২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

নেপালে বন্যা: বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি বন্ধ

প্রতি বছর ১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করে আসছিল নেপাল।

নেপালে বন্যা: বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি বন্ধ
ভোতেকোশি নদীতে গত ২৬ অগাস্ট আকস্মিক বন্যার পর কাদা ও পলিতে প্রায় ঢেকে যাওয়া নেপালের একটি বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন। ছবি দ্য কাটমান্ডু পোস্ট।

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Sep 2026, 12:28 AM

Updated : 19 Sep 2026, 02:27 PM

নেপালে ভোতেকোশি নদীতে বিধ্বংসী বন্যার কারণে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশটি থেকে ভারতীয় সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে।  

দ্য কাঠমান্ডু পোস্টে বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত সপ্তাহের বন্যায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য অনুমোদিত দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। প্রকল্প দুটি হল- ২২.১ মেগাওয়াটের চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং ২৪ মেগাওয়াটের ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।

খবরে বলা হয়, সাধারণ বর্ষাকালে নেপালে নদীগুলো খরস্রোতা থাকায় এ সময়কে বলা হয় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাচুর্যময় সময়। গত কয়েক বছরে নেপাল বর্ষা মৌসুমে গড়ে প্রায় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করে আসছিল। এর ওপর নির্ভর করে নেপাল নিজেদের একটি আঞ্চলিক বিদ্যুৎ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছিল। 

কিন্তু চলতি বছর এই নদীগুলোই চরম বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২৬ অগাস্ট ভোতেকোশি নদীতে হড়পা বানের ফলে সৃষ্ট বিধ্বংসী বন্যায় একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। বন্যা পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন হাজার থেকে কমে প্রায় ৬৫০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। ফলে ভারতীয় গ্রিডের মাধ্যমে নেপাল বাংলাদেশে যে বিদ্যুৎ রপ্তানি করছিল কার্যত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

এর আগে ২০২৪ সালের ৫ জানুয়ারি নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানির জন্য দেশটির বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ (এনইএ), ভারতের এনটিপিসি বিদ্যুৎ ব্যাপার নিগম লিমিটেড (এনভিভিএন) এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি বছর ১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করে আসছিল নেপাল। 

২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকায় জেএসসি বৈঠকে বিদ্যমান ৪০ মেগাওয়াটের বাইরে অতিরিক্ত আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি বাড়াতে বাংলাদেশ ও নেপাল নীতিগতভাবে সম্মত হয়। যদিও ভারত সরকার এখনো তাদের সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত এই বিদ্যুৎ আনার অনুমোদন দেয়নি।  

কাটমান্ডু পোস্টের খবরে বলা হয়, চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ভারতের কাছে ২১.৪ মেগাওয়াট এবং ত্রিশূলীর কেন্দ্র থেকে ১৮.৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিক্রির অনুমোদন ছিল। ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্যও এই দুটি প্রকল্পকে অনুমোদন দেওয়া হয়। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বিক্রি করে নেপাল মার্কিন ডলারে অর্থ পেয়ে থাকে। কিন্তু রপ্তানি বন্ধ হওয়ার পর সেই অর্থ প্রাপ্তি আপাতত থমকে গেল। 

নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির (এনইএ) ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠ বলেন, “বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী দুটি প্রকল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই আমরা বিকল্প হিসেবে অন্য একটি প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ পাঠানোর অনুমতির জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করেছি। বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।”

খবরে বলা হচ্ছে, বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি কেবল ওই দুটি প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বন্যার পর থেকে নেপালে মোট ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

কাটমান্ডু পোস্টের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নেপাল বাংলাদেশ ও ভারতের ২৯৩২ কোটি নেপালি রুপির বিদ্যুৎ রপ্তানি করেছে। শুষ্ক মৌসুমে ভারত থেকে দেশটি ১০২৩ কোটি রুপির বিদ্যুৎ আমদানি করলেও, নিট বিদ্যুৎ বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত ছিল ১৯০৯ কোটি রুপি। 

আপাতত এনইএ ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদন ও সঞ্চালন অবকাঠামো পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি অন্য সচল প্রকল্পগুলো থেকে বিদ্যুৎ বাংলাদেশে পাঠানোর অনুমতি পাওয়ার জন্য ভারতের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

নেপালের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে গত ২৬ অগাস্ট ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দ্য হিন্দুর খবর অনুযায়ী ১২৫০ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ আছে ৪ হাজারের বেশি মানুষ। 

ঘটনার দিন সকালে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছাকাছি রাসুয়া জেলার তিমুরে ও স্যাফ্রুবেশি এলাকায় ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিক ও শক্তিশালী বন্যা দেখা দেয়। পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে নদীর তীরবর্তী জনপদ তছনছ করে দেয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক, সেতু, ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। পরে সেই পানির স্রোত ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে পড়ে।

বন্যার প্রবল স্রোতে মানুষ, যানবাহন ও স্থাপনা ভেসে যায়। নদীর স্রোতে মরদেহ ও মানবদেহের বিভিন্ন অংশ মূল বন্যাকবলিত এলাকা থেকে বহু দূরে ভাটির বিভিন্ন জেলায় পৌঁছায়।