Published : 10 Sep 2026, 12:52 PM
তার নাম ধ্রুব।
নামটি শুনলে মনে হয় যেন স্থির কোনো মানুষ সে, অথবা আকাশের একটি নির্দিষ্ট বিন্দু, যার দিকে তাকিয়ে পথিকেরা পথ চিনত। অথচ ধ্রুবর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিহাস, সে নিজেই কোনোদিন নিজের পথ ঠিকমতো চিনতে পারেনি।
তার জীবনে পথের অভাব ছিল না। বরং পথ ছিল বেশি।
ধ্রুব একসময় বিশ্বাস করত, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা হলো বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা। বয়স বাড়ার পর তার ধারণাটা বদলে গেছে। এখন তার মনে হয়, মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্যও হয়তো বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা। একটি পথ বেছে নেওয়া মানে শুধু সেই পথে যাওয়া নয়, একইসঙ্গে বাকি সব পথ হারিয়ে ফেলা। আর হারিয়ে যাওয়া পথের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে, সেগুলো বাস্তবের চেয়ে স্মৃতিতে বেশি সুন্দর হয়ে ওঠে।
নারীদের নিয়ে ধ্রুবর নিজস্ব কিছু ধারণা আছে। সেগুলো সবসময় ন্যায়সংগত নয়, এমনকি পরস্পরবিরোধীও। কিন্তু মানুষের নিজের দর্শন আদালতের সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে তৈরি হয় না। তৈরি হয় অভিজ্ঞতা, ক্ষত, আকাঙ্ক্ষা আর ভুল দিয়ে। ধ্রুব মনে করে, কোনো নারীকে সুন্দর লাগা এবং তাকে ভালোবাসা সম্পূর্ণ আলাদা দুটি ঘটনা। সৌন্দর্য চোখের ঘটনা। কামনা শরীরের। মুগ্ধতা মনের। আর ভালোবাসা?
ভালোবাসা কোথায় ঘটে, সে আজও জানে না।
শুধু এটুকু বুঝেছে, কোনো একজন মানুষ চলে যাওয়ার পরও যদি তার সঙ্গে মনে মনে কথা বলতে হয়, তবে সেখানে কিছু একটা ঘটেছিল।
তার জীবনে সুন্দরী নারী এসেছে। তাকে চেয়েছে এমন নারীও এসেছে। এমন নারী এসেছে যার শরীরের দরজা তার জন্য খোলা ছিল। অথচ আশ্চর্য, সহজে পাওয়া যায় এমন জিনিসের প্রতি ধ্রুবর আকর্ষণ বেশিদিন থাকে না।
এ-নিয়ে একদিন তার স্ত্রী অহনা বলেছিল,
—তোমার সমস্যা জানো কী?
—কী?
—তুমি সুখী হতে জানো না।
ধ্রুব হেসেছিল।
—সুখী হওয়ার আবার জানা-না-জানা আছে?
অহনা বলেছিল,
—আছে। তোমার সামনে যা আছে, তুমি সেটা দেখো না। যা নেই, সারাজীবন তার দিকে তাকিয়ে থাকো।
কথাটা শুনে ধ্রুব সেদিন রেগে গিয়েছিল। পরে বহুবার একা বসে তার মনে হয়েছে, অহনা হয়তো তাকে অপমান করার জন্য কথাটা বলেছিল, কিন্তু কথাটা পুরোপুরি মিথ্যা নয়। ধ্রুবর কাছে স্বপ্ন মানে ঘুমের মধ্যে দেখা কোনো দৃশ্য নয়। স্বপ্ন হলো এমন একটি জীবনের স্মৃতি, যে জীবন ধ্রুব কখনো যাপনই করেনি।
এই কথাটা সে কাউকে বোঝাতে পারে না। অহনাকে তো নয়ই।
কখনো মাঝরাতে তার মনে হয়, মানুষের একটি জীবন নয়, অনেকগুলো জীবন থাকে। কিন্তু তাকে বেছে নিতে দেওয়া হয় মাত্র একটি।
যে সুন্দরী মেয়েটির কাছে সে যায়নি, তার সঙ্গে গেলে কেমন হতো জীবন? যৌনপল্লির সেই বিষণ্ন মেয়েটির কাছে দ্বিতীয়বার ফিরে গেলে? অহনাকে বিয়ে না করলে?
কিংবা প্রথম মেয়েটি যদি কোনো এক বিকেলে বলত, ‘এসো’?
এই প্রতিটি সম্ভাবনার মধ্যে একটি করে ধ্রুব বাস করে।
ধ্রুব বিশ্বাস করে, মানুষের জীবনের বড় বড় সিদ্ধান্তের অনেকগুলোই মানুষ স্বাভাবিক অবস্থায় নেয় না। নেয় কোনো না কোনো ঘোরের মধ্যে। প্রেম একটা ঘোর। কামনা একটা ঘোর। অভিমানও ঘোর। এমনকি সংসারও এক ধরনের দীর্ঘ ঘোর, যেখানে মানুষ একই বিছানা, একই খাবার টেবিল, একই মুখ, একই ঝগড়া দেখতে দেখতে একদিন ভুলে যায়, সে এই জীবনটি নিজে বেছে নিয়েছিল, নাকি জীবনই তাকে বেছে নিয়েছিল।
যৌনপল্লির মেয়েটির প্রেমে পড়াটাও ছিল ঘোর। ধ্রুব এখন সেটা বোঝে। বন্ধুদের সঙ্গে নিষিদ্ধ কিছুর উত্তেজনায় সেখানে গিয়েছিল। কিন্তু মেয়েটির মুখের বিষণ্নতা দেখে তার ভেতরে অন্যকিছু জেগেছিল। সেখান থেকে ফিরে এসে তার মনে হয়েছিল দস্তইয়েভস্কির রাসকলনিকভের মতো সেও বুঝি তার সোনিয়াকে খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু সাহিত্য আর জীবন এক নয়। রাসকলনিকভের গল্প বইয়ের পাতা বন্ধ করলেও থেকে যায়। ধ্রুবর ঘোর কয়েকদিনের মধ্যেই কেটে গিয়েছিল। সে আর সেখানে ফিরে যায়নি। মেয়েটিও আর ধ্রুবর জীবনের সোনিয়া হয়নি।
অনেক পরে তার মনে হয়েছে, মেয়েটিকে নয়, সেদিন সে নিজের একটি মহৎ সংস্করণকে ভালোবেসেছিল। যে মানুষটি একজন পতিতার চোখের বিষণ্নতা দেখে পৃথিবীর সমস্ত নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। সেই মানুষটি ধ্রুব ছিল না। অন্তত বেশিদিন ছিল না।
কিন্তু প্রথম মেয়েটির ক্ষেত্রে ঘোর কাটে না কেন? এই প্রশ্নের উত্তর ধ্রুব পায় না। হয়তো কারণ, মেয়েটিকে পুরোপুরি পাওয়া হয়ে ওঠেনি। প্রাপ্তির একটা সমাপ্তি আছে। অপ্রাপ্তির নেই। ধ্রুবর মনে হয়, মায়া আসলে ভালোবাসার চেয়েও ভয়ংকর। ভালোবাসার মধ্যে দাবি থাকে, শরীর থাকে, ঈর্ষা থাকে, ভবিষ্যৎ থাকে। মায়ার কোনো সংবিধান নেই। একজন মানুষকে না পেয়েও তার জন্য মন খারাপ করা যায়। অধিকার না পেয়েও তার অসুখে ভয় পাওয়া যায়। কোনো সম্পর্কের নাম না দিয়েও তার একটি ছোট্ট মেসেজের জন্য সারাদিন অপেক্ষা করা যায়।
এই মেয়েটি ধ্রুবর জীবনে ঠিক সেই জায়গাতেই থেকে গেছে।
এক রাতে অহনা ঘুমাতে যাওয়ার আগে বলল,
—আজও ফোন নিয়ে বসে থাকবে?
—একটু কাজ আছে।
—কাজ?
ধ্রুব উত্তর দিল না।
অহনা কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থাকল।
—তোমার সবচেয়ে বড় সুবিধা কী জানো?
—কী?
—তুমি চুপ করে থাকাকে সততা মনে করো।
ধ্রুব এবার তাকাল।
—সব কথা বলা যায় না।
—কেন?
—বললে অনেক কিছু ভেঙে যায়।
অহনা হাসল। সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না।
—আর না বললে কিছু ভাঙে না?
ধ্রুব চুপ।
অহনা বলল,
—না বললে ধীরে ধীরে ভাঙে। শব্দ হয় না বলে তুমি টের পাও না।
কথাটা বলে সে শুতে চলে গেল, আর চারপাশ ভেঙে যাচ্ছে এমন শব্দ সঙ্গে নিয়ে ধ্রুব অনেকক্ষণ বসে রইল।
ফোনের পর্দায় তখন প্রথম মেয়েটির নাম। কোনো নতুন মেসেজ নেই।
ধ্রুব কখনো নিশ্চিত হতে পারেনি অহনা তাকে ভালোবাসে কি না। আরও ভয়ংকর ব্যাপার হলো, একসময় তার মনে হয়েছে, সেও হয়তো নিশ্চিত না অহনাকে সে ভালোবাসে কি না। অথচ এতগুলো বছর তারা পাশাপাশি আছে। একদিন ঝগড়ার সময় অহনা বলেছিল,
—তুমি আমাকে কখনো ভালোবাসোনি।
ধ্রুব বলেছিল,
—তাহলে এত বছর আছি কেন?
—থাকা আর ভালোবাসা এক?
—তুমি আছ কেন?
অহনা থেমে গিয়েছিল।
তারপর বলেছিল,
—জানি না।
এই ‘জানি না’ কথাটা ধ্রুবকে সেদিন আশ্চর্যভাবে শান্ত করেছিল। কারণ দীর্ঘ দাম্পত্যে সম্ভবত ‘ভালোবাসি’ কিংবা ‘ভালোবাসি না’, দুটোই খুব সরল উত্তর।
তাদের মধ্যে সন্তান থাকতে পারে, অভ্যাস থাকতে পারে, একসঙ্গে কাটানো অসংখ্য সকাল থাকতে পারে, হাসপাতালের করিডর থাকতে পারে, বেড়াতে যাওয়ার ছবি থাকতে পারে, অপমান থাকতে পারে, ক্ষমা থাকতে পারে, একই বিছানায় দুদিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে থাকা রাত থাকতে পারে। এসবের যোগফলের নাম কী?
ধ্রুব জানে না।
একদিন অহনা তাকে মানুষের সামনে অপমান করেছিল। বাড়ি ফেরার পথে গাড়িতে ধ্রুব বলল,
—তুমি কথাটা সবার সামনে না বললেও পারতে।
—কোন কথাটা?
—তুমি জানো।
—সত্যি কথা বলেছি।
—সব সত্যি কথা সবার সামনে বলতে হয়?
অহনা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—তুমি তো আমাকে অনেক সত্যিই বলো না।
—তার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?
—আছে।
—কী সম্পর্ক?
এবার অহনা তার দিকে তাকাল।
—তুমি আমাকে এমন একজন মানুষের সঙ্গে সংসার করতে বলছ, যার অর্ধেক আমার সঙ্গে থাকে, আর বাকি অর্ধেক কোথায় থাকে আমি জানি না।
ধ্রুব স্তব্ধ হয়ে গেল।
অহনা আবার জানালার দিকে তাকাল।
—মানুষের শরীর ঘরে থাকলেই মানুষ ঘরে থাকে না, ধ্রুব।
সেদিন আর কোনো কথা হয়নি।
রাতে ধ্রুব ভাবল, মানুষ কি সত্যিই একজনকেই ভালোবাসে?
তার মনে হলো—না।
একজন মানুষকে মানুষ একভাবে ভালোবাসে না, এবং জীবনের সব মানুষকেও একই ভাষায় ভালোবাসে না।
কাউকে শরীর দিয়ে। কাউকে স্মৃতি দিয়ে। কাউকে দায়িত্ব দিয়ে। কাউকে অভ্যাস দিয়ে। কাউকে কল্পনা দিয়ে। আর খুব অল্প কয়েকজনকে মানুষ ভালোবাসে নিজের সেই অংশ দিয়ে, যে অংশটির অস্তিত্বের কথা সে নিজেও আগে জানত না।
প্রথম মেয়েটি সম্ভবত ধ্রুবর সেই অংশটি আবিষ্কার করেছিল। অথচ মেয়েটি কিছুই করেনি। সে তাকে ডাকেনি। প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ভবিষ্যৎ দেখায়নি। এমনকি ভালোবাসি পর্যন্ত বলেনি।
এইখানেই ধ্রুবর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিহাস। যে নারীরা তাকে চেয়েছে, তাদের কাছ থেকে সে সরে এসেছে। যে স্ত্রী তার জীবনের এতগুলো বছর নিয়ে বসে আছে, তার কাছ থেকে সে মনে মনে দূরে সরে যাচ্ছে। আর যে নারী তাকে নিজের বলে একবারও দাবি করেনি, তার কাছেই সে ফিরে ফিরে যাচ্ছে।
কেন?
প্রথম মেয়েটির কাছে ধ্রুব নিজেকে অন্যরকম দেখতে পায়। আরও সংবেদনশীল। আরও মেধাবী। আরও শিল্পমনস্ক। আরও সুন্দর একজন মানুষ। তাহলে সে মেয়েটিকে ভালোবাসে? নাকি মেয়েটির চোখে দেখা নিজের সেই মানুষটিকে? প্রশ্নটির উত্তর নেই।
শেষ অপমানটির পর সেই রাতে অহনা বলেছিল,
—যেতে চাইলে চলে যাও।
ধ্রুব অবাক হয়েছিল।
—কোথায় যাব?
—যেখানে এতদিন ধরে মনে মনে যাচ্ছ।
—তুমি কী বলতে চাইছ?
অহনা ক্লান্ত গলায় বলেছিল,
—আমি কিছু বলতে চাই না। শুধু একটা কথা মনে রেখো। দূর থেকে যে জীবনকে সুন্দর লাগে, তার ভেতরেও রান্নাঘর থাকে, বিদ্যুতের বিল থাকে, বিরক্তি থাকে, অসুখ থাকে, একই মানুষকে প্রতিদিন দেখতে হয়।
ধ্রুব বলেছিল,
—সব সম্পর্ক তোমার কাছে এত সাধারণ?
—না। আমি শুধু জানি, ঘোরের মধ্যে কোনো মানুষকে দেবী মনে হয়। সংসারে সেই দেবীকেও মানুষ হতে হয়।
ধ্রুব আর কথা বলেনি।
অহনা চলে যাওয়ার আগে দরজায় দাঁড়িয়ে বলেছিল,
—আর একটা কথা।
—বলো।
—তুমি যাকে ভালোবাসো বলে ভাবছ, তাকে পাওয়ার আগে ঠিক করে নিও, সে কি আসল মানুষ, নাকি দিবাস্বপ্নের ঘোর দিয়ে তাকে তুমি নির্মাণ করেছ?
দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
ধ্রুব একা বসে থাকে।
প্রথমবার তার মনে হয়, অহনা তাকে যতটা অপমান করেছে, হয়তো সে তাকে তার চেয়েও বেশি চিনেছে। ভোরের দিকে সে বেরিয়ে পড়ে। শহর তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। একটি মোড়ে এসে দাঁড়ায় ধ্রুব।
একদিকে নিজের বাড়ি। অন্যদিকে সেই মেয়েটির বাড়ির দিকে যাওয়ার রাস্তা।
ফোন বের করে ধ্রুব। মেয়েটির পুরোনো একটি মেসেজ খোলা।
খুব সাধারণ কথা। প্রেম নেই। প্রতিশ্রুতি নেই। অপেক্ষার কথাও নেই।
অথচ এত বছর ধরে ধ্রুব ওই কয়েকটি শব্দের ভেতর নিজের জন্য একটি বাড়ি বানিয়ে রেখেছে। সেখানে একটি সংসারও পেতে রেখেছে। হঠাৎ তার মনে হলো, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা কোনো ভুল রাস্তা নয়। সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা হলো মোড়। কারণ ভুল রাস্তায় গেলে অন্তত মানুষ জানে সে কোথাও যাচ্ছে। মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ শুধু সম্ভাবনার মধ্যে বেঁচে থাকে।
ধ্রুব হাঁটতে শুরু করে। কোন দিকে, তা কেউ জানে না। হয়তো অহনার কাছে। হয়তো মেয়েটির কাছে। হয়তো কোনো নারীর কাছেই নয়। কারণ এতদিনে ধ্রুব সামান্য একটি সত্য বুঝতে শুরু করেছে, প্রথম মেয়েটি, যার নাম নীরা, ধ্রুব তাকে প্রথম দেখেছিল এমন এক জায়গায়, যেখানে মানুষ সাধারণত নিজের সবচেয়ে ভদ্র, পরিশীলিত, চিন্তাশীল সংস্করণটুকু নিয়ে আসে। বই, শিল্প, সংগীত—এসব নিয়ে কথা হচ্ছিল। নীরা সেখানে খুব বেশি কথা বলেনি। কিন্তু যখন বলেছিল, ধ্রুব লক্ষ করেছিল, তার কথায় কোনো প্রদর্শন নেই। নিজের জ্ঞান দেখানোর তাগিদ নেই। বরং সে কথা বলছিল আনমনে।
সেদিন থেকেই ধ্রুব নীরাকে আলাদা করে মনে রেখেছিল। নীরা ধ্রুবকে মনে রেখেছিল অন্য কারণে। ধ্রুব মন দিয়ে তার কথা শুনেছিল। এই গুণটি নীরার কাছে বিরল মনে হয়েছিল। অনেক পুরুষ কথা শোনে উত্তর দেওয়ার জন্য। ধ্রুব শুনত বুঝতে চাওয়ার জন্য। অন্তত নীরার প্রথমে তাই মনে হয়েছিল। এরপর তাদের কথা বাড়তে থাকে। ধ্রুব মাঝেমধ্যে কোনো কবিতা পাঠাত। নীরা কখনো শুধু একটি লাইন লিখে উত্তর দিত।
‘এই কবিতাটার শেষটা আমার ভালো লাগে।’
কখনো বলত, ‘তোমার পাঠানো গানটা সারাদিন মাথায় ছিল।’
ধ্রুব সেই ছোট ছোট বাক্যের মধ্যেই অনেক বড় অর্থ খুঁজে পেত। নীরা তা জানত না, এমন নয়।
বরং একসময় সে বুঝতে শুরু করেছিল। ধ্রুবর অপেক্ষা সে টের পেত। কোনো মেসেজের উত্তর দিতে দেরি হলে ধ্রুবর ভাষা বদলে যেত। একটু বেশি নিরাসক্ত, একটু বেশি ভদ্র হয়ে উঠত। নীরা বুঝত, অভিমান হয়েছে। তখন তার মায়া লাগত। আবার ভয়ও করত। এক রাতে ধ্রুব লিখেছিল, ‘তোমার সঙ্গে কথা না হলে দিনটা যেন সম্পূর্ণ হয় না।’ নীরা অনেকক্ষণ উত্তর দেয়নি। তারপর লিখেছিল,
‘কোনো মানুষকে দিনের অভ্যাস বানিও না।’
ধ্রুব লিখেছিল,
‘কেন?’
নীরা বলেছিল,
‘অভ্যাস ভাঙলে মানুষ বেশি কষ্ট পায়।’
তারপর দুজন একদম চুপ। ধ্রুব বুঝতে পারছিল না, কী লিখবে। পরে কী ভেবে লিখল, ‘তুমি চলে যাওয়ার কথা ভাবছ?’
অনেকক্ষণ পর উত্তর এসেছিল,
‘সব মানুষই একদিন না একদিন চলে যায়।’
এই ধরনের কথাই ধ্রুবকে আরও টেনে নিত।
নীরার মধ্যে একটা দূরত্ব ছিল। কিন্তু সেই দূরত্ব ঠান্ডা ছিল না। বরং তার মধ্যে এক ধরনের উষ্ণতা ছিল, যা কাছে টানে অথচ ছুঁতে দেয় না। ধ্রুব একদিন সরাসরি বলেছিল, ‘তুমি কি আমাকে ইচ্ছে করে দূরে রাখো?’
নীরা হেসেছিল।
—সব কাছাকাছি যাওয়াই কি ভালো?
—আমি জানি না।
—আমি জানি।
ধ্রুব তাকিয়ে ছিল তার দিকে।
নীরা বলেছিল,
—কিছু মানুষ দূরে থাকলেই সুন্দর থাকে।
ধ্রুবর বুকের ভেতর কেমন করেছিল।
—আমি কি সেই মানুষ?
নীরা উত্তর দেয়নি।
ধ্রুব আবার বলেছিল,
—তুমি আমাকে পছন্দ করো?
—করি।
—ভালোবাসো?
নীরা চুপ।
ধ্রুব বলেছিল,
—এই প্রশ্নটা কি খুব কঠিন?
নীরা বলেছিল,
—না। উত্তরটাই কঠিন।
—কেন?
নীরা ধীরে বলেছিল,
—কারণ ভালোবাসা বলা সহজ। তার পরের দায়টা কঠিন।
সেদিন ধ্রুব প্রথম বুঝেছিল, নীরা শুধু তাকে নিয়ে দ্বিধায় নেই। নিজের সঙ্গেও তার লড়াই আছে।
নীরার নিজের জীবনও ছিল জটিল। তার অতীতে এমন একটি সম্পর্ক ছিল, যেটি তাকে শিখিয়েছিল, মানুষের বলা কথার চেয়ে না বলা কথায় বেশি বিপদ থাকে। একসময় সে একজনকে বিশ্বাস করেছিল। ভেবেছিল, যে মানুষ তার সঙ্গে রাত জেগে কথা বলে, তার দুঃখ শোনে, তার হাত ধরে রাখে, তাকে নিয়ে ভবিষ্যতের কথা বলে, সে নিশ্চয়ই তারই।
কিন্তু একদিন সেই মানুষ তাকে বলেছিল, ‘আমি তোমাকে কখনো প্রতিশ্রুতি দিইনি। সম্পর্ক মানে কমিটমেন্ট নয়।’ বাক্যটি নীরাকে বদলে দিয়েছিল। তারপর থেকে সে প্রতিশ্রুতিকে ভয় পেত। আরও বেশি ভয় পেত এমন সম্পর্ককে, যার কোনো নাম নেই অথচ গভীরতা আছে। ধ্রুবর সঙ্গে তার সম্পর্ক ঠিক সেখানেই এসে দাঁড়িয়েছিল।
নীরা জানত, ধ্রুব তাকে চায়। সে এটাও জানত, ধ্রুবর সংসার আছে। আর এই একটি সত্যই তার সামনে অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ধ্রুব একদিন বলেছিল,
—আমার সংসার সুখের নয়।
নীরা বলেছিল,
—অসুখী সংসার মানেই নতুন প্রেমের অনুমতি নয়।
ধ্রুব চুপ করে গিয়েছিল।
—আমি অনুমতি চাইছি না।
—তাহলে কী চাইছ?
—তোমাকে।
নীরা তাকিয়ে ছিল তার দিকে।
ধ্রুব বলেছিল,
—তুমি কি একবারও আমাকে চাও না?
নীরা খুব আস্তে বলেছিল,
—চাওয়ার সঙ্গে নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে।
ধ্রুবর মনে হয়েছিল, এই মেয়েটি তাকে একই সঙ্গে আশ্রয়ও দেয়, শাস্তিও দেয়।
নীরা আবার বলেছিল,
—একজন মানুষকে চাইতে পারি। তার মানে এই নয় যে তাকে পাওয়ার জন্য আরেকজনের জীবন ভাঙতে চাই।
—আমার জীবন যদি আগেই ভাঙা হয়?
—তাহলে আগে সেটা শেষ করো। আমার জন্য নয়। নিজের জন্য।
ধ্রুব তিক্ত স্বরে বলেছিল,
—তুমি সবকিছু এত যুক্তি দিয়ে দেখো কেন?
নীরা বলেছিল,
—কারণ আবেগ দিয়ে দেখা জিনিসের দাম আমি আগে দিয়েছি।
ধ্রুব সেদিন আর কিছু বলেনি।
কিন্তু নীরাও সেদিন রাত জেগেছিল। সে নিজের সঙ্গে সৎ হতে চেয়েছিল। ধ্রুবকে তার ভালো লাগত।
খুব।
তার কথা, তার পাঠ, তার সংবেদনশীলতা, তার অদ্ভুত কিছু প্রশ্ন, এমনকি তার দুর্বলতাও।
ধ্রুব কোনো বিষয়ে উত্তেজিত হয়ে কথা বললে নীরার ভালো লাগত। কোনো গান শুনে ধ্রুব হঠাৎ পুরোনো স্মৃতির কথা বললে তার ভালো লাগত। ধ্রুব যখন কোনো মানুষের কষ্টের গল্প শুনে অস্বাভাবিকভাবে নরম হয়ে যেত, তখন নীরার মনে হতো, এই মানুষটির ভেতরে এখনও কিছু নষ্ট হয়নি।
কিন্তু নীরা আরও একটি জিনিস দেখত। ধ্রুব সৌন্দর্যের চেয়ে অপ্রাপ্তির প্রেমে বেশি পড়ে। যা ধরা দেয় না, সেটাই তার কাছে গভীর মনে হয়। যে নারী তাকে নিঃশর্ত ভালোবেসেছিল, তাকে সে নেয়নি। স্ত্রীর সঙ্গে থেকেও সে অন্য জীবনের স্বপ্ন দেখে। যৌনপল্লির মেয়েটির মধ্যে সে সোনিয়াকে খুঁজেছিল। আর এখন নীরার মধ্যে সে হয়তো এমন একজন নারী খুঁজে পেয়েছে, যে একই সঙ্গে বাস্তব এবং অসম্ভব।
নীরা একদিন বলেছিল,
—তুমি জানো তোমার একটা সমস্যা আছে?
ধ্রুব হেসেছিল।
—এই কথাটা আমার স্ত্রীও বলে।
—কী বলে?
—আমি নাকি সামনে যা আছে তা দেখি না। যা নেই তার দিকে তাকিয়ে থাকি।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল।
তারপর বলেছিল,
—তিনি তোমাকে ভালো চিনেন।
ধ্রুব কষ্ট পেয়েছিল।
—তুমি তার পক্ষ নিচ্ছ?
—আমি কারও পক্ষ নিচ্ছি না।
—তাহলে?
—আমি তোমাকে দেখছি।
ধ্রুব সেদিন বিরক্ত হয়ে বলেছিল,
—তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না।
নীরা বলেছিল,
—করি।
—তাহলে এত ভয় কিসের?
নীরা উত্তর দিয়েছিল,
—তোমার ভালোবাসা সত্যি কি না, সে ভয় নয়।
—তাহলে?
—এই ভয় যে তুমি আমাকে পাওয়ার পরও কি আমাকে এইভাবেই দেখবে?
ধ্রুব উত্তর দিতে পারেনি।
নীরা বলেছিল,
—দূর থেকে মানুষকে শিল্প মনে হয়, ধ্রুব। কাছে গেলে তার ক্লান্তি দেখা যায়, বিরক্তি দেখা যায়, দৈনন্দিনতা দেখা যায়।
—আমি সেসবও চাই।
—এখন চাইছ।
—পরে চাইব না কেন?
নীরা একটু হেসেছিল।
—মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি মিথ্যা বলে। এই কথায় ধ্রুব চুপ হয়ে গিয়েছিল।
নীরা তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল,
—আমি তোমার কল্পনার নারী হতে পারি। কিন্তু আমি বাস্তবে খুব সাধারণ। আমারও খারাপ মেজাজ হয়। কাউকে উত্তর দিতে ইচ্ছে করে না। আমি অসুস্থ হই। একই কথা বারবার শুনলে বিরক্ত হই। আমি অনেক সময় অন্যায় করি। আমি সবসময় মেধাবী নই, সবসময় সুন্দরও নই।
ধ্রুব বলেছিল,
—আমি তোমাকে দেবী ভাবি না।
নীরা বলেছিল,
—ভাবো।
—না।
—ভাবো বলেই ভয় পাই।
তারপর তাদের মধ্যে কয়েকদিন কোনো কথা হয়নি। এই নীরবতা নীরার জন্যও সহজ ছিল না। সে বারবার ফোন হাতে নিয়েছে। ধ্রুবর নাম দেখেছে।
লিখেছে—
‘কেমন আছ?’
আবার মুছে দিয়েছে।
‘রাগ করেছ?’
মুছে দিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত একটি কবিতা পাঠিয়েছে।
কোনো কথা নয়।
শুধু কবিতা।
ধ্রুব সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়েছিল,
‘তাহলে সব শেষ হয়নি?’
নীরা অনেকক্ষণ পর লিখেছিল,
‘সবকিছুর কি শেষ থাকতে হয়?’
এই উত্তর পাঠিয়ে নীরা নিজেই বুঝেছিল, সে ধ্রুবকে মুক্তিও দিচ্ছে না। নিজেকেও নয়। তারপর একদিন তাদের দেখা হয়।
বৃষ্টির দিন।
দুজন জানালার পাশে বসে ছিল।
ধ্রুব বলল,
—আমি কখনো কখনো ভাবি সব ছেড়ে চলে আসি।
নীরা তাকাল না।
—কোথায়?
—তোমার কাছে।
নীরা এবার তাকাল।
—আমার কাছে এসে কী করবে?
ধ্রুব প্রশ্নটা আশা করেনি।
—থাকব।
—তারপর?
—তারপর কী?
—এই যে সকাল হবে। আমাকে কাজে যেতে হবে। তোমারও কাজ থাকবে। বাজার লাগবে। অসুখ হবে। ক্লান্তি হবে। মতের অমিল হবে। তখন?
ধ্রুব একটু বিরক্ত হয়ে বলেছিল,
—তুমি ভালোবাসার কথাতেও বাজারের হিসাব ঢোকাও?
নীরা হেসেছিল।
—না। আমি শুধু ভালোবাসাকে জীবন থেকে আলাদা করি না।
—তোমার কাছে ভালোবাসা তাহলে কী?
নীরা জানালার বাইরে বৃষ্টি দেখছিল।
অনেকক্ষণ পরে বলেছিল,
—কাউকে পেতে চাওয়া নয়। কারও জীবনকে নিজের ইচ্ছার জন্য নষ্ট না করতেও পারা।
ধ্রুব বলেছিল,
—এটা তো ত্যাগ।
—মায়ার মধ্যে ত্যাগ থাকেই।
—আর প্রেম?
—প্রেমে মানুষ নিতে চায়। মায়ায় কখনো কখনো ছেড়ে দিতে হয়।
ধ্রুব আস্তে বলেছিল,
—তুমি তাহলে আমাকে ভালোবাসো না, মায়া করো?
নীরা হেসেছিল।
—এত নাম দিতে হবে কেন?
ধ্রুবর মুখে কষ্টের রেখা ফুটেছিল। নীরা সেটা দেখেছিল। তার খুব ইচ্ছে হয়েছিল হাত বাড়িয়ে ধ্রুবর হাত ছুঁয়ে দিতে। কিন্তু দেয়নি। কারণ সে জানত, কিছু স্পর্শের পরে মানুষ আর আগের জায়গায় ফিরে যেতে পারে না। সেই রাতে নীরা নিজের ডায়েরিতে লিখেছিল, ‘ধ্রুবকে আমি চাই কি না, এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা আছে। কিন্তু আমি তাকে নিতে চাই কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরই আসল।’
আরেকদিন লিখেছিল, ‘কিছু মানুষ আমাদের জীবনে প্রেম হয়ে আসে না। আসে পরীক্ষা হয়ে। তাদের ভালোবেসে আমরা বুঝতে পারি আমরা কেমন মানুষ হতে চাই।’ এরমধ্যে অহনার সঙ্গে সম্পর্কটা কেমন যেন তিক্ত হয়ে ওঠে। ধ্রুব আরও অস্থির হয়ে উঠছিল।
অহনার সঙ্গে ঝগড়া, নীরার দূরত্ব, নিজের বয়স, নিজের অপূর্ণতা, সব মিলিয়ে সে আস্তে আস্তে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, নীরাই তার মুক্তি। একদিন সে নীরাকে বলল, ‘আমি যদি সত্যিই চলে আসি?’
নীরা বলল,
—আমার কাছে?
—হ্যাঁ।
—তাহলে আমি তোমাকে ফিরিয়ে দেব।
ধ্রুব যেন শুনতে পায়নি।
—কী?
—ফিরিয়ে দেব।
—কেন?
—কারণ তুমি যদি আমার জন্য সংসার ছেড়ে আসো, কোনো একদিন আমার ওপর তার দায় চাপাবে।
—আমি কখনো করব না।
—আজ করবে না।
—তুমি আমাকে এত নিচু ভাবো?
নীরা শান্ত গলায় বলেছিল,
—নিচু ভাবি না। মানুষ ভাবি।
ধ্রুব রেগে উঠেছিল।
—তুমি সবকিছুকে এত ভয় পাও!
—হ্যাঁ।
—কীসের ভয়?
নীরা এবার প্রথমবারের মতো গলা উঁচু করেছিল।
—তোমার ঘোর কেটে যাওয়ার ভয়!
ধ্রুব স্থির হয়ে গিয়েছিল।
নীরা থামেনি।
—আজ তুমি আমার মধ্যে মেধা দেখছ, শিল্প দেখছ, সৌন্দর্য দেখছ। কাল আমি তোমার পাশে ঘুম থেকে উঠব এলোমেলো চুলে, খারাপ মেজাজে। কোনোদিন তোমার কথা শুনতে ইচ্ছে করবে না। কোনোদিন তোমাকেই অপমান করে ফেলতে পারি। তখন তুমি কি আবার কোনো অন্য মোড়ে দাঁড়িয়ে ভাববে, আরেকটা পথ ছিল?
ধ্রুব কোনো উত্তর দিতে পারেনি। নীরার চোখে জল এসেছিল, কিন্তু সে মুছে নেয়নি।
—আমি তোমার পরবর্তী অসমাপ্ত পথ হতে চাই না, ধ্রুব।
এই বাক্যটি ধ্রুবকে বহুদিন তাড়া করে।
সেই রাতেই ধ্রুব প্রথমবার বুঝতে শুরু করে, নীরা তাকে প্রত্যাখ্যান করছে না। নিজেদের সম্ভাব্য ধ্বংসকে প্রত্যাখ্যান করছে।
আর নীরা?
সে বাড়ি ফিরে কেঁদেছিল।
কারণ নৈতিক হওয়া সবসময় শক্তিশালী হওয়ার নাম নয়। কখনো কখনো নৈতিকতা হলো নিজের সবচেয়ে প্রিয় ইচ্ছাটির সামনে দরজা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকা। তারও মনে হয়েছিল, দরজা খুলে দিলে কী এমন ক্ষতি হতো? হয়তো ধ্রুব সত্যিই তাকে ভালোবাসত। হয়তো তারা সুখী হতো। হয়তো না।
সম্ভাবনার এই ‘হয়তো’ শব্দটাই নীরার সবচেয়ে বড় শত্রু। সে জানত, ধ্রুবর মতো সেও একদিন মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। শুধু পার্থক্য হলো, ধ্রুব মোড়কে রোমান্টিক করে দেখে। নীরা দেখে বিপজ্জনক জায়গা হিসেবে। কারণ মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল হলো, সে ভাবে সব পথ এখনও খোলা। আসলে প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে কিছু পথ চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। শেষবার দেখা হওয়ার সময় ধ্রুব তাকে বলেছিল,
—তুমি যদি একদিন শুধু বলো, ‘এসো’, আমি চলে আসব।
নীরা বলেছিল,
—তাই তো বলি না।
—একবারও ইচ্ছে হয় না?
নীরা অনেকক্ষণ ধ্রুবর চোখের দিকে তাকিয়েছিল।
তারপর খুব আস্তে বলেছিল,
—হয়।
ধ্রুবর বুক কেঁপে উঠেছিল।
—তাহলে?
নীরা বলেছিল,
—সব ইচ্ছা পূরণ করতে নেই।
—কেন?
—কিছু ইচ্ছা পূরণ হলে মরে যায়।
ধ্রুব চুপ।
নীরা একটু হেসেছিল।
—কিছু অপূর্ণতা মানুষকে বাঁচিয়েও রাখে।
সেদিন বিদায়ের সময় ধ্রুব বলেছিল,
—তুমি জানো, আমি হয়তো কোনোদিন তোমাকে ভুলব না।
নীরা বলেছিল,
—ভুলতে হবে কেন?
ধ্রুব অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।
নীরা বলেছিল,
—সব মানুষকে পেতে হয় না। কিছু মানুষকে শুধু জীবনের একটা সুন্দর জায়গায় রেখে দিতে হয়।
ধ্রুব বলেছিল,
—আর তুমি আমাকে কোথায় রাখবে?
নীরা উত্তর দেয়নি।
শুধু চলে গিয়েছিল।
অনেক দূর যাওয়ার পর একবার পিছনে তাকিয়েছিল। ধ্রুব তখনও দাঁড়িয়ে।