গোলান মালভূমির ফুটবল মাঠে রকেট হামলায় ঝরল ১২ শিশুর প্রাণ
“আমরা একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের মুখোমুখি,” বলছেন ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ইসরায়েল অধিকৃত গোলান মালভূমির একটি ফুটবল মাঠে রকেট হামলায় ১২ শিশু ও তরুণ নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে কয়েক ডজন।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, শনিবার লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ছোড়া একটি রকেট দ্রুজ শহর মাজদাল শামসে পড়ে। তবে ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছে গোষ্ঠীটি।
হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে বদলা নেওয়ার অঙ্গীকার করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তাদের 'চড়া মূল্য দিতে হবে'।
বিবিসি লিখেছে, রকেট হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে নিয়মিতভাবেই ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে।
গত ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তে এটাই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা।
জাতিসংঘের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি থাকায় সব পক্ষের জন্যই “সর্বোচ্চ সংযম' খুবই গুরুত্বপূর্ণ; নাহলে 'পুরো অঞ্চল অবিশ্বাস্য বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে।”
গোলান মালভূমিতে হামলার কথা অস্বীকার করেছেন হিজবুল্লাহর মুখপাত্র মোহাম্মদ আফিফ। সশস্ত্র গোষ্ঠীটি জাতিসংঘের কাছে দাবি করেছে, ইসরায়েলি ইন্টারসেপ্টর রকেটে ওই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। হিজবুল্লাহর এই দাবি যাচাইয়ের চেষ্টা করার কথা লিখেছে বিবিসি।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বলছে, নিহতদের বয়স ১০ থেকে ২০ বছর বয়সের মধ্যে। যদিও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম বলছে, কয়েকজন ‘অল্প বয়সী’ রয়েছে।
ওই ঘটনার এক ভিডিওতে দেখা যায়, ফুটবল মাঠে মানুষের ভিড়, সেখানে অপেক্ষমান অ্যাম্বুলেন্সে নেওয়া হচ্ছে স্ট্রেচার।
ঘটনাস্থল মাজদাল শামস গোলান মালভূমির চারটি গ্রামের মধ্যে একটি, যেখানে আরবি ভাষী দ্রুজ ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর প্রায় ২৫ হাজার মানুষের বসবাস।
মাজদাল শামসে হতাহতের ঘটনা প্রকাশের আগে হিজবুল্লাহ অন্য চার হামলার কথা স্বীকার করে।
এসব হামলার একটি ঘটে ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তের হারমন পর্বতের ঢালে অবস্থিত একটি সামরিক ঘাঁটিতে। সেখান থেকে হতাহত শিশুদের ফুটবল মাঠের দূরত্ব প্রায় ৩ কিলোমিটার।
আইডিএফের মুখপাত্র ড্যানিয়েল হাগারি ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে 'মিথ্যাচারের’ অভিযোগ তুলেছেন। বলেছেন, তারা ‘ঘটনার দায় অস্বীকার করার' চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, ইরানের তৈরি ফালাক-১ রকেটটির 'একমাত্র মালিক হিজবুল্লাহ’।
"আমাদের গোয়েন্দা তথ্য স্পষ্ট। নিষ্পাপ শিশুদের হত্যার জন্য হিজবুল্লাহ দায়ী। ওই ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েল।”
বিবিসি লিখেছে, গত অক্টোবর থেকে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নিয়মিত পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটলেও দুই পক্ষই এমন পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকছে-যাতে দক্ষিণ লেবাননে বড় ধরনের যুদ্ধ না বাঁধে।
গোলান মালভূমিতে হতাহতের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র সফরে থাকা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আগেভাগেই দেশে ফিরছেন।
এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের দ্রুজ সম্প্রদায়ের নেতা শেখ মোয়াফাক তারিফ বলেছেন, 'ভয়াবহ নৃশংসতা’ সম্ভাব্য সব সীমারেখা অতিক্রম করেছে।
“সত্যিকারের একটি রাষ্ট্র তার নাগরিক ও বাসিন্দাদের ধারাবাহিকভাবে ক্ষতি হতে দিতে পারে না। উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য গত নয় মাস ধরে এটিই চলমান বাস্তবতা।”
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ দেশটির টিভি স্টেশন চ্যানেল টুয়েলভকে বলেছেন, “আমরা একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের মুখোমুখি।”
হামলার ওই ঘটনাকে ‘ভয়াবহ ও মর্মান্তিক বিপর্যয়' বর্ণনা করে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বলেছেন, “ইসরায়েল রাষ্ট্র দৃঢ়ভাবে তার নাগরিক ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে।”
হামলার প্রতিক্রিয়ায় লেবানন সরকার এক বিরল বিবৃতিতে বলেছে, তারা ‘বেসামরিক নাগরিকের বিরুদ্ধে সব ধরনের সহিংসতা ও আগ্রাসনের নিন্দা’ জানায়।
অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধে সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, “বেসামরিক নাগরিকদের নিশানা করা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং মানবতার নীতির পরিপন্থি।”
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
জাতিসংঘের দূত টর ওয়েনেসল্যান্ড হামলার নিন্দা জানিয়ে সব পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি এক্স পোস্টে বলেছেন, "মধ্যপ্রাচ্য খাদের কিনারায় রয়েছে; বিশ্ব ও এ অঞ্চল আরেকটি প্রকাশ্য সংঘাতের ভার বহন করতে পারবে না।”
বেশিরভাগ দ্রুজ উত্তর ইসরায়েল, লেবানন, জর্ডান ও সিরিয়ায় বসবাস করেন। ইসরায়েলে তাদের পূর্ণ নাগরিক অধিকার রয়েছে এবং দেশটির জনসংখ্যার প্রায় ১.৫ শতাংশই দ্রুজ।
১৯৮১ সালে গোলান মালভূমি সিরিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় তাদের ইসরায়েলি নাগরিকত্বের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সবাই তা গ্রহণ করেনি।
গোলানের দ্রুজরা বর্তমানে ইসরায়েলে পড়াশোনার পাশপাশি কাজ করতে পারে; যদিও কেবল তারাই ভোট দিতে পারে-যাদের নাগরিকত্ব আছে।
দ্রুজ পুরুষদের সেনাবাহিনীতে চাকরি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীতে তারাই অ-ইহুদি বৃহত্তম গোষ্ঠী। ইসরায়েল যে গোলান মালভূমি অধিগ্রহণ করেছে, তাতে সায় নেই আন্তর্জাতিক বেশিরভাগ সম্প্রদায়ের।
