১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

তসলিমা নাসরিন: উত্থান, নির্বাসন, নতুন বিতর্ক ও প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন

তসলিমার এই অবস্থার জন্য শুধু একটি সরকার বা একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে দায়ী করা যায় না। ১৯৯৪ সালে তিনি দেশ ছাড়েন। এরপর বাংলাদেশে একাধিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে। বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং সামরিক-সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার—কেউই তার স্বাভাবিক প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম করেনি। ফলে এটি কোনো একক সরকারের ব্যর্থতা নয়; বরং রাষ্ট্রের ধারাবাহিক রাজনৈতিক সংকোচের একটি উদাহরণ।

মজিদ মাহমুদ মজিদ মাহমুদ

Published : 01 Aug 2026, 01:35 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:46 PM

তসলিমা নাসরিনের সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক পরিচিতি এমন এক সময়ে বিস্তৃত হয়, যখন ভারতীয় উপমহাদেশে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিও নতুনভাবে শক্তিশালী হচ্ছিল। আমার কাছে এই দুটি সমান্তরাল বাস্তবতার মধ্যে একটি রাজনৈতিক সম্পর্কের ইঙ্গিত রয়েছে, যদিও এটিকে সরল কারণ-সম্পর্ক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। দীর্ঘ নির্বাসনের পর ভারতে তার নতুন স্বীকৃতিও সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোচনাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। এই দুই ঘটনার মধ্যে সরল কারণ-সম্পর্ক টানা না গেলেও, তাদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে আলাদা করে দেখাও সহজ নয়।

আমি তার লজ্জা উপন্যাসটি প্রকাশের সময়ই পড়েছিলাম। সাহিত্যিক বিচারে এটি আমার কাছে খুব শক্তিশালী উপন্যাস বলে মনে হয়নি। বিষয় এবং শিল্পরীতির মধ্যে একটি অসামঞ্জস্য ছিল। চরিত্র, ভাষা ও আখ্যানের গভীরতার তুলনায় বক্তব্যই সেখানে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে উপন্যাসটি সাহিত্যকর্মের চেয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের উপাদান হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। একই সঙ্গে বিষয়টির ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং সময়ের রাজনৈতিক অভিঘাত উপন্যাসটিকে সাহিত্যিক সীমাবদ্ধতার চেয়েও বেশি আলোচিত করে তুলেছিল।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু ধর্মীয় বক্তাও এই বই এবং তসলিমার অন্যান্য লেখাকে নিজেদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। বিশেষ করে নারীর প্রতি ধর্মীয় ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে লেখা তার কলামগুলোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ওয়াজ-মাহফিলে তাকে আক্রমণের বিষয় বানানো হয়। এর ফলে যেমন তসলিমা নাসরিনের পরিচিতি বেড়েছে, তেমনি কিছু বক্তার জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে এটাও বলা অন্যায় হবে যে, তসলিমার সেই লেখাগুলোর কোনো মূল্যই ছিল না। আমাদের সমাজে নারী তো বটেই, অনেক দুর্বল পুরুষও সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় সহিংসতার শিকার হন। সেই বাস্তবতার কিছু দিক তিনি তুলে ধরেছিলেন। তার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা স্বাভাবিক; কিন্তু সেই দ্বিমত কখনোই সহিংসতা, প্রাণনাশের হুমকি, দেশত্যাগে বাধ্য করা বা একজন নাগরিকের চলাফেরার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার যৌক্তিকতা তৈরি করে না।

যাদের কাছে তার লেখা আপত্তিকর বা ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিপন্থী মনে হয়েছে, তারা যুক্তি দিয়ে তার জবাব দিতে পারতেন। অথবা সম্পূর্ণ উপেক্ষাও করতে পারতেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, তার লেখাগুলো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সমর্থকদের চেয়ে বিরোধীদের ভূমিকাই বেশি ছিল। ধর্মীয় বক্তারা নিজেদের বক্তব্যে বারবার তার লেখা উদ্ধৃত না করলে অধিকাংশ মানুষের এগুলো পড়ার বা জানারও প্রয়োজন হতো না।

আমার পর্যবেক্ষণে, এ ধরনের বক্তৃতার উদ্দেশ্য কেবল তসলিমার সমালোচনা ছিল না; বরং শ্রোতাদের আবেগকে উত্তেজিত করা, তাদের একটি নির্দিষ্ট মানসিক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া এবং সেই আবেগের ওপর নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা। ফলে তসলিমা নাসরিন ব্যক্তি হিসেবে যতটা আলোচিত হয়েছেন, তার চেয়েও বেশি তিনি একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছেন—যাকে ঘিরে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করার সুযোগ পেয়েছে।

অথচ ধর্মীয় আলোচনার মূল বিষয় হওয়া উচিত ছিল ইসলামের মানবিকতা, ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা, ত্যাগ এবং নারীর মর্যাদা। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে সেই জায়গা দখল করে নেয় সমকালীন বিতর্ক, শাস্তি, পোশাক, যৌনতা এবং বিভাজনের প্রশ্ন। ফলে ধর্মীয় আলোচনাও ধীরে ধীরে সমাজ-রাজনীতির তাৎক্ষণিক উত্তেজনার অংশ হয়ে ওঠে।

এ কারণেই প্রশ্ন আসে—কেন তসলিমা নাসরিন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন? সমাজ কি এমন একটি প্রতীকের অপেক্ষায় ছিল, নাকি তিনিও সচেতনভাবে সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই।

আমি অবশ্যই বলতে চাই না যে, লজ্জার মতো একটি উপন্যাস লেখা অন্যায়। একজন লেখক যে কোনো বিষয় নিয়েই লিখতে পারেন। কিন্তু যখন একটি উপন্যাসে শিল্পের তুলনায় বক্তব্য মুখ্য হয়ে ওঠে এবং সাহিত্যিক নির্মাণের চেয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির প্রবণতা বেশি দৃশ্যমান হয়, তখন তার সাহিত্যমান নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। আমার পাঠ-অভিজ্ঞতায়, লজ্জা সেই প্রশ্ন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়।

তসলিমা নাসরিনের দেশত্যাগ বা নির্বাসনের তিন দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু আজও তিনি স্বাভাবিকভাবে নিজের দেশে ফিরতে পারেননি। আমার কাছে দেশত্যাগ বা নির্বাসন পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন শাস্তিগুলোর একটি। অনেক সময় এটি মৃত্যুদণ্ডের চেয়েও নির্মম। মৃত্যুদণ্ড রাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী কার্যকর হয়; কিন্তু নির্বাসন একজন মানুষকে তার জন্মভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি এবং স্বাভাবিক নাগরিক জীবনের বাইরে ঠেলে দেয়। একজন লেখকের ক্ষেত্রে এই শাস্তি আরও গভীর, কারণ তার সৃজনশীলতার প্রধান উৎসই তার ভাষা ও সমাজ।

বাংলা ভাষায় প্রচলিত ‘জ্বালাতন’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি নিয়ে একটি প্রচলিত মত রয়েছে যে, এটি আরবি ‘জালাওয়াতুন’ (নির্বাসন বা বিতাড়ন) শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত। ব্যুৎপত্তিগত বিতর্ক যাই থাক, নির্বাসনের অভিজ্ঞতা যে গভীর মানসিক যন্ত্রণার নাম—তাতে সন্দেহ নেই। আসলে একজন মানুষের জন্য নিজের জন্মভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা শুধু ভৌগোলিক দূরত্ব নয়; এটি স্মৃতি, পরিচয় ও আত্মপরিচয়েরও এক দীর্ঘ সংকট।

তসলিমার এই অবস্থার জন্য শুধু একটি সরকার বা একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে দায়ী করা যায় না। ১৯৯৪ সালে তিনি দেশ ছাড়েন। এরপর বাংলাদেশে একাধিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে। বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং সামরিক-সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার—কেউই তার স্বাভাবিক প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম করেনি। ফলে এটি কোনো একক সরকারের ব্যর্থতা নয়; বরং রাষ্ট্রের ধারাবাহিক রাজনৈতিক সংকোচের একটি উদাহরণ।

বিশেষত তসলিমা নির্বাসনের পরে দুই মেয়াদে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ এককেন্দ্রিক ক্ষমতায় আসীন ছিল। দলটি নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ধারক হিসেবে উপস্থাপন করত। সেই কারণেই প্রশ্ন ওঠে—দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকেও তারা কেন তসলিমা নাসরিনের দেশে ফেরার বিষয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিল না? এর রাজনৈতিক ব্যাখ্যা অবশ্যই থাকতে পারে; তবে প্রশ্নটি অমূলক নয়।

ভারতেও তার অবস্থান সবসময় স্থিতিশীল ছিল না। কলকাতায় দীর্ঘদিন বসবাসের পর তাকে শেষ পর্যন্ত দিল্লিতে চলে যেতে হয়। এর পেছনে নিরাপত্তা, রাজনীতি ও প্রশাসনিক বাস্তবতার নানা ব্যাখ্যা রয়েছে। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, ভারতও তাকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবন দিতে পারেনি। তিনি নিরাপদ ছিলেন, কিন্তু স্থায়ীভাবে স্বস্তিতে ছিলেন—এ কথা বলা কঠিন।

নির্বাসনের শুরুতে হয়তো তসলিমা নাসরিনেরও বিশ্বাস ছিল যে, আন্তর্জাতিক পরিসরে তার সাহিত্য নতুন পাঠক পাবে এবং তিনি বিশ্বসাহিত্যে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশা শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পায়নি।

এর একটি কারণ ভাষা। বাংলা ভাষায় জনপ্রিয় হওয়া আর বিশ্বসাহিত্যে প্রতিষ্ঠা পাওয়া এক বিষয় নয়। অনুবাদ, নতুন পাঠক, ভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট এবং উচ্চতর সাহিত্যিক নির্মাণ—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন একটি দীর্ঘ ও কঠিন প্রক্রিয়া।

আরেকটি কারণ সাহিত্য নিজেই। কোনো লেখক যদি প্রতিদিনের রাজনৈতিক বা সামাজিক ঘটনাকে গভীর শিল্পে রূপ দিতে না থাকেন, তাহলে সেই রচনা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার তাৎক্ষণিক গুরুত্ব হারায়। স্থানীয় বিতর্ক আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে দীর্ঘকাল প্রাসঙ্গিক থাকে না; কিন্তু শিল্পে উত্তীর্ণ সাহিত্য সময় ও ভূগোল অতিক্রম করে টিকে থাকে।

আমার পাঠ-অভিজ্ঞতায়, তসলিমা নাসরিনের রচনায় সেই সাহিত্যিক শক্তি ধারাবাহিকভাবে দেখা যায়নি। তিনি একজন আলোচিত লেখক হয়েছেন, কিন্তু আলোচিত হওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী সাহিত্যিক স্বীকৃতি অর্জন এক বিষয় নয়। বিতর্ক একজন লেখককে দ্রুত পরিচিতি এনে দিতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সাহিত্যিক মর্যাদা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে শিল্পের শক্তির ওপর।

এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে, তার লেখার কোনো গুরুত্ব ছিল না। বরং তিনি একটি সময়ের সামাজিক বাস্তবতা, নারীর অবস্থান এবং ধর্মীয় রক্ষণশীলতার কিছু দিককে সামনে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু সামাজিক গুরুত্ব এবং সাহিত্যিক সাফল্য সব সময় একই জিনিস নয়। কোনো লেখা সমাজে তীব্র আলোড়ন তুলতে পারে, অথচ সাহিত্য হিসেবে সীমাবদ্ধও হতে পারে। আমার কাছে তসলিমা নাসরিনের রচনার মূল্যায়ন এই দুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থানে।

এই কারণেই আমার মনে হয়, তসলিমা নাসরিনকে বিচার করার ক্ষেত্রে দুটি বিষয়কে আলাদা রাখা জরুরি। একদিকে রয়েছে তার সাহিত্য; অন্যদিকে একজন নাগরিক হিসেবে তার অধিকার। সাহিত্য নিয়ে কঠোর সমালোচনা করা যায়, তার বইকে দুর্বল বলা যায়, তার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা যায়। কিন্তু এসবের কোনোটিই একজন নাগরিককে অনির্দিষ্টকালের জন্য নির্বাসনে রাখার নৈতিক বা গণতান্ত্রিক ভিত্তি হতে পারে না। একটি রাষ্ট্রের শক্তি প্রকাশ পায় তার সমালোচকদের প্রতি আচরণে, শুধু সমর্থকদের প্রতি নয়।

দীর্ঘ নির্বাসনের পর সাম্প্রতিক সময়ে তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে মনে করেন, ভারতে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি তার জন্য তুলনামূলকভাবে অনুকূল হয়েছে। এটিকে কেউ রাজনৈতিক স্বীকৃতি বলেন, কেউ কৃতজ্ঞতার প্রকাশ, আবার কেউ নিছক বাস্তব রাজনীতির ফল বলে মনে করেন। এসব ব্যাখ্যার কোনটি পুরোপুরি সঠিক, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে এটুকু বলা যায়, রাজনৈতিক শক্তিগুলো প্রায়ই কিছু ব্যক্তিকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের একটি নির্দিষ্ট ভাবমূর্তি নির্মাণ করতে চায়।

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বক্তব্য এবং ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু তার সাহিত্য নয়; বরং তার জন-ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক অবস্থান। ফলে আজকের তসলিমা নাসরিনকে বোঝার জন্য শুধু নব্বইয়ের দশকের প্রেক্ষাপট যথেষ্ট নয়; তার বর্তমান অবস্থান ও প্রকাশ্য বক্তব্যগুলোকেও বিবেচনায় নিতে হয়।

তসলিমা নাসরিনের ক্ষেত্রেও আমার আপত্তির জায়গা মূলত সাহিত্য বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নয়; বরং তার বক্তব্য ও ব্যক্তিগত আচরণের মধ্যে যে অসামঞ্জস্য বহুবার দেখা গেছে, সেটি। আত্মজীবনীমূলক লেখাগুলোতে তিনি ব্যক্তিগত সম্পর্কের এমন অনেক বিবরণ প্রকাশ করেছেন, যা নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক হয়েছে। একজন লেখকের ব্যক্তিজীবন অবশ্যই তার নিজস্ব বিষয়; কিন্তু যখন সেই ব্যক্তিজীবনই ধারাবাহিকভাবে সাহিত্যিক উপকরণে পরিণত হয় এবং অন্যদেরও বিতর্কের মধ্যে টেনে আনে, তখন সমালোচনার সুযোগ তৈরি হয়। এই সমালোচনা অবশ্যই সাহিত্যিক ও নৈতিক; এর সঙ্গে রাষ্ট্রের আচরণের কোনো সম্পর্ক নেই।

এই কারণেই আমি সাহিত্যিক মূল্যায়ন এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নকে একসঙ্গে মিশিয়ে দেখতে চাই না। একজন লেখকের বই দুর্বল হতে পারে, তার মতামত ভুল হতে পারে, এমনকি তার ব্যক্তিগত আচরণ নিয়েও কঠোর সমালোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু এসবের কোনোটিই তাকে নিজের দেশ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিচ্ছিন্ন রাখার ন্যায্যতা সৃষ্টি করে না।

বিষয়টি মূলত রাষ্ট্রের নৈতিকতার প্রশ্ন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি প্রকাশ পায় এইখানে যে, সে তার সমর্থকদের মতো সমালোচকদেরও সমান আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে পারে কি না। রাষ্ট্র যদি কোনো লেখকের বক্তব্যের বিচার জনতার আবেগের ওপর ছেড়ে দেয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রেরই নৈতিক ভিত্তি।

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে যে বিতর্ক চলেছে, তা কেবল একজন লেখককে নিয়ে নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্ম, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও একটি আয়না। এই বিতর্কে যেমন তসলিমার অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়ে, তেমনি প্রশ্নের মুখে পড়ে রাষ্ট্রের সহনশীলতা, সমাজের আত্মবিশ্বাস এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপক্বতাও।

পরিশেষে বলতে চাই, তসলিমা নাসরিনকে দেশে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া উচিত। যদি তার বিরুদ্ধে কোনো আইনগত অভিযোগ থাকে, তাহলে সেটি আদালতে নিষ্পত্তি হোক। রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচার হোক, এবং আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হোক। কিন্তু যদি তার বিরুদ্ধে এমন কোনো কার্যকর আইনগত বাধা না থাকে, তাহলে একজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে তার দেশে ফিরে আসার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।