে
পথ পাড়ি দিই কাঁটায় ছেঁড়া অন্ধকারে
হাতড়ে ফিরি
হাতড়ে ফিরি
নিমজ্জিত মানিক রতন, অমূল্য সে পরশ পাথর!
পাই না বলে নৈরাশাজ্বর
নশ্বরতার পাথর ভেঙে
সৃজন করি রক্তলেখায়
করতে করতে
করতে করতে
রক্তঢেউয়ে দুরন্ত ঝড়!
বৈপরীত্যে, আপাতবিরোধে
শব্দের ভেতরই আছে নৈঃশব্দ্যের আস্তানা ও করোটি কঙ্কাল।
মানুষের ভেতরই আছে অমানুষ হিংস্র দানবীয় সত্তা, কাপুরুষ।
ফুলের ভেতরই আছে নষ্ট কীট, দংশনের মধুবিষ অসহ গরল।
জ্যোৎস্নার ভেতরই থাকে অমানিশা, ঘুরঘুট্টি নিষ্ঠুরতা অন্ধকার।
প্রাপ্তির মধ্যেই আছে শূন্যতা রোদনকষ্ট শুষ্কতা ও স্বপ্নের ফসিল।
বীজের মধ্যেই সুপ্ত আগামীর সম্ভাবনা সবুজের সমূহ সম্ভার।
জীবনের প্রাণরসে লুকোনো রয়েছে শ্রান্তি মরণের ফেনা।
আয়ুর নৈকট্যে বাঁচে অবসাদ স্তব্ধশোক সমাপ্তি বুদবুদ।
শব্দের ভেতরই লগ্ন হিমায়িত নির্জনতা পাহাড়ের দুর্লঙ্ঘ্য দেয়াল।
দিনের বল্কলে আছে রাতের অমিয়সুধা ক্রীড়াসুখ সুগন্ধি আঁচল।
আমিষ-রৌদ্রের মধ্যে ওত পেতে আছে বৃষ্টি অপেক্ষা-বিধুর।
নদীর শরীরে লগ্ন হয়ে থাকে মরাস্রোত বালিয়াড়ি বন্ধ্যা বালুচর।
পাখির ডানায় সিক্ত সন্নিহিত অসুখের কালোভ্রূণ শত্রু উড়ানের।
নিরাগ মধ্যাহ্নমাঝে আশ্রিত বর্ধিত হয় বানকুড়ালির স্পর্ধা দুঃসাহস।
সংসারের নিবুনিবু প্রদীপেরই ভগ্ন আঁচে সন্ন্যাসের অতল পরিখা।
আস্থার বুকেই বিদ্ধ হয়ে থাকে প্রতারক অনাস্থা ও অশান্তি অঙ্কুর।
খাঁচায় নিভৃতে বন্দী মনোপাখি তার মধ্যে হননেচ্ছা অবিমৃষ্য ভুল।
পুরুষেরও মধ্যে থাকে নারীসত্তা, ক্রোধে ছেঁড়া সৌকুমার্য তার।
অমৃতেরই সুধাভাণ্ডে গোপনে বর্ধিত হয় বিষদ্রব গাঢ় আগ্রাসন।
মরুর চৈতন্যমধ্যে শ্যামলিম পুষ্পরাগ, অনাদৃত একা ক্যাকটাস।
অবকাশ নেই আর
থেমে গেছে গুঞ্জনের দিন
এখন মৃত্যুর চোখে সরাসরি তাকানোর
ক্ষমতা অর্জিত, সুতরাং
গুঞ্জনের পরোয়া করি না
না করলেও চলে!
জীবনসায়াহ্নে এসে তাকাই পেছনে
তাতাপোড়া স্মৃতির জোনাকি
আলপথে ওড়াউড়ি করে
ছুঁতে চাই, কিন্তু ওরা অধরাই থাকে
মানুষের ডানা নেই, চাইলেও
কোনওমতে উড়তে পারে না
জোনাকিও ঈর্ষণীয় হতে পারে
এমত আকাঙ্ক্ষাচাপ অদ্ভুত বিচিত্র নয়!
কল্পনার ডানা ভেঙে যায়
মরমি গানেরই মতো কুহকী জীবন
ঠারেঠোরে হাতছানি দেয়
সাড়া দেওয়া আদৌ কী সমীচীন
সংশয়ের ঊর্ণাজাল ঘন হয়
সে বন্ধন দৃঢ় হতে থাকে!
গুঞ্জনের দিন গেছে থেমে
এখন মৃত্যুর লগ্নি বিনিয়োগ
জীবন উশুল দেনা ঋণশোধ ইত্যাকার
হিসাব নিকাশে ব্যস্ত, তাকানোর ফুরসত নেই!
জীবন কেমন?
এই জীবনের সংজ্ঞা কেমন
রোদের গুঁড়ো ঝিমোয় যেমন,
তার চাহিদা আহ্লাদী সাধ
বঙ্কিমতা ছেলেখেলার তিতকুটে স্বাদ
মিটিয়ে দিতে শূন্য আয়ু
উধাও কখন পরান বায়ু
জীবন তুমি কেমনধারা
আপনবেগে পাগলপারা
উড়াল প্রিয় ছিন্নমেঘে
তপস্যা ও তাপের ত্যাগে
মুষড়ে পড়া, ক্লান্তি গরল
ধুঁকতে ধুঁকতে পল অনুপল
শ্বাসনিশ্বাস কষ্টে সচল
ভজন সাধন ব্যর্থ বিফল!
এই জীবনের সংজ্ঞা জেনে
আপোস গ্লানি সবটা মেনে
বাঁচার তিয়াস হয় কী পূরণ?
মৃত্যুনখর স্বভাব স্ফূরণ
স্বল্পবাসের উপত্যকায়
বোধিদ্রুমের শুষ্ক ছায়ায়
কতো যে ফুল গোপন ফোটে
বসুন্ধরার একলা গোঠে
সংশয়ী মেঘ ঢেউ খেলে যায়!
কেউ ছুঁতে পায় কেউ বা হারায়
একটু নিরল বাঁচার আশা
রুগ্ণ চপল ক্ষুৎপিপাসা
কামড়ে ধরে রক্ত ঝরায়
কুজ্ঝটিকা তপ্ত খরায়
নাছোড় তোমার একগুঁয়েমি
খেলাচ্ছলের সালতামামি!