Published : 15 Feb 2026, 03:16 PM
ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি কয়েকদিন পর জেনিভাতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে হতে যাওয়া শান্তি আলোচনায় ফল মিলবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও কেবল কিইভকেই ‘বারবার’ ছাড় দিতে বলায় বিরক্তিও প্রকাশ করেছেন।
আলোচক দলের নেতা পরিবর্তনের মাধ্যমে মস্কো সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেরি করাতে চাইছে বলেও তিনি শনিবার অভিযোগ করেছেন, বলেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
আগামী মঙ্গল ও বুধবার সুইজারল্যান্ডের শহরটিতে রুশ, মার্কিন ও ইউক্রেইনীয় আলোচক দলের বসার কথা রয়েছে। ১৯৪৫ সালের পর ইউরোপে হওয়া সবচেয়ে বড় যুদ্ধের অবসানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও এখন মস্কো, কিইভ দুই পক্ষকেই ব্যাপক চাপ দিচ্ছেন।
“ত্রিপক্ষীয় বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ হবে, সবার জন্য সহায়ক হবে বলে আমরা সত্যিই আশা করছি। কিন্তু সত্যি কথা বলতে মাঝে মাঝে মনে হয় সবাই যেন পুরোপুরি ভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলছে,” বার্ষিক মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুশ বাহিনী প্রতিবেশী দেশে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরু করার পর চলতি বছর ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেইন আবু ধাবিতে দুই দফা আলোচনায় মিলিত হয়েছিল। উভয় পক্ষ সেসব আলোচনাকে ‘গঠনমূলক’ বললেও দৃশ্যমান কোনো ব্রেক থ্রু দেখা যায়নি।
জেলেনস্কি মস্কোর ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ইউক্রেইনে বেশি বেশি অস্ত্র সরবরাহসহ নানামুখী উপায়ে রাশিয়াকে চাপ দিয়ে শান্তিতে রাজি করাতে মিত্রদের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছেন।
চার বছর আগে, ইউক্রেইনের রুশ অভিযান শুরুর কয়েকদিন আগে একই সম্মেলনে বক্তৃতা দেওয়ার কথা স্মরণ করে ইউক্রেইনের এ প্রেসিডেন্ট বলেন, পশ্চিমা কর্মকর্তারা অনেক কথা বলেন, কিন্তু সেই তুলনায় তেমন পদক্ষেপ নেন না।
পুতিনকে যুদ্ধবিরতি ঘোষণায় বাধ্য করার ক্ষমতা রয়েছে ট্রাম্পের এবং এই যুদ্ধবিরতি খুবই দরকার, বলেছেন তিনি।
ইউক্রেইনের অন্য কর্মকর্তারাও বলছেন, কোনো শান্তি চুক্তি হলে তা নিয়ে গণভোট আয়োজনে যুদ্ধবিরতি লাগবে। ওই গণভোট জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গেই হবে।
শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে ট্রাম্পের দিক থেকে ‘খানিকটা চাপ’ আছে বলেও স্বীকার করে নিয়েছেন জেলেনস্কি। আগেরদিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, দ্রুত শান্তি অর্জনের ‘সুযোগ’ হাতছাড়া করা জেলেনস্কির উচিত হবে না, যে কারণে তিনি ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্টকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতেও তাগাদা দিচ্ছেন।
“আমেরিকানরা প্রায়ই ছাড়ের প্রসঙ্গে ফিরে আসে, এবং বেশিরভাগ সময়ই ইউক্রেইনের ক্ষেত্রে এই ছাড়ের বিষয়টি আসে, রাশিয়ার ক্ষেত্রে নয়,” বলেন জেলেনস্কি।
ইউক্রেইনে এরই মধ্যে অনেক কিছুতে ছাড় দিয়েছে দাবি করে তিনি এখন মস্কো কী কী বিষয়ে ছাড় দিতে প্রস্তুত তা শুনতে চান বলেও জানান।
এদিকে রাশিয়া বলেছে, জেনিভায় তাদের আলোচক দলের নেতৃত্বে থাকবেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উপদেষ্টা ভ্লাদিমির মেদিনস্কি। অথচ আবু ধাবিতে দুই দফার আলোচনায় রুশ দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ইগর কোস্তিওকভ।
আলোচক দলের নেতা বদলানোর এ ঘটনায় শনিবার ‘বিস্ময়’ প্রকাশ করেছেন জেলেনস্কি; কোনো সিদ্ধান্তে দুই পক্ষের একমত হতে যেন দেরি হয় তার লক্ষ্যেই রাশিয়া এমনটা করছে বলেও তার ধারণা।
আগের যে আলোচনাগুলোতে মেদিনস্কি ছিলেন, সেগুলোতে তার ভূমিকা নিয়ে ইউক্রেইনের কর্মকর্তাদের ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। গঠনমূলক আলোচনার বদলে মেদিনস্কি প্রায়ই ইউক্রেইনের আলোচক দলকে ‘ইতিহাসের পাঠ’ দেওয়া শুরু করেন বলে তাদের অভিযোগ।
ভূখণ্ড নিয়ে অচলাবস্থা
পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্কের যে এলাকাগুলো এখনও ইউক্রেইনের বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তার ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনও মতবিরোধ রয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
রাশিয়া চায় সেসব এলাকা থেকে কিইভ সেনা প্রত্যাহার করে নিক, কিন্তু ইউক্রেইন তাতে রাজি নয়।
ইউক্রেইনের বাহিনী সেসব এলাকা থেকে সরে গেলে রাশিয়া দ্রুত যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে মার্কিন আলোচকরা কিইভকে বলেছেন, শনিবার সংবাদ সম্মেলনে জেলেনস্কি এমনটাই জানান।
যুক্তরাষ্ট্র এর আগে ইউক্রেইনের দখলে থাকা দোনেৎস্কের এলাকায় ‘মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠা ও এক হাজার ২০০ কিলোমিটার ফ্রন্টলাইনে যার যেখানে দখল আছে সেটাকে সেভাবে রেখে যুদ্ধ থামানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। সেই প্রস্তাব নিয়ে ইউক্রেইনও আলোচনায় আগ্রহী ছিল বলে জানান জেলেনস্কি।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে তার সঙ্গে থাকা ইউক্রেইনের প্রধান আলোচক রুস্তম উমেরভ বলেন, কেবল দুটি বিকল্পই খোলা রয়েছে। হয় ইউক্রেইন এখনকার সীমানা ধরে রাখবে না হলে সেখানে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হবে।
ক্রাইমিয়াসহ ইউক্রেইনের ২০১৪ পূর্ববর্তী সীমানার প্রায় ২০ শতাংশই এখন রাশিয়ার দখলে। ২০২৪ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত তারা ইউক্রেইনের পুরো ভূখণ্ডের প্রায় দেড় শতাংশ কব্জা করে নিয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ভাষ্য। সম্প্রতি তারা ইউক্রেইনের বিভিন্ন শহরে বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে লাগাতার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইউক্রেইনের কর্মকর্তাদের আরেকটি উদ্বেগ হল- নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। সেজন্য আর কয়েক মাস পর পুরো ট্রাম্প প্রশাসনের নজরই চলে যাবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যুতে, সেসময় ওয়াশিংটনের মনোযোগ যেমন কমে যাবে তেমনি রাশিয়ার নতুন সমন্বিত আক্রমণের সম্ভাবনাও কম নয়।
জেলেনস্কির আশা, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় থাকবে এবং ইউরোপের জন্যও সুযোগ তৈরি হবে, যেন তারা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মস্কো-কিইভ আলোচনায় এখন ইউরোপের ভূমিকা নেই বললেই চলে।
“ইউরোপ কার্যত আলোচনার টেবিলে নেই, আমার মতে, এটা অনেক বড় ভুল,” বলেছেন তিনি।