০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

লোহিত সাগরে হুতিদের দাপট, হুমকির মুখে সৌদি তেল রপ্তানি

লোহিত সাগরে সংঘাতের খবরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ছাড়াল ১০৫ ডলার

লোহিত সাগরে হুতিদের দাপট, হুমকির মুখে সৌদি তেল রপ্তানি
ইয়েমেনের আল-হাজম এলাকার কাছে ইরান সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনীর সদস্যরা। ছবি: ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনীর মিডিয়া সেন্টার

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 11 Sep 2026, 01:54 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:58 AM

ইয়েমেনের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর লোহিত সাগর উপকূল ঘেঁষে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপগুলোর দিকে দ্রুত এগিয়ে চলেছে ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা।

বৃহস্পতিবার সামরিক সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, উপকূলজুড়ে হুতিদের এই নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের ফলে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান জলপথ ‘বাব আল-মানদেব’ প্রণালির ওপর তাদের কর্তৃত্ব আরও শক্তিশালী হল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরান যুদ্ধ শেষ হতে পারে বলে আভাস দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইয়েমেন উপকূলে এই নতুন উত্তেজনা তৈরি হল।

হুতিরা ইতোমধ্যে লোহিত সাগরের কৌশলগত ‘হানিশ’ দ্বীপপুঞ্জে অবস্থান নিয়েছে। এই জলপথের পুরো নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে চলে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের মিত্র ইরানের হাত আরও শক্তিশালী হবে, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বড় সংকট তৈরি করতে পারে।

একই সঙ্গে এটি ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ আরও কঠিন করে তুলতে পারে, যা ইতোমধ্যে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার দল রিপাবলিকান পার্টির অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ইয়েমেনের হুতি পরিচালিত ‘মানবিক কার্যক্রম সমন্বয় কেন্দ্র’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সৌদি আরবের জাহাজ ছাড়া অন্য যে কোনো দেশের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য লোহিত সাগরে চলাচল সম্পূর্ণ নিরাপদ।

হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব এতদিন বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরের এই পথটি ব্যবহার করছিল। এখন সেই পথও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

এদিকে হুতিদের ঠেকাতে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী এবং তাদের মিত্ররা লোহিত সাগর উপকূলের দক্ষিণ দিকে বাব আল-মানদেব প্রণালির বিপরীত পাশে ‘ধুবাব’ এবং ‘পেরিম’ দ্বীপের দিকে অবস্থান জোরদার করছে।

বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে ইয়েমেন বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, কারণ ইয়েমেন যুদ্ধ এখন ‘নতুন ও আরও বিপজ্জনক ধাপে’ প্রবেশ করেছে।

তিনি বলেন, মোখা শহর দখলের ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রণালির প্রবেশদ্বারে হুতিদের সরাসরি উপস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা মুক্ত নৌ চলাচলের জন্য বড় হুমকি।

নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি জেনিফার নিডহার্ট ডে ওরটিজ হুতিদের ‘ইরানের হাতিয়ার’ আখ্যায়িত করেন। 

তিনি সতর্ক করে বলেন, “এই সংঘাত বাড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এর পরিণতির জন্য মদদদাতাদেরই দায়িত্ব নিতে হবে।”

তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ‘সামরিক পদক্ষেপ বা অবরোধ দিয়ে ইয়েমেন সংকট সমাধান সম্ভব নয়’ মন্তব্য করে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। যদিও নিজেদের ভূমিকার কথা তারা এড়িয়ে গেছে।

ইয়েমেন সরকার, ইরান ও আঞ্চলিক সূত্রগুলোর বরাতে রয়টার্স লিখেছে, চলতি সপ্তাহে উপকূলীয় এলাকায় হুতিদের এই ঝটিকা অভিযান ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সরাসরি দিকনির্দেশনায় পরিচালিত হয়েছে।

তবে হুতিদের মুখপাত্র মোহাম্মদ আবদুস সালাম দাবি করেছেন, তাদের এই তৎপরতা স্রেফ প্রতিরক্ষামূলক এবং ইয়েমেনে হামলা বন্ধ হলেই তাদের অভিযান থেমে যাবে।

লোহিত সাগরে নতুন করে এই সংঘাতের খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪ শতাংশ বেড়ে ১০৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম ইতিহাসে প্রথমবারের মত গ্যালনপ্রতি ৬ ডলারে ঠেকেছে।

গত মার্চে ইসরায়েলে হামলার মাধ্যমে যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়া হুতিরা জুলাইয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দেয়। 

গত ২৪ ঘণ্টায় সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খামিস মুশাইত শহরে চারবার জরুরি সতর্কতা জারি করেছে দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ঠেকাতে পাকিস্তান ইতোমধ্যে ইরানের কাছে সৌদি আরবের একটি কড়া সতর্কবার্তা পৌঁছে দিয়েছে। তবে জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, হুতিদের ওপর তেহরানের কোনো ‘নিয়ন্ত্রণ নেই’।

যুদ্ধের মধ্যে তেহরানের সামরিক অর্থায়ন বন্ধ করতে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় 'অপারেশন ইকনোমিক আউটকাস্ট'-এর আওতায় হিজবুল্লাহ এবং ইরান সমর্থিত গ্রুপগুলোকে সহায়তাকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওপর নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

এদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় এবং জ্বালানির দাম বাড়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে।

ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে ইরান, যে নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে কি না।

ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমি অনুশোচনা শব্দটিতে বিশ্বাস করি না। যদি আমাকে আবার সিদ্ধান্ত নিতে হত, তবে আমি ঠিক একই কাজ করতাম।”

ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে।

কয়েক সপ্তাহ ধরে ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের ট্যাংকার নিরাপদে পার করে দেওয়ার ক্ষেত্রে সাফল্যের দাবি করে আসছিল। কিন্তু চলতি মাসে নতুন করে লড়াই শুরু হওয়ায় সেই প্রক্রিয়ায় ছন্দপতন ঘটেছে। 

গত বুধবার মাত্র সাতটি পণ্যবাহী জাহাজ এই প্রণালি পার হতে পেরেছে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।

একই দিনে আইআরজিসির নৌবাহিনী প্রণালির প্রবেশদ্বারে একটি মার্কিন চালকবিহীন নৌযানে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানি সংবাদমাধ্যম।