২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯ আশ্বিন ১৪৩৩

ডোপামিন সাইট: টাকা ছাড়াই ‘কেনাকাটার’ রোমাঞ্চ সাড়া ফেলেছে ভারতে

ভারতের রাজস্থানের দুই সফটওয়্যার প্রকৌশলী গড়ে তুলেছেন ‘ফুডনেভারকামস’ নামের এই অভিনব প্ল্যাটফর্ম।

ডোপামিন সাইট: টাকা ছাড়াই ‘কেনাকাটার’ রোমাঞ্চ সাড়া ফেলেছে ভারতে

পুরোটাই ঘটছে স্ক্রিনের ভেতরে একটি ভুয়া অর্ডারিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ছবি: ফুডনেভারকামস

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 24 Sep 2026, 03:36 PM

Updated : 24 Sep 2026, 03:37 PM

ক্ষুধা থাকুক বা না থাকুক, অ্যাপ খুলে বাটার চিকেন কিংবা বিবিমবাপের মতো পছন্দের খাবার কার্টে জমা করলেন। এরপর চেকআউট চেপে অর্ডারের পুরো প্রক্রিয়াও শেষ করে ফেললেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্ক্রিনের ট্র্যাকার দেখাল, রাইডার খাবার নিয়ে আপনার ঠিকানার দিকেই রওনা হয়েছে।

একটু পরেই ফোনে এলো এআই প্রযুক্তির তৈরি এক কৃত্রিম কল। রাইডার জানাল, সে ভবনের নিচে পৌঁছে গেছে, কিন্তু আপনার ফ্ল্যাট নম্বরটি খুঁজে পাচ্ছে না!

তবে এই গল্পের আসল চমক হলো- বাস্তবে কোনো খাবারই কেনা হয়নি, পকেট থেকে খরচ হয়নি একটি টাকাও। পুরোটাই ঘটেছে স্ক্রিনের ভেতরে একটি ভুয়া অর্ডারিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

“খাবার অর্ডার করুন, বিল এড়িয়ে যান”- ওয়েবসাইটটির মূল বার্তা এটিই। আর তাদের নিজস্ব স্লোগানটি আরও স্পষ্ট- “খাবার কখনো আসে না, তবে ডোপামিনের যে মানসিক আনন্দ, তা মিলবে পুরোটাই।”

বিবিসি লিখেছে, ভারতের রাজস্থানের উদয়পুরের দুই ২৬ বছর বয়সী সফটওয়্যার প্রকৌশলী, পূর্বংশ পারমার ও অংশুল শর্মা গড়ে তুলেছেন ‘ফুডনেভারকামস’ নামের এই অভিনব প্ল্যাটফর্ম।

গত জুনে চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২৭ লাখেরও বেশি মানুষ সাইটটি ঘুরে দেখেছেন। এতে রয়েছে ২২টি কৃত্রিম কিচেন, ৩২৭টি ডিস এবং ৩১৯টি আসল রেসিপি, তবে পুরোটাই কাল্পনিক দাম, ভুয়া চেকআউট এবং কৃত্রিম ডেলিভারির অভিজ্ঞতা দিয়ে সাজানো।

মূলত ইন্টারনেটের একটি নতুন ট্রেন্ড বা ধারাকে ধারণ করছে এই উদ্যোগ, যাকে বলা হচ্ছে ‘ডোপামিন সাইট’।

প্রকৃত পণ্য বা খাবার না কিনেও অর্ডারের পুরো তৃপ্তিটুকু পাওয়ার সুযোগ দেয় এসব প্ল্যাটফর্ম। ভুয়া শপিং সাইট, নকল ডেলিভারি সেবা থেকে শুরু করে কাল্পনিক ভ্রমণের সুযোগও রয়েছে এই ধরনের ওয়েবসাইটে।

দক্ষিণ কোরিয়া থেকে শুরু হওয়া ইন্টারনেটের এই প্রবণতা এখন বিশ্বজুড়ে ছড়াচ্ছে, যার উদাহরণ ‘ডোপামিন শপ’ কিংবা ‘ফেকহোল’।

কম্পিউটার সায়েন্স পড়ার সময় পারমার ও শর্মার পরিচয়। পরে তারা গড়ে তোলেন ‘নিউরো-এক্স এআই’। কাজ করার সময় তারা নিজেদের জীবনেই এক অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করেন, পছন্দসই পণ্য অনলাইন কার্টে জমা হলেও শেষ পর্যন্ত আর তা কেনা হয় না।

পারমার জানান, মুম্বাইতে কাজ করার সময় তিনি সপ্তাহে প্রায় ৫ থেকে ১০ হাজার রুপি শুধু খাবার অর্ডারে খরচ করতেন।

বেলজিয়ান ওয়াফেল, আইসক্রিম কিংবা বড় জারের সোয়ার ক্রিম অর্ডার করতেন, যার অনেকগুলোই তাঁর প্রয়োজন ছিল না। পরে তিনি উপলব্ধি করেন, আসল ক্ষুধা খাবারের জন্য ছিল না, ছিল খাবার অর্ডারের আনন্দদায়ক প্রক্রিয়াটির জন্য।

পারমার বলেন, “অনেক সময় আপনার একদমই ক্ষুধা থাকে না। কিন্তু বোরিং সময়ে বা ব্যস্ততার মাঝে খাবার অর্ডার করলে আপনার ভালো লাগে। একসময় শুধু খাবার নয়, অর্ডারের সেই প্রক্রিয়াই আপনার আনন্দের মূল উৎস হয়ে ওঠে।”

ইয়েল সেন্টার ফর কাস্টমার ইনসাইটসের পরিচালক রবি ধর বিষয়টিকে বলছেন ‘অ্যান্টিসিপেটরি ইউটিলিটি’ বা পাওয়ার আগের আশাজাগানিয়া আনন্দ। তার মতে, নতুন এক জোড়া জুতো, ট্রিপ কিংবা রেস্তোরাঁর খাবারের মতো আকর্ষণীয় জিনিস পাওয়ার চেয়ে সেটি পাওয়ার জন্য যে দীর্ঘ প্রতীক্ষা, সেটি অনেক সময় বেশি রোমাঞ্চকর হয়।

রবি ধরের ভাষায়, “পাওয়ার চেয়ে তাড়া করার বা পাওয়ার চেষ্টার মধ্যেই আসল রোমাঞ্চ থাকে।” কিন্তু জিনিসটি একবার হাতে চলে এলে বা ইচ্ছা পূরণ হয়ে গেলে সেই উত্তেজনা হঠাৎ কমে যায়।

তবে স্নায়ুবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, ডোপামিনকে শুধুই ‘সুখের রাসায়নিক’ বলা এক ধরনের ভুল ধারণামাত্র।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী কেন্ট বেরিজ জানান, ‘ওয়ান্টিং’ (চাওয়া) এবং ‘লাইকিং’ (পছন্দ করা) দুটি ভিন্ন প্রক্রিয়া। ডোপামিন মূলত কোনো কিছু পাওয়ার আগ্রহ বা মোহের প্ররোচনা যোগায়, কিন্তু পাওয়ার পর যে তৃপ্তি পাওয়া যায়, তার জন্য ডোপামিন সরাসরি দায়ী নয়।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. অ্যানা লেম্বকে জানান, ডোপামিন মূলত মস্তিষ্ককে সংকেত দেয় ‘আরও নাও’ বা ‘আরও করো’। অর্ডারের অভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত আচারগুলোই একসময় আসল অনুভূতির রূপ নেয়।

Image

প্রকৃত পণ্য বা খাবার না কিনেও অর্ডারের পুরো তৃপ্তিটুকু পাওয়ার সুযোগ দেয় এসব প্ল্যাটফর্ম। ছবি: ফুডনেভারকামস

আসক্তি নাকি মানসিক স্বস্তি?

কৃত্রিমভাবে খাবার অর্ডার কি আসল ক্ষুধা মেটাতে পারে? স্নায়ুবিজ্ঞানী বেরিজ মনে করেন, কিছুদিনের মধ্যে এতে অভ্যস্ত হয়ে উঠলে মানুষের কৌতূহল কমে যাবে। তবে রবি ধরের মতে, ভিডিও গেমসের কৃত্রিম কেনাকাটার মতো এই সাইটগুলোও মানুষের কেনার অতিরিক্ত ঝোঁক কমানোর একটি মানসিক স্বস্তির মাধ্যম হতে পারে।

অন্যদিকে ড. লেম্বকে সতর্ক করে বলেন, অবাস্তব কেনাকাটার অভ্যাস দীর্ঘদিন চর্চা করলে তা আসক্তির একই ধরনের নিউরাল নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।

তবে শর্মা নিজেই এক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছেন। তার ফোন স্ক্রিন ফেটে গেলে তিনি আমাজনে ৬-৭টি ফোন কার্টে জমা রেখে এক সপ্তাহ গবেষণা করেন। পরে ফোনটি না কিনে পুরানোটাই মেরামত করে নেন। তিনি বলেন, “পছন্দ করা ও কার্টে রাখার প্রক্রিয়াই আমি উপভোগ করেছি, ফোন কেনার আর প্রয়োজন হয়নি।”

পারমার ও শর্মা তাদের এই ধারণাকে খাবারে সীমাবদ্ধ না রেখে চালু করেছেন ‘ট্রিপনেভারলিভস’ নামের আরেকটি সাইট।

সেখানে ব্যবহারকারীরা গন্তব্য, ফ্লাইট, হোটেল বুকিং করে একটি ভার্চুয়াল ফ্লাইটে উঠার অভিজ্ঞতা নিতে পারেন, যে বিমানটি কখনোই রানওয়ে ছাড়বে না। ইতোমধ্যে এক লাখেরও বেশি মানুষ সাইটটি ব্যবহার করেছেন।

কিশোর বা তরুণরা কেন এতে বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে, তা ব্যাখ্যা করে ড. লেম্বকে বলেন, বিকাশমান বয়সে মস্তিষ্কের সামনের অংশ (ফ্রন্টাল লোব), যা আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা পুরোপুরি সংযুক্ত থাকে না। তাই তরুণরা কোনো কিছুর নেতিবাচক প্রভাব না বুঝেই এতে দ্রুত আসক্ত হয়ে পড়ে।

উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, মুনাফা করা তাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। সাইটগুলো বিনামূল্যে রাখার পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের তথ্য ভবিষ্যতে স্নায়ুবিজ্ঞানী ও মনস্তাত্ত্বিকদের গবেষণার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।