Published : 31 Jul 2025, 08:25 PM
প্রতিবাদ আর কূটনৈতিক চাপের মুখে নতি স্বীকার করল সদবি’স নিলাম ঘর। গৌতম বুদ্ধের দেহাবশেষ এবং এর সঙ্গে উদ্ধার হওয়া বেশ কিছু মূল্যবান পাথর ও গয়নার সংগ্রহ অবশেষে ভারতকে ফিরিয়ে দিয়েছে তারা।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বুধবার এই রত্নগুলো ফেরার ঘোষণা দিয়ে এক্সে বলেন, “এটি দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক গর্বের ও আনন্দের মুহূর্ত। ১২৭ বছর পর বুদ্ধের গহনা আমাদের ঘরে ফিরছে।”
মূল্যবান এই সম্পদগুলো মে মাসে হংকংয়ে সদবি’সয়ে নিলামে উঠার কথা ছিল। ভারত এগুলো নিলাম না করে তাদের কাছে তা ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিল। নিলাম বন্ধ না হলে এর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দিয়েছিল ভারত।
ধর্মীয় অনুভূতি ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের প্রশ্ন তুলে সদবি’স- এর ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়াচ্ছিল ভারত সরকার ও বিশ্বজুড়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা। এর ফলেই হংকংয়ে নির্ধারিত নিলাম বাতিল করে নিলামঘরটি।
পরবর্তীতে ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী গোদরেজ ইন্ডাস্ট্রিজ গ্রুপ ওই রত্নসম্ভার গ্রহণ করেছে ভারতে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। সদবি’স নিলামঘর জানিয়েছে, দুইমাসের আলোচনার পর তারা রত্নগুলো ফিরিয়ে দিতে পেরে আনন্দিত।
কী ছিল এই রত্নসম্ভারে?
১৮৯৮ সালে উইলিয়াম ক্ল্যাক্সটন পেপে নামের এক ব্রিটিশ এস্টেট ম্যানেজার উত্তর ভারতে (বর্তমানে উত্তরপ্রদেশ) পিপরাওয়া বৌদ্ধ স্তূপের কাছে খনন করে মূল্যবান ওই সম্পদগুলো উদ্ধার করেছিলেন।
বুদ্ধের জন্মস্থল হিসাবে পরিচিত লুম্বিনীর অদূরেই ছিল এই পিপরাওয়া স্তূপ। সেখান থেকে বুদ্ধের দেহাবশেষের পাশাপাশি উদ্ধার হয় প্রায় ১৮০০ রত্ন; যার মধ্যে ছিল রুবি, মুক্তা, চুনি, পোখরাজ, টোপাজ ও নীলার মতো মূল্যবান পাথর এবং আঁকিবুঁকি করা সোনার পাত।
বৌদ্ধ ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা এই আবিষ্কারকে আধুনিক যুগের অন্যতম বিস্ময়কর প্রত্নতাত্ত্বিক ঘটনা বলে অভিহিত করেছেন বলে জানিয়েছে, বিবিসি।
বিবিসি জানায়, উইলিয়াম পেপে এসব সম্পদ ঔপনিবেশিক ভারত সরকারকে দিয়েছিলেন। সেখান থেকে বুদ্ধের অস্থি দেওয়া হয়েছিল সিয়ামের (বর্তমানে থাইল্যান্ড) বুদ্ধ রাজা চুলালংকর্ণকে।
আরও কিছু রত্ন পাঠানো হয়েছিল ভারতের কলকাতা মিউজিয়ামে (তৎকালীন ইম্পেরিয়াল মিউজিয়াম)। আর উইলিয়াম পেপের পরিবারে রয়ে গিয়েছিল অল্প কিছু রত্ন। তখনকার ব্রিটিশ ঔপনিবেশক প্রসাশন সেগুলোকে ‘ডুপ্লিকেট’ আখ্যা দিয়েছিল।
উইলিয়ামের প্রপৌত্র ক্রিস পেপে বর্তমান এই সম্পদগুলোর রক্ষক। সম্প্রতি সদবি’স- রত্নগুলি হংকংয়ে নিলামে তোলে, যা চূড়ান্ত বিতর্কের জন্ম দেয়।
বিতর্ক ও প্রতিবাদ
বিশ্বজুড়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়, শিল্প ইতিহাসবিদ এবং ভারত সরকার সদবিরের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল একটাই প্রশ্ন— “ধর্মীয় পবিত্র বস্তুকে কি নিলামে তোলা যেতে পারে?”
দিল্লিভিত্তিক শিল্প ইতিহাসবিদ নমন আহুজা বলেন, “বুদ্ধের দেহাবশেষ কি এমন কোনও বস্তু, যাকে শিল্পকর্মের মতো বাজারে বিক্রি করা যায়?”
অন্যদিকে, পেপে পরিবারের বর্তমান সদস্য ক্রিস পেপে যুক্তি দিয়েছিলেন, “আমরা দান করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সবকটি প্রস্তাবেই সমস্যা ছিল। তাই নিলামই ছিল সবচেয়ে স্বচ্ছ এবং ন্যায্য পথ।” তবে তাঁর এই ব্যাখ্যা অনেকেই গ্রহণ করেননি।
রত্নের ভবিষ্যৎ
রত্নগুলো এখন ভারতের মাটিতেই স্থায়ীভাবে সর্বসাধারণের প্রদর্শনের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
গোদরেজ ইন্ডাস্ট্রিজ গ্রুপ নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান পিরোজশা গোদরেজ বলেন, “এই রত্নগুলো কেবলই প্রত্নবস্তু নয়—এগুলো শান্তি, সহানুভূতি এবং মানবজাতির একত্রিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের চিহ্ন।”
সদবি’স এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের জন্য ভারত সরকার, ক্রেতা ও পেপে পরিবারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে।
১২৭ বছরের অপেক্ষার পর বুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন এখন আবার ভারতের বুকে—এই ঘটনা কেবল প্রত্নতাত্ত্বিক নয়, এক গভীর সাংস্কৃতিক পুনরুদ্ধারও।