০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

শামসুর রাহমান : একটি অসামান্য কবিতা-জীবন

কুমার দীপ

Published : 24 Oct 2020, 01:06 PM

Updated : 23 Jun 2022, 03:58 PM


একজন শামসুর রাহমান বাংলাদেশের কবিতায় প্রায় অদ্বিতীয়। শুধু কাব্যিক ঐশ্বর্য নয়, যাপিত জীবনের প্রেক্ষাপটেও অসামান্য একটি কবিতা-জীবন অতিবাহিত করেছিলেন তিনি; বাঙালি কবিতাজীবন। অথচ বাল্য ও কৈশোরে বিশেষ কোনো সাংস্কৃতিক পরিমÐল পাননি তিনি। নিজেই বলেছেনÑ 'আমি মানুষ হয়েছি সাহিত্যছুট পরিবেশে। আমাদের পরিবারে সঙ্গীত ও চিত্রকলা সম্পর্কেও কারও কোনও আগ্রহ ছিল না।' [কালের ধুলোয় লেখা]। মাহুতটুলি এলাকায় তখন ঢাকাইয়া সংস্কৃতি বলতে উর্দু কাওয়ালি আর মেরিসানের গান চলতো। আর কবির বাড়িতে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে 'কোরান শরীফ' এবং 'বিষাদ সিন্ধু' ছাড়া অন্য কোনও বইয়ের প্রবেশাধিকার ছিলো না। আত্মজীবনীতে আফ্শোসের সুরেই লিখেছেনÑ 'আমি ঈর্ষা করি আজকের ছেলেমেয়েদের, যাদের কাছে সহজলভ্য সুকুমার রায়ের 'আবোলতাবোল', 'খাই খাই', 'হযবরল', উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর 'টুনটুনির বই', 'ছোটদের রামায়ণ', অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ক্ষীরের পুতুল', 'নালক', 'রাজকাহিনী', ইত্যাদি বই।' সাহিত্যের প্রতি সামান্যতম আকর্ষণহীন সেই পরিবেশে থেকে কীভাবে বাঙালি সংস্কৃতি ও বাংলা কবিতার দিকে ঝুঁকেছিলেন শামসুর রাহমান ?
প্রথম সূত্রটা বোধকরি অসাম্প্রদায়িকতার শিক্ষা, যা প্রথমত– পিতা এবং দ্বিতীয়ত– দুজন শিক্ষকের নিকট থেকে পেয়েছিলেন। কবি জানাচ্ছেন– 'অসাম্প্রদায়িক হবার শিক্ষা পেয়েছি আব্বার কাছে। তিনি কখনও হিন্দু-মুসলমান সমস্যাকে আমাদের সামনে বড় করে তুলে ধরেননি। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই যে এক মানবজাতির অন্তর্ভুক্ত এটা তিনি সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করতেন। মনুষ্যত্বের অধিকারী হতে পারাটাই ছিল তাঁর কাছে প্রধান বিবেচ্য।' দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া বাবার এই অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রন্থপাঠ থেকে আসেনি, আবহমান বাংলার পরিপার্শ্ব থেকে সহজাতভাবে প্রবেশ করেছিল। এ-কারণে শৈশব-কৈশোরে একাধিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হতে দেখলেও কবির জীবনে তার প্রভাব পড়েনি।
অসাম্প্রদায়িক চেতনা তৈরির ক্ষেত্রে পিতার পরে আসে বাল্যবন্ধু সূর্যকিশোর আর দুই প্রিয় শিক্ষক আবদুল আউয়াল ও চিন্তাহরণ সোম-এঁর কথা। কবি লিখেছেন– 'একথা আমাকে স্বীকার করতেই হবে, আজ আমি একজন প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি হয়ে উঠতে পেরেছি, তার ভিত্তিভূমিটি রচনা করেছিলেন আমার ছেলেবেলার গৃহশিক্ষক আবদুল আউয়াল। এই প্রসঙ্গে পোগোজ স্কুলের শিক্ষক চিন্তাহরণ সোমের কথা না বললে ঘোরতর অন্যায় হবে। তিনি একজন ভালো শিক্ষক তো ছিলেনই, অসাম্প্রদায়িক চেতনায়ও ঋদ্ধ ছিল তাঁর চিত্ত।' নাইনে পড়ার সময় গৃহশিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন আবদুল আউয়ালকে। তাঁর প্রগতিশীল কথাবার্তা, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে যুক্তিবাদী চিন্তাচেতনা কিশোর কবিমনে স্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের কথা, সাম্যবাদের কথা বলা এই আদর্শবান ও প্রগতিশীল এই শিক্ষকের কারণে 'অনেকের কাছে যা ছিল স্বতঃসিদ্ধ তা মেনে নেওয়ার প্রবণতা' রাহমানের মন থেকে উধাও হতে শুরু করলো। পরবর্তীতে ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে চলে যাওয়া এই শিক্ষকের নিকট থেকেই প্রায় শৈশবে রাহমান জেনেছিলেন মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা ও কারণ, উপলব্ধি করেছিলেন তাদের প্রতি মমত্ব। আর পোগোজ স্কুল, যেখানে ৮০০ ছাত্রের ভেতরে মাত্র ১০ জনের মতো মুসলিম ছিলো, সেই বিরূপ পরিবেশে অসাধারণ সুন্দর ইংরেজি পড়ানো শিক্ষক চিন্তাহরণ সোম কবিকে ¯েœহভরে কাছে টেনে নিয়েছিলেন এবং বাইরের বই পড়ার সুযোগ দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে ওঠার মন্ত্র দিয়েছিলেন। কলকাতা থেকে প্রকাশিত 'শামসুর রাহমানের গদ্যসংগ্রহ' গ্রন্থের একান্ত ভাবনা নামক আত্মস্মৃতিতে 'আমার মাস্টারমশাই' শিরোনামে চিন্তাহরণ সোমকে নিয়ে লিখেছেনÑ 'শ্রীযুক্ত চিন্তাহরণ সোমের স্মৃতি আমার মনে অত্যুজ্জ্বল।' 'পাথ অব পিস' বইটি পড়তে দেখা ব্যতিক্রম, নিঃসঙ্গ এই শিক্ষক সম্পর্কে কবি শামসুর লিখেছেনÑ 'আমি একথা নির্দ্বিধায় বলবো, আমার মাস্টারমশাই, চিন্তাহরণ সোমের মতো আদর্শবান শিক্ষক দুর্লভ।'
এই পোগোজ স্কুলে পড়ার সময় 'এক টুকরো কয়লার আত্মকাহিনী' প্রবন্ধ লিখে অন্যের নজর কেড়েছিলেন, 'দুর্ভিক্ষ' বিষয়ক প্রবন্ধ লিখে মনীন্দ্রচন্দ্র ভট্টাচার্য স্যারকে ব্যাপক খুশি করতে সমর্থ হন। এটাকে বোধহয় লেখালিখির ভ্রæণ বলে চিহ্নিত করা যায়। এরপরে বসন্ত রোগে ছোটো বোন নেহার মৃত্যু ৭ম শ্রেণিতে পড়া কবিকে প্রচÐ আঘাত করেছিল। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত'র 'ছিন্ন মুকুল' কবিতাটির ছায়া অবলম্বনে বোনকে হারানো কবি একসময় এই শোককে কেন্দ্র করে একটি গদ্যও লিখে ফেলেছিলেন, যা পড়ে শোনালে কবির মা খুব কেঁদেছিলেন।

তবে এরপরও কিন্তু শামসুর রাহমান লেখালিখিতে নিযুক্ত হননি, বরং চিত্রশিল্পী হতে চেয়েছিলেন। বাবুর বাজারের এক শিল্পী নঈম মিয়া, তার আঁকা দুলদুল ঘোড়াসহ বিভিন্ন ছবি দেখে মুগ্ধ শামসুর রাহমান ছবি আঁকা শিখতে চেয়েছিলেন তার কাছে। কিন্তু বালক শামসুরকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ না করে বরং শিল্পীর কঠিন ও করুণ পরিণতির কথা বলে তাকে প্রতিহত করেছিলেন।
যেহেতু সাহিত্য-বিচ্ছিন্ন একটি পরিবারে বেড়ে উঠছিলেন শামসুর রাহামান, তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিষয়ে প্রায় কোনো জানাশোনা বা আগ্রহ ছিলো না। এই সময়ের কথা স্মরণ করে লজ্জিত কবি বলেছেনÑ 'তখন নিচুক্লাসে পড়ি। একদিন ইশ্কুলে এসে ক্লাসরুমে বসেছিলাম যথারীতি। হঠাৎ ছুটি হয়ে গেল। কিসের ছুটি ? রবীন্দ্রনাথ মারা গেছেন, সে জন্য ছুটি। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর কথা শুনে দুঃখিত হইনি। বিন্দুমাত্র, বরং ছুটি পাওয়া গেল বলে আনন্দিত হই। রবীন্দ্রনাথ এবং মৃত্যু– উভয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতন ছিলাম, তাই সেদিন অমন একটি সবদিক অন্ধকার দেয়া সংবাদ শোনার পর বই বগলদাবা করে, শব্রি আম খেতে খেতে হাসিখুশি বাড়ি ফিরছিলাম।' রবীন্দ্রনাথের বিশালত্ব সম্পর্কে প্রথম ধারণা করতে শুরু করেন ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরে, হাতের কাছে পাওয়া 'রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ, দ্বিতীয় খণ্ড' পড়ে। তন্ময় হয়ে বিকাল থেকে গভীর রাত অবধি পড়তে পড়তে মনে হলো, 'এই গল্পগুলো কোনও মানুষের লেখা নয়, নিশ্চয় কোনও ফেরেশতা কিংবা দেবতা এসব কাহিনীর স্রষ্টা।' প্রথমবারের মতো শামসুর রাহমান সচেতন হলাম রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে। অনুপম এক মুগ্ধতাবোধ তাকে কৌত‚হলী করে তুলল রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য লেখা সম্পর্কে। শুরু হলো সন্ধান। এই সন্ধানের সূত্র হিসেবে নিজ উদ্যোগেই পাটুয়াটুলির রামমোহন লাইব্রেরির সদস্য হয়েছিলেন শামসুর রাহমান। পাঠস্পৃহা বাড়ার সাথে সাথে বঙ্কিমচন্দ্র ও শরৎচন্দ্রের রচনার সঙ্গেও পরিচয় হয় রাহমানের।
কিন্তু কবির এই পাঠস্পৃহাসমূহের পুরোটাই তো গদ্যকন্দ্রিক; তাহলে তিনি আসলে যা, সেই কবিতা ? কবিতার কাছে এসেছেন আরও একটু পরে, উর্দুভাষী বড়ো ভাবি জাহানারা বেগমের সহযোগিতায়। জাহানারা ভাবি তাকে গালিব প্রভৃতি কবির কবিতা পাঠ ও ব্যাখ্যা করে শুনিয়েছেন অনেক সন্ধ্যায়। এর অর্থ– বোধকরি বাংলা নয়, রাহমানের কবিতাপ্রেম শুরু হযেছিল উর্দু কবিতা দিয়ে।

কবিতার দিকে যাত্রা

কবি হিসেবে শামসুর রাহমানের চর্চাটা ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময়েই পেয়ে বসে। এসময় বিখ্যাত রাজনৈতিক নেতা তাজউদ্দিন আহমদের বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়েছেন, বন্ধুত্ব হয়েছে পরবর্তীকালের আরেক বিখ্যাত নেতা জিল্লুর রহমানের সঙ্গে, যিনি কি না শামসুর রাহমানকে 'আপনি কি লেখেন ?' প্রশ্ন করে লিখতে না শুরু করা একটা ছেলেকে পরোক্ষভাবে লেখার জন্য উস্কে দেন। তখন রাহমান রোমা রঁলার 'জাঁ ত্রিস্তফ' এর মতো বই পড়ছিলেন রাত জেগে, অন্যদিকে সিলেবাসের বই এবং কলেজের ক্লাসের প্রতি দেখাচ্ছিলেন চরম অবহেলা। ঢাকা কলেজের আরেক শিক্ষক মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন, যিনি বিখ্যাত 'হারামণি'র সংগ্রাহক, বাংলা পড়াতেন, শামসুর রাহমানকে খুব স্নেহ তো করতেনই, এমনকি সদ্য কবিতার জগতে পা রাখা রাহমানের কবিতারও ভক্ত ছিলেন। একবার কবিকে একটি লাল গোলাপ দিয়েছিলেন কবিতার জন্য। আত্মজীবনীতে রাহমান বলেছেন, 'তিনি যখন সস্নেহে একটি রক্ত গোলাপ আমার হাতে তুলে দিয়েছেলেন, তখন আমি কোনও পুরস্কারই পাইনি। পরবর্তী জীবনে আমি বহু পুরস্কার পেয়েছি। সেসব পুরস্কারের সবগুলোর কথা আমার মনেও পড়ে না, অথচ হারামণি গ্রন্থের প্রণেতা প্রদত্ত গোলাপটির কথা কস্মিনকালেও ভুলব না।' এইসময়ে কাছে ডাকছেন শিল্পী হামিদুর রহমান এবং কারণ হিসেবে বলছেন– শামসুরকে তাঁর লেখক মনে হয়। এই হামিদুর রহমানের বাসায় সাংস্কৃতিক আড্ডায় একে একে কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ, চিত্রকর আমিনুল ইসলাম, চিত্রকর মর্তুজা বশীর, কবি বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আশরাফ আলী প্রমুখ পরবর্তীকালের বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের সাক্ষাৎ পান এবং বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। আশরাফ আলীর ইংরেজি সাহিত্যের সংগ্রহ ও বিভিন্ন ইংরেজ কবির কবিতা আবৃত্তিতে মুগ্ধ হয়ে পরবর্তীতে ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চতর পড়ালেখার প্রেরণা পেয়েছিলেন রাহমান। এবং হামিদুর রহমানের বাসাতেই দেখেছিলেন রবীন্দ্র রচনাবলীর সুদৃশ্য সেট। এই হামিদের তাগিদেই প্রথম কবিতা পাঠিয়েছিলেন পত্রিকায়। সেকথা স্মরণ করে লোকান্তরিত বন্ধুটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শামসুর লিখেছেন,
তারই তাগিদে আমার একটি কবিতা সেকালের বিখ্যাত সাপ্তাহিক পত্রিকা 'সোনার বাংলা'য় দাখিল করি। 'সোনার বাংলা'য় এক সময় জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং অন্যান্য নামজাদা লেখক লিখতেন। আমার অক্ষম লেখা কে ছাপাবে, একথা হামিদকে বললেই সে জবাব দিত, 'পাঠিয়েই দেখ না, আমার বিশ্বাস, লেখা ছাপা হবেই।' কী আশ্চর্য, আমার কবিতা ১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি 'সোনার বাংলা'য় প্রকাশিত হলো। সেই দিনটি আমার স্মৃতিতে অম্লান হয়ে রয়েছে। সেদিন আমার চেয়ে বেশি আনন্দিত হয়েছিল হামিদ। [ কালের ধুলোয় লেখা ]
'সোনার বংলা'য় কবিতা মুদ্রিত হওয়ার সূত্র ধরেই রাহমানের জীবনে আসেন আরেক বন্ধু, কবি হাসান হাফিজুর রহমান। বয়সে রাহমানের চেয়ে দু'বছরের ছোটো হলেও লেখালিখির জগতে সিনিয়র, স্নিগ্ধ ও বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার এই লেখকের সঙ্গে সদরঘাটের একটি দোকানে প্রথম দেখা হয় শামসুরের। পরবর্তীতে তাঁদের বন্ধুত্ব তো আরেক ইতিহাস। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীসহ আরও অনেক ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে এই কলেজ অধ্যয়নকালেই।

কবিতাই মুখ্য, কবিতাই লক্ষ্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে সম্মান ভর্তি হওয়ার পরে বন্ধু হিসেবে পান জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীকে। পরবর্তীকালের বিখ্যাত পণ্ডিত-অধ্যাপক এই বন্ধুর নিকট থেকে জীবনানন্দ দাশের 'রপসী বাংলা' ধার নিয়ে সারারাত জেগে পড়েছিলেন। রাহমানের তখনকার অনুভূতি ছিলো– 'এরকম কবিতা আমি আগে কখনও পড়িনি। এরপরই আমি জীবনানন্দ দাশের অনুরক্ত হয়ে পড়ি।' শুধু জীবনানন্দ নয়, ধীরে ধীরে পুরো কাব্যজগৎ, বিশেষ করে তিরিশের কবিতার প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন কবি। এবং নিজের কবিতানিমগ্নতাও এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, অনার্স পরীক্ষা দেওয়া হয় না এবং একাধিকবার খামখেয়ালিপনার জন্য ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স ডিগ্রিও অর্জন করা সম্ভব হয় না। পরে পাশ কোর্স থেকে বিএ উত্তীর্ণ হয়ে এমএ-তে ভর্তি হওয়ার পরে প্রথম পার্ট পরীক্ষা দিলেও দ্বিতীয় পার্ট পরীক্ষা না-দিয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করেন। বলা যায়, কবিতার জন্য একটি সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার-জীবনের হাতছানি অবহেলা করে এক অনিশ্চয়তার জীবনে প্রবেশ করেন কবি। ছাত্র হিসেবে কৃতিত্বের ঝলক দেখাতে না পারলেও কবিতা রচনার ক্ষেত্রে কিছু কিছু সাফল্য ধরা পড়েছিল সে-সময়ে, সেকথা বলাই বাহুল্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে কবির শিক্ষক অমিয়ভূষণ চক্রবর্তীও আগামীর কবিকে চিনতে পেরেছিলেন। এই স্যারের আহ্বানে 'কয়েকটি দিন, ওয়াগনে' শিরোনামে দেশবিভাগের সূত্র ধরে পশ্চিম বাংলা থেকে আসা কিছু রিফিউজি, যারা রেলের পরিত্যক্ত ওয়াগনে থাকতো, তাদের নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন শামসুর রাহমান। কবিতাটি নিজের প্রকাশিতব্য পত্রিকায় প্রকাশের জন্য আরেক স্যার সৈয়দ নুরুদ্দিন তরুণ কবিকে ২৫ টাকা সম্মানী দিয়েছিলেন, পরে এই কবিতাটি অনিল সিংহ সম্পাদিত, কলকাতা থেকে প্রকাশিত 'নতুন সাহিত্য' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। গান আকারে এটি পাকিস্তান রেডিওতে গীতও হয়। কিন্তু এই কবিতাটি হারিয়ে যাওয়ায় পরবর্তীতে কোনো কাব্যে অন্তর্ভূক্ত হয়নি।

আমরা জানি, যারা নিজস্ব মেধা, শ্রম ও প্রতিভার দ্বারা শিল্প-সাহিত্য, দর্শন-বিজ্ঞান ইত্যাদিতে কিংবদন্তিতুল্য স্বীকৃতি অর্জন করেছেন, তাদের প্রায় কেউই একাডেমিকভাবে খুব উজ্জ্বলতর রেকর্ডের অধিকারী ছিলেন না। শামসুর রাহমানের মতো মানুষও যে শেষ পর্যন্ত একাডেমিক ক্যারিয়ার নয়, কবিতায় থিতু হবেন, এটাই স্বাভাবিক।
১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত 'সংস্কৃতি সংসদ'-এ এবং পরে 'প্রগতি লেখক সংঘ'-র আয়োজনে বিভিন্ন আসরে বিখ্যাত সব ব্যক্তির সম্মুখে কবিতা পড়তেন শামসুর রাহমান। 'প্রগতি লেখক সঙ্ঘের' শেষ সভাতে পড়া 'কোনও এক নিমগ্ন শহরকে' কবিতা শুনে মুস্তফা নূরউল ইসলাম বলেছিলেন, 'আজ থেকে আমাদের কবিতা নতুন মোড় নিল। এই কবিকে ধন্যবাদ জানাই।' পরে এই কবিতাটি ফজলে লোহানী ও নূরউল ইসলাম সম্পাদিত সম্পাদিত 'অগত্যা' পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।
এরমধ্যে দু-একটি কাব্য-উদ্যোগের সাথে নিজেও জড়িয়েছেন, যেমন– 'নতুন কবিতা'। আমরা জানি, বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল পঞ্চাশের দশকের এই 'নতুন কবিতা' সংকলনটি। ১৯৫০ সালে প্রকাশিত পূর্ববাংলার প্রথম এই আধুনিক এই কাব্যসংকলনটির সম্পাদক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী ও আবদুর রশীদ খান। 'কালের ধুলোয় লেখা'তে পাই :
সেকালের আমরা ক'জন তরুণ আরমানিটোলা মাঠে এক পড়ন্ত বিকেলে বসে বাদাম চিবোতে চিবোতে 'নতুন কবিতা' প্রকাশে উদ্যোগী হই। যতদূর মনে পড়ে, সঙ্কলনটির নাম আমি প্রস্তাব করেছিলাম। 'নতুন কবিতা' শুরু হয়েছিল হাবীবুর রহমানের কবিতা এবং শেষ হয়েছিল তরুণতম বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের কবিতা দিয়ে। প্রত্যেক কবির চার কিংবা পাঁচটি কবিতা সঙ্কলিত হয়েছিল। প্রত্যেক কবির কবিতাবলীর আগে ছোট ভূমিকা লিখেছিলেন মোহাম্মদ মামুন।
আত্মজীবনীতে, আরও পরে লিখেছেনÑ 'সঙ্কলিত কবিদের প্রত্যেকের কাছ থেকে পঁচিশ টাকা চাঁদা সংগ্রহ করে ওয়ার্সি বুক সেন্টারের কিঞ্চিৎ সহায়তায় নতুন কবিতা প্রকাশিত হয়।'

রূপালি স্নান, বুদ্ধদেব বসু এবং স্বীকৃতির রোদ
সেকালের বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত 'কবিতা'য় শামসুর রাহমানের 'রূপালি স্নান' কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই শামসুর রাহমানের কবিস্বীকৃতি নিশ্চিত হয়ে যায়Ñ আমরা অনেকেই একথা জানি। কিন্তু এই কবিতাটির পিছনের ইতিহাসও কিছুটা জানা দরকার বাংলাদেশের কবিতাপাঠকদের। এক ভোরে সমাপ্ত হলে, সদ্য লেখা 'রূপালি স্নান' কবিতাটি নিয়ে আনন্দচিত্তে 'দৈনিক সংবাদে'র সাহিত্য সম্পাদকের টেবিলে জমা দিয়ে আসেন শামসুর। ততদিনে এই পাতায় বেশকিছু কবিতা প্রকাশিত হয়েছে কবির। সাহিত্যপাতার দায়িত্বে ছিলেন কবি আবদুল গনি হাজারী। কিন্তু পরের দিন সংবাদের অফিস থেকে রাহমানের ডাক এলো। সাহিত্য সম্পাদকের উপস্থিতিতে সম্পাদক খায়রুল কবির কবিতাটির পাÐুলিপি কবির দিকে দিয়ে জানালেন, লাল কালি চিহ্নিত শব্দগুলো বদলে দিলে ছাপানো যেতে পারে। শামসুর রাহমান তখন হয়তো আবেগী হয়ে উঠেছিলেন, তাতে হয়তো কষ্ট ছিলো, রুষ্টতার ছাপ ছিলো। কম্পিত গলায় বললেন, 'আমি শব্দগুলো বদলাব না।' এরপর কবিতাটি 'দৈনিক সংবাদ' থেকে ফেরত এনে হুবহু আরেকটি কপি করে বন্ধু কায়সুল হকের কথা স্মরণ করে সে-যুগের বিখ্যাত কবি-সম্পাদক-সমালোচক বুদ্ধদেব বসু বরাবর পাঠিয়ে দিলেন কবিতাটি। এপ্রসঙ্গে কবির নিজের জবানিটাই চমৎকার :
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, 'রূপালি স্নান'-এর কয়েকটি জায়গা লাল কালি লাঞ্ছিত হওয়ায় আমি অসন্তুষ্ট হয়েছিলাম। তবে এই অপ্রীতিকর ঘটনাটি আমার জন্য শাপে বর হয়েছিল। সেই ক্ষতবিক্ষত পাÐুলিপি ফেরত নিয়ে এসেই আমি তাড়াতাড়ি 'রূপালি স্নান'-এর একটি নতুন কপি করে বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত 'কবিতা' পত্রিকার ঠিকানা ২০২ রাসবিহারী এ্যাভিনিউ, কলকাতা ২৯-এ রওনা করে দিলাম। মনে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছিল কবিতা বিষয়ে। কিন্তু আমাকে অবাক এবং উৎফুল্ল করে দিয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই খোদ বুদ্ধদেব বসুর একটি চিঠি পেলাম। [ কালের ধুলোয় লেখা ]
এরপর 'মনে মনে', 'তার শয্যার পাশে' ইত্যাদি কবিতা পঞ্চাশের দশকে বুদ্ধদেব বসুর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। উল্লেখ্য, 'মনে মনে', ও 'তার শয্যার পাশে' কবিতাদুটি দিয়েই শুরু হয়েছিল ১৯৫২ সালের জুন মাসের 'কবিতা' সংখ্যাটি। বুদ্ধদেব বসুর কবিতাভবনে বসে স্বয়ং সম্পাদকের কণ্ঠে সেই স্মৃতিচারণ শুনেছিলেন শামসুর রাহমান। সেই সংখ্যায় বিষ্ণু দে, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, অশোকবিজয় রাহা, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মণীন্দ্র রায়, অরুণ কুমার সরকার প্রমুখের কবিতা থাকা সত্তে¡ও সঞ্জয় ভট্টাচার্যের পরামর্শে শ্রেষ্ঠ কবিতা হিসেবেই উক্ত কবিতাদুটিকে সবার উপরে স্থান দিয়েছিলেন সম্পাদক।
শুধু কি বুদ্ধদেব বসু ? কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্যও শামসুর রাহমানের কবিতা অত্যন্ত মর্যাদার সাথেই প্রকাশ করতেন। তাঁর বিখ্যাত 'পূর্বাশা' পত্রিকার প্রত্যেকটি সংখ্যা শুরু হতো একটি উৎকৃষ্ট প্রবন্ধ দিয়ে। একবার শামসুর রাহমানের 'এ্যাপোলোর জন্যে' কবিতাটি দিয়েই শুরু হয়েছিল একটি সংখ্যা। একথা স্মরণ করে রাহমান লিখেছেন, 'আমার পরম সৌভাগ্য যে, আমি বুদ্ধদেব বসু এবং সঞ্জয় ভট্টাচার্যের মতো সাহিত্যস্রষ্টা ও গুণীজনের প্রশংসা এবং স্বীকৃতি পেয়েছি একজন তরুণ কবি হিসেবে।' বলা বাহুল্য, এসব স্বীকৃতি শামসুর রাহমানকে অত্যন্ত উদ্দীপ্ত করেছিল এবং আরও গভীর মনোযোগে কবিতার নান্দনিক সাগরে ডুব দিতে প্রেরণা যুগিয়েছিল।

রাজনৈতিক কবিত কিংবা কবিতায় রাজনীতি
একটি বিষয় উল্লেখ করবার মতো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়, চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে দেশভাগসহ একাধিক বড়ো রাজনৈতিক ঘটানসত্ত্বেও রাজনীতিতে যুক্ত কিংবা রাজনীতি সম্পর্কে বিশেষ সচেতন ছিলেন না শামসুর রাহমান। তবে রাজনীতি সচেতন বন্ধু ও অন্য মানুষের সংস্পর্শে থাকা, তাদের মঙ্গল কামনা এবং প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার সাথে কবির পরিচিতি ছিলো প্রথম থেকেই। ১৯৩৭ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময়েই তিনি চিহ্নিত করেছিলেন মানুষের দীনতাকে। প্রকৃতপক্ষে, রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হয়েও প্রগতিশীলতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চায় নিয়োজিত ছিলেন কবি। মানসিক সঙ্কীর্ণতা, কুসংস্কার, চিন্তাক্ষেত্রে পশ্চাদ্মুখীনতা এবং মানুষের অকল্যাণ তাকে পীড়িত করত। কোনো রাজনৈতিক দলে নাম লেখানো কিংবা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক মত প্রকাশ করা রাহমানের স্বভাবে ছিলো না। অবশ্য দলীয় রাজনীতির বিষয়ে তাঁর অনীহা থাকলেও যে রাজনীতি মানুষের সব রকম বন্দিত্বকে ঘুচিয়ে দেয়, যে রাজনীতি প্রগতিশীল চেতনায় সমুজ্জ্বল, যে রাজনীতি পশ্চাদ্পদতাকে পরিহার করে, যে রাজনীতি মানুষের সার্বিক কল্যাণে নিয়োজিত, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সেই মতাদর্শের পক্ষে থেকেছেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। আর কবিতায় রাজনীতি সংশ্লিষ্টতা তাঁর আদর্শের মধ্যে ছিলো না। প্রথম জীবনে তিরিশের কবিদেরকে আদর্শ মানা কবি ভাবতেন কবিতা কেবল শিল্প ও সুন্দরের সাধনা, সেখানে রাজনীতির প্রবেশাধিকার নেই। রবীন্দ্রনাথের 'সমাজ সংসার মিছে সব' ধরনের রোমান্টিকতাও ছিলো তাঁর ভেতরে। তবে কবিতার এই আদর্শ তিনি ধরে রাখতে পারেননি, একসময় তাঁর কবিতায় হুড় হুড় করে রাজনীতি প্রবেশ করে। এবং তা অনিবার্যভাবেই।

১৯৫৮ সালের ৭ই সেপ্টেম্বরের সামরিক আইন জারি করে, সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সংকটাপন্ন করে ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল আইয়ুব খান। এসময়ই প্রথমবারের মতো প্রতিবাদী ধারার কবিতা লেখেন শামুসর রাহমান। 'হাতির শুঁড়' নামে সেই কবিতাটিতে সামরিক জান্তা আইয়ুবের হঠাৎ ক্ষমতাগ্রহণের বিষয়টি রূপকের আড়ালে তুলে ধরেন। সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত 'সমকাল' পত্রিকায় এই কবিতাটি ছাপা হলে অগ্রজ কবি শওকত ওসমান কবিকে টেলিফোন করে বলেন, 'শামসুর রাহমান, তোমার 'হাতির শুঁড়' কবিতাটি পড়ে খুশি হয়েছি। তোমার ভাগ্য ভালো যে, দেশের রাজা এবং তার খাস সভাসদরা বাংলা ভাষা জানে না।' কবিতাটির শেষ স্তবকে আছেÑ
প্রাক্তন সেই ভেল্কিবাজির মন্তরে
যাচ্ছে চেনা অনেক সাধু-সন্তরে !
সেই চালে ভাই মিত্র কি-বা শত্তুর
চলছে সবাইÑ মস্ত সহায় হাতির শুঁড়।
পাক-শাসকেরা বাংলা জানলে যে কবির গর্দান থাকতো না, সেকথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন শওকত ওসমান। মূলত, ষাটের দশক থেকে শামসুর রাহমানের কবিতায় রাজনীতি ছায়া ফেলতে শুরু করে। কিন্তু রাজনীতির কারণে কবিতা যাতে শ্লোগানধর্মী না-হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি ছিলো সর্বদা। কবি নিজেই বলেছেনÑ
কিন্তু কবিতা যেন শ্লোগানধর্মী হয়ে না ওঠে, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি ছিল আমার গোড়া থেকেই। কোনও কোনও বিষয় আছে যেগুলোকে কবিতা করে তোলা খুবই কষ্টসাধ্য। কোনও কষ্টসাধ্য ব্যাপারকে সফল সফল করে তোলার মধ্যে এক ধরনের নান্দনিক আনন্দ লাভ হয়। [ কালের ধুলোয় লেখা ]
ষাটের দশকের পর থেকে একুশ শতকের সূচনালগ্ন পর্যন্ত, আমৃত্যু শামসুর রাহমানের কবিতা রাজনীতি থেকে আর দূরে থাকেনি। কিন্তু সেই রাজনীতি অবশ্যই দলীয় কোনো রাজনীতি নয়, সামষ্টিক মানুষের আনন্দ-বেদনা, আশা-হতাশার রাজনীতি। ১৯৬১ সালে রেডিও-টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ হলে, ১৯৬৪-তে পাকিস্তান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সংখ্যালঘু হত্যা ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির পাঁয়তারা শুরু হলে কিংবা ১৯৬৬-তে ছয়দফা ও তার প্রেক্ষাপটে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হলে কবির কলম থেমে থাকেনি প্রতিবাদের পঙ্ক্তিমালা থেকে। আর ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে আসাদ শহিদ হলে 'আসাদের শার্ট' শিরোনামে যে কবিতা লেখেন, তা-তো ইতিহাসেই জায়গা করে নিয়েছে। ঊনসত্তর থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত অনেক অনেক রাজনীতি সচেতন কবিতা লিখেছেন শামসুর রাহমান। অনেকটা অনিবার্য কারণে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে না-পারলেও যুদ্ধ চলাকালীন রচনা করেছিলেন 'স্বাধীনতা তুমি', 'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা', 'তুমি বলেছিলে' প্রভৃতি অবিশ্বাস্য সব কবিতাগুচ্ছ, যা কলকাতা থেকে 'মজলুম আদিব' (যার অর্থÑ নির্যাতিত লেখক। নামটি বিখ্যাত সাহিত্য-সমালোচক আবু সয়ীদ আইয়ুবের দেওয়া ) ছদ্মনামে প্রকাশিত হয় এবং 'বন্দী শিবির থেকে' নামের কাব্যে অন্তর্ভূক্ত হয়। ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্টের অবিশ্বাস্য ট্রাজেডির পরেও লিখেছেন কবিতা, আর নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নিজে যেমন সরাসরি সম্পৃক্ত হয়েছেন, তেমনি গণতন্ত্রের দাবিতে শহিদ নূর হোসেনকে নিয়ে লিখেছেন 'বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়' নামে আরও এক ল্যান্ডমার্ক কবিতা। এমনকি ২০০১ সালের নির্বাচনপরবর্তী সংখ্যালঘু নির্যাতনের ভয়াবহতাও তাঁর কবিতায় চিত্রিত হয়েছে অসাধারণ দরদের সাথে। কিন্তু প্রায় কোথাও শ্লোগানকে জায়গা দেননি তিনি, ক্ষোভের আবেগে কাউকে অশ্লীল গালি দেননি কবিতায়; প্রায় সবখানেই কবিতার শর্ত বজায় রাখার সচেতন প্রয়াস রেখেছেন।

আমরা প্রায় সকলেই জানি, ১৯৬০ সালের গোড়াতে প্রকাশিত হয় শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্য 'প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে'। কথাটি সত্য, তবে ভিন্নটিও হতে পারতো; তাঁর প্রথম কাব্যের নাম হতে পারতো 'মেধাবী রাতের নদী'। এই নামে প্রথম বইয়ের পাÐুলিপি প্রস্তুত করেও চূড়ান্ত মুহূর্তে নিজেই ছিঁড়ে ফেলে দেন এর কবিতাগুলো; যদিও সেই পাÐুলিপিতে 'পূর্বাশা', 'নতুন সাহিত্য', 'উত্তরসুরী', এবং 'দেশ'-এর মতো পত্রিকায় মুদ্রিত কিছু কবিতাও ছিলো। কবিতা বিষয়ে শামসুর রাহমানের কতটা পারফেকশন ছিলো, তা এই ঘটনা থেকে পরিষ্কার হওয়া যায়। তবে একথাও সত্য যে, এই ঘটনার কারণে বাংলা কবিতার পাঠকেরা 'মেধাবী রাতের নদী' নামে একটি কাব্য পাঠ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, যা-কি না কবির প্রস্তুতিপর্বকে চিনতে আরও অধিক সহায়ক হতো।

শামসুর রাহমান প্রায় প্রথম থেকেই কবিতায় তাঁর লক্ষ্যের ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। প্রথম কাব্য প্রকাশের পরে যাতে একই ধরনের কবিতার পুনরাবৃত্তি না-হয়, সেজন্যে বিষয় ও আঙ্গিকে বদল আনতে সচেষ্ট ছিলেন। দ্বিতীয় কাব্য 'রৌদ্র করোটিতে' (১৯৬৩) প্রকাশিত হলে একথার প্রমাণ মেলেও বৈকি। স্বদেশি পাকপন্থীদের প্রতিবন্ধকতাসত্তে¡ও এই কাব্যের জন্য 'আদমজী পুরস্কার' লাভ করেছিলেন কবি। এরপর 'বিধ্বস্ত নীলিমা' (১৯৬৭), 'নিরালোকে দিব্যরথ' (১৯৬৮) পেরিয়ে তিনি প্রত্যাবর্তন করেন 'নিজ বাসভূমে' (১৯৭০)। প্রত্যাবর্তন বললাম এজন্যেই যে, ওই পূর্বকথিত রাজনীতি সংশ্লিষ্টতা বা রাজনীতির চেতনাসমৃদ্ধ কবিতগুলো প্রথম সাড়ম্বড়ে জায়গা করে নেয় এই কাব্যটিতে। কেবলমাত্র শিল্প-সুন্দরের আরশি থেকে কবিতার আকাশগামী রথটিকে ধুলো-কাদাময় মৃত্তিকার বুকে নামিয়ে আনেন কবি। এবং এরপর থেকে প্রেম-শিল্প-সুন্দরের পাশাপাশি রাজনীতি ও মানব-কল্যাণের মন্ত্রগুলো অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যের সাথেই জায়গা করে নেয় রাহমানের কবিতায়।

প্রেমে-বিরহে-আবেগে কবিতাসুন্দরীকে

প্রায় শুরুতে বলবার চেষ্টা করেছিলাম, কবিতার প্রতি ভালোবাসার জন্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও ছাত্রত্বের সাধারণ ধর্ম ধরে রেখে ভালো ফল লাভ করা কিংবা উন্নত ক্যারিয়ারসমৃদ্ধ একটি জীবনের হাতছানিকে অগ্রাহ্য করেছিলেন। কিন্তু কবিরও তো সংসার থাকে, স্ত্রী-কন্যা-পুত্র থাকে, নানারকমের চাহিদা থাকে; তাই জীবিকার প্রয়োজনে কিছু তো একটা করতে হয়। বাংলা সাহিত্যের আরও অনেক কবির ন্যায় শামসুর রাহমানও বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতাকে। তাতে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে না-হলেও সংসারের হাল চলেছে মোটামুটি। কিন্তু এরশাদের আমলে 'দৈনিক বাংলা'র সম্পাদক থেকে পদত্যাগের পর দু-একটি পত্রিকাতে কাজ করলেও কোথাও থিতু হননি। ফলত, শেষ জীবনের প্রায় পনেরো বছর সৃজনশীল কলমের উপরে নির্ভর করেই কাটাতে হয়েছে কবির, যা অনেকটাই দারিদ্র্যরেখাপীড়িত।

কিন্তু শামসুর রাহমান সাংবাদিকতা করেই জীবনের অধিকাংশ সময় জীবিকা নির্বাহ করেছেন, সেখানেও কি খুব সাংবাদিকতাধর্মমনস্ক ছিলেন ? না। কবি নিজেই বলেছেন– 'নিজের কবিসত্তাকে টিকিয়ে রাখার প্রেরণায় জীবিকার অবলম্বনকে স্বেচ্ছায় কিছুটা হলেও অবহেলা করেছি। যতটুকু কাজ করলে চাকরি বজায় থাকে তা করেছি, বাকি সময় অর্পণ করেছি অপরূপ সুন্দরী কিন্তু অমনোযোগ-বিদ্বেষী কবিতা নাম্নাী দেবীকে।' এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশে যখন তিনি 'দৈনিক বাংলা'র সম্পাদক, অফিস এবং অফিসের বাইরে প্রচুর পরিশ্রম ব্যস্ততার পরও কবিতাকে ছাড়েননি। রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়েছেন কবিতার জন্য।
বস্তুত, কবিতাই ছিলো শামসুর রাহমানের ধ্যান-জ্ঞান। কবিতাচর্চায় বিঘ্ন ঘটতে পারে বলেই হয়তো রাজনীতি ও সংগঠন থেকে দূরে থাকতেন তিনি। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতেন সেখানেও প্রাধান্য থাকতো কবিতার। এমনকি লেখার সময় যাতে অলসতা বা নিদ্রা পেয়ে বসতে না পারে, সেজন্য বসে বসেই লিখতেন তিনি। আত্মজীবনীতে লিখেছেন– 'জীবনে লেখাকেই ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম। কখনও ঘরের কোণে টেবিলে ঝুঁকে, কখনও-বা বিছানায় শুয়ে বালিশে বুক পেতে লিখতাম অনেক আগে। এখন টেবিলে ঝুঁকেই লিখি। বিছানায় গা এলিয়ে লেখার বিলাসিতাটুকু বর্জন করেছি ঘুমের কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায়।' কবিতা নিয়ে কী পরিমাণ নিষ্ঠা ছিলো শামসুর রাহমানের সেকথা 'কালের ধুলোয় লেখা'র একাধিক স্থানে উল্লেখিত আছে। নিরলস সাধনা আর শ্রমেই যে তিনি একের পরে এক গড়ে তুলেছেন কাব্য ইমারত, তা অনুধাবন করা যায় তাঁর কথাতেই–
যত ঘোরাঘুরিই করতাম, আড্ডা দিতাম, কবিতাকে অবহেলা করিনি কোনও দিন। কারণ, কাব্যলক্ষী যে বিন্দুমাত্র অমনোযোগ কিংবা অবহেলা বরদাশত করেন না, তা আমার জানতে বাকি ছিল না। যখন যেখানেই যাই না কেন, ইয়ারদের সঙ্গে যত গল্পগুজবে মেতে থাকি না কেন, হঠাৎ দৃষ্টিপথে ভেসে উঠত কাব্যলক্ষীর উপসিস্থিতি। আসরের অন্য কেউ টের পাক আর না-ই পাক আমি স্পষ্টতই দেখতাম, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন আমার সামনে, তার দৃষ্টিতে কখনও ক্রোধ, কখনও অভিমান, কখনও অভিমান, কখনও-বা কোমল মধুর হাসি। আমি যতদূর সম্ভব তার প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছি, বুঝি তাই তিনি হাজির হয়েছেন আমার চলার পথে, আমার বিশ্রামের প্রহরে, বিনিদ্র রাত্রির অন্ধকারে, সুখে, অসুখে। অনুপম আলিঙ্গনে আমাকে বেঁধেছেন অক্লান্তভাবে।

কাব্যদেবীকে প্রেমে-বিরহে-আবেগে বেঁধেছেন শামসুর রাহমান। কখনও প্রেমিকা, কখনও দেবী রূপে কবির হৃদয়ে ধরা দিয়েছেন তিনি। শাদা খাতার পিঠে একের পর এক এঁকে গেছেন কাব্যদেবীর রূপলাবণ্য। অসীম ব্যাকুলতা আর উদ্বিগ্নতায় রাতের রাতের পর রাত জেগে, হৃদয়কে ক্ষত-বিক্ষত করে যে কাব্য রচনা করেছেন কবি, তাকি সত্যিই অক্ষয় কাব্যকুসুম হয়ে টিকে থাকবে, নাকি মিলিয়ে যাবে কালের স্রোতে?- একথাও ভেবেছেন কবি। একথার উত্তরে নিজেই আবার বলেছেন, 'কাল যে বড় নির্দয়, বড় উদাসীন। তবু যে লেখনীকে সক্রিয় রাখতে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করি তার কারণ, সাধনায় আমি বিশ্বাসী।' কোনো উপেক্ষা কিংবা অবহেলা কাব্যলক্ষী যে দূরে সরে যান, একথা ভালোভাবেই জানতেন শামসুর।
এমনকি তিনি যখন বেকারত্বের বেদনায় বিমর্ষ ও হতাশাগ্রস্ত, দিনগুলোতেও কবিতা থেকে দূরে থাকেননি, কলমকে ঝিমানোর সুযোগ দেননি। প্রায় প্রতিদিনই কবিতার কথা ভেবেছেন, পঙ্ক্তিমালা সাজিয়েছেন সাদা কাগজে। কখনও কখনও দিন কলম বিদ্রোহ করে বসেছে, কিন্তু সেই ক্ষণিক বিদ্রোহকে আমল না দিয়ে লিখে গেছেন দিনের পর দিন। সাময়িক মোহ-আবেগকে সংযত রেখে ধৈর্য ও নিষ্ঠার সাথে কবিতাচর্চা অব্যাহত রাখতে পেরেছেন বলেই হতাশার অন্ধকারেও কবিতা দিয়েছে আলোর সন্ধান। সুদীর্ঘ সময় ধরে কাবচর্চার প্রতি নিবিষ্ট থাকবার রসদ কবি পেয়েছিলেন নানাগ্রন্থের সাহচর্য, দূরের স্বপ্ন, সুহৃদদের সহানুভূতি ও বরাভয় আর বাবা-মায়ের অকৃত্রিম স্নেহ ও সহনশীলতা থেকে। আর ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথ। বাল্য বয়সে যে-রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু শামসুর রাহমানকে ন্যূনতম ভাবায়নি, স্কুল ছুটির আনন্দে শব্রি আম খেতে খেতে বাড়ি ফিরেছিলেন, সেই রবীন্দ্রনাথই তাঁর অনিঃশেষ প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিলেন পরিণত বয়সে। 'রৌদ্র করোটিতে' কাব্যের 'যখন রবীন্দ্রনাথ' কবিতায় লিখেছেন–
আমার দিনকে তুমি দিয়েছ কাব্যের বর্ণচ্ছটা
রাত্রিকে রেখেছো ভ'রে গানের স্ফুলিঙ্গে, সপ্তরথী
কুৎসিতের ব্যুহ ভেদ করবার মন্ত্র আজীবন
পেয়েছি তোমার কাছে। ঘৃণার করাতে জর্জরিত
করেছি উন্মত্ত বর্বরের অট্টহাসি কী আশ্বাসে।

প্রতীকের মুক্ত পথে হেঁটে চলে গেছি আনন্দের
মাঠে আর ছড়িয়ে পড়েছি বিশ্বে তোমারই সাহসে ।
অকপট নাস্তিকের সুরক্ষিত হৃদয় চকিতে
নিয়েছ ভাসিয়ে কত অমলিন গীতসুধারসে।
ব্যাঙডাকা ডোবা নয়, বিশাল সমুদ্র হতে চাই।

এসনকি কোনো কোনো রাতে যখন লিখতে বসেও কিছুতেই কিছু লিখতে পারছেন না, মাথায় পাতলা হয়ে যাওয়া চুলগুলো টানছেন, টেবিলে ঠুকছেন বলপেন, তখন, একেবারে চমকে দিয়ে উদ্ভূত হলেন এক দেবমূর্তি; রবীন্দ্রনাথের। সশ্রদ্ধ মুদ্রানত, বিহŸল, একটি শব্দের প্রত্যাশায় অস্থির থাকা শামসুর রাহমানের কাঁধে হাঁত রেখে পরামর্শ দিলেন, 'নিজেকে অপেক্ষা করতে শেখাও, এই আমি / আশি বছরের রবীন্দ্রনাথ একটি শব্দের জন্যে অপেক্ষা / করেছি প্রহরের পর প্রহর, দুপুরে কখনো / নরম শয্যায় শয়ন করিনি, পাছে ঘুমিয়ে পড়ি। / তোমরা তো জানো কত শ্রম আমাকে / করতে হয়েছে। সাধনায় যতি পড়েনি ব'লেই কবিতা / এসেছে আমার কাছে, যেমন পাতা আসে গাছে, / মাছের ঝাঁক ভেসে ওঠে জলাশয়ে। [ দাঁড়িয়ে আছেন এক দেবমূর্তি / হেমন্ত সন্ধ্যায় কিছুক্ষণ ]।

কবিতা। কবির কাছে অনিঃশেষ ভালোবাসার বিষয়। একটি উৎকৃষ্ট কবিতার জন্ম, কবিকে দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি ক্ষুদ্রতা, চারদিকের হঠকারিতা, ক্রমাগত মনুষ্যত্ব হরণকারী প্রবণতা, সমাজ নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের ফাঁপা, ফাঁকা, লাগামহীন বুলি থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায় অসীম আনন্দলোকে, জীবনের অন্তহীন গভীরে। নিষ্ঠাবান কবি তাঁর জীবনের কোনো স্তর থেকেই কবিতাকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারেন না। শামসুর রাহমানও পারেননি। তাই প্রথম তারুণ্যের কোনো এক মেঘলা দুপুরে হঠাৎ কাগজ-কলম নিয়ে বসে যে-কাব্যপঙক্তি রচনার শুরু করেছিলেন, তা তাঁর জীবনে অনিবার্য সঙ্গী হয়ে থাকলো আমৃত্যু। এবং তিনি প্রেরণা রেখে গেলেন এক অসামান্য কবিতাজীবনের।