Published : 28 Jun 2022, 05:37 PM
শেষ তিন মাসের মধ্যেই, তুমুল বর্ষণের কারণে চীন, ভারত, বাংলাদেশ বিপর্যয়কর বন্যা দেখেছে এবং দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপের অনেক অংশ তাপদাহে সেদ্ধ হয়েছে। এদিকে, দীর্ঘ খরাও উত্তর আফ্রিকার লাখ লাখ মানুষকে দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে।
এসব দুর্যোগের বেশিরভাগই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রত্যাশিত, বলছেন বিজ্ঞানীরা।
মঙ্গলবার ‘এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ: ক্লাইমেট’ জার্নালে একদল জলবায়ু বিজ্ঞানীর একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বিজ্ঞানীরা গত দুই দশকের প্রত্যেকটি আবহাওয়াজনিত ঘটনায় জলবায়ু পরিবর্তন কী ভূমিকা রেখেছে তা যাচাই করে দেখেছেন বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে।
তাদের গবেষণার ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা যেভাবে আমাদের বিশ্বকে বদলে দেবে সে বিষয়ক সতর্কবার্তাগুলো নিশ্চিত করেছে এবং কোন কোন তথ্য নেই তা স্পষ্ট করেছে।
“তাপদাহ এবং প্রবল বর্ষণের ক্ষেত্রে এসবের তীব্রতা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কীভাবে বদলায় সে বিষয়ে ভালো ধারণা পেয়েছি আমরা,” বলেছেন ওয়েলিংটনের ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী এবং জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটির সহ-লেখক লুক হ্যারিংটন।
তবে দাবানল এবং খরার ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন কী ধরনের প্রভাব ফেলে সে সম্বন্ধে তারা তুলনামূলক কম ধারণা পেয়েছেন।
তাদের পর্যালোচনা প্রতিবেদনের জন্য বিজ্ঞানীরা কম্পিউটার সিমুলেশন ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকে কাজে লাগিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে আবহাওয়ার চরমভাবাপন্ন ঘটনাকে প্রভাবিত করে এ সংক্রান্ত শত শত ‘নামকরা’ গবেষণার ওপর নির্ভর করেছেন।
স্বল্প ও মধ্য আয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রে তথ্যে ব্যাপক ফাঁক থাকারও উল্লেখ করছেন তারা; যে কারণে ওইসব অঞ্চলে আবহাওয়াজনিত ঘটনায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বোঝা কষ্টসাধ্য হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন আরেক সহ-লেখক ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের (ডব্লিউডব্লিউএ) আন্তর্জাতিক গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া অন্যতম জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ফ্রিডরিক ওটো।
তাপদাহ
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই তাপদাহ আরও মারাত্মক রূপ ধারণ করছে, এই সম্ভাবনা প্রকট বলে মত বিজ্ঞানীদের।
“বিশ্বজুড়ে এখন প্রায় সব তাপদাহই আগের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র হচ্ছে এবং এর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনেরই দায় আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে,” বলেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানী, এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ: ক্লাইমেট জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনের সহ-লেখক বেন ক্লার্ক।
আগে যেখানে তাপদাহ হওয়ার সম্ভাবনা থাকতো ১০ ভাগের একভাগ, এখন তা ৩ ভাগের কাছাকাছি হয়ে গেছে, তাপমাত্রাও এক ডিগ্রির মতো বেড়ে গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া এটি হতো না।
এ বছরের এপ্রিলে ভারত, পাকিস্তানে এক তাপদাহে তাপমাত্রার পারদ চড়েছিল ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এই তাপদাহের সম্ভাবনা ৩০ গুণ বেড়েছিল বলে জানিয়েছে ডব্লিউডব্লিউএ।
“আমাদের পর্যালোচনা প্রতিবেদনে তাপদাহের পরিমাণ ও তীব্রতা ব্যাপক বেড়ে গেছে বলে দেখানো হয়েছে, জুনে উত্তর গোলার্ধে ইউরোপ থেকে শুরু করে যু্ক্তরাষ্ট্রে যে তাপদাহ তা সেটিকেই তুলে ধরেছে,” বলেছেন ওটো।
বৃষ্টি, বন্যা
গত সপ্তাহেই চীন তুমুল ভারি বর্ষণের পর মাত্রাতিরিক্ত বন্যা দেখেছে, কাছাকাছি সময়ে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল এবং বাংলাদেশও ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে।
ভারি বৃষ্টি এখন আগের তুলনায় আরও তীব্র, আরও বেশি হচ্ছে, কেননা উষ্ণ বাতাস বেশি আর্দ্রতা ধরে রাখে, তাই ঝড়ের মেঘও ‘ভারি’ হয়ে যায় এবং তারপর বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে।
অবশ্য বৃষ্টিপাতের ওপর অঞ্চলভিত্তিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভিন্নতা দেখা গেছে, কিছু কিছু এলাকায় পর্যাপ্ত বৃষ্টিও হয় না বলে গবেষণায় উঠেও এসেছে।
খরা
জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে খরাকে প্রভাবিত করে তা বের করার ক্ষেত্রে গলধঘর্ম হতে হয়েছে বিজ্ঞানীদের।
কিছু কিছু অঞ্চলে ক্রমাগত শুষ্কতায় ভুগছে। উদাহরণস্বরূপ, যু্ক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলের উষ্ণ তাপমাত্রা মাটিতে পড়া তুষারকে দ্রুত গলিয়ে দিচ্ছে এবং বাষ্পীভবন চালাচ্ছে।
এদিকে পূর্ব আফ্রিকার খরাও এখন পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হতে পারেনি। ওই অঞ্চলে বসন্তকালে বর্ষা কমে যাওয়ার সঙ্গে ভারত মহাসাগরের উষ্ণ পানির সংযোগ আছে, যে কারণে হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে বৃষ্টি পৌঁছানোর আগেই তা দ্রুত সমুদ্রে ঝরে পড়ে, বলছেন বিজ্ঞানীরা।
দাবানল
তাপদাহ এবং খরা পরিস্থিতিও দাবানল বিশেষ করে ১০ হাজারের বেশি একর পুড়িয়ে ফেলা বৃহদ দাবানলগুলোর অবনতি ঘটাচ্ছে। এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর দাবানল ৩ লাখ ৪১ হাজার একর পুড়িয়েছে।
ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়
বৈশ্বিক স্কেলে ঝড়ের পরিমাণ খুব একটা বাড়েনি। তবে প্রশান্ত মহাসাগরের কেন্দ্রস্থল ও উত্তর আটলান্টিকে ঘূর্ণিঝড় এখন আগের থেকে বেশি হচ্ছে আর বঙ্গোপসাগর, উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর ও দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে কম দেখা যাচ্ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছ।
ক্রান্তীয় ঝড়গুলো এখন আগের চেয়ে বেশি শক্তিধর হচ্ছে এবং কখনো কখনো স্থলভাগে এসে থমকে থেকে নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় বেশি বৃষ্টি ঝরাচ্ছে, এমনটাও দেখা যাচ্ছে।