০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

জর্জ অরওয়েলের ‘১৯৮৪’

সত্য মন্ত্রণালয়ের কাজ হলো সকল প্রকার মিডিয়া, বিনোদন এবং শিল্পকলা নিয়ন্ত্রণ করা।

মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 15 Aug 2024, 10:34 PM

Updated : 26 Aug 2026, 10:16 AM

সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, এবং ঔপন্যাসিক এরিক ব্লেয়ার, যিনি জর্জ অরওয়েল নামে বেশি পরিচিত। ‘১৯৮৪’ এবং ‘অ্যানিমাল ফার্ম’ - সর্বগ্রাসী সরকার ব্যাবস্থা সম্পর্কে এই দুটি সর্বাধিক পরিচিত সতর্কীকরণ উপন্যাস লেখার কারণে তিনি বিখ্যাত। অরওয়েলের উত্তরাধিকারের সামগ্রিকতা বিবেচনা করলে নিশ্চিতভাবে আগামী বহু দশক এবং সম্ভবত বহু শতকের জন্য রাজনীতির মাপকাঠি হয়ে থাকবে। আমাদের পরবর্তী বংশধরেরা আমাদের কিভাবে মনে রাখবে কে জানে। তবে তারা সম্পূর্ণরূপে কর্তৃত্ববাদকে অতিক্রম করতে বহু প্রজন্ম পরেও লড়াই করবে, আর চিরকাল কর্তৃত্ববাদের হুমকি ও উত্থানের বিপক্ষে অরওয়েলের নাম উচ্চারিত হতে থাকবে।

জর্জ অরওয়েলের ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস “নাইনটিন এইটি ফোর” বা ‘১৯৮৪’ হল সতর্কতামূলক কাহিনি। উপন্যাসটি ১৯৪৯ সালের ৮ জুন সেকার এবং ওয়ারবার্গ প্রকাশনা সংস্থার প্রকাশিত অরওয়েলের নবম এবং শেষ গ্রন্থ হিশেবে প্রকাশিত হয়। অরওয়েলের অকালমৃত্যুর কিছুদিন আগে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি সর্বগ্রাসীতাবাদ, গণ নজরদারি এবং সমাজের মধ্যে মানুষের এবং আচরণের দমনমূলক বিধিনিষেধের নাগপাশের ফলাফলের উপর কেন্দ্রীভূত হয়। অরওয়েল একজন গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক ব্যক্তিত্ব হিশেবে স্টালিনবাদের যুগের সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং নাৎসি জার্মানির কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের আদলে উপন্যাসটির কাহিনি রচনা করেছেন। আরও বিস্তৃতভাবে বলতে গেলে সমাজের মধ্যে সত্য ও তথ্যের ভূমিকা এবং যে উপায়ে তাদের নিপূণভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে উপন্যাসটি তা নিরীক্ষা করে।

গল্পটি একটি কল্পিত ভবিষ্যতের একটি অনির্দিষ্ট বছরে ঘটে যা ১৯৮৪ সাল বলে বিশ্বাস করা হয়। যখন বিশ্বের বেশিরভাগ অংশ চিরস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে থাকে। এয়ারস্ট্রিপ ওয়ান নামে পরিচিত গ্রেট ব্রিটেন সর্বগ্রাসী সুপারস্টেট ওশেনিয়ার একটি প্রদেশে পরিণত হয় যার নেতৃত্বে থাকেন ‘বিগ ব্রাদার’ নামের স্বৈরাচারী নেতা। তিনি তার দলের থট পুলিশ কর্তৃক নির্মিত এক তীব্র বিশ্বাসে সমর্থিত একজন একনায়ক। সর্বব্যাপী সরকারী নজরদারির মাধ্যমে এবং সত্য মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে তার দল ব্যক্তিত্ব এবং স্বাধীন চিন্তাভাবনাকে তাড়িত করার লক্ষ্যে ঐতিহাসিক নেতিবাচক মনোভাবের দ্বারা অবিরাম প্রচারে জড়িত।

‘১৯৮৪’ উপন্যাসটি রাজনৈতিক এবং ডিস্টোপিয়ান কথাসাহিত্যের একটি ধ্রুপদী সাহিত্যিক উদাহরণ হয়ে উঠেছে। এটি "অরওয়েলিয়ান" শব্দটিকে একটি বিশেষণ হিসেবেও জনপ্রিয় করে তোলে। উপন্যাসে ব্যবহৃত অনেকগুলো পরিভাষা সাধারণভাবে সর্বত্র ব্যবহৃত হতে শুরু করে, যার মধ্যে রয়েছে "বিগ ব্রাদার", "ডাবলথিঙ্ক", "থট পুলিশ", "থটক্রাইম", "নিউজস্পিক", এবং "২+ ২ = ৫"। উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও অন্যান্য ভাবনার মধ্যে সর্বগ্রাসীতা, গণ-নজরদারি এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘনকে বাস্তব জীবনের উদাহরণসমূহের সাদৃশ্যে নির্মাণ করা হয়েছে। অরওয়েল তার বইটিকে "ব্যঙ্গাত্মক" হিসাবে বর্ণনা করেছেন এবং "একটি কেন্দ্রীভূত অর্থনীতির বিকৃতির জন্য দায়বদ্ধতার" একটি প্রদর্শন হিসাবে বর্ণনা করেছেন। পাশাপাশি তিনি বিশ্বাস করতেন যে "হুবহু ধরণের কিছু ভবিষ্যতে ঘটতে পারে।" ১৯২৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত ইংরেজি ভাষার ১০০টি সেরা উপন্যাসের তালিকায় টাইম সাময়িকী উপন্যাসটিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং এটি মডার্ন লাইব্রেরির ১০০টি সেরা উপন্যাসের তালিকায় স্থান পেয়েছে। এডিটর’স লিস্টের ১৩ নম্বরে এবং রিডার্স লিস্টের ৬ নম্বরে অবস্থান করেছে। ২০০৩ সালে, এটি বিবিসির “দ্য বিগ রিড” জরিপে আট নম্বরে তালিকাভুক্ত হয়।

১৯৪৮ সালের একটি চিঠিতে অরওয়েল দাবি করেছেন যে "১৯৪৩ সালে বইটি সম্পর্কে প্রথম চিন্তাভাবনা তৈরি হয়"। অন্যটিতে তিনি বলেছেন যে তিনি এটি ১৯৪৪ সালে ভেবেছিলেন এবং ১৯৪৩ সালের তেহরান সম্মেলনকে অনুপ্রেরণা হিসাবে উল্লেখ করেছেন : "এটি আসলে বিশ্বকে 'প্রভাবিত অঞ্চলে' বিভক্ত করার বিষয়ে আলোচনা করার উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছে এবং পাশাপাশি সর্বগ্রাসীবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাবকে ব্যঙ্গ করার মাধ্যমে ইঙ্গিত করার উদ্দেশ্যে। আমি ১৯৪৪ সালে তেহরান সম্মেলনের ফলস্বরূপ এটি ভেবেছিলাম।”

১৯৪৪ সালের জানুয়ারিতে সাহিত্যের অধ্যাপক গ্লেব স্ট্রুভ অরওয়েলকে ইয়েভজেনি জামিয়াতিনের ১৯২৪ সালের ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস ‘উই’ এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এর প্রতিক্রিয়ায় অরওয়েল এই ধারার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং স্ট্রুভকে জানান যে তিনি তার নিজের একটি উপন্যাসের জন্য ধারনা লিখতে শুরু করেছেন, "যা শীঘ্রই বা পরে লেখা হতে পারে।" ১৯৪৬ সালে অরওয়েল ট্রিবিউন সাময়িকীতে প্রকাশিত তার “ফ্রিডম অ্যান্ড হ্যাপিনেস” প্রবন্ধে ১৯৩১ সালের অ্যালডাস হাক্সলির ডাইস্টোপিয়ান উপন্যাস “ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড” সম্পর্কে লেখেন। সেখানে তিনি ‘উই’ উপন্যাসের সাথে মিল উল্লেখ করেন। এই সময়ে অরওয়েল তার ১৯৪৫ সালের রাজনৈতিক স্যাটায়ার এনিম্যাল ফার্ম উপন্যাস রচনা করে প্রচণ্ড সমালোচিত হন। বাণিজ্যিকভাবে উপন্যাসটি অত্যন্ত সফলতা অর্জন করে এবং সারা বিশ্বে অরওয়েলের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। এই উপন্যাসের সফলতা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তিনি নিজের একটি ডাইস্টোপিয়ান উপন্যাস রচনার সিদ্ধান্ত নেন।

অ্যানিমেল ফার্ম প্রকাশের কিছু আগে ১৯৪৪ সালের জুন মাসে তার ব্রিটিশ প্রকাশক সেকার অ্যান্ড ওয়ারবার্গের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফ্রেডরিক ওয়ারবার্গের সাথে একটি বৈঠকে অরওয়েল ঘোষণা করেন যে তিনি তাঁর নতুন উপন্যাসের প্রথম ১২ পৃষ্ঠা লিখেছেন। তিনি শুধুমাত্র সাংবাদিকতা থেকে জীবিকা অর্জন করতেন তাই ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে উপন্যাসটি ১৯৪৭ সালের আগে প্রকাশিত হওয়ার সুযোগ নেই। অগ্রগতি ধীর গতিতে চলছিল; ১৯৪৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে অরওয়েল প্রায় ৫০ পৃষ্ঠা লিখেছিলেন। অরওয়েল সাংবাদিকতার সাথে জড়িত বিধিনিষেধ এবং চাপের কারণে হতাশ হয়ে পড়েন এবং লন্ডনের নগর জীবনকে ঘৃণা করতে থাকেন। তাঁর স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্থ হয়, প্রচণ্ড শীতের কারণে তার ব্রঙ্কাইক্টেসিস হয় একটি ফুসফুসে ক্ষত ধরা পড়ে।

১৯৪৬ সালের মে মাসে অরওয়েল স্কটিশ দ্বীপ জুরাতে চলে যান। তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে একটি হেব্রিডিয়ান দ্বীপে বসতি গড়তে চেয়েছেন। ডেভিড অ্যাস্টর তাকে বার্নহিলে থাকার সুপারিশ করেছিলেন, সেই দ্বীপের একটি প্রত্যন্ত খামারবাড়ি অ্যাস্টর পরিবারের মালিকানাধীন ছিল। বার্নহিলের কটেজে কোন বিদ্যুৎ বা গরম জলের ব্যবস্থা ছিল না তবুও এখানেই অরওয়েল মাঝে মাঝে খসড়া তৈরি করেন এবং ‘১৯৮৪’ উপন্যাসটি শেষ করেন। দ্বীপে তাঁর প্রথমবারের অবস্থান ১৯৪৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই সময়ে তিনি ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ হওয়া কয়েকটি পৃষ্ঠায় সামান্য অগ্রগতি করেন এবং এক পর্যায়ে তিন মাস ধরে উপন্যাসটিতে কোনও কাজ করেননি। লন্ডনে শীত কাটিয়ে অরওয়েল জুরায় ফিরে আসেন। ১৯৪৭ সালের মে মাসে তিনি ওয়ারবার্গকে অবহিত করেন যে লেখার অগ্রগতি ধীর এবং কষ্টসাধ্য হওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রায় এক তৃতীয়াংশ পথ অতিক্রম করেছেন। তিনি তার প্রথম খসড়া পাণ্ডুলিপির "ভয়াবহ জগাখিচুড়ি" লন্ডনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেখানে মিরান্ডা ক্রিস্টেন একটি পরিষ্কার সংস্করণ টাইপ করতে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করেন। সেপ্টেম্বরে অরওয়েলের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে এবং ফুসফুসের প্রদাহ নিয়ে তিনি বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। তাঁর শরীরের প্রায় ২৮ পাউন্ড ওজন কমে যায়, তিনি রাতের বেলা অনবরত ঘামতে থাকেন। তবুও তিনি চিকিৎসা না নেওয়ার সংকল্প গ্রহণ করে লেখা চালিয়ে যান। ১৯৪৭ সালের ৭ নভেম্বর তিনি তাঁর রোগ শয্যায় থেকেই প্রথম খসড়াটি সম্পন্ন করেন। এরপর অরওয়েল হেয়ারমাইরেস হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গ্লাসগোর কাছে ইস্ট কিলব্রাইডে যান। যেখানে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অরওয়েলের রোগটিকে দীর্ঘস্থায়ী এবং সংক্রামক যক্ষ্মারোগ বলে শনাক্ত করেন।

১৯৪৮ সালের গ্রীষ্মে হেয়ারমাইরেস হাসপাতাল থেকে অরওয়েলকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। তারপর তিনি আবার জুরা দ্বীপে ফিরে যান এবং ‘১৯৮৪’ উপন্যাসের একটি সম্পূর্ণ দ্বিতীয় খসড়া তৈরি করেন। খসড়াটি তিনি নভেম্বরে শেষ করেন। তিনি ওয়ারবার্গকে অনুরোধ জানান যেন বার্নহিলে কেউ এসে পাণ্ডুলিপিটি পুনরায় টাইপ করে দেয়। পাণ্ডুলিপিটি এতটাই হিজিবিজি ধরণের ছিল যে, কাজটি কেবলমাত্র অরওয়েলের উপস্থিতিতেই সম্ভব বলে মনে করা হয়। শুধুমাত্র তিনিই এটি বুঝতে পারতেন। পূর্ববর্তী স্বেচ্ছাসেবক মিরান্ডা ক্রিস্টেন দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন এবং স্বল্প সময়ের নোটিশে অন্য কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি তাই একজন অধৈর্য অরওয়েল জ্বর এবং রক্তাক্ত কাশি নিয়ে দিনে প্রায় চার হাজার শব্দ হারে উপন্যাসের পাণ্ডুলিপিটি পুনরায় টাইপ করেন। ১৯৪৮ সালের ৪ ডিসেম্বর অরওয়েল সমাপ্ত পাণ্ডুলিপিটি সেকার অ্যান্ড ওয়ারবার্গের কাছে পাঠান। ১৯৪৯ সালের জানুয়ারি মাসে স্কটল্যান্ডের জুরা দ্বীপের বার্নহিলকে চিরদিনের জন্য বিদায় জানান। এরপর তিনি কটসওল্ডসের একটি স্যানিটরিয়ামে ভর্তি হয়ে কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠেন।

১৯৪৯ সালের ৮ জুন যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত হয় ‘১৯৮৪’। অরওয়েল প্রায় ৫০০ পাউন্ড আয়ের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। ২৫,৫৭৫ কপির একটি প্রথম মুদ্রণ ১৯৫০ সালের মার্চ মাসে ছাপা হয় এবং কাটতি বেড়ে যাওয়ায় আগস্টে আরও ৫০০০ কপি ছাপা হয়। উপন্যাসটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে। সেখানে ১৯৪৯ সালের ১৩ জুন উপন্যাসটি হারকোর্ট ব্রেস এন্ড কোম্পানী প্রকাশ করে। প্রাথমিক মুদ্রণ হয় ২০ হাজার কপি এবং ১ জুলাই আবার মুদ্রণ হয় ১০ হাজার, আবার ৭ সেপ্টেম্বরে আরও ১০ হাজার কপি দ্রুততম সময়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। ১৯৭০ সালের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই উপন্যাসটির আট মিলিয়নের বেশি কপি বিক্রি হয়। এরপর ১৯৮৪ সালে উপন্যাসটির নামকরণের সাথে মিল হওয়া বছরে এটি সেদেশের সর্বকালের সেরা বিক্রয় তালিকার শীর্ষে অবস্থান করে।

১৯৫২ সালের জুন মাসে অরওয়েলের বিধবা স্ত্রী সোনিয়া ব্রাউনেল একমাত্র অক্ষত খসড়া পাণ্ডুলিপিটি এক দাতব্য নিলামে ৫০ পাউন্ডে বিক্রি করেন। খসড়াটি অরওয়েলের একমাত্র বেঁচে থাকা সাহিত্য পাণ্ডুলিপি হিসাবে রয়ে গেছে এবং বর্তমানে রোড আইল্যান্ডের প্রোভিডেন্সের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির জন হে লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে।

অরওয়েল এই উপন্যাসের গল্পটি বুনেছেন অসাধারণ এক বুননে। ১৯৮৪ সালে বিশ্বযুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ এবং বিপ্লবের ফলে সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়। এয়ারস্ট্রিপ ওয়ান (পূর্বে গ্রেট ব্রিটেন নামে পরিচিত) হল বিশ্বকে শাসন করে চলা তিন সর্বগ্রাসী শক্তিশালী-রাষ্ট্রের একটি ওশেনিয়ার এক প্রদেশ। এটি "ইংসোক" ("ইংরেজি সমাজতন্ত্র"-এর একটি নিউজপিক সংক্ষিপ্তকরণ) এবং  তীব্র ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রহস্যময় নেতা বিগ ব্রাদারের আদর্শের অধীনের "দ্য পার্টি" দ্বারা শাসিত হয়। টেলিস্ক্রিন (দ্বি-মুখী টেলিভিশন), ক্যামেরা এবং লুকানো মাইক্রোফোনের মাধ্যমে থট পুলিশ নামক বাহিনীকে ব্যবহার করে অবিরাম নজরদারি করে। পার্টি নির্মমভাবে তাদের শাসনের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ লোককে শাস্তি দেয়। যারা পার্টির সান্নিধ্য থেকে বেরিয়ে যায় তারা "অব্যক্তি" হয়ে যায়, তাদের অস্তিত্বের সমস্ত প্রমাণ ধ্বংস হয়ে যায়।

লন্ডনে উইনস্টন স্মিথ আউটার পার্টির একজন সদস্য। আমরা উইনস্টন স্মিথ এবং তার চির চেনা পৃথিবীর সাথে পরিচিত হই। ঊনত্রিশ বছর বয়সী ছোটখাটো, পাতলা গড়নের একজন মানুষ উইনস্টন। ওশেনিয়া নিয়ন্ত্রণকারী সরকারের চারটি মন্ত্রণালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, সত্য মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন। সেখানে তিনি রাষ্ট্রের পরিবর্তনশীল ইতিহাসের সংস্করণের সাথে সামঞ্জস্য করার জন্য ঐতিহাসিক রেকর্ডগুলো পুনর্লিখন করেন। উইনস্টন দ্য টাইমস পত্রিকার অতীত সংস্করণগুলোকে সংশোধন করেছেন, যখন মূল নথিগুলি “মেমরি হোল” নামের পরিচিত নালীতে ফেলে দেওয়ার পরে ধ্বংস হয়ে যায়, সেটিকে একটি বিশাল চুল্লির দিকে নিয়ে যায়। তিনি গোপনে পার্টির শাসনের বিরোধিতা করেন এবং বিদ্রোহের স্বপ্ন দেখেন। যদিও তার জানা আছে যে ইতোমধ্যে তিনি একজন "থট-ক্রিমিনাল" হয়ে উঠেছেন বিধায় কোনো একদিন ধরা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সত্য মন্ত্রণালয়ের কাজ হলো সকল প্রকার মিডিয়া, বিনোদন এবং শিল্পকলা নিয়ন্ত্রণ করা। শান্তি মন্ত্রনালয়ের কাজ হলো যুদ্ধবিষয়ক যাবতীয় তত্ত্বাবধান করা। প্রেম মন্ত্রণালয় হলো বিচার ব্যবস্থার একটি রূপ আর অর্থনৈতিক বিষয়মূহ পরিচালনার দায়িত্ব প্রাচুর্য মন্ত্রণালয়ের। উইনস্টন স্মিথের নিজস্ব জগতে জীবন বড্ড নিরানন্দ। তিনি সেদ্ধ বাঁধাকপির দুর্গন্ধময় একটি অপরিচ্ছন্ন ভবনে থাকেন। লিফট সবসময় ভাঙ্গা থাকে অথচ তার বসবাসের ফ্ল্যাটটি সেই সপ্তম তলায়। উইনস্টনের ডান পায়ের গোড়ালির ঠিক উপরে বিরামহীন ব্যথাযুক্ত ভেরিকোজ আলসারের কারণে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে এবং নামতে তার ভয়ানক কষ্ট হয়। অবশেষে বাড়িতে ফিরে আসার পরও সে ‘বিগ ব্রাদার’ বা সরকারের ক্রমাগত নজরদারির আওতায় থাকে। এই ক্রমাগত নজরদারির মাধ্যমটি দেয়াল জুড়ে থাকা একটি টেলিস্ক্রিন যা ক্রমাগত কেবল তার প্রতিটি কাজ এবং শব্দই নয়, তার মুখের অভিব্যক্তিও পর্যবেক্ষণ করে। কোনোরকম অঙ্গভঙ্গি বা ইশারার মাধ্যমে পার্টির বিরুদ্ধে যৎসামান্য ধারণা পোষণ করলেই তার অর্থ মৃত্যু বা বীভৎস শাস্তি। তাকে অবশ্যই পুরো সত্তা জুড়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে পার্টির সদস্য হতে হবে অর্থাৎ বিগ ব্রাদারকে সমর্থন করতে হবে। সেই আনুগত্য বাস্তবায়নের জন্য থট পুলিশ সদা সজাগ রয়েছে। উপন্যাসের প্রতিটি বর্ণনা এক ধরনের ঠান্ডা, অন্ধকারাচ্ছন্ন, শূন্যগর্ভ, বর্ণহীন অস্তিত্বের ছবি এঁকে চলে। পার্টির স্লোগান, "যুদ্ধই শান্তি, স্বাধীনতাই দাসত্ব, অজ্ঞতাই শক্তি," –যেদিকে চোখ যায় কেবল এই শ্লোগানই খোদাই করা রয়েছে। তাদের সাথে, বিগ ব্রাদারের একটি প্রতিকৃতি শিরোলিপি সহ জ্বলজ্বল করছে, “বিগ ব্রাদার আপনাকে দেখছে।" উইনস্টন যে অপ্রতিরোধ্য এবং ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ অনুভব করেন তা অবিলম্বে স্পষ্ট হযয়ে ওঠে। যদিও বিষয়টি তার জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ তবুও তিনি একটি কলম, কালি এবং একটি জার্নাল সংগ্রহ করেছেন। তার ফ্ল্যাটে একটি দেওয়ালের গায়ে খিলানযুক্ত কুলুংগি রয়েছে যা টেলিস্ক্রিনের পর্দা থেকে কিছুটা আড়ালে। তিনি এটিকে নিজের গোপন স্বাধীন স্থান হিসাবে ব্যবহার করেন এবং লিখতে থাকেন। তিনি ভাল করেই জানেন এই সমস্ত কর্মের একমাত্র শাস্তি হল মৃত্যুদন্ড। এমনকি কেউ যদি পার্টির বিরুদ্ধে চিন্তাভাবনাও করে, তাহলে তা ‘থট ক্রাইম’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। লিখতে বসার পর তিনি বুঝতে পারেন যে তারিখ, তার সঠিক বয়স, বা তার নিজের ইতিহাস বা পৃথিবীর ইতিহাস সম্পর্কে তিনি ঠিক নিশ্চিত নন। তিনি মনে করেন যে এটি ৪ এপ্রিল, ১৯৮৪। তিনি সত্যিই কিছু নিশ্চিত করতে পারেন না কারণ পার্টির উদ্দেশ্য এবং অগ্রাধিকার হলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে অতীতকে মুছে ফেলা এবং পার্টির ইচ্ছামাফিক প্রতিস্থাপন করা। ১৯৫০-এর দশকে, সমস্ত সংবাদপত্র, বই, ইত্যাদি ধ্বংসের মাধ্যমে অতীতকে বিলীন করার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং পরবর্তীকালে পার্টির উপযোগী করে মনগড়া ইতিহাস পুনর্লিখিত হয়। এই প্রক্রিয়ার আরেকটি অংশের মধ্যে রয়েছে ‘নিউজপিক’ নামে একটি নতুন ভাষা তৈরি করা এবং ‘ওল্ডস্পিক’ নামে পরিচিত বর্তমান ভাষা-রূপের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটানো। এই প্রক্রিয়াটি ২০৫০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল। পুরানো ভাষার তুলনায় নতুন ভাষাটি ব্যাখ্যামূলকভাবে ছোট হবে এবং আবেগ বা চিত্রকল্প বর্জিত থাকবে। উদাহরণস্বরূপ, ভাল এবং খারাপের সমস্ত প্রতিশব্দ এবং সেইসাথে খারাপ শব্দটিও বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাদের জায়গায় ভাল এবং অ-ভাল শব্দ ব্যবহৃত হবে। খুব ভালো বোঝাতে হলে ‘ডবলপ্লাসগুড’ বলতে হবে, আর খুব খারাপ বোঝাতে হলে ‘ডাবলপ্লাসগুড’ ব্যবহার হবে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই এইসব নতুন নতুন শব্দভান্ডার কঠোরভাবে নির্মিত হচ্ছে। সম্মান, নৈতিকতা, গণতন্ত্র এবং বিজ্ঞানের মতো শব্দসমূহ ভাষা থেকে সম্পূর্ণরূপে কেটে ফেলা হয়। "মেঝেটি আবর্জনা থেকে মুক্ত" -শুধুমাত্র এই ধরনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে মুক্ত শব্দটি বজায় রাখা হয়েছে কিন্তু টেলিস্ক্রিন শুধুমাত্র মানুষের উপর নজরদারি করেই ক্ষান্ত হয় না, তার চেয়েও বেশি কাজ করে ; এটি এমন একটি মাধ্যম যার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রচার তাদের জনগণের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। সারাদিন জুড়ে ইমানুয়েল গোল্ডস্টেইনের ঝলক, মানুষের শত্রু ‘টু মিনিটস হেইট‘ আকারে পর্দায় উপস্থিত হয়। এটি একটি নিউজপিক শব্দ যা একটি দুই মিনিটের সময়কালকে বর্ণনা করে যেখানে দৃশ্যাবলী এবং বর্ণনা বিশেষত মানুষের মধ্যে ভয় ও ক্রোধের গভীরতা তৈরি করে এবং বিগ ব্রাদারের সহযোগিতায় এটিকে লঘু করার কৃতিত্ব প্রকাশে তৈরি করা হয়। স্ক্রিনে গোল্ডস্টেইনের মুখ দেখা গেলেই চিৎকার, গালি গালাজ এবং বস্তু নিক্ষেপ করা হয়। তারপরে আবার সমস্বরে "বিবি" (বিগ ব্রাদারের সংক্ষিপ্তরুপ) জয়ধ্বনি চলতে থাকে। বিক্ষোভের সময় খুব শান্ত বা নির্লিপ্ত থাকার বিষয়টিও নিজের বিপদ ডেকে আনতে পারে। কারণ এতে থট পুলিশের সন্দেহ হতে পারে যে পার্টির সম্পূর্ণ সমর্থনে না থাকা ব্যক্তিই একমাত্র এমনতর করতে পারে।

প্রোলদের পাড়ায় থাকাকালীন তিনি একদিন পুরনো জিনিসপত্রের দোকানের মালিক মিস্টার চ্যারিংটনের সাথে দেখা করেন। তিনি একটি ডায়েরি কিনে আনেন, তারপর থেকে তিনি পার্টি এবং বিগ ব্রাদারের সমালোচনা লিখতে শুরু করেন। তারপর তিনি যখন একটি প্রোলদের কোয়ার্টার পরিদর্শন করেন তখন আতঙ্কিত অবস্থায় আবিষ্কার করেন যে তাদের কোন রাজনৈতিক চেতনা নেই। সত্য মন্ত্রণালয়ে কাজ করার সময় তিনি জুলিয়াকে দেখেন। যুবতী জুলিয়া মন্ত্রণালয়ের উপন্যাস-লেখার মেশিনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত। উইনস্টন তাকে একজন গুপ্তচর বলে সন্দেহ করেন, ফলে সেই যুবতীর প্রতি তার তীব্র ঘৃণা জন্মায়। তিনি তার ঊর্ধ্বতন একজন অভ্যন্তরীণ পার্টির কর্মকর্তা ও'ব্রায়েনকে অস্পষ্টভাবে সন্দেহ করেন। তিনি মনে করেন ও'ব্রায়েন হলো বিগ ব্রাদারের নিন্দিত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইমানুয়েল গোল্ডস্টেইনের ব্রাদারহুড নামে পরিচিত রহস্যময় গুপ্ত প্রতিরোধ আন্দোলনের সদস্য।

একদিন জুলিয়া গোপনে উইনস্টনকে একটি প্রেমের চিঠি দেয় এবং দুজনের মধ্যে একটি গোপন সম্পর্কের শুরু হয়। জুলিয়া ব্যাখ্যা করেন যে, তিনি পার্টিকেও ঘৃণা করেন। কিন্তু উইনস্টন লক্ষ্য করেন যে মেয়েটি রাজনৈতিকভাবে উদাসীন এবং শাসনকে উৎখাত করতে আগ্রহী নন। প্রাথমিকভাবে দেখা হওয়ার পর মিস্টার চ্যারিংটনের দোকানের উপর তলায় একটি ভাড়া ঘরে তারা উভয়ে মিলিত হন। সম্পর্কের সময় উইনস্টন ১৯৫০ সালের গৃহযুদ্ধের সময় তার পরিবারের অন্তর্ধান এবং তার বিচ্ছিন্ন স্ত্রী ক্যাথারিনের সাথে তার উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। কয়েক সপ্তাহ পরে, ও'ব্রায়েন উইনস্টনকে তার ফ্ল্যাটে আমন্ত্রণ জানান, সেখানে তিনি নিজেকে ব্রাদারহুডের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন এবং উইনস্টনকে গোল্ডস্টেইনের রচিত “দ্য থিওরি অ্যান্ড প্র্যাকটিস অফ অলিগার্কিকাল কালেকটিভিজম” -এর একটি অনুলিপি পাঠান। এদিকে জাতির ঘৃণা সপ্তাহের সময় সবার অলক্ষ্যে ওশেনিয়ার শত্রু হঠাৎ করে ইউরেশিয়া থেকে ইস্টাসিয়াতে পরিবর্তিত হয়। রেকর্ড বিভাগের নথিপত্রের প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে সাহায্য করার জন্য উইনস্টনকে মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়। উইনস্টন এবং জুলিয়া গোল্ডস্টেইনের বইয়ের কিছু অংশ পড়েন। কীভাবে পার্টি ক্ষমতা বজায় রাখে, পার্টির স্লোগানের প্রকৃত অর্থ এবং চিরস্থায়ী যুদ্ধের ধারণা ইত্যাদি বিষয়ে বইটিতে ধারণা দেয়া আছে।। এটি যুক্তি দেখায় যে পার্টির বিরুদ্ধে প্রোলরা জেগে উঠলে পার্টিকে নিপাতিত করা সম্ভব।। যাইহোক, যে অধ্যায়টিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে 'কেন' পার্টি ক্ষমতা বজায় রাখতে অনুপ্রাণিত, উইনস্টন কখনই সেই অধ্যায়টি পড়ার সুযোগ পান না ।

উইনস্টন এবং জুলিয়া ধরা পড়ে যান। তাদের উভয়কে বন্দী করা হয় কারণ মিঃ চারিংটন আদতে একজন গোপন থট পুলিশ এজেন্ট হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাদের আলাদা করা হয় এবং প্রেম মন্ত্রণালয়ে বন্দী করে রাখা হয়। ও'ব্রায়েন নিজেকে থট পুলিশের সদস্য এবং পার্টির রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের ধরার একটি ছদ্মবেশী অভিযানের সদস্য বলেও আত্মপ্রকাশ করেন। কয়েক মাস ধরে উইনস্টনকে কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তার বিশ্বাসকে পার্টির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য ক্ষুধার্ত রাখা হয় এবং তিনি বিরামহীন নির্যাতনের শিকার হন। ও'ব্রায়েন উইনস্টনকে বলেন যে তিনি কখনই ব্রাদারহুডের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পারবেন না। আর স্বৈরাচার গোল্ডস্টেইনের বইটি তিনি এবং পার্টির কতিপয় সদস্য মিলে যৌথভাবে লিখেছেন। পুনঃশিক্ষার চূড়ান্ত পর্যায়ে ও'ব্রায়েন উইনস্টনকে ১০১ নম্বর কক্ষে নিয়ে যান। ১০১ মূলত টর্চার সেল। এই কক্ষটিতে প্রত্যেক বন্দীর জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ শাস্তি অপেক্ষা করে। ইঁদুরের শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার পর উইনস্টন জুলিয়াকে দোষ দেন এবং পার্টির প্রতি আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি দেন। উইনস্টনকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং তিনি চেস্টনাট ট্রি ক্যাফেতে নিয়মিত যেতে থাকেন। তিনি এবং জুলিয়া মুখোমুখি হওয়ার পর উভয়ই স্বীকার করেন যে তারা পরস্পরের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন এবং আর প্রেমে নেই। ক্যাফেতে ফিরে একটি সংবাদ সতর্কতায় তিনি শুনতে পান যে, আফ্রিকায় ইউরেশীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ওশেনিয়ার কথিত বিশাল বিজয়ের গুণকীর্তন করা হচ্ছে। উইনস্টন অবশেষে স্বীকার করেন যে, তিনি বিগ ব্রাদারকে ভালবাসেন।

 ‘১৯৮৪’ উপন্যাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়সমূহের মধ্যে অন্যতম হল সেন্সরশিপ, বিশেষ করে সত্য মন্ত্রনালয়ের সেন্সরশিপ। যেখানে ফটোগ্রাফ এবং সর্বজনীন নথিপত্রসমূহ থেকে তাদের "অব্যক্তি" (পার্টি কর্তৃক ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা ব্যক্তি) করে দেওয়ার কাজটি নিপুণভাবে করা হয়৷টেলিস্ক্রিনের যাবতীয় উপস্থাপনার প্রায় সমস্ত পরিসংখ্যানই স্থূলভাবে অতিরঞ্জিত, অথবা বলা যায় কেবল একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি নির্দেশ করার জন্য বানোয়াট। এমনকি সেই সময়েও, যখন বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। অন্তহীন সেন্সরশিপের একটি ছোট উদাহরণ হল উইনস্টনকে একটি সংবাদপত্রের নিবন্ধে একজন অব্যক্তির উল্লেখ চেপে যাওয়ার জন্য অভিযুক্ত করা হয়। তিনি কমরেড ওগিলভি সম্পর্কে একটি নিবন্ধ লিখতেও অগ্রসর হন, ওগিলভি একজন নিবেতিপ্রাণ পার্টি সদস্য। তিনি "তিনি যে দস্তাবেজসমূহ নিয়ে যাচ্ছিলেন তা শত্রুর হাতে না পড়ুক- এই প্রত্যয়ে হেলিকপ্টার থেকে সমুদ্রে লাফ দিয়ে মহান বীরত্ব প্রদর্শন করেন।”

আজীবন সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী অরওয়েল এই ভেবে উদ্বিগ্ন ছিলেন যে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে অতিক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর লাগামহীন উত্থানের ফলে রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারে নিপীড়নের যন্ত্র। আপন মতপ্রকাশের যাবতীয় স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলতে পারে এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতাও লোপ হতে পারে ব্যক্তির। জনসাধারণের প্রতিটি পদক্ষেপে নজরদারির অবৈধ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে সরকার। এরপরও ভিন্নমত চর্চার কোনো চেষ্টা হলে, রাষ্ট্রযন্ত্র অফুরন্ত ক্ষমতা ও শক্তি ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি অথবা দলকে পিষে ফেলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। স্বৈরতন্ত্রের বিপদ সম্বন্ধে পৃথিবীর মানুষকে সাবধান করে দিতেই লেখা হয়েছিল নাইনটিন এইটি ফোর গ্রন্থটি। অরওয়েল কেবল সাবধান করেই পার পেয়েছিলেন। ১৯৫০ সালের ২১ জানুয়ারি মাত্র ৪৬ বছর বয়সে যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে লন্ডনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই খ্যাতিমান লেখক।