১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

কবি নজরুল যখন অনুবাদক

আমরা জানি, শুধু কবি, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সাংবাদিক, সংগীতব্যক্তিত্বই নন উৎকৃষ্ট অনুবাদকও ছিলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর সৃষ্টিশীল জীবন ছিল স্বল্প সময়ের। এরই মধ্যে তিনি যথাসাধ্য বিশ্বসাহিত্য সংস্কৃতি ও সংগীতের ভুবন গভীর আগ্রহ ও কৌতূহলে ভ্রমণ-মন্থন করেছেন।

হাসান হাফিজ হাসান হাফিজ

Published : 24 May 2026, 03:40 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:18 PM

আমরা জানি, শুধু কবি, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সাংবাদিক, সংগীতব্যক্তিত্বই নন উৎকৃষ্ট অনুবাদকও ছিলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর সৃষ্টিশীল জীবন ছিল স্বল্প সময়ের। এরই মধ্যে তিনি যথাসাধ্য বিশ্বসাহিত্য সংস্কৃতি ও সংগীতের ভুবন গভীর আগ্রহ ও কৌতূহলে ভ্রমণ-মন্থন করেছেন। সেই তৃষ্ণা, অভিজ্ঞতা,পর্যবেক্ষণ তিনি উপহার দিয়েছেন বাংলাভাষী পাঠকদের। সাহিত্য জীবনের শুরুর দিকে মৌলিক রচনার পাশাপাশি ফারসি সাহিত্য থেকে অনুবাদে আকৃষ্ট হন। 

সেনাবাহিনীতে থাকার সময় অনুবাদ করেছিলেন ‘দীওয়ান-ই-হাফিজ’ থেকে কয়েকটি গজল। 

তাঁর ‘রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় কলকাতার শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী এ্যান্ড সন্স থেকে। রুবাইগুলো প্রথম বেরিয়েছিল মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায়। ‘রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ’ প্রকাশের তিন বছর পর বের হলো ‘রুবাইয়াৎ ই ওমর খৈয়াম’। সেটি ১৩৬৬ বঙ্গাব্দের পৌষ মাসের ঘটনা। এ গ্রন্থে রুবাই ছিল ১৯৭টি।

মূল ফারসি থেকে নজরুল ইরানী কবি হাফিজ এবং ওমর খৈয়ামের রচনা অনুবাদ করেছেন। কবি তাঁর শৈশবে আরবি ও ফার্সি ভাষার প্রথম পাঠ নিয়েছিলেন। ফার্সি শেখেন চাচা কাজী বজলে করিমের কাছ থেকে। রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজের প্রথম কবিতাটি হচ্ছে-

তোমার ছবির ধ্যানে, প্রিয়

দৃষ্টি আমার পলক-হারা

তোমার ঘরে যাওয়ার যে-পথ

পা চলে  না সে-পথ ছাড়া।

হায় দুনিয়ায় সবার চোখে

নিদ্রা নামে দিব্য সুখে,

আমার চোখেই নেই কি গো ঘুম,

দগ্ধ হল নয়ন-তারা।

রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ গ্রন্থে কাজী নজরুল ইসলাম নাতিদীর্ঘ মুখবন্ধ লিখেছেন। একইসঙ্গে মরমি কবি হাফিজের সংক্ষিপ্ত জীবনীও সংযুক্ত করেছেন ‘বুলবুল-ই-শিরাজ’ শিরোনামে। 

মুখবন্ধে তিনি লিখেছেন,

“সত্যকার হাফিজকে চিনতে হলে তাঁর গজল-গান-প্রায় পঞ্চশতাধিক-পড়তে হয়। তাঁর রুবাইয়াৎ বা চতুষ্পদী কবিতাগুলি পড়ে মনে হয়, এ যেন তাঁর অবসর সময় কাটানোর জন্যই লেখা। অবশ্য এতেও তাঁর সেই দর্শন, সেই প্রেম, সেই শারাব সাকি তেমনিভাবেই জড়িয়ে আছে।

এ যেন তাঁর অতল সমুদ্রের বুদ্বুদকণা। তবে এ ক্ষুদ্র বিম্ব হলেও এতে সারা আকাশের গ্রন্থ-তারার প্রতিবিম্ব প’ড়ে একে রামধনুর কণার মতো রাঙিয়ে তুলেছে। হয়ত ছোট বলেই এ এত সুন্দর। 

আমি অরিজিন্যাল (মূল) ফার্সি হ’তেই এর অনুবাদ করেছি। আমার কাছে যে কটি ফার্সি ‘দীওয়ান-ই-হাফিজ’ আছে, তার প্রায় সব কয়টাতেই পঁচাত্তরটি রুবাইয়াৎ দেখতে পাই। অথচ ফার্সি সাহিত্যের বিশ্ববিখ্যাত সমালোচক ব্রাউন সাহেব তাঁর  History of Persian Literature-এ এবং মৌলানা শিবলী নোমানী তাঁর “শেয়রুল-আজম”-এ মাত্র ঊনসত্তরটি রুবাইয়াতের উল্লেখ করেছেন। এবং এই দুইজনই ফার্সি কবি ও কাব্য সম্বন্ধে  authority-- বিশেষজ্ঞ।

মুখবন্ধে কবি কাজী নজরুল ইসলাম আরো লিখেছেন,

“ইরানী কবিদের অধিকাংশই তথাকথিত নাস্তিকরূপে আখ্যাত হলেও এঁরা ঠিক নাস্তিক ছিলেন না। এঁরা খোদাকে বিশ্বাস করতেন। শুধু স্বর্গ, নরক, রোজকিয়ামত (শেষ বিচারের দিন) প্রভৃতি বিশ্বাস করতেন না। কাজেই শাস্ত্রাচারীর দল এঁদের উপর এত খাপ্পা ছিলেন। এঁরা সর্বদা নিজেদের ‘রিন্দান্’ বা স্বাধীন চিন্তাকারী, ব্যভিচারী বলে সম্বোধন করতেন। এর জন্য এঁদের প্রত্যেককেই জীবনে বহু দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়েছিল। 

হাফিজের সমস্ত কাব্যের একটি সুর- “কায় বেখবর, আজ ফসলে গুল ও তরকে শারাব”।

“ওরে মূঢ়! এমন ফুলের ফসলের দিন-আর তুই কিনা শারাব ত্যাগ করে বসে আছিস।”

নজরুল অনুবাদিত হাফিজের ৭৩ সংখ্যক  (শেষ) রুবাইটি এখানে উল্লেখ করি-

ওরে হাফিজ, শেষ কর তোর

    কৃত্রিম এই কলমবাজি!

হল সময়- খোলা পাতা

    ঝোলায় তুলে রাখার আজি।

নীরব হয়ে বসার পালা

এবার রে তোর, আজকে শুধু

শূন্য গেলাস টইটুম্বুর,

    কর রে ঢেলে শেষ শিরাজী।

দুই.

‘রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম’এবারের প্রসঙ্গ। তিনটি রুবাই উদ্ধৃত করি-

৯৭ সংখ্যক রুবাই

    প্রেমের চোখে সুন্দর সেই হোক কালো কি গৌর-বরণ,

    পরুক ওড়না রেশমি কিংবা পরুক জীর্ণ দীন-বসন।

    থাকুক শুয়ে ধুলোয় সে কি থাকুক সোনার পালঙ্কে,

    নরকে সে গেলেও প্রেমিক করবে সেথায় অন্বেষণ।

১৯৫ সংখ্যক রুবাই-

     খৈয়াম! তোর দিন দুয়েকের এই যে দেহের শামিয়ানা

    আত্মা নামক শাহানশাহের হেথায় ক্ষণিক আস্তানা।

    তাম্বুওয়ালা মৃত্যু আসে আত্মা যখন লন বিদায়,

    উঠিয়ে তাঁবু অগ্রে চলে; কোথায় সে যায় অ-জানা।

তৃতীয় উদ্ধৃতি  ৬২ সংখ্যক রুবাই-

    হুরি বলে থাকলে কিছু -একটি হুরি মদ খানিক

    ঘাস-বিছানো ঝর্নাতীরে, অল্প-বয়েস বৈতালিক-

    এই যদি পাস, স্বর্গ নামক পুরনো সেই নরকটায়

    চাসনে যেতে, স্বর্গ ইহাই, স্বর্গ যদি থাকেই ঠিক।

কবি নজরুল কী বলছেন কবি ওমর খৈয়াম সম্পর্কে? ‘রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম’ গ্রন্থের ভূমিকায় কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন,

“আমি ওমরের রুবাইয়াৎ বলে প্রচলিত প্রায় এক হাজার রুবাই থেকে কিঞ্চিদধিক দুশো রুবাই বেছে নিয়েছি; এবং তা ফারসি ভাষার রুবাইয়াৎ থেকে। কারণ, আমার বিবেচনায় এইগুলি ছাড়া বাকি রুবাই ওমরের প্রকাশভঙ্গি বা স্টাইলের সঙ্গে একেবারে মিশ খায় না। রবীন্দ্রনাথের কবিতার পাশে আমার মতো কবির কবিতার মতো তা একেবারে বাজে। বাকিগুলিতে ওমর খৈয়ামের ভাব নেই, ভাষা নেই, গতি ঋজুতা- এক কথায় স্টাইলের কোনো কিছু নেই। খুব সম্ভব ওগুলি অন্য- কোনো পদ্য লিখিয়ের লেখা। আর, তা যদি ওমরেরই না হয়, তবে তা অনুবাদ করে, পণ্ডশ্রম করার দরকার নেই। বাগানের গোলাপ তুলব; তাই বলে বাগানের আগাছাও তুলে আনতে হবে এর কোনো মানে নেই। 

আমি আমার ওস্তাদি দেখাবার জন্য ওমর খৈয়ামের ভাব ভাষা বা স্টাইলকে বিকৃত করিনি- অবশ্য আমার সাধ্যমতো। এর জন্য আমার অজস্র পরিশ্রম করতে হয়েছে, বেগ পেতে হয়েছে। কাগজ-পেন্সিলের, যাকে বলে আদ্যশ্রাদ্ধ, তা-ই করে ছেড়েছি। ওমরের রুবাইয়াতের সবচেয়ে বড় জিনিস ওর প্রকাশের ভঙ্গি বা ঢং। ওমর আগাগোড়া মাতালের ‘পোজ’ নিয়ে তাঁর রুবাইয়াৎ লিখে গেছেন -মাতালের মতোই ভাষা, ভাব, ভঙ্গি, শ্লেষ, রসিকতা, হাসি, কান্না-সব। কত বৎসর ধরে কত বিভিন্ন সময়ে তিনি এই কবিতাগুলি লিখেছেন, অথচ এর স্টাইল সম্বন্ধে কখনো এতটুকু চেতনা হারাননি। মনে হয়, একদিনে বসে লেখা। আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্ট করেছি-ওমরের সেই ঢংটির মর্যাদা রাখতে, তাঁর প্রকাশভঙ্গিকে যতটা পারি কায়দায় আনতে। কতদূর সফল হয়েছি, তা ফারসি-নবিশরাই বলবেন।”

তিন.

এই লেখার শেষ পর্বে আমরা চোখ বুলোতে চাই ‘কাব্য আমপারা’ গ্রন্থটির ওপরে। প্রথমেই উল্লেখ করব সুরা ফাতেহার বঙ্গানুবাদ-

সুরা ফাতেহা

(শুরু করিলাম) লয়ে নাম আল্লার 

করুণা ও দয়া যাঁর অশেষ অপার।

সকলি বিশ্বের স্বামী আল্লার মহিমা,

করুণা কৃপার যাঁর নাই নাই সীমা।

বিচার-দিনের বিভু! কেবল তোমারি

আরাধনা করি আর শক্তি ভিক্ষা করি।

সরল সহজ পথে মোদেরে চালাও,

যাঁদেরে বিলাও দয়া সে পথ দেখাও

অভিশপ্ত আর পথ-ভ্রষ্ট যারা, প্রভু,

তাহাদের পথে যেন চালায়ো না কভু               

সুরা-শ্লোক ফাতেহা -উদঘাটিকা যাবতীয় সুরার শানে-নজুল ও আবশ্যকীয় হাওয়ালা পরিশিষ্ট দ্রষ্টব্য।

‘কাব্য আমপারা’ গ্রন্থের ‘আরজ’ এ কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন,

“আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাধ ছিল পবিত্র “কোর-আন” শরীফের বাঙলা পদ্যানুবাদ করা। সময় ও জ্ঞানের অভাবে এতদিন তা করে উঠতে পারি নি। বহু বৎসরের সাধনার পর খোদার অনুগ্রহে অন্তত পড়ে বুঝবার মতও আরবি-ফার্সি ভাষা আয়ত্ত করতে পেরেছি বলে নিজেকে ধন্য মনে করছি।

কোর-আন শরীফের মত মহাগ্রন্থের অনুবাদ করতে আমি কখনো সাহস করতাম না বা তা করবারও দরকার হত না- যদি আরবি ও বাঙলা ভাষায় সমান অভিজ্ঞ কোনো যোগ্য ব্যক্তি এদিকে অবহিত হতেন। 

ইসলাম ধর্মের মূলমন্ত্র-পুঁজি ধনরত্ন মণি-মাণিক্য সবকিছু - কোর-আন মজীদের মণি-মঞ্জুষায় ভরা, তাও আবার আরবি ভাষার চাবি দেওয়া। আমরা বাঙালি মুসলমানেরা তা নিয়ে অন্ধ-ভক্তিভরে কেবল নাড়াচাড়া করি। ঐ মঞ্জুষায় যে কোন মণিরত্নে ভরা, তার শুধু আভাষটুকু জানি। আজ যদি আমার চেয়ে যোগ্যতর ব্যক্তিগণ এই কোর-আন মজীদ, হাদিস, ফেকা প্রভৃতির বাঙলা ভাষায় অনুবাদ করেন তা হলে বাঙালি মুসলমানের তথা বিশ্ব-মুসলিম সমাজের অশেষ কল্যাণ সাধন করবেন। অজ্ঞান-অন্ধকারের বিবরে পতিত বাঙালি মুসলমানদের তাঁরা বিশ্বের আলোক-অভিযানের সহযাত্রী করার সহায়তা করবেন। সে শুভদিন এলে আমার মত অযোগ্য লোক এ বিপুল দায়িত্ব থেকে সানন্দে অবসর গ্রহণ করবে।”

“ আরজ’ এ নজরুল আরো লিখেছেন,

“আমার বিশ্বাস, পবিত্র কোর-আন শরীফ যদি সরল বাঙলা পদ্যে অনূদিত হয়, তা হ’লে তা অধিকাংশ মুসলমানই সহজে কণ্ঠস্থ করতে পারবেন- অনেক বালক-বালিকাও সমস্ত কোর-আন হয়ত মুখস্থ করে ফেলবে। এই উদ্দেশেই আমি যতদূর সম্ভব সরল পদ্যে অনুবাদ করবার চেষ্টা করেছি। খুব বেশি কৃতকার্য যে হয়েছি তা বলতে পারিনে- কেননা কোর-আন পাকের একটি শব্দও এধার ওধার না করে তার ভাব অক্ষুণ্ন রেখে কবিতায় সঠিক অনুবাদ করার মত দুরূহ কাজ আর দ্বিতীয় আছে কিনা জানিনে। কেননা আমার কলম, আমার ভাষা, আমার ছন্দ এখানে আমার আয়ত্তাধীন নয়।

মুক্তব-মাদ্রাসা স্কুল-পাঠশালার ছেলে-মেয়েদের এবং স্বল্প শিক্ষিত সাধারণের বোধগম্য ভাষাতেই আমি অনুবাদ করতে চেষ্টা করেছি। যদি আমার এই দিক দিয়ে প্রথম প্রচেষ্টাকে পাঠকবর্গ সাদরে গ্রহণ করেন-আমার সকল শ্রম সার্থক হল মনে করব। .... ”

নজরুলকৃত সুরা ইখলাসের বাংলা তরজমা-

সুরা ইখলাস

শুরু করিলাম পুত নামেতে আল্লার.

শেষ নাই সীমা নাই যাঁর করুণার।

বল, আল্লাহ এক! প্রভু ইচ্ছাময়,

নিষ্কাম নিরপেক্ষ, অন্য কেহ নয়।

করেন না কাহারেও তিনি যে জনন,

কাহারও ঔরস-জাত তিনি নন।

সমতুল তাঁর

নাই কেহ আর।

ইখলাস-বিশুদ্ধ।