Published : 15 Feb 2026, 12:16 AM
একসময়ের ‘ঘাঁটি’ রংপুরে জাতীয় পার্টি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় ‘ধুয়েমুছে’ গেছে। বিপরীতে বড় ধরনের উত্থান হয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
রংপুর বিভাগের ৩৩ আসনের মধ্যে ১৯টিতে জয় পেয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা। ১৩টিতে জয়ী হয়েছে বিএনপি আর একটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয় পেয়েছে।
রংপুর সদরের আসটি প্রায় চার দশক ধরে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এইচ এম এরশাদ ও তার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেখানে এবার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ন্যূনতম প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করতে পারেননি।
একই অবস্থা দলের মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীর। তিনি দুটি আসনে লড়েছিলেন। এক আসনে জামানত হারিয়েছেন, অন্যটিতে তৃতীয় হয়েছেন। সারাদেশে কোথাও জাতীয় পার্টি কোনো আসনে বিজয়ী হতে পারেনি। শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাও গড়তে পারেনি।
জাতীয় পার্টির এমন খারাপ ফলাফলের বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয়ভাবে রাজনীতির পর্যবেক্ষণকারী রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, “জাতীয় পার্টির জনপ্রিয়তায় অনেক আগেরই ধস নেমেছিল। কিন্তু যেহেতু তারা বিগত কয়েকটি নির্বাচন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে বা আওয়ামী লীগের সঙ্গে থেকে করেছিল ফলে এই দুর্বলতাটা সামনে আসেনি। বা জাতীয় পার্টিও হয়ত বুঝেতে পারেনি। কিন্তু আমরা যারা স্থানীয়, স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে মিশি, তারা কিন্তু এটা জানতাম।
“আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে জামায়াতে ইসলামী সরাসরি এখানে সাংগঠনিকভাবে কাজ করতে পারেনি। কিন্তু তাদের সংগঠনের নারীরা সেই সময়টাতে কাজন করেছেন। এটা নারীদের ভোট টানতে তাদের সহায়তা করেছে। ৫ অগাস্ট পরবর্তী সময়ে জামায়াত সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়েছে।
তিনি বলেন, “নারা কারণে মানুষ এখানে জাতীয় পার্টি থেকে সরে গেছে। একই কারণে মানুষ আওয়ামী লীগের উপরও বিরক্ত ছিল। বিএনপি ভোট পেয়েছে। কিন্তু জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তিকে তারা মোকাবিলা করতে পারেনি।”
এক প্রশ্নের জবাবে তুহিন ওয়াদুদ বলেন, “আওয়ামী লীগের কিছু ভোট নিশ্চয়ই জামায়াতের দিকে গেছে। এটা তাদের কৃতিত্ব। এটা অস্বীকার করা যাবে না।”
এমন একজন পর্যবেক্ষক বলছিলেন, “দলের বিভক্তি-অনৈক্য-সাংগঠনিক দুর্বলতাসহ অনেক কারণ আছে। তবে দুটি বিষয় মনে হচ্ছে গুরুত্বপর্ণ- এক. আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার রাজনীতিতে জড়িয়ে জাতীয় পার্টি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার অংশীদার থাকলেও উত্তরবঙ্গে প্রত্যাশিত উন্নয়ন তারা নিশ্চিত করতে পারেননি। দুই. ৫ অগাস্ট পরবর্তী সময়ে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ বলে যে ট্যাগ দেওয়া হয়েছিল, সেটা দলটির নেতৃত্ব মোকাবিলা করতে পারেননি।”
“পাশাপাশি তৃণমূলের সাংগঠনিক দুর্বলতা, ভোটের মাঠে নামতে দেরি করা, প্রচারে ভাল না করা, ভোট থেকে সরে যাওয়া এগুলোও রয়েছে। এর সঙ্গে জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তির প্রভাবকেও স্বীকার করে নিতে হবে। তারা মাঠের রাজনীতিতে ভাল করে মানুষের ভোট পেয়েছে।”
‘দলীয় নেতাকর্মীরাও বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে’
জাতীয় পাটির ভাইস চেয়ারম্যান রংপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা দলের হেরে যাওয়ার কারণ বর্ণনা করে বলছিলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে জাতীয় পার্টির নামে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চলাচ্ছিল একটি গোষ্ঠী। জাতীয় পার্টিকে দুর্বল করার জন্য তারা বিভিন্ন পরিকল্পনা করেছে, যাতে করে জাতীয় পার্টি রংপুরের মাটি থেকে উৎখাত হয়ে যায়। এতে আমাদের দলীয় নেতাকর্মীরাও বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে।
“আমরা তারপরও চেষ্টা করেছি দলীয় নেতাকর্মীদের একসঙ্গে রাখতে। আমরা নির্বাচনি মাঠে নামতে দেরি করে ফেলেছি। মাত্র ১১ দিন নির্বাচনি প্রচার করতে পেরেছি। আমাদের নেতাকর্মীরা মাঠে নামার আগেই অন্যরা মাঠ দখল করে নিয়েছিল।”
তিনি বলেন, “তবে আশা করি, ঈদের পর থেকে আমরা আবার নতুন করে কাজ করব। জাতীয় পার্টি পুনরায় সব আসন ফিরে পাবে।”
‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন জাতীয় পাটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আজমল হোসেন লেবু। তিনি বলেন, “নাহলে আমাদের হারার কোনো কারণ নাই।”
একই ধরনের ধারণা পোষণ করেন রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এ এইচ এম ইয়াসিরও।
তবে মহানগর জাতীয় পাটির একজন নেতার ভাষ্য, “দলের ভেতরের সমস্যা আর কেন্দ্রের রাজনীতির কারণে জাপার ক্ষতি হয়েছে। দলকে নতুন করে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করা গেলে মানুষ আবারও জাপার দিকে ফিরবে।”
বিএনপির রংপুর মহানগর আহ্বায়ক কমিটির সদস্য বুলবুল আহমেদ বলেন, “একটা সূক্ষ্ম কারচুপির মাধ্যমে দাঁড়িপাল্লাকে প্রশাসন জিতিয়ে দিয়েছে।”
পার্টির ভাঙা-গড়ার প্রভাব পড়েছে
জাপার চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ ২০১৯ সালে মারা যান। এরশাদ জীবিত থাকা অবস্থায়ই জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের মধ্যে বিরোধ ছিল। এরশাদ ছোট ভাই ও স্ত্রী রওশনের সঙ্গে সমন্বয় করে দল চালিয়েছেন।
কিন্তু এরশাদের মৃত্যুর পর তা আর নেই। রওশন এরশাদ অসুস্থ হলেও তার নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির আরেকটি ধারা রয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জি এম কাদেরকেই মূল নেতা হিসেবে কাছে টেনেছিল আওয়ামী লীগ। ফলে রওশন অনেকটাই আড়ালে চলে যান।
৫ অগাস্টের পর দল আবার বিভক্তির মুখে পড়ে। অনেক নেতাই জি এম কাদেরকে ছেড়ে চলে যান। এখন জি এম কাদেরের দলের মহাসচিব হয়েছেন অপেক্ষাকৃত তরুণ শামীম হায়দার পাটোয়ারী। দলের সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাকে গত বছরের সেপ্টেম্বরে দল থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে ১৪ ডিসেম্বর ক্ষমা চেয়ে আবার জাতীয় পার্টিতে ফেরেন তিনি। একই সঙ্গে রংপুর-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদ মণ্ডল আবার দলে ফিরেছেন। এর মাধ্যমে ভঙ্গুর দলকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।
রংপুর-৩ সদর আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর মাহবুবুর রহমান বেলাল। তিনি তার দলের জয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলছিলেন, “আমরা ১৭ বছর ধরে মানুষের পাশে থেকেছি। গরিব মানুষের সঙ্গে কাজ করেছি। তারা আমাদেরকে ভালোবেসেছে।
“আরেকটি দল দীর্ঘ দিন ধরে রংপুরের মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। রংপুরের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। তাই মানুষ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে।”
জামায়াতে ইসলামীর সংযোগী সংগঠন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহমুদ কাউসার আলী বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে রংপুরের মানুষের স্বার্থে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। আন্দোলনের কারণে আমাদের নেতাকর্মীকে জেল খাটানো হয়েছে। মানুষ সেটি দেখেছে।
“মানুষ জানতে পেরেছে যে, জামায়াতে ইসলাম ছাড়া রংপুরের উন্নয়ন সম্ভব না। যার কারণে ছয়টি আসলেই রংপুরের মানুষ জামায়াতে ইসলামকে উপহার দিয়েছে।”