নেপালের বন্যায় চীনের বাঁধ ও আগাম সতর্কতা নিয়ে বিতর্ক, যা বলছে বেইজিং
চীনা দূতাবাস বলেছে, "দোষারোপ কোনো কাজে আসে না, সহযোগিতাই জীবন বাঁচায়।"
তিব্বত থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও চীনে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং প্রাণহানির পর বেইজিংয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি লিখেছে, সীমান্তের চীনা অংশে একটি ভূমিধস প্রতিরক্ষা বাঁধ ধসে এই বিপদ তৈরি করেছে কিনা, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
চীনের ভূখণ্ডে বিপদের পূর্বাভাস পাওয়া গেলে আগাম সতর্কতা দিয়ে ভাটির দিকে মানুষের প্রাণহানি কমানো সম্ভব ছিল কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহলে।
এর জবাবে চীন বলেছে, তাদের পক্ষ থেকে আগাম সতর্কতা না দেওয়ার কারণে নেপালের দিকে প্রাণহানি হয়েছে—এমন দাবি ‘ভুয়া’।
নেপালে চীনা দূতাবাস এক বিবৃতিতে বলেছে, “২৬ আগস্ট সকালে নেপাল প্রান্তে একটি ভূমিকম্প বা ভূমিকম্পের মত হিমবাহ ধসের ঘটনা ঘটে। এতে সৃষ্ট বিশাল কাদার স্রোতে জিরং-রসুয়াগড়ি সীমান্ত অঞ্চলের নেপাল ও চীন–উভয় পাশেই ব্যাপক হতাহত ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটে।"
চীনা দূতাবাস বলেছে, "দোষারোপ কোনো কাজে আসে না, সহযোগিতাই জীবন বাঁচায়।"
বুধবার সকালে উত্তর নেপালের পাহাড়ি ভোটেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। এর জেরে তিব্বত সীমান্তের কাছে রসুয়া জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
ভিডিওতে দেখা যায়, সীমান্ত এলাকায় কাদা, পাথর ও পানির প্রবল স্রোত বহু মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
এই দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা ইতোমধ্যে ১৭৭ জনে পৌঁছেছে। এই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে নেপাল ও চীনা কর্মকর্তাদের ধারণা।
এ ঘটনায় ৭০০ বিদেশি নাগরিকসহ প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয়। বৃহস্পতিবারও নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
আগাম সতর্কতা নিয়ে কেন প্রশ্ন?
বন্যার পর নেপালের বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, সীমান্তের রাসুওয়াগাধি-গিয়েরং পারাপার কেন্দ্র এবং চীনের গিয়েরং বন্দর যখন দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন ভাটির দিকে থাকা মানুষকে সতর্ক করার মত তথ্য চীনের কাছে ছিল কি না।
নেপালি দৈনিক 'নয়া পত্রিকা'-এর এক সাংবাদিক সামাজিক মাধ্যম এক্সে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, "নেপাল সবসময় প্রতিবেশীদের বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগের দিকে নজর রেখেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, উত্তরের প্রতিবেশী আমাদের চরম অবমূল্যায়ন করেছে। এত বড় দুর্যোগের আগাম সতর্কতা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আমরা বিপুল প্রাণহানি শিকার করেছি।"
নেপালের জাতীয় পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক ভাইস চেয়ার ও ২০১৫ সালের ভূমিকম্প পরবর্তী পুনর্গঠন কর্তৃপক্ষের সাবেক সিইও ড. গোবিন্দ রাজ পোখরেলও এ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে তিনি বলেন, "আমি আশা করেছিলাম, তাদের উন্নত স্যাটেলাইট সিস্টেম ও প্রযুক্তির মাধ্যমে অন্তত কোনো চিত্র বা আভাস তারা পাবে এবং নেপালকে জানাবে। কিন্তু তারা সেটিও খেয়াল করতে পারেনি।"
তিনি বলেন, "আমাদের দিকে কোনো বৃষ্টিপাত না থাকায় এই বন্যা ছিল সম্পূর্ণ ধারণাতীত। নদীর ধারে যেতে নিষেধ করা পুলিশ সদস্যরাও ভেসে গেছেন, কারণ তারা নিজেরাই বন্যার মাত্রা আঁচ করতে পারেননি।"
ড. পোখরেলের মতে, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা হয় কার্যকর ছিল না, অথবা কাজ করেনি। তিনি চীন-নেপাল সীমান্তে হিমবাহ বিস্ফোরণজনিত বন্যা (জিএলওএফ) এবং অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবেলায় দুই দেশের মধ্যে শক্তিশালী নজরদারি ও সমন্বয়ের তাগিদ দেন।
চীনের ভূখণ্ডে বাঁধ ধসেছে?
চীনের ভূখণ্ডে ভূমিধস প্রতিরক্ষা বাঁধ ধসে নেপালে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার অভিযোগ চীনা দূতাবাস বিশেষভাবে নাকচ করেছে।
দূতাবাসের দাবি, ২৬ অগাস্ট সকালে নেপালের দিকেই ‘ভূমিকম্প বা ভূমিকম্পসদৃশ হিমবাহ ধসের’ ঘটনা ঘটে এবং সেটি বড় ধরনের কাদার স্রোত সৃষ্টি করে।
এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পিপলস ডেইলি জানিয়েছে, বুধবার দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের শিজাং (তিব্বত) স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের জিরং বন্দরের কাছে ভূমিধসের ঘটনায় অনেকেই নিখোঁজ রয়েছেন।
জিরং কাউন্টির জরুরি ব্যবস্থাপনা ব্যুরো জানিয়েছে, দুর্যোগের কারণে চীনের দিকের বন্দরের রাস্তাঘাট, যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জিরং বন্দরটি চীন ও নেপালের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী অন্যতম প্রধান স্থলবন্দর।
বন্যার উৎস নিয়ে কী জানা যাচ্ছে?
বন্যার সঠিক কারণ ও ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তদন্ত চলছে। তবে এখন পর্যন্ত স্যাটেলাইট ছবি ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে হিমবাহের বরফ ও পাথরের বড় ধরনের ধসকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে একটি হিমবাহের সামনের অংশের বড় একটি অংশ ভেঙে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা থেকে বরফ ও পাথর প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচের উপত্যকায় নেমে আসে। এর সঙ্গে পলি ও ধ্বংসাবশেষ মিশে গিয়ে নদীতে প্রবল স্রোত তৈরি হতে পারে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, রাসুওয়াগাধি সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে লেন্দে নদীর এলাকায় হিমবাহ-সম্পৃক্ত বন্যা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সংস্থা আইসিআইএমওডির বলেছে, বন্যার সময় ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পানি, পলি ও বড় বড় পাথরের শক্তিশালী স্রোত নেমে যায়।
নেপালের কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে বলেছিলেন, দুর্যোগের কয়েক মিনিট আগে ওই এলাকায় একটি ভূমিকম্প হয়েছিল। সেই ভূমিকম্প হিমবাহের বরফ ও পাথরের ধস নামিয়ে বন্যা সৃষ্টি করতে পারে বলে তাদের ধারণা হয়েছিল।
তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, দুর্যোগের সময় রেকর্ড হওয়া ৪ দশমিক ৪ মাত্রার যে ভূমিকম্পের কথা প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহের পাথর ও বরফ ধসে পড়া এবং ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ থেকে সৃষ্ট ভূকম্পনজনিত শক্তি।
এর আগে, গত বছরের অগাস্টেও অতিরিক্ত তাপমাত্রায় তিব্বতের একটি হিমবাহ হ্রদ উপচে পড়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল। ওই ঘটনায় ৯ জন মারা যায় এবং জিরং বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
