আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের "খোয়াবনামা" কি শুধুই খোয়াব?
লেখক যেন ইচ্ছে করেই এক গোলকধাঁধা র খেলা খেলতে বসেছেন পাঠকের সঙ্গে। "খোয়াবনামা" উপন্যাসটি যদি পরাজয়ের কাহিনিমাত্র হত তাহলে গ্রামের খুন, জখম, দাঙ্গা, মুসলিম লিগ প্রমুখ রাজনৈতিক দলগুলির ধাপ্পাবাজি পাঠককে বিষন্ন করত, রেলের এ কামরা থেকে ও কামরায় পুলিশের নজর থেকে তমিজের পালিয়ে একটা ব্যর্থতার লাঞ্ছন এঁকে দিত পাঠকের হৃদয়ে--- কিন্তু তা তো করছে না।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের (১৯৪৩--১৯৯৭) "খোয়াবনামা" ১৯৯৬র ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার 'মাওলা ব্রাদার্স ' থেকে প্রকাশিত হয়। সেই বছরের এপ্রিলে কলকাতার 'নয়া উদ্যোগ ' প্রকাশনী থেকে এর একটি ভারতীয় সংস্করণও প্রকাশিত হয়। ১৯৯৬তেই বইটি বাংলাদেশের সা'দত আলি আখন্দ এবং ভারতবর্ষের 'আনন্দ পুরস্কার' পায়। 'খোয়াবনামা' প্রথমে ঢাকার 'দৈনিক জনকণ্ঠ '-তে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই রাজনৈতিক কারণে এর প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না "খোয়াবনামা" একটি অত্যন্ত জটিল উপন্যাস। এবং বর্ণিত জনগোষ্ঠীর জীবনের বহু রঙকে প্রতিফলিত করা একটি অসাধারণ 'এপিক' রীতির উপন্যাস। বর্তমান দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে ভারত -পাকিস্তান-বাংলাদেশের সাধারণ জনজীবন যে যে সমস্যার দ্বারা পঙ্গুদশা প্রাপ্ত হয়েছে ---- দারিদ্র্য, অনাহার, অশিক্ষা, নারীর অবদমন, সমাজের প্রতিটি খাঁজে ঘাপটি মারা সামন্ততান্ত্রিক শোষণ, ১৯৪৭-এর দেশভাগ, রাজনৈতিক দলগুলির নানা দুর্নীতি, আত্মস্বার্থে জনসাধারণকে ঠকানো এবং বিপথে পরিচালনা, অন্তর্দলীয় কোন্দল, প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষয় এবং ভাঙনজণিত কারণে লোকজনের বাস্তুচ্যুতি ----আমাদের জীবনের সব মহাভারত সাকার লাভ করেছে "খোয়াবনামা"য়।
বাঙলা উপন্যাসের নিরিখে এই উপন্যাসটির গঠন এতো বেশি জটিলতাপূর্ণ, এর খাঁজে খাঁজে জীবনরহস্যের এতো মণিমাণিক্য ছড়ানো যে উপন্যাসটির গড়ন থেকে শুরু করে এর বিষয়বস্তুর নানা দিক দিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করা সম্ভব। সেজন্য একটু অস্বস্তি নিয়েই বলছি, আমাদের মধ্যবিত্তদের, যারা একটু বইপত্র নাড়াচাড়া করি, মাঝে মাঝে এক-আধটা প্রবন্ধও ফেঁদে বসি, তাদের মাথায় নারী বা দলিতের অধিকার, প্রাকৃতিক পরিবেশের ভাঙন-- ইত্যাদি সমস্যার আলোচনা আজকাল অগ্রাধিকার পায়। এই সমস্যাগুলি গুরুত্বপূর্ণ নয়, একথা একেবারেই বলছি না।।"খোয়াবনামা"য় এগুলি খুব বড় জায়গা নিয়েই আছে, আর সেটা মাথায় রেখে আপনাদের অনুমতি নিয়ে বিষয়ান্তরে যেতে চাই।
এই উপন্যাসের লেখক আখতারুজ্জামান খুব সচেতনভাবেই ইতিহাসের একটি সত্য ঘটনা যা অখণ্ড ভারতের উত্তর প্রদেশে জন্ম নেওয়া ফকির মজনু শাহর (জন্ম?--১৭৮৭) নেতৃত্বে অষ্টাদশ শতকে ঘটেছিল অর্থাৎ সন্ন্যাসী--ফকির বিদ্রোহের ঐতিহাসিক ঘটনাটি উপন্যাসের মূল প্রেক্ষাপট। ঘটনাটি ছিল এরকম: ফকির মজনু শাহ পরিচালিত সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের অন্তর্গত একটি খণ্ডযুদ্ধ যা বগুড়া অঞ্চলে ঘটেছিল ১৭৮৬ খৃস্টাব্দের ২৯ ডিসেম্বর, যেখানে মজনু শাহের একজন অনুগামী সেনাপতি,নাম মুনসি বরকতুল্লা শাহ মহাস্থান কেল্লায় (লোকমুখে বেশি প্রচলিত মহাস্থানগড় নামে) তাঁর অধীনস্থ সৈন্যদল পরিচালনার পথে ইংরেজ সেপাই টেলরের বন্দুকের গুলিতে মরে গিয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে যান। সবারই জানা আছে যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাত্রাতিরিক্ত লাগাতার কর আদায়ের জুলুমে অখণ্ড ভারতের অনেক জায়গায় দুর্ভিক্ষ হয়, বহু মানুষ অনাহারে মারা যায় বা ভিটেশূন্য হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের "আনন্দমঠ'' (১৮৮২) উপন্যাসে সেই ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের এবং সন্ন্যাসী বিদ্রোহের জীবন্ত চিত্র চিরস্থায়ী হয়ে আছে।(পরবর্তী গবেষণায় অবশ্য দেখা গেছে যে মহারাষ্ট্রের একদা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী বলবন্ত রাও ফাড়কের (১৮৪৫--১৮৮৩) নেতৃত্বে মহারাষ্ট্রের নানান জায়গায় কোম্পানির সীমাহীন অত্যাচারের বিরুদ্ধে যে সমস্ত বিদ্রোহ হয়েছিল সেই সমস্ত ঘটনা জায়গা পেয়েছে "আনন্দমঠ''-এ)। ফকির মজনু শাহ মাদারিয়া তরিকার অনুসারী ছিলেন। ওই সময় বহু তরিকার পীর-ফকিররা দেশের বিভিন্ন তীর্থস্থানে (খানকা-দরগা ইত্যাদিতে) ঘুরে বেড়াতেন, যেমন সন্ন্যাসীরা ঘুরে বেড়াতেন নানা হিন্দু তীর্থে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নানা জুলুমের একটি ছিল এই সমস্ত তীর্থস্থানগুলির উপর অনায্য ট্যাক্স বসিয়ে সন্ন্যাসী এবং -ফকিরদের নাকাল করা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে সন্ন্যাসী-ফকিরদের হাতিয়ারবন্ধ বিদ্রোহের অন্যতম কারণ ছিল এটি।
"খোয়াবনামা" র আরম্ভ মুনসি বরকতুল্লার (উপন্যাসে যাকে বার বার পাঠান সেনাপতি বলে উল্লেখ করা হয়েছে) শাহাদাৎ দিয়ে : ".......ঐসব দিনের এক বিকালবেলা মজনু শাহের বেসুমার ফকিরের সঙ্গে মহাস্থান কেল্লায় যাবার জন্যে করতোয়ার দিকে ছোটার সময় মুনসি বরকতুল্লা শাহ গোরা সেপাইদের সর্দার টেলরের বন্দুকের গুলিতে মরে পড়ে গিয়েছিল ঘোড়া থেকে। বন্দুকের গুলিতে ফুটো গলা তার আর পুরট হলো না। মরার পর সেই গলায় জড়ানো শেকল আর ছাইভষ্মমাখা গতর নিয়ে মাছের নকশা করা লোহার পান্টি (লাঠি/সড়কি) হাতে সে উঠে বসলো কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথানে পাকুড় গাছের মাথায়। (এখানে মুনসি বরকতুল্লার গলার শেকল/ জিঞ্জিরের উল্লেখ কিছু ধন্দ জাগায়। উপন্যাসের অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যে মনে হয় এই শেকল বলতে যোদ্ধার বর্মকে নির্দেশ করা হচ্ছে, বন্দীর প্রতি শত্রুর চাপানো শেকল নয়। একটি গানে সিপাহিদের প্রতি মজনু শাহের নির্দেশ শোনা যায় "....সিনাতে জিঞ্জির পরো......"। ) সেই থেকে দিনের বেলা রোদের ভিতর রোদ হয়ে সে ছড়িয়ে থাকে সারাটা বিল জুড়ে, আর রাতভর বিল শাসন করে ওই পাকুড় গাছের ওপর থেকেই।" উপন্যাসটি নিয়ে আলোচনায় আমরা যত এগোতে থাকব, খেয়াল করব যে এই কাৎলাহার বিলের জনগোষ্ঠী যারা জীবনযাপনের দিক থেকে ইতিহাসের মাপকাঠিতে সভ্যতার ধারায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে দারিদ্র্য এবং অশিক্ষার কারণে --- বছরের খুব অল্পদিনই যারা দুবেলা পেট পুরে খেতে পায়, অসুখ-বিসুখে আধুনিক চিকিৎসার কোনো সুযোগ পায় না, তারা একটি চাক্ষুষ বাস্তব ঘটনাকেও কীভাবে অলৌকিকে পরিণত করে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে তৎকালীন অখণ্ড ভারতের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে ফকির মজনু শাহ সংগঠিত সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের অন্যতম সেনাপতি মুনসি বরকতুল্লা ঘোড়সওয়ার হয়ে ফৌজ নিয়ে বগুড়া অঞ্চলের মহাস্থানগড়ের দিকে যাচ্ছিলেন তখন ইংরেজ সেনাপতি টেলরের বন্দুকের গুলিতে বিদ্ধ হয়ে মৃত অবস্থায় ঘোড়া থেকে পড়ে যান, এটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। কিন্তু এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে ওই অঞ্চলের অধিবাসীরা একটি অলৌকিক ঘটনায় পরিণত করে। তাদের চোখে ঘটনাটি এমন এক রূপ পায় যে মুনসি বরকতুল্লা শাহাদাৎ বরণের পর কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথানে পাকুড় গাছের মাথায় আশ্রয় নিয়ে মাছের নকশা আঁকা লোহার সড়কি হাতে বিলটি পাহারা (উপন্যাসে লেখা আছে শাসন করা। মারাঠি ভাষায় শাসন মানে নিয়মতান্ত্রিকভাবে দেখাশোনা বা পরিচালনা করা) দেন। ওই বিলে অনেক হিংস্র গজার মাছের বসবাস। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী দিনের বেলায় তারা ভেড়ার রূপ ধারণ করে আকাশে মেঘের মধ্যে মিশে যায়। উপন্যাসে দেখি যে সারারাত ঘুমের মধ্যে হেঁটে বেড়ানো তমিজের বাপ (যার নাম উপন্যাসে কখনও উল্লিখিত হয় না), যে স্বভাবে সাদাসিধা , হয়তো লোকের চক্ষে একটু বোকাও। সে রাতের অন্ধকারে তীর্থের কাকের মতো কাৎলাহার বিলের ঢালে কাদায় পা গেঁড়ে অপেক্ষা করে এজন্য যে দৈবাৎ যদি সে বরকতুল্লা মুনসির দেখা পায়।
কেন এই অপেক্ষা? কারণ মুনসির মধ্যে স্থানীয় মানুষ প্রচুর অলৌকিক ক্ষমতা দেখতে পেয়েছিল। গলায় বন্দুকের গুলি বিঁধে মরে যাবার পরও তিনি কাৎলাহার বিল পাহারা দেন, বিলের দুর্ধর্ষ গজারমাছগুলি মুনসির অলৌকিক ক্ষমতাবলে সূর্যোদয়ে প্রথমে ভেড়ায় রূপান্তরিত হয়, তারপর মেঘ হয়ে আকাশে উড়াল দেয়।মুনসি কি যে সে ব্যক্তি? দিনের আলো প্রখর হতেই তিনি শকুনের চোখের মণির ভেতরে প্রবেশ করে সূর্যের আকাশ পাড়ি দেওয়া দেখবেন , দেখতে দেখতে হঠাৎ রোদের সঙ্গে মিশে গিয়ে বিলের গজার, শোল, রুই, কাৎলা, পাবদা, ট্যাংরা , পুঁটির হিমশরীরে ওম যোগাবেন। আর হয়রান হয়ে পড়লে পাকুড় গাছের ঘন পাতার আড়ালে কোনো হরিয়াল পাখির ডানার নিচের নরম মাংসে একটা লোম হয়ে টানা ঘুম দেবেন সারাটা বিকেল ধরে। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী মুনসি সীমাহীন ক্ষমতাসম্পন্ন আগুনের জীব, যেজন্য ঘোড়াসীন অবস্থায় কোম্পানির গোরা সেপাইয়ের গুলিতে মরে মাটিতে পড়ে গেলেও তিনদিন ধরে লাল-নীল আগুনের ধোঁয়া বেরোতে থাকে তার শরীর থেকে , গোরা সেপাইরা মুনসির মৃতদেহের নাগাল পায় না, অলৌকিক ক্ষমতায় মুনসি রক্ষা করে কাৎলাহার বিলের মাছসহ এর দু'পারের গ্রাম গিরিরডাঙা এবং নিজগিরির ডাঙার গ্রামের বাসিন্দাকে। এটা অবশ্য নিছক অন্ধবিশ্বাসই, কারণ মুনসির অপার অলৌকিক ক্ষমতা সত্ত্বেও গরীব গ্রামবাসীদের দীর্ঘ অনাহার, রোগভোগ, মৃত্যু --- কিছুই রদ হয় না।
"খোয়াবনামা"র প্রায় সবটাই যেহেতু লেখাপড়াবঞ্চিত, দরিদ্র, অনাহারক্লিষ্ট, ফলে অত্যন্ত কুসংস্কারাচ্ছন্ন লোকজনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা সেজন্য সাদাচোখে দেখা বাস্তব ঘটনাকেও একটা অলৌকিকের পোশাক চাপিয়ে দেওয়া হয়। নাহলে যেন ঘটনাটির যথেষ্ট গুরুত্ব থাকে না। উপন্যাসে বর্ণিত স্থানগুলিতে শাসক-শোষিতের বাস্তব লড়াই যে অনেক হয়েছে তার চিহ্ন ছড়িয়ে আছে এলাকাসংলগ্ন নানা স্থাননামে--- লাঠিডাঙা, গিরিরডাঙা, নিজগিরিরডাঙা (আমরা জানি যে গিরিপদবীধারী লোকেরা "দশনামী" ----অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সন্ন্যাসীবিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত একটি সম্প্রদায়, ভবানী পাঠক(তাঁর জন্মতারিখ জানা যায় না, কিন্তু ১৮৮৭-তে রঙপুর অঞ্চলে তাঁর বিদ্রোহমূলক কার্যকলাপের বিবরণ পাওয়া যায়, সম্ভবত এর কাছাকাছি সময়েই ভবানী পাঠকের মৃত্যু ঘটে) সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন । অনুমান করে নিতে অসুবিধা হবার কারণ নেই যে গিরিরডাঙা, নিজগিরিরডাঙা গ্রামে এক সময় গিরিপদবীধারী লোকদের প্রাধান্য ছিল।------অর্থাৎ এই জায়গাগুলোর একটা জঙ্গী ইতিহাস ছিল। এমনকি 'মহাস্থানগড়' নামটাই তো জানিয়ে দেয় যে ওখানে একটা দুর্গ কখনো বর্তমান ছিল । "খোয়াবনামা"র বর্তমান বাসিন্দাদের মধ্যে যারা গরীবের অধম গরীব তাদের অনেকেই জীবনকে যেভাবে পেয়েছে সেই অবস্থার মধ্যেই আঁটসাঁটভাবে টিঁকে থাকতে চায়, কিন্তু এর মধ্যেও তমিজ, দশরথ কর্মকার, বা কেরামত আলির মতো লোকদের 'রণং দেহি' মনোভাব নিয়ে কমবেশি কোনো রাখঢাক নেই। তারা নিজের জীবনের অবস্থার পরিবর্তন চায়। তারা সকলেই তেভাগা আন্দোলনকে স্বাগত জানায়। যদিও কেরামত আলি তেভাগার গান লিখেই খিয়া অঞ্চল থেকে ফেরার হতে বাধ্য হয়েছে, পরে পাকেচক্রে তাকে বাধ্য হয়ে মুসলিম লিগের 'লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান "-এর সমর্থনে গান বাঁধতে হয়েছে। জায়গা বিশেষে তেভাগার লড়াকু গানকে ফকিরি গানের খোলস পরাতে হয়েছে। ক্ষমতাসীনগোষ্ঠী সব সময়েই বিরোধীপক্ষের লড়াইকে ধূলিসাৎ করে দিতে চায়, "খোয়াবনামা"-তেও মুসলিম লিগ সমর্থক কাদের , ইসমাঈল, কৃষক -প্রজাপার্টি সমর্থক কালাম মাঝি, কংগ্রেস সমর্থক নায়েব পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী--- এরা আপাতভাবে তেভাগা আন্দোলনকে ধর্তব্যের মধ্যে গণ্য করছে না ঠিকই কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা সকলেই খুব শঙ্কিত হয়ে রয়েছে এই আন্দোলনের কারণে।
লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস "খোয়াবনামা"য় দৃশ্যায়িত করেছেন চেরাগ আলি ফকিরের মধ্যযুগীয় "খোয়াবনামা" পুথিটি। যে পুথি খুলে চেরাগ আলি ফকির সাধারণ লোকের স্বপ্নবৃত্তান্ত বলে দেয়। উপন্যাসের এক জায়গায় পরে বলাও হয়েছে যে পুথিটিতে সাঙ্কেতিক কিছু আঁকিবুঁকি আছে, সে আঁকিবুঁকির উপর কোথাও কোথাও আরবি অক্ষরে কিছু লেখাও আছে, কিন্তু কোনো গান নেই। চেরাগ আলি ফকির, যাঁর হেফাজতে প্রথমে পুথিটি ছিল, তিনি অল্পসল্প আরবি হয়তো জানতেন, এই পুথির উত্তরাধিকারী তমিজের বাপ তো নৈব নৈব চ!
বলাই বাহুল্য ফকির চেরাগ আলির হেফাজতে থাকা "খোয়াবনামা" পুথিটিতে যেভাবে স্বপ্নের ফলাফল লেখা আছে তার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই--- যেভাবে মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড বিংশ শতাব্দীতে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করেছেন। উপন্যাস "খোয়াবনামা"র নানা চরিত্রের স্বপ্ন যেমন, যমুনার ঘোলা জলে নিজের ডুবে যাওয়া, নিজের বিবাহের স্বপ্ন দেখা, পুত্রবধূর সঙ্গে শ্বশুরের "জেনায় লিপ্ত হওয়া " ইত্যাদির 'তাবির' জানতে লোকজন চেরাগ আলি ফকীরের কাছে ভিড় করে, চেরাগ আলি স্বপ্নের অর্থ খুঁজতে খুঁজতে মাটিতে আঁকিবুকি কাটে, জিজ্ঞেস করে যে স্বপ্ন দেখার সময় লোকটা ডান বা বাঁ--- কোন কাতে শুয়েছিল। লক্ষ্য করবার বিষয় যে ভাতের অভাবের দিনে লোকজন নাকি স্বপ্ন দেখে না, পেটে দুবেলা ভাত পড়ার লোকজনের ঘুমে স্বপ্নেরা দেখা দেয়।
ছবি: ওমর শামস-এর তোলা
যদিও আপাতভাবে লেখক "খোয়াবনামা" উপন্যাসে মধ্যযুগীয় এই পুথিটিকে সম্মুখায়িত করেছেন গ্রামের দীনের অধম দীনের শিক্ষাবঞ্চিত, কুসংস্কারাচ্ছ জীবনের বাস্তব অবস্থাটি তুলে ধরতে, কিন্তু এর উল্টোপিঠেই আছে এক লড়াকু ইতিহাসের কথা, যে সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইস্পাতকঠিন ভিতকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ফকির মজনু শাহ, এবং সন্ন্যাসী ঠাকুর ভবানী পাঠকের যৌথ নেতৃত্বে অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে যে লড়াই হয়েছিল, তারই উত্তরসূরি তো বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে কম্যুনিস্ট নেতৃত্বে তেভাগা আন্দোলন, বাঙলার কৃষককুল যাতে অভূতপূর্ব জঙ্গি লড়াই লড়েছিল। সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের মতো তেভাগা আন্দোলনও মধ্যবিত্তশ্রেণীর দ্বিধান্বিত দুর্বল নেতৃত্বের জেরে হেরে গিয়েছিল ঠিকই " কিন্তু সত্যানন্দ যে আগুন জ্বালিয়াছিলেন, তাহা কিন্তু নিভিল না"।
"খোয়াবনামা"তে যখন খোদিত থাকে ,"মজনু হুঙ্কারে যত মাদারি ফকির /আন্ধার পাগড়িত বান্ধো নিজ নিজ শির (আন্ধার বলতে কালো রঙ )/ সিনাতে জিঞ্জির পরো আঁখির ভিতর /সুরমা করিয়া মাখ সুরুজের কর" অথবা ভবানী পাঠকের শাহাদতবরণের বর্ণণায় লেখা হয়, "দশনামী প্রভুগণে/ বন্দিয়া পবিত্র মনে/গিরিসেনা দাঁড়ায় কাতারে /ভবানী নামিল রণে/ পাঠান সেনাপতি সনে/গোরা কাটো আদেশে হুঙ্কারে/ ভবানীর কণ্ঠধ্বনি /মৃগরাজধ্বনি জিনি/গর্জনে শার্দূলে লজ্জিত /সেই ডাকে চঞ্চল / মানাস নদীর জল/ হইল গোরা শোণিতে রঞ্জিত /কোম্পানির গোরাসবে/ পাঠাইয়া যমভবে/ জলে প্রভু করে আচমন/ বন হইতে সঙ্গোপনে/ গোরাগণ আক্রমণে/ প্রভু সেথা ত্যাজিল জীবন / গিরিগণে নামে জলে/ যতনে লইল কোলে/ কৃষ্ণকোলে যেন শত রাই/পাষাণে হৃদয় বান্ধো/ কান্দো গিরিগণে কান্দো/ ভবানী পাঠক ভবে নাই "। যদিও শেষ দুটি পঙক্তিতে পূর্বের জঙ্গীপনা ততটা রক্ষিত হয়নি। "খোয়াবনামা" উপন্যাসে বারে বারেই দেখা যায় যে একদা যে গানগুলো ছিল সশস্ত্র লড়াইয়ের বর্ণনা, কালে কালে তা মুর্শিদী/ মারিফতী অথবা ক্ষেত্রেবিশেষে ভক্তি ভাবাপন্ন হয়ে পড়েছে---- যেমন একটু আগেই উল্লিখিত ভবানী পাঠকের শাহাদত বরণের বর্ণনাতে দেখা গেছে। অন্যত্র পাই, মাঝরাতে ফকিরের দরজায় যুদ্ধের ঘোড়া পৌঁছামাত্র যোদ্ধা ফকির ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়ে যায়, তার পাশেই লিখিত হয়, "চান্দ জাগে বাঁশঝাড়ে/ একটা একটা ডিম পাড়ে /ভাঙা ডিমে হলুদবরন হইল সকল ঠাঁই / উঁকি দিয়া চায়া দেখি ফকির ঘরত নাই"।
ফাটা ডিমের কুসুমের হলুদবরনের সঙ্গে রহস্যময় কাব্যিক চাঁদনিরাতের বর্ণনা যে কতবার আছে উপন্যাসে, পাঠককে টেনে রাখবার এটা একটা অপূর্ব কৌশল হিসাবে কাজও করেছে, কিন্তু ঐতিহাসিক সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহের জঙ্গী ভাবকে অনেকটাই তা মিইয়ে দিয়েছে। "খোয়াবনামা" এক জায়গায় বলা হয়, তমিজের বাপের পাকুড়তলায় শরাফত মন্ডলের দাপটে একদিন মুনশি উৎখাত হবে, যদিও
উপন্যাসের এক জায়গায় বর্ণিত হয়: "চান্দ কোলে জাগে গগন/ পাশে বিবি নিন্দে মগন/ খোয়াবে কান্দিল বেটা না রাখে হদিশ/ (হায়রে শিথানে পড়িয়া থাকে কার্পাসের বালিশ/ (ফকির) ঘোড়ায় চড়ি বাহিরিল নাহিক উদ্দিশ"।
কিন্তু এক সময় তমিজের বাপ উপলব্ধি করে যে "ফকির নাই, মুনশির হুকুম আসবে কার মুখ দিয়ে। কতদূরে কোন কোন গাঁয়ে, কত চর, কত কায়েমি চর, কত নতুন জেগে -ওঠা -বিরান- বিরান- চর যমুনার সাত স্রোতের টানে টানে, ঊনপঞ্চাশ ঢেউয়ের তালে তালে চেরাগ আলির গান উছলে পড়বে বাঙালি নদীর পানিতে, সেখানে কয়েকটা ডুব দিয়ে উঠে মানুষের জোতজমি, জোতদারদের সঙ্গে লাঠালাঠি করা বর্গাচাষাদের রক্তে পিছলা জমির আল পেরোতে পেরোতে মুনশির গান কমজোর হয়ে গড়িয়ে পড়ে কাৎলাহার বিলে। বিলের পানিতে হাবুডুবু খেয়ে উঠে এই গিরিরডাঙায় আসতে আসতে গান ঝাপসা হয়ে পড়ে। বৃষ্টিভেজা তারার আলোয় তমিজের বাপের বাড়ির খুলিতে তার ছায়া পড়ে। এই ছায়া ছায়া আলোয় ঐ গান এসেছে কার গলায় সওয়ারি হয়ে? ভালো করে খেয়াল করলে ছায়াটিকে পাকুড়তলার সাদা ঘোড়া বলে ঠাহর করা যায়। সারা অঙ্গে তার দুষমনের তীর বেঁধা, সওয়ারি নেওয়ার জন্য অস্থির সাদা ঘোড়ার গায়ের তীরের ডগাগুলো তিরতির করে কাঁপে। অত অত তীরের মধ্যে মুনশি বসবে কোথায় তা ভালো করে বুঝতে না বুঝতে ঘোড়া ছুটতে শুরু করে। ঘোড়ার খুরের আওয়াজ বাজিয়ে তোলে চেরাগ আলি ফকীরের গান: চান্দ কোলে জাগে গগন/ পাশে বিবি নিন্দে মগন/.....
আমরা যা বলতে চাইছিলাম লেখক যেন অনেক ভাঁজের মধ্যে তা বলে দিলেন। তবুও আমাদের বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন যে কেন, কী উদ্দেশ্যে লেখক এই পথটি বেছে নিলেন। আমার নিজের ধারণা এই যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস অবিভক্ত ভারতের আকালের সময় অর্থাৎ ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭-এর দেশভাগ ও তথাকথিত স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত বর্তমান বাঙলাদেশের উত্তর-পূর্ব- পশ্চিম অর্থাৎ বগুড়া-রঙপুর এবং খানিকটা রাজশাহী অঞ্চলের মূলত সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনযাত্রার একটা ছবি তুলে ধরতে চাইছিলেন। সে জীবন তো কোনো আদর্শ জীবন নয়, অজস্র ভুলভ্রান্তি আর গোঁজামিলে ভরা। আগেও যেমন বলেছি এই লোকগুলোর জীবন কণ্টকিত হয়ে আছে দারিদ্র্য, অশিক্ষা, হাজারো রকম সামন্ততান্ত্রিক শোষণ আর প্রকৃতির খেয়াল খুশিতে। বহু প্রাচীন কাল থেকেই ঝড়ঝঞ্জা, ভূমিকম্প, নদীর গতি পরিবর্তনের ফলে পুরনো বাসস্থান থেকে উৎখাত হয়ে বন কেটে বসতনির্মাণ, ফসলের জমিপ্রস্তুত, আকালের সময়ে বা অন্যকোনো সামাজিক বিপর্যয়ে সেই জমি বিক্রি করে বা বন্ধক দিয়ে হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ---এসবই ওরা নিয়তি বলে মেনে নিয়েছে। তাদের বিদ্যেসাধ্যি নেই বলে তাদেরই প্রতিবেশী কিছু অতি চালাক মধ্যবিত্ত শ্রেণী এইসব গরীব, শিক্ষাবঞ্চিত লোকদের জমি ইত্যাদি হাতিয়ে নিয়েছে। উপন্যাসে দেখি তমিজের সৎমা কুলসম অনেক কিছুর গন্ধ শুঁকে খিদের জ্বালা দূর করে। বছরের তিনটা মাসও যারা দুবেলা পেট পুরে খেতে পায় না, তাদের আচার -আচরণ, চিন্তাধারা তো অন্য রকম হবেই। কোন সুদূর অতীতে তাদের কোন দাদার দাদার দাদা হাতিয়ারবন্ধ লড়াই করেছিল, সেগুলো তাদের বহুদূরস্মৃতি। যদিও সশস্ত্র লড়াই বিনা সমাজ পরিবর্তনের ঐতিহাসিক নজির নেই, কিন্তু তমিজদের জীবনে সেই সশস্ত্র লড়াইয়ের দিশা কোথায়? কৃষকদের তেভাগা আন্দোলনও তো সঠিক নেতৃত্বের অভাবে এবং রাষ্ট্রের দমনপীড়নে প্রায় ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। নেতৃত্বহীন খেটে খাওয়া মানুষের অবলম্বন হয়ে ওঠে তাই হতদরিদ্র অবস্থার মধ্যেও কোনো প্রকারে টিকে থাকা, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া লড়াইয়ের গাথার মধ্যে একটা ভাববাদী দর্শনের প্রলেপ ঢেলে কোনো না কোনোভাবে তার আশ্রয়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখা।
পুথি বেড়ে যাচ্ছে, সকলে অধৈর্য হয়ে যাবার আগে দু'একটা কথা বলে পাততাড়ি গুটোতে চাই। "খোয়াবনামা" উপন্যাসের গড়নটা এতোই জটিল, আর খুব হিসেব করেই তাঁর উদ্দেশ্য গোপনে রেখেছেন, সামনে যা বলছেন, পেছনে তা বলছেন না। পর্দার বাইরে দরিদ্র, শিক্ষাবঞ্চিত মানুষগুলোর অল্প কয়েকটি স্বপ্নের উল্লেখ করে তাদের মধ্যযুগীয় অবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হাজির করেছেন কিন্তু আসল খোয়াবনামা রচনা করেছেন তমিজের হাড়ভাঙা পরিশ্রম করবার শক্তিবলে চাষের জমি সংগ্রহ করবার দৃঢ় প্রতিজ্ঞায়, কেরামতের নূতন দিনের গান বাঁধবার স্বপ্নে এবং ফুলজানের পেটানো স্বাস্থ্যের খাটুনি ক্ষমতা এবং তার মেয়ের ভাত খাবার স্বপ্ন এবং আবদারে। হতদরিদ্র নারীচরিত্রগুলি যতই জাতপাত, অন্যান্য কুসংস্কারের চাপে থাকুক না কেন, পরিবারের পিতৃতান্ত্রিক শাসনকে চ্যালেঞ্জ করতে জানে---- সময় বিশেষে স্বামী আর সৎছেলের বাক্যযন্ত্রণা কুলসুমকে প্রতিবাদী করে, তখন বাড়ির পুরুষরা তাকে ঘাঁটাতে সাহস পায় না, ফুলজানকে তো তার বাবা ভয়ই করে, শরাফত মন্ডলের দ্বিতীয় বিবি তার সতীনের কটুকাটব্যে এমন পোক্ত জবাব দেয় যে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই সাব্যস্ত হয় না। তাই "খোয়াবনামা" উপন্যাসের প্রকৃত খোয়াব লব্ধ হতে পারে ভবিষ্যতেই। শরাফত মণ্ডল, হরমতুল্লা, কালাম মাঝি, এমনকি মুসলিম লিগের আন্দোলনে যারা জড়িত , ঘোলাজলে যারা দিব্যি মাছ ধরে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত , সাধারণ মানুষের মাথায় যারা কাঁঠাল ভেঙে খাচ্ছে তাদের স্বপ্ন কোনো স্বপ্নই নয়। তারা শুধু নিজের লোভের পেছনে ছুটছে। ইতিহাস তাদের ধ্বজা বইবে না। ইতিহাস ধ্বজা বইবে তাদেরই যারা নিজের শ্রমটুকু সম্বল করে উপযুক্ত রাজনৈতিক নেতার সামর্থ্যে জনগণের বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। দুর্ভাগ্যবশত "খোয়াবনামা" র কালে সেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব উপলব্ধ নয়। কিন্তু আজ নেই বলে ভবিষ্যতেও থাকবে না---- পৃথিবীর ইতিহাস কী তা বলে? আগে বলা কথাটার পুনরুক্তি করেই বলি, এই উপন্যাসের গড়নটা এতোই জটিল এবং অনেক সময়েই পাঠককে বিপথে পরিচালিত করে। লেখক যেন ইচ্ছে করেই এক গোলকধাঁধা র খেলা খেলতে বসেছেন পাঠকের সঙ্গে। "খোয়াবনামা" উপন্যাসটি যদি পরাজয়ের কাহিনিমাত্র হত তাহলে গ্রামের খুন, জখম, দাঙ্গা , মুসলিম লিগ প্রমুখ রাজনৈতিক দলগুলির ধাপ্পাবাজি পাঠককে বিষন্ন করত, রেলের এ কামরা থেকে ও কামরায় পুলিশের নজর থেকে তমিজের পালিয়ে একটা ব্যর্থতার লাঞ্ছন এঁকে দিত পাঠকের হৃদয়ে--- কিন্তু তা তো করছে না। বরং একটা দিনবদলের নকীবকেই দেখি আমরা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মধ্যে।
