১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

ফিলিস্তিনি আন্দোলনের বরেণ্য ইতিহাসবিদ ওয়ালিদ খালিদির প্রয়াণ

তার কাজের ফলেই ১৯৪৮ সালের আগের ও পরের ফিলিস্তিনি সমাজের ইতিহাস বিশ্ব ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টিকে আছে, থাকবে।

ফিলিস্তিনি আন্দোলনের বরেণ্য ইতিহাসবিদ ওয়ালিদ খালিদির প্রয়াণ
ছবি: আল জাজিরা।

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 13 Mar 2026, 07:40 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:09 PM

ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও ফিলিস্তিনের বিপর্যয় নেমে আসার ঘটনাপ্রবাহ যার গবেষণার মাধ্যমে উঠে এসেছে, ফিলিস্তিন বিষয়ক গবেষণার পথ দেখিয়েছে কয়েক প্রজন্ম ধরে, সেই প্রবীণ ইতিহাসবিদ ওয়ালিদ খালিদি প্রয়াত হয়েছেন।

ইনস্টিটিউট ফর প্যালেস্টাইন স্টাডিজের সহপ্রতিষ্ঠাতা, ‘নাকবা’ বিষয়ক শীর্ষ এ পণ্ডিত ১০০ বছর বয়সে রোববার যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসে মারা গেছেন।

আল জাজিরা লিখেছে, তার মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত করেছে তারই প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্যালেস্টাইন স্টাডিজ।

ফিলিস্তিনি আন্দোলনের ইতিহাসবিদ খালিদির মৃত্যুর খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পণ্ডিত, কূটনীতিক ও ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। যুক্তরাজ্যে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত হুসাম জমলোট এক্সে খালিদিকে ‘জাতীয় সম্পদ, স্মৃতির রক্ষক ও প্রজন্মের মেন্টর’ অভিহিত করে শ্রদ্ধা জানান।

জেরুজালেমের এক প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী পরিবারে ১৯২৫ সালে জন্ম খালিদির। প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন রামাল্লায়, এরপর জেরুজালেমের সেন্ট জর্জ স্কুলে পড়াশোনা করেন।

পরবর্তীতে ১৯৫১ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করেন এবং উজ্জ্বল অ্যাকাডেমিক জীবন পার করেন।

তিনি ১৯৮২ সাল পর্যন্ত বৈরুতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে (এইউবি) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। এরপর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স’ এ রিসার্চ ফেলো হিসেবে যোগ দেন।

‘নাকবা’র ইতিবৃত্ত রচনা

১৯৪৮ সালে জায়োনিস্ট মিলিশিয়া ফিলিস্তিনে চালানো জাতিগত নির্মূল অভিযান বা ‘নাকবা’ চালিয়েছিল। ইহুদিদের হাতে ফিলিস্তিনের সেই গ্রামগুলোর ধ্বংস হওয়ার চিত্র নিখুঁতভাবে নথিবদ্ধ করার জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন খালিদি।

খালিদি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন ১৯৪৮ সালে জায়োনিস্ট মিলিশিয়াদের দ্বারা ফিলিস্তিনে চালানো জাতিগত নির্মূল অভিযান বা 'নাকবা' (বিপর্যয়)-র সময় ধ্বংস হওয়া ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোর নিখুঁত নথিবদ্ধ করার জন্য।

প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় কীভাবে ৪০০ এরও বেশি ফিলিস্তিনি গ্রাম ধ্বংস বা জনশূন্য করা হয়েছিল, সেটি খালিদি তুলে ধরেছেন তার ‘অল দ্যাট রিমেইনস’ বইতে। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত বইটিতে তিনি বিলুপ্ত করে ফেলা জনপদের জীবন পুনর্গঠনে ঐতিহাসিক গবেষণা, মানচিত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যের এক অনন্য সমন্বয় ঘটিয়েছেন।

ইনস্টিটিউট ফর প্যালেস্টাইন স্টাডিজ খালিদিকে এমন এক ‘পথপ্রদর্শক’ হিসেবে বর্ণনা করেন, যিনি ১৯৪৮ সালে জায়োনিস্ট আন্দোলনের মাধ্যমে ফিলিস্তিন দখলের অনেক গোপন কৌশল উন্মোচন করেছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ১৯৬০ এর দশকে তিনিই প্রথম ফিলিস্তিন দখল ও সেখানকার জনগণকে বিতাড়িত করার সেই মহাপরিকল্পনা ফাঁস করেন, যা পরিচিত ‘প্ল্যান ডালেট’ নামে।

খালিদির আরেক একটি প্রধান কাজ হল ‘বিফোর দেয়ার ডায়াসপোরা’। বইটিতে তিনি ১৯৪৮ সালের আগের ফিলিস্তিনি সমাজকে তুলে ধরতে দুর্লভ সব আর্কাইভাল আলোকচিত্র ব্যবহার করেছেন, যেটি সেই সময়ের শহর ও গ্রামগুলোর দৈনন্দিন জীবনের এক অনন্য চাক্ষুষ দলিল হিসেবে স্বীকৃত।

অ্যাকাডেমিক ও কূটনৈতিক ভূমিকা

অক্সফোর্ডে কিছুকাল অধ্যাপনার পর খালিদি বৈরুতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে কাটান কয়েক দশক। সেখানে তিনি ইনস্টিটিউট ফর প্যালেস্টাইন স্টাডিজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন। এ প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীতে ফিলিস্তিনি ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে কাজ করা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

খালিদি পরবর্তীতে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স’ এ রিসার্চ ফেলো হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছেন। ‘আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস’ এর ফেলো হিসেবে নির্বাচিত হন।

অ্যাকাডেমিক জগতের বাইরে ফিলিস্তিনি কূটনীতিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পরের সময়কে বলা হয় ‘নাকসা’ (পরাজয়)। যুদ্ধে ইসরায়েল পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম, গাজা, সিরিয়ার গোলান মালভূমি ও মিশরের সিনাই উপদ্বীপ দখল করে নেয়। খালিদি তখন কূটনীতির দিকে মনোনিবেশ করেন।

তিনি জাতিসংঘে ইরাকি প্রতিনিধি দলের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে একটি আরব শীর্ষ সম্মেলনে ব্রিটিশ সরকারের কাছে পাঠানো প্রতিনিধি দলে যোগ দেন। ১৯৮০ এর দশকের মাঝামাঝিতে আরব লিগের মহাসচিবের বিশেষ উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। ১৯৯১ সালের মাদ্রিদ শান্তি সম্মেলনে জর্ডান-ফিলিস্তিন যৌথ প্রতিনিধি দলেরও সদস্য হয়েছিলেন খালিদি।

তিনি দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সমর্থক ছিলেন। ১৯৮৮ সালে ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ সাময়িকীতে তিনি লিখেছিলেন, ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ও ‘ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই’ হল ‘শতবর্ষী ঐতিহাসিক এ সংঘাতের আপোসের একমাত্র ধারণাগত পথ’।

‘খালিদি তার জন্মভূমির সমার্থক’

খালিদির মৃত্যুর পর ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা ও পণ্ডিতদের শ্রদ্ধাঞ্জলিতে ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তৈরিতে তার অনবদ্য ভূমিকার কথা বারবার উঠে এসেছে।

ওয়াশিংটন ডিসির ‘আরব সেন্টারের’ নির্বাহী পরিচালক খলিল জাহশান সামাজিক মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, খালিদি নামটি তার ‘প্রিয় জন্মভূমি ফিলিস্তিনের সমার্থক’ হয়ে উঠেছিল। খালিদির পরিবার, ফিলিস্তিনের জনগণ ও পরিচিত সকলের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান তিনি।

ইনস্টিটিউট ফর প্যালেস্টাইন স্টাডিজ খালিদিকে ফিলিস্তিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইতিহাসবিদ হিসেবে বর্ণনা করেছে। বলছে, খালিদির কাজ আধুনিক ফিলিস্তিন বিষয়ক গবেষণার ভিত্তি স্থাপনে সহায়তা করেছে।

নীতি বিশ্লেষক এবং ‘লাইট ইন গাজা’ বইয়ের লেখক জিহাদ আবুসালিম এক্সে লিখেছেন, খালিদি ফিলিস্তিনের ইতিহাস রক্ষায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তার পাণ্ডিত্য ও গবেষণা এমন এক ভিত্তি, যার ওপর আগামী প্রজন্মগুলো তাদের কাজ চালিয়ে যাবে।”

অনেক ইতিহাসবিদের মতে, খালিদির উত্তরাধিকার কেবল তার নিজস্ব পাণ্ডিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তার গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান ও তার হাতে তৈরি হওয়া কয়েক প্রজন্মের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের মধ্যেও বেঁচে আছে।

যখন ফিলিস্তিনের ইতিহাসের অনেক রেকর্ড বা নথি হারিয়ে যাওয়া অথবা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে ছিল, তখন খালিদি পুরো কর্মজীবন সেই ইতিহাস নথিবদ্ধ করতে উৎসর্গ করেছিলেন।

তার কাজের ফলেই ১৯৪৮ সালের আগের ও পরের ফিলিস্তিনি সমাজের ইতিহাস বিশ্ব ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টিকে আছে, থাকবে।