Published : 07 Aug 2026, 11:19 PM
মোটা দাগে আমরা এতদিন এটাই জেনে এসেছি যে স্পানঞার দুই মহান প্রতিভা যথাক্রমে হুয়ান রামোন হিমেনেস ও অর্তেগা ই গাসেৎকে রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ করেছিলেন তাঁর প্রাচ্যরূপের বিশ্বজনীনতা দিয়ে। কিন্তু এরা ছাড়াও আরও অনেকেই ছিলেন যারা রবীন্দ্রনাথের সাথে পরোক্ষে যুক্ত হয়েছিলেন যেমন চলচ্চিকার লুইস বুনুয়েল ও কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা; অবশ্য এই যুক্ততা ছিলো মূলত রবীন্দ্রনাথের একটি নাটকের কুশীলবের ভূমিকায় অভিনয়ের সূত্রে। স্পানঞল সাহিত্যের পরবর্তী ইতিহাসের দিকে তাকালে এখন আমরা বলতে পারি হুয়ান রামোনের মাধ্যমে সেটা ছিল ভারতীয় সূর্যোদয়ের সূচনা মাত্র।
হিমেনেস-পরবর্তী প্রজন্মের কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথকে কীভাবে নিচ্ছেন তার ধারাবাহিক ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাবো উনিশ শতকের স্পানঞল সাহিত্যের আধুনিকতাবাদ(Modernismo)-এর শেষ থেকে (মানুয়েল মাচাদো) যে রাবীন্দ্রিক বিকীরণের শুরু হয়েছে তা ক্রমশঃ ‘৯৮-এর প্রজন্ম’(La Generacion del 98)-এর শীর্ষ ব্যক্তিত্বকে (আন্তোনিও মাচাদো) ছুঁয়ে বিশ শতকের স্পানঞল গীতিকবিতার চূড়াকে স্পর্শ (অর্থাৎ হুয়ান রামোন হিমেনেথ) করে ‘প্রজন্ম ২৭’(La Generacion del 27)-এর আরেক শীর্ষে (রাাফায়েল আলবোর্তি) এসে ছড়িয়ে পড়েছিল। ঐ গীতিকবিতার ( Lirico) যুগেই সংঘটিত হয়েছিলো পাশাপাশি উইদোব্রোর ‘সৃজনবাদ’(Creacinismo) আর অন্যটি হচ্ছে ‘উল্ত্রাবাদ’(Ultraismo)-এর যার নেতৃত্বে ছিলেন রাফায়েল কানসিনোস আসসেন্স। উল্ত্রাবাদের সঙ্গে ১৮ বছরের তরুণ বোর্হেসও জড়িত ছিলেন। অন্যদিকে ‘সৃজনবাদ’-এর সাথে উল্লেখযোগ্য অন্য যে দুজন কবি ছিলেন তারা হলেন হুয়ান লাররেরা এবং হেরার্দো দিয়েগো। রবীন্দ্রসূত্রে স্পানঞল সাহিত্যের বিশ শতকের প্রথম দিককার এই আন্দোলনগুলোর উল্লেখ করতে হলো দুটো কারণকে স্পষ্ট করে তোলার জন্য। এক. ভ্যানগার্ড বলতে যা বুঝায় রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে তাকে কখনোই তীব্রতার সঙ্গে ঘোষণা যেমন করেননি, তেমনি সাহিত্যের আন্দোলনের সামগ্রিক সুফল ও মর্মার্থ নিয়েও খুব একটা আগ্রহও দেখাননি। তা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ স্পানঞার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সাহিত্যিক আন্দোলনকে ছুঁয়ে গেছেন। ‘ছুঁয়ে গেছেন’ বলতে আন্দোলনকারীদের কাউকে কাউকে বুঝাতে চাইছি। দুই. এসব আন্দোলনের সবাই যে একই রকম সাড়া দিয়েছিলেন তাঁর প্রতি--তা-ও নয়, যেমন সৃজনবাদের উইদোব্রো যদি হয়ে থাকেন রবীন্দ্রনাথের প্রতি বীতরাগ, অন্যদিকে হেরার্দো দিয়েগোর ছিল অনুরাগ। একই রকমভাবে ‘উল্ত্রাবাদ’(Ultraismo)-এর রাফায়েল কান্সিনোস্ আসসেন্স ছিলেন রবীন্দ্রনাথের অনুরাগী, কিন্তু তাঁরই শিষ্য বোর্হেস ছিলেন তাঁর বিপরীত। কৌতুককর হলেও সত্য এই যে অম্ল-মধুর দ্বৈততার পথ ধরেই রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে গিয়েছিলেন রাফায়েল আলবের্তি পর্যন্ত। আলবের্তির কথা বলছি এই জন্য যে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত স্পানঞার কবিদের মধ্যে তিনিই সর্বশেষ যিনি রবীন্দ্রনাথের প্রতি সাড়া দিয়েছিলেন। তবে খ্যাতি ও প্রতিভার উচ্চতাকে বিবেচনায় না রাখলে পরবর্তীকালে স্পানঞার আরও অনেক লেখককেই পাওয়া যাবে এক দীর্ঘ তালিকায়; তাঁদের মধ্যে অধ্যাপক অনুবাদকই বেশি যারা নানা সূত্রে নানাভাবে সাড়া দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের প্রতি। মজার ব্যাপার এই যে, রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায়ই আলবের্তি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন। আর সেই কবিতা, যদিও বর্ণাশ্রয়ী (বর্ণমালা অর্থে) কিন্তু তা ছিল বর্ণে রঞ্জিত। অর্থাৎ এক কবি ছবি আঁকছেন বর্ণমালার সাহায্যে কিংবা উল্টো করে বলা যায় এক চিত্রশিল্পী কবিতা লিখছেন রংয়ের সাহায্যে। ফলে কবিতাটি রবীন্দ্রবিষয়ক হওয়ার কারণে যেমন আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রং ও বর্ণের সহাবস্থানের শিল্পকৌশলের কারণেও ভীষণ তাৎপর্যময়।
কবিতাটি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত বলার আগে দেখা যাক আলবের্তি আসলে কী লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এই কবিতাটিতে:
রবীন্দ্রনাথের প্রতি
আমাকে আঁকতে দাও
প্রতিটি মানচিত্রের সমুদ্রকে নীলে!
ইতিমধ্যে,আমাকে জানাও সম্ভাষণ
জলের উপর ভোরের উদ্দেশ্যে গান গেয়ে,
তালগাছের পাখি হয়ে,
বঙ্গোপসাগরে চোখ রেখে।
A Tagore
!Dejadme pintar de azul
el mar de todos los atlas!
Mientras, salúdame tú,
cantando al alba del agua,
pájaro en una palmera
que mire al mar de Bengala.
কবিতাটি আয়তনে ছোট্ট হলেও- নানামুখী তাৎপর্যের বিপুলতার কারণে এই ছোট্ট আয়তনকে তা কীভাবে অতিক্রম করে গেছে সেটা লক্ষ্য করা যাক।
কবিতা-প্রেমিক বাঙালি পাঠকদের কাছে রাফায়েল আলবের্তিকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার মাসির গল্প না ফেঁদে প্রাসঙ্গিক কয়েকটি তথ্য স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। মাচাদো, হিমেনেস ও লোরকা-পরবর্তী রাফায়েল আলবের্তির এই কবিতাটি কবে লিখিত হয়েছিলো তা জানা না থাকলেও এটুকু নিশ্চিত করে বলা যায়, কোনোভাবেই তা ১৯২৪ সালের পরে হবার কথা নয়। কারণ যে গ্রন্থে এটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল সেটি বেরিয়েছিল ১৯২৪ সালে, রাফায়েল আলবের্তির সবচেয়ে প্রশংসিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ মর্ত্যের নাবিক (Marinero en la tierra)-এ। সহজেই অনুমান করা যায় যে গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হওয়ারও অন্তত ২/১ বছর আগে এটি লিখিত হয়েছিল। এমনকি আরও আগেও হতে পারে। রচনাকাল যদি ১৯২০ ( ‘১৯২০’ সাল থেকে শুরু করার কারণ এ বছর থেকেই তার কবিতা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে শুরু করে।) থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত অনুমান করে নেই, তাহলে দেখতে পাবো যে এই সময়টাই ছিল স্পানঞল সাহিত্যে সেনোবিয়া হিমেনেস কর্তৃক রবীন্দ্র-প্লাবনের তুঙ্গ মুহুর্ত, কারণ ১৯১৫ সাল থেকে--মাঝে দু এক বছরের ব্যবধানে--১৯২২ সাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের প্রায় ২২টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিলো। কোনো বছর তিন থেকে চারটি বইও বেরিয়েছে। আর বেরিয়েছিলো মূলত মাদ্রিদ থেকেই। সন্দেহ নেই যে এই প্লাবন আলবের্তির সৃষ্টিশীল চিত্তকে স্পর্শ করে গেছে। সেই স্পর্শেরই স্মারকচিহ্ন রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশ্যে নিবেদিত তাঁর ঘনীভূত উপলব্ধির তাৎপর্যপূর্ণ এই কবিতাটি। তাৎপর্যপূর্ণ এই অর্থে যে ১৯১৫ সাল থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত স্পানঞার শীর্ষস্থানীয় লেখকদের কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথকে গদ্যের স্বভাবসুলভ বিস্তারিত প্রকরণে বরণ করে নিলেও কাব্যের ঘনীভুত ভাষার সংকেতে কেবল দুজন কবি তুলে নিয়েছিলেন যাদের একজন আন্তানিও মাচাদো, অন্যজন আলবের্তি। ভুলে যাচ্ছি না যে হিমেনেসকৃত অনুবাদগুলোতে যে ভূমিকাগুলো যুক্ত হয়েছিল তা ছিল কবিতারই আদল। কিন্তু এই ভূমিকাকে অনুবাদকেরই সম্প্রসারণ ও কৈফিয়ত হিসেবে দেখলে আলবের্তিকে অন্যতম বলে বিবেচনা করা ছাড়া উপায় নেই। এই কবিতার রাজনৈতিক তাৎপর্যের দিকটিও আমাদের সামনে উন্মোচিত হওয়া দরকার এই কারণে যে আলবের্তি, যিনি মর্ত্যের নাবিক প্রকাশের ছয় বছর পর, স্পানঞার ‘সাম্যবাদী দল’ (Partido Comunista)-এর সদস্যপদ গ্রহণ করবেন। সত্য বটে, তিনি সাম্যবাদী হওয়ার আগেই এই কবিতাটি লিখেছিলেন, কিন্তু এ-ও সত্য যে সাম্যবাদী হওয়ার কারণে তিনি পরবর্তী কোনো সংস্করণ থেকেই এই কবিতাটিকে কখনো বর্জন করেন নি বা পরিবর্তন করেন নি। অর্থাৎ তাঁর সাম্যবাদী মন রবীন্দ্রনাথসম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গীকে বদলাবার ক্ষেত্রে কোনো তাগিদ দেয়নি। যদিও তাঁর লেখক ও শিল্পী বন্ধুদের কেউ কেউ, স্মরণ করা যাক মেহিকোর দিয়েগো রিবেরার কথাই, যিনি তীব্র বিরাগের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে কৌতুককর অমর্যদায় চিত্রায়িত করেছেন। চিত্রশিল্পের প্রতি তার আবাল্য অনুরাগ ও বন্ধুত্বের সূত্রে রিবেরার এই প্রত্যাখান তিনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করে থাকবেন। রিবেরা ছাড়াও, রবীন্দ্রনাথের প্রতি উইদোব্রোর তাচ্ছিল্য, বোর্হেসের কটুক্তি এবং আরও কারোর কারোর অবমূল্যায়ন আলবের্তিকে তাঁর রবীন্দ্র-অবস্থান থেকে চ্যুত করতে পারেনি। এটা ভাবলে বেশ কৌতুককরই মনে হয় যে এক মহাদেশের এক সাম্যবাদী শিল্পীর রংয়ের চাপাতি দ্বারা জখম হলেও, অন্য মহাদেশের আরেক সাম্যবাদী কবির বর্ণমালায় সশ্রদ্ধ অনুরাগে গৃহীত হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। সাম্যবাদী মনের বহু বর্ণ আমাদেরকে কেবল এ কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় যে সাম্যবাদী মনের উদারতা যেমন আছে, তেমনি আছে তার অনুদার রূপও; ব্যক্তিভেদে তার অভিব্যক্তি ভিন্ন হতে বাধ্য। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও হয়েছে তা-ই।
তৃতীয় তাৎপর্যের দিকটিও আমাদের কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আলবের্তি, সবাই জানেন, তিনি হতে চেয়েছিলেন চিত্রশিল্পী; শব্দের জগতে প্রবেশের আগে বর্ণই ছিল তাঁর সৃষ্টিশীল সত্তার মাতৃভূমি। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে ঘটেছিল ঠিক উল্টোটাই। যদিও দু’জনের কেউ-ই দুই জগতের কোনোটাকেই পুরোপুরি তালাক দেননি; বরং পরস্পর প্রবহমান ছিল। রবীন্দ্রনাথকে নিবেদিত কবিতায় আলবের্তি যেন অবচেতনে এই দুই জগতকে একাকার করে রবীন্দ্রনাথকে বরণ করে নিয়েছিলেন।