০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

বাংলা গানের ধারাবাহিক ইতিহাস: বাংলা গানে অতুলপ্রসাদ

গোলাম মুরশিদ

Published : 11 Dec 2020, 11:59 AM

Updated : 23 Jun 2022, 03:58 PM

পঞ্চকবির গান বলে একটা জনপ্রিয় কথা আছে। এই পঞ্চকবি হলেন রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ আর নজরুল ইসলাম। এঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের জন্ম সবার আগে—১৮৬১ সালে। ১৮৬৩ সালে জন্ম দ্বিজেন্দ্রলালের, ১৮৬৫ সালে রজনীকান্তের, ১৮৭১ সালে অতুলপ্রসাদের আর সবশেষে—১৮৯৯ সালে—নজরুলের। এঁরা সবাই কবি এবং তাঁদের গানগুলো তাঁরা নিজেরাই রচনা করেন। সুরও দেন তাঁরা। অবশ্য নজরুল তাঁর দু-তিন শো গানে নিজে সুর দেওয়ার সময় পাননি। অন্যদের বলেছিলেন সুর দেওয়ার জন্যে।
এই পাঁচজনই গায়ক। যদিও তাঁরা নিজেরা বেশি গান করেননি, বিশেষ করে রেকর্ডে। রজনীকান্ত সম্ভবত রেকর্ডে কোনো গানই করেননি। কারণ তিনি যখন অকালে মারা যান, তখন রেকর্ড করার প্রযুক্তি ছিলো তার শৈশবে। তা ছাড়া, তিনি থাকতেনও কলকাতা থেকে দূরে। নয়তো তিনি ভালো গাইতেন বলে অনেকেই লিখেছেন।
এঁদের যুগ শেষ হবার পর গান রচনার কলাকৌশল ভাগ হয়ে যায়। যাঁরা গান লিখতেন, তাঁরা সুরকার অথবা গায়ক নন। যাঁরা গানে সুর দিতেন, তাঁরা কবি নন—গান লিখতে পারতেন না। তাঁরা অন্যের লেখা গানে সুর দিতেন। আর যাঁরা গাইতেন, তাঁরা সুর দিতেন না, অথবা গান লিখতেও পারতেন না। ব্যতিক্রম ছিলো বৈকি! যেমন, পঙ্কজ মল্লিক প্রধানত পরিচিত গায়ক হিসেবে। কিন্তু তিনি সুরকারও ছিলেন। বহু গানে সুর দিয়েছিলেন, সিনেমার সংগীত পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। একই কথা প্রযোজ্য শচীনদেব বর্মণ এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে। কী, ধরা যাক, কমল দাশগুপ্ত। তিনি পরিচিত প্রধানত সুরকার হিসেবে। কিন্তু তিনি বহু গান গেয়েছেনও।

বস্তুত, বাংলা গানের জগতে পঞ্চকবির সবাই সমান অবদান রাখেননি বা রাখতে পারেননি। কেবল গানের সংখ্যা দিয়ে গানের ইতিহাসে একজনের অবদান বিচার করা যায় না। যাঁরা গানের ইতিহাসে নতুন আঙ্গিক প্রবর্তন করেছেন অথবা সুর-ধারার মোড় ফিরিয়েছেন, তাঁর আগে ছিলো না, এমন পথ দেখিয়েছেন, সেই নতুন পথে মাইল-ফলক তৈরি করেছেন, তেমন ব্যক্তিই গানের ইতিহাসে জায়গা পেতে পারেন। আমার ধারণা, এই মানদণ্ড দিয়ে বিচার করলে রজনীকান্ত বাংলা গানের ইতিহাসে পঞ্চকবির অন্যতম বলে বিবেচিত হতে পারেন না।


ব্যক্তিগত জীবনে রজনীকান্ত সেন বারবার আঘাতে বিধ্বস্ত হয়েছেন। মৃত্যু এসে বারবার তাঁর পরিবারের ওপর হানা দিয়েছে। এমন কি, তিনি নিজেও স্বল্পায়ু ছিলেন, তিনি মারা যান মাত্র ৪৫ বছর বয়সে। যথেষ্ট লেখার অথবা যথেষ্ট সংগীত চর্চার সময় ও সুযোগ তিনি পাননি। কিন্তু অল্পকালের মধ্যে তিনি অনেকগুলো সাদামাটা গান রচনা করেছিলেন, যা তাদের সরলতা এবং আন্তরিকতার জন্যে মনের ওপর গভীর দাগ কেটে যায়। যেমন, 'তুমি নির্মল কর মঙ্গল কর মলিন মর্ম মুছায়ে।' এ গানটি আঙ্গিক বিচারে কুলীন নয়, সুরের বিচারেও অভিজাত নয়—অতিব্যবহৃত ভৈরবী সুরে গাওয়া। তা সত্ত্বেও, এ গানটি শোনেনি, শিক্ষিতদের মধ্যে এমন লোক কমই আছে। তাঁর গান প্রার্থনার মতো। 'ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়', 'আমি অকৃতী বলেও তো কিছু কম করে মোরে দাও নি', 'আমি তো তোমারে চাহিনি জীবনে', 'কবে তৃষিত এ মরু ছাড়িয়া যাইব তোমারি রসাল নন্দনে' ইত্যাদি গানের কথাও এ প্রসঙ্গে মনে করা যেতে পারে।
রজনীকান্ত দেশাত্মবোধক গান খুব বেশি লেখেননি, কিন্তু কোনো কোনো গান এক শতাব্দী পরে এখনো স্মরণযোগ্য, এখনো প্রাসঙ্গিক। স্বদেশী আন্দোলনের সময় রচিত তাঁর 'মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই' গানটি এখনো জনপ্রিয়। বিস্মিত হতে হয় যখন দেখি রজনীকান্ত তাঁর দুঃখভরা জীবনে বেশ কয়েকটা হাসির গানও রচনা করেছিলেন।

অতুলপ্রসাদের জীবনও ছিলো দুঃখভরা। তবে তাঁর দুঃখের কারণ আলাদা। তাঁর পিতা ছিলেন ডাক্তার। তিনি মারা যান ১৮৮৪ সালে, অতুলপ্রসাদের বয়স যখন তেরো। আপাতদৃষ্টেতে মনে হয়, এর ফলে অতুলপ্রসাদের লেখাপড়া কিছু দিনের জন্যে ব্যাহত হয়। তারপর মা-সহ তাঁরা চার সন্তান আশ্রয় পান মাতামহ কালীনারায়ণ গুপ্তের কাছে। অতুলের সংগীত শিক্ষাও শুরু হয় পিতামহের কাছে। এনট্রেন্স পরীক্ষায় পাশ করেন একটু বেশি বয়সে—উনিশ বছরের সময়। এর পর তিনি লেখাপড়া শেখার জন্যে কলকাতায় যান। আশ্রয় পান মামার কাছে। কোন মামা জানা যায় না। তাঁর বড়ো মামা কেজি (কৃষ্ণগোবিন্দ) গুপ্ত ছিলেন বিখ্যাত আইসিএস কর্মকর্তা। ভারতবর্ষে দেশীয়দের মধ্যে সবার আগে আইসিএস হয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৮৬৪ সালে। আর কৃষ্ণগোবিন্দ বাঙালিদের মধ্যে পঞ্চম আইসিএস। তিনি আইসিএস হয়েছিলেন ১৮৭২ সালে। চাকরিতে সত্যেন্দ্রনাথের উন্নতি হয়েছিলো সামান্যই। অপর পক্ষে, একজন আইসিএস কর্মকর্তা যতো দূর ওপরে উঠতে পারেন, কেজি গুপ্ত ততো দূরেই উঠেছিলেন।
সে যাই হোক, অতুলপ্রসাদ লেখাপড়ার জন্যে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। কিন্তু সে কলেজের লেখাপড়া শেষ হবার আগেই—১৮৯২ সালে—তাঁর মামারা ঠিক করেন যে, অতুলপ্রসাদকে ব্যারিস্টারি পড়ার জন্যে ইংল্যান্ডে পাঠানো হবে। তাঁর খরচ জোগান কেজিগুপ্ত বাদে অন্য দুই মামা।
অতুলপ্রসাদ যখন বিলেতে লেখাপড়া করছিলেন তার শেষ দিকে, কেজিগুপ্ত সপরিবারে লম্বা ছুটি কাটাতে—ফার্লোতে—যান লন্ডনে। সেখানে অতুলপ্রসাদের সঙ্গে মামাতো বোন হেমকুসুমের ঘনিষ্ঠতা হয়। এক কথায়, তাঁরা প্রেমে পড়েন। পরের বছর—১৮৯৫ সালে—অতুলপ্রসাদ ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরে আসেন। প্র্যাকটিস শুরু করেন কলকাতা হাইকোর্টে। সেখানে তাঁর সিনিয়র ছিলেন সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন সিনহা, পরবর্তী কালে যিনি লর্ড সিনহা নামে পরিচিত হন। প্র্যাকটিসে তিনি বেশি জুৎ করতে পারেননি। তিনি তখন রংপুরে যান ভাগ্য পরীক্ষা করার জন্যে। সেখানেও সুবিধে করতে না-পারায় অল্পকালের মধ্যে তিনি আবার কলকাতায় ফিরে আসেন। লাখনৌয়ের দুই বন্ধুর পরামর্শে তিনি শেষ পর্যন্ত লাখনৌ গিয়ে ব্যারিস্টার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
ওদিকে, কলকাতায় থাকার সময়ে হেমকুসুমের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। তাঁরা দুজনই বিয়ে করার সংকল্প ঘোষণা করেন। কিন্তু সেকালে মামাতো, পিসতুত, মাসতুত ইত্যাদি ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভাইবোনদের মধ্যে বিয়ে হবার আইন ছিলো না। তা ছাড়া, তাঁদের গুরুজনরা কেউই এই প্রস্তাবে রাজি ছিলেন না। শেষে তাঁরা দুজন ১৯০০ সালে বিলেতে যান সেখানে গিয়ে বিয়ে করার জন্যে। কিন্তু সেখানেও কাজিনদের মধ্যে বিয়ের আইন ছিলো না। এ ধরনের বিয়ের আইন ছিলো একেমাত্র স্কটল্যান্ডের একটি গ্রাম্য চার্চে—গ্রেটা গ্রীনে। সেখানে তাঁদের বিয়ে হয়।
বিয়ের পর অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানোর জন্যে তাঁরা তখনই দেশে ফেরেননি। অতুলপ্রসাদ লন্ডনেই ব্যারিস্টার হিসেবে প্র্যাকটিস করতে আরম্ভ করেন। তাঁরা দু বছর লন্ডনে ছিলেন। তারপর দেশ ফিরে আসেন। ইতিমধ্যে তাঁদের দুটি যমজ পুত্রের জন্ম হয়েছিলো। তাদের মধ্যে একটি আবার সাত মাস বয়সে মারা যায়। কলকাতায় আত্মীয়দের কেউই অতুলপ্রসাদ-দম্পতিকে স্বাগত জানাননি। এই পরিস্থিতিতে তাঁরা লাখনৌ গিয়ে সেখানে আইন ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নেন এবং সাফল্য লাভ করেন।
আগেই বলেছি, অতুলপ্রসাদ পিতাকে হারান তেরো বছর বয়সে। তারপর এক অর্থে মা হেমন্তশশীকেও হারান উনিশ বছর বয়সে। তবে মা মারা যাননি, তিনি তখন চার সন্তানকে ফেলে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছিলেন। যাঁর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়, তিনি ব্রাহ্মসমাজের নাম-করা নেতা—দুর্গামোহন দাশ। তাঁর আর-এক পরিচয়, তিনি চিত্তরঞ্জন দাসের জ্যেঠা। এ নিয়ে অতুলপ্রসাদ এবং তাঁর তিন ছোটো বোনের অভিমান ও ক্ষোভ ছিলো মায়ের ওপর। কয়েক বছর পরে দুর্গামোহন দাশ মারা গেলে হেমন্তশশী লাখনৌ গিয়ে পুত্রের আশ্রয়ে ওঠেন।
এদিকে, স্ত্রী হেমকুসুম তাঁর শাশুড়িকে আদৌ সহ্য করতে পারতেন না। দুজনের তিক্ত সম্পর্ক নিয়ে সংসারে প্রায়ই অশান্তি হতো। কিন্তু মায়ের ওপর অভিমান থাকলেও তাঁর প্রতি অতুলপ্রসাদের ভক্তি ছিলো অবিচল। তিনি নতুন বাড়ি নির্মাণ করে তার নাম রাখেন মায়ের নামানুসারে। তাতে শাশুড়ির ওপর হেমকুসুমের বিদ্বেষ আরও বেড়ে যায়। এর কিছুদিন পরে তিনি বাড়ির একটি কক্ষে শাশুড়ির একটি তৈলচিত্র আবিষ্কার করেন। অবিলম্বে সেই চিত্রটি সরিয়ে ফেলার জন্যে তিনি স্বামীকে বলেন। কিন্তু অতুলপ্রসাদ ছবিটি সরাতে রাজি হননি। এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক আরও খারাপ হয়। অতঃপর হেমকুসুম লাখনৌয়ের অন্য একটি বাড়িতে উঠে যান। তবে মাঝেমধ্যে তিনি অল্প সময়ের জন্যে স্বামীর বাড়িতে আসতেন। আপাতদৃষ্টিতে দুজনের সম্পর্ক এতো তিক্ত হওয়া সত্ত্বেও, স্ত্রীর প্রতি অতুলপ্রসাদের প্রেম অক্ষুণ্ন থাকে।


দুজনের সম্পর্ক নিয়ে এতো বিস্তারিত আলোচনা করার কারণ এই যে, এই পটভূমি জানা না-থাকলে অতুলপ্রসাদের বহু গানের অর্থ সঠিক বোঝা যায় না। হেমকুসুম এলে অথবা আসতে পারেন, এমন সম্ভাবনা দেখা গেলে অতুলপ্রসাদ উচ্ছ্বসিত হতেন। অমনি হয়তো একটা গান লিখে ফেলতেন। কিন্তু বেশির ভাগ গানে হেমকুসুমের আসার প্রত্যাশার কথাই প্রকাশ পেয়েছে। কখনও হঠাৎ তাঁর অপ্রত্যাশিত আগমনের কারণে তিনি আনন্দিত হয়েছেন। যেমন, 'চাঁদিনী রাতে কে গো আসিলে / উজল নয়নে কে গো হাসিলে', 'কেন এলে মোর ঘরে আগে নাহি বলিয়া', 'ভাঙা দেউলে মোর কে আইলে আলো হাতে,' 'বঁধু, ক্ষণিকের দেখা তবু তোমারে ভুলিতে পারে না আঁখি', 'একা মোর গানের তরী ভাসিয়েছিলাম নয়নজলে', 'বঁধু, এমন বাদলে তুমি কোথা, আজি পড়িছে মনে মম কত কথা' ইত্যাদি।


একবার হেমকুসুম স্বামীর বাড়িতে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ তাঁদের অতিথি হয়ে লাখনৌতে গেলে। সেবারে স্বামীর বাড়িতে বেশ কয়েক দিন ছিলেন হেমকুসুম। অতুলপ্রসাদ তাতে আশান্বিত হন। 'কে আবার বাজায় বাঁশি এ ভাঙা কুঞ্জবনে' গানটি রচনা করে তিনি তাঁকে স্বাগত জানান। এর থেকেও প্রত্যক্ষভাবে তিনি তাঁর প্রেমের কথা বলেছেন আর-একটি গানে, 'আজ আমার শূন্য ঘরে আসিল সুন্দর / ওগো অনেক দিনের পর।' তাঁর প্রাসাদের মতো বাড়ি, তাঁর সকল আয়োজন নিয়ে তিনি বসে থাকতেন হেমকুসুম কব আসবেন সেই আশায়। আকুল আবেদন জানিয়ে গেয়েছেন: 'তুমি কবে আসিবে মোর আঙিনায় /কত বেলী, কত চামেলি যায় বৃথা যায়।' কিন্তু ঘর তাঁর শূন্যই থাকতো। সেই বিরহের হাহাকার প্রকাশ পেয়েছে অসংখ্য গানে। তার মধ্যে একটি হলো: 'বঁধুয়া, নিদ নাহি আঁখিপাতে / তুমিও একাকী আমিও একাকী আজি এ বাদল-রাতে।' তাঁর হতাশার চূড়ান্ত প্রকাশ পেয়েছে এ রকমের আরও গানে: 'তাই ভালো দেবী স্বপনেই তুমি এসো', 'আবার তুই বাঁধবি বাসা কোন সাহসে।'
সেই হতাশার মধ্যেই তিনি ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন, সেই ভালো— 'আমায় রাখতে যদি আপন ঘরে, বিশ্বঘরে পেতাম না ঠাঁই।' প্রিয়াকে না-পাওয়ার দুঃখ ভুলেছেন আপন বিরহকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়ে। 'মিছে তুই ভাবিস মন / তুই গান গেয়ে যা, গান গেয়ে যা আজীবন' বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছেন।
মনে করার কারণ নেই যে, অতুলপ্রসাদকে হেমকুসুম ভালোবাসতেন না। স্বামীর প্রতি তাঁর ভালোবাসার একটা পরোক্ষ প্রমাণ মেলে তিনি স্বামীর রচিত গান গাইতেন। গান তিনি কতোটা জানতেন, তা জানা যায় না। তবে 'বড়োলোকে'র কন্যা হিসেবে তিনি পিয়ানো বাজাতে শিখেছিলেন। শোনা যায় যে, নিজের বাড়িতে তিনি অতুলপ্রসাদের গান গাইতেন/বাজাতেন।
অতুলপ্রসাদের মাত্র ২০৭টি গানের সন্ধান মেলে। বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে তাঁর গানে বৈচিত্র্য কম। কিন্তু তারই মধ্যে ঈশ্বরপ্রেমের গান, প্রকৃতিপ্রেমের গান, দেশকে ভালোবাসার গান—নানা ধরনের গানই তিনি রচনা করেছিলেন। অনেক ঈশ্বরপ্রেমের গান রচনার পেছনে কাজ করেছে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অশান্তি এবং হাহাকার। তিনি যখন বলেন 'সংসারে যদি নাহি পাই সাড়া / তুমি তো আমার রহিবে / বহিবারে যদি না পারি এ ভার / তুমি তো বন্ধু বহিবে' তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর ব্যক্তিগত মর্মবেদনা কিভাবে তাঁকে ঈশ্বরের আশ্রয় খোঁজার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। যদিও সৃষ্টির একান্ত সৌন্দর্যও তাঁর গান রচনার প্রেরণা হয়ে দেখা দিয়েছে। একটি গানে তিনি বলেছেন, 'প্রভাতে যাঁরে নন্দে পাখি / কেমনে বলো তাঁরে ডাকি / কোন ভরসায় তাহারে মাগি?' অন্য একটি গানের মাধ্যমে পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করেছেন ঈশ্বরের কাছে—'যখন তুমি গাওয়াও গান / তখন আমি গাই / গানটি যখন হয় সমাপন তোমার পানে চাই।'
তিনি দেশপ্রেমের গান রচনা করেছেন মাত্র কয়েকটি। কিন্তু গানগুলো তাদের সরলতা এবং আন্তরিকতায় শ্রোতাদের মুগ্ধ এবং অনুপ্রাণিত করে।
আমরা এ পর্যন্ত আলোচনা করেছি তাঁর গানের বিষয়বস্তু কিভাবে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে, তা নিয়ে। নয়তো কাব্যবিচারে তাঁর গানগুলো বাংলা সংগীতের জগতে অবদান বলে বিবেচিত হতে পারে কিনা সন্দেহ আছে। তাঁর গানগুলো পুনরাবৃত্তিতে ভরা। পুনরাবৃত্তি কেবল ভাবের নয়, পুনরাবৃত্তি বাণীর, শব্দের, স্টাইলের। তা সত্ত্বেও, বাংলা গানে অতুলপ্রসাদের অবদান তাঁকে অমর করে রাখবে। এই অবদান বিশেষ করে গানের আঙ্গিকের। তিনি রবীন্দ্রনাথের থেকে দশ বছরের ছোটো হওয়া সত্ত্বেও, রবীন্দ্রনাথের চার তুকের কাঠামো দিয়ে প্রভাবিত হননি। ধ্রুপদও তিনি আদৌ রচনা করেননি। তাঁর আগে রবীন্দ্রনাথ এবং দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বিলেতে লেখাপড়া শেখার সময়ে ইংরেজি, স্কটিশ এবং আইরিশ গান দিয়ে প্রভাবিত হয়েছিলেন। সে প্রভাব তাঁদের বাংলা গানের সুরেও স্থায়ী ছাপ এঁকে দিয়েছিলো। কিন্তু অতুলপ্রসাদ ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়ে এবং ব্যারিস্টার হিসেবে কাজ করতে গিয়ে মোট পাঁচ বছর বিলেতে বসবাস করেছিলেন। কিন্তু তবু সেখানকার গান তাঁকে আকৃষ্ট করেনি। একে প্রায় অবিশ্বাস্য মনে হয়। অথচ তিনি বঙ্গের বাইরে থেকেই বাংলা গানে নতুনত্ব আমদানি করেছিলেন।

লাখনৌ প্রবাসের ফলে তিনি স্থানীয় গানের দুটি ফর্ম দিয়ে আকণ্ঠ প্রভাবিত হয়েছিলেন—ঠুংরি এবং গজল। অবশ্য তাঁর আগেই বঙ্গদেশে ঠুংরি এসেছিলো। গজলও এসেছিলো। এই দুই রীতির গান নিয়ে কলকাতায় এসেছিলেন নির্বাসিত নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ, ১৮৫৬ সালে। কিন্তু এর পরেও বাংলা ভাষায় ঠুংরি অথবা গজল গানের প্রচলন হয়নি। অতুলপ্রসাদ বাংলা ঠুংরি এবং গজল রচনা করেছিলেন খোদ তাদের জন্মভূমিতে বসে। তাঁর অসংখ্য গান লাখনৌ রীতির ঠুংরির স্টাইলে রচিত। গজলও তিনি ভালোবাসতেন, তবে নিজে গজল রচনা করেছিলেন মাত্র দুটি কি তিনটি। এবং সে গজলকে আমরা গজল বলে স্বীকার নাও করতে পারি। কারণ আমরা গজল বলতে বুঝি নজরুল ইসলামের প্রাণ-মাতানো গজলকে। অতুলপ্রসাদের একটি গান—'কত গান তো হল গাওয়া / মিছে কেন তরী বাওয়া' উৎকৃষ্ট গান বলে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু গজল বলে একে চেনা শক্ত।

তাঁর বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই ঠুংরি। তবে তাঁর কোনো কোনো ঠুংরিতে বাংলা কাব্যগীতের লক্ষণ দেখা যায়। কোনো কোনো ঠুংরিতে আবার টপ্পার অলংকার লক্ষ করা যায়। এখানে তাঁর বিখ্যাত কয়েকটি ঠুংরির উল্লেখ করছি। 'মধুকালে এলো হোলি,' 'ওগো নিঠুর দরদী এ কি খেলছ অনুক্ষণ', 'কেন এলে মোর ঘরে আগে নাহি বলিয়া', বঁধু এমন বাদলে তুমি কোথা', 'তুমি কবে আসিবে মোর আঙিনায়', 'ডাকে কোয়েলা বারে বারে', 'আমি বাঁধিনু তোমার তীরে তরণী আমার', 'চাঁদিনী রাতে কে গো আসিলে', 'কে আবার বাজায় বাঁশি এ ভাঙা কুঞ্জবনে', 'যখন তুমি গাওয়াও গান তখন আমি গাই' ইত্যাদি।

দীর্ঘদিন অতুলপ্রসাদ লাখনৌতে বাস করলেও কৈশোরে এবং যৌবনে বঙ্গদেশে তিনি যে-বঙ্গীয় সুরের মধ্যে লালিত হয়েছিলেন, বাউল ও কীর্তন, তা তিনি ভোলেননি, ভুলতে পারেননি। তিনি বাউল সুরে ষোলোটি, কীর্তনের সুরে বারোটি, বাউল ও কীর্তনের মেশানো সুরে দুটি আর একটি ভাটিয়ালি সুরের গান রচনা করেছিলেন। তবে স্বদেশী সুরের প্রতি ভালোবাসা সত্ত্বেও, তাঁর সত্যিকার প্রেম ছিলো ঠূংরির প্রতি। সেই প্রেমই তিনি অকৃপণভাবে বিতরণ করেছেন।