১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্ত থেকে যে কৌশলে ফিরে এল ভারত-পাকিস্তান

রাজধানী ইসলামাবাদের কাছে নূর খান বিমান ঘাঁটিতে ভারতের হামলা দুই দেশের সংঘাতকে পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করছিল।

পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্ত থেকে যে কৌশলে ফিরে এল ভারত-পাকিস্তান
পাকিস্তান-শাসিত কশ্মীরের নিলম ভ্যালির শাহকোট গ্রামে হমলায় ধ্বংস হওয়া একটি বাড়ি। ছবি: রয়টার্স।

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 15 May 2025, 08:09 PM

Updated : 26 Aug 2026, 12:43 PM

শনিবার (১০ মে) ভোররাত, পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটি রাওয়ালপিন্ডির কাছে একটি বিমানঘাঁটির পাশের বাড়িতে বাস করা আহমাদ সুবহান প্রথম বিস্ফোরণের শব্দে জেগে ওঠেন। কেঁপে ওঠে তার ঘরের জানালা—দক্ষিণ এশিয়া তখন পৌঁছে যায় যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে।

প্রায় তিন সপ্তাহের উত্তেজনার পর সেদিন ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে পারমাণবিক শক্তিধর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ লড়াই চরমে পৌঁছায়।

দু'দেশের যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে উড়ছিল। পাকিস্তান জানায়, তারা শীর্ষ পারমাণবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কমিটির জরুরি বৈঠক ডাকার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

রাত দুইটা থেকে ভোর- এই উত্তেজনাকর আট ঘণ্টায় ভারতের একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পাকিস্তানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি, এর মধ্যে রাজধানী ইসলামাবাদের কাছের নূর খান ঘাঁটিও ছিল, যা হামলার শিকার হয়।

নূর খানের কাছে বাস করা সুবহান বলেন, “প্রথম বিস্ফোরণের পর আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরেকটা বিস্ফোরণ হলো। তখনই আমি আমার স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাই।”

নূর খানে ভারতের এই হামলা পারমাণবিক সংঘাতের উদ্বেগ সৃষ্টি করে। সেদিন (শনিবার) এই ঘটনার সূচনা হয় এক সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা নিয়ে। তবে সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর সেই আশঙ্কা কেটে যায়।

 রয়টার্স যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও পাকিস্তানের ১৪ জন কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার এবং তিন দেশের প্রকাশিত সরকারি বিবৃতি পর্যালোচনার ভিত্তিতে একথা জানিয়েছে।

এসব বিবৃতিতে পরিস্থিতি নিমেষেই যুদ্ধের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া এবং আড়াল থেকে চলা কূটনৈতিক প্রচেষ্টা উঠে এসেছে। যে প্রচেষ্টা সক্রিয়ভাবে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও পাকিস্তান। সেখানে ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতার ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আহমাদ সুবহান ও নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুজন পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, নূর খান বিমান ঘাঁটিতে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে দুটি ছাদ ধসে পড়াসহ একটি জ্বালানি ভরার প্লেনের হ্যাঙ্গার আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তবে সেটি তখন আকাশে ছিল।

এক ভারতীয় কর্মকর্তা অবশ্য সাংবাদিকদের বলেছেন, নূর খানের একটি কমান্ড সেন্টারে হামলা চালানো হয়েছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশহাক দার বলেন, “রাজধানীর কাছে নূর খান ঘাঁটিতে হামলা হওয়ায় আমাদের পাল্টা জবাব দেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না।”

এই ঘাঁটি পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচি পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা সামরিক দপ্তরের খুব কাছেই অবস্থিত।

সেকারণে এ হামলাকে ভারতের অভিপ্রায়ের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হিসাবে দেখা হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের আলবানি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ক্লেরি।

তিনি বলেন, “এমন একটি সংঘাত পারমাণবিক রূপ না নিয়ে সীমার মধ্যে থাকা সম্ভব তেমনটি ভেবে নেওয়া দুই পক্ষের কারও জন্যই ঠিক হত না। রাশিয়ান রুলেট (জুয়া) খেললে এবং ট্রিগার টানলে, তার অর্থ এই নয় যে, আবার ট্রিগার টানা উচিত হবে।”

এসব বিষয় নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো রয়টার্সের প্রশ্নের কোনও উত্তর দেয়নি। সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সরাসরি কোনও মন্তব্য করেনি। তবে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কেবল বলেছেন, আরও সংঘর্ষ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।

মোদীকে ভ্যান্সের ফোনকল:

গত ২২ এপ্রিল ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে এক হামলায় ২৬ জন নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই পর্যটক। ভারত এর জন্য পাকিস্তান-সমর্থিত জঙ্গিদের দায়ী করে। পাকিস্তান অভিযোগ অস্বীকার করে।

৭ মে ভারতের বিমান বাহিনী পাকিস্তানে "সন্ত্রাসী অবকাঠামোতে" হামলা চালায়। পরে পাকিস্তান জানায়, তারা পাঁচটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। ভারতও পাল্টা আঘাত হানার কথা জানায়।

৯ মে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন যে, এই সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই সূত্রে এমনটি জানা যায়।

আরেক সূত্র জানায়,  মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ৬ থেকে ৮ মে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীসহ দুই দেশেরই কর্মকর্তা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সঙ্গে দফায় দফায় ফোনে কথা বলেছিলেন।

পরদিন, ৯ মে সকালে রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ফোন করার ভ্যান্সের পরিকল্পনা এবং ৪ দিনে গড়ানো ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ যে নাটকীয় মোড় নিতে পারে সে ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ তুলে ধরার কথা জানানো হয় বৈঠকে।

এরপরই পরিকল্পনামত মোদীকে ফোন করে ভ্যান্স উত্তেজনা প্রশমনের জন্য তাগাদা দেন। তিনি মোদীকে একটি সম্ভাব্য সমঝোতা প্রস্তাব দেন, যা তার মতে, পাকিস্তানের পক্ষেও গ্রহণযোগ্য হবে।”

রুবিও এরপর ভারত ও পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে ১০ মে সকাল পর্যন্ত টেলিফোন কূটনীতি চালান। যদিও ভ্যান্স এর কিছুদিন আগে প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, “এই যুদ্ধ আমাদের দেখার বিষয় নয়, যুক্তরাষ্ট্র এর মধ্যে যাবে না।”

সূত্রগুলো জানায়, মোদী তখন প্রস্তাবের বিষয়ে সাড়া দেননি। ভ্যান্সকে তিনি বলেছিলেন, পাকিস্তান আবার কিছু করলে আরও কড়া জবাব দেওয়া হবে।

ভারতীয় কর্মকর্তাদের কথায়, ওই ফোনালাপের ঘণ্টা কয়েক পরই উত্তেজনায় বাড়বাড়ন্ত দেখা যায়। ১০ মে ভোরে ভারতের ভেতরে অন্তত ২৬টি জায়গায় হামলা চালায় পাকিস্তান।

পাকিস্তান বলেছিল, তারা এই হামলা চালায় নূর খান বিমানঘাঁটিসহ কয়েকটি স্থাপনায় ভারতের চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে।

পারমাণবিক সংকেত:

ভারতের ওই হামলার এক ঘণ্টার একটু পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী জানান, তাদের তিনটি বিমানঘাঁটিতে ভারত হামলা করেছে।

এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা ও একটি ভারতীয় সূত্র জানায়, ১০ মে কিছু হামলায় ভারত ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।

পাকিস্তানের ধারণা, ব্রহ্মস পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন, যদিও ভারত বলে এটি কেবল প্রচলিত অস্ত্রই বহন করে।

১০ মে ভোর পাঁচটার দিকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জানায়, তারা ভারতের বিমানঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

এর প্রায় ২ ঘন্টা পর পাকিস্তান তাদের জাতীয় কমান্ড কর্তৃপক্ষের বৈঠক ডাকার কথা সাংবাদিকদের জানায়—যেটি পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটির (এনসিএ) এই বৈঠক আহ্বান করেন।

রয়টার্সকে গত মঙ্গলবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, “আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়ানো উদ্বেগ অতিরঞ্জিত। তেমন কিছু ঘটেনি। আমরা দায়িত্বশীল দেশ।”

তবে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, “সংকট কতটা গভীর রূপ নিয়েছে, সেটিই ছিল পাকিস্তানের এনসিএ বৈঠক আহ্বানের বার্তা। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার জন্য এটি হয়ত পরোক্ষ একটি আহ্বান ছিল।”

এনসিএ বৈঠকের ঘোষণা আসার প্রায় এক ঘণ্টা পর যুক্তরাষ্ট্র জানায়, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।

মুনিরকে পাকিস্তানের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষ হিসাবেই দেখা হয়। তাকে এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে উত্তেজনা প্রশমনে রাজি করানোর চেষ্টা করছিলেন রুবিও।

এরপর রুবিও ফোনালাপ করেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে।

ইসহাক দার রয়টার্সকে বলেন, “রুবিও বললেন, ভারত থামতে চায়। আমি বললাম, তারা থামতে চাইলে আপনি তাদের থামান, আমরাও তখন থামব।”

‘চমৎকার বুদ্ধিমত্তা’

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ কিছুদিন আগেই যুদ্ধ নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তিনি স্থানীয় একটি টিভি চ্যানেলে ফোন করেন।

পাকিস্তানি কর্মকর্তারা এনসিএ-এর বৈঠকের খবর শেয়ার করার আড়াই ঘণ্টা পরই আসিফ ঘোষণা দেন যে, “এমন কোনও বৈঠক ডাকা হয়নি।” তার এই বার্তাই দুই দেশের সংঘাত পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা প্রশমিত করে।

ওদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর পর্দার পেছনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় অবশেষে যুদ্ধবিরতির পথ প্রশস্ত হয়।

পরে ভারত ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মহাপরিচালকদের মধ্যে ফোনালাপের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত হয়। তারা গত সোমবার ফের কথা বলেন।

পাকিস্তানের লেফটেন্যান্ট জেনারেল চৌধুরী এক ব্রিফিংয়ে জানান, গত ৭ মে তে ভারতের হামলার পর নয়াদিল্লিই প্রথম দুই দেশের সেনাবাহিনীর মহাপরিচালকদের মধ্যে ফোনকলের অনুরোধ জানিয়েছিল।

তবে ইসলামাবাদ সেই অনুরোধে সাড়া দেয় শনিবার (১০ মে) ভারতে পাল্টা হামলার পর এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের আহ্বানে। যদিও সেই মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর নাম প্রকাশ করেননি তিনি।

ভারতের হামলার জবাবে পাকিস্তান তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভারতীয় বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর কথা ঘোষণা করার ঠিক ১২ ঘণ্টা পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দেন—যুদ্ধ থামছে।

ট্রাম্প পোস্টে লেখেন, “সাধারণ জ্ঞান ও চমৎকার বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগানোর জন্য দুই দেশকেই অভিনন্দন।’