পরোয়ানাভুক্ত সিরীয় জেনারেলকে ‘অর্থ ও সুরক্ষা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-লেবানন’
সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ছিলেন বাসাম আল-হাসান নামের ওই সাবেক সেনা কর্মকর্তা।
মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত সিরিয়ার সাবেক এক জেনারেলকে গোপন চুক্তির আওতায় অর্থ ও সুরক্ষা দিয়ে লেবাননে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র ও লেবাননের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এবং মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম এনপিআরের এক যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য উঠে এসেছে।
সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ছিলেন বাসাম আল-হাসান নামের ওই সাবেক সেনা কর্মকর্তা। দেশটির অতি সংবেদনশীল রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচি তদারকি করতেন তিনি।
সেপ্টেম্বরে বিবিসি জানিয়েছিল, ২০১২ সালে মার্কিন সাংবাদিক অস্টিন টাইসকে অপহরণের পরিকল্পিত অভিযানে চেইন অব কমান্ডের নেতৃত্বে ছিলেন এই হাসান।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতনের পর হাসান প্রথমে ইরানে পালিয়ে যান। পরে যুক্তরাষ্ট্র, লেবানন ও ইরানের ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে তাকে লেবাননে নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সাংবাদিক অস্টিন টাইসের বিষয়ে তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র ও ইরানের সঙ্গে সামরিক সম্পর্কের স্পর্শকাতর তথ্য পাওয়ার বিনিময়ে হাসানকে এই সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে।
পুরো বিষয়টি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই, সিআইএ এবং লেবাননের নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের ত্রিপক্ষীয় সমঝোতায় পরিচালিত হচ্ছে।
সিরিয়ার নতুন সরকারের দুই কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মুখোমুখি করতে তারা হাসানকে ফেরত চান। কিন্তু মার্কিন সরকারের অনিচ্ছার কারণে দামেস্ক এ বিষয়ে কিছুই করতে পারছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন অপহৃত সাংবাদিক অস্টিন টাইসের পরিবারের মুখপাত্র ফিল এলউড।
তিনি বলেন, “সিরীয় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র হামলায় জড়িত এবং অস্টিন টাইসকে হত্যার দাবি করা ব্যক্তির আরামদায়ক জীবনের পেছনে মার্কিন করদাতাদের অর্থ ব্যয় হওয়া অত্যন্ত আপত্তিকর।”
তিনি আরও বলেন, “এটি মূলত একজন পরোয়ানাভুক্ত যুদ্ধাপরাধীকে পালিয়ে থাকতে সাহায্য করার সামিল। সিরিয়ার জনগণ ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রাখে এবং তাকে বিচারে মুখোমুখি করতে দামেস্কে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।”
বিবিসির অনুসন্ধানী পডকাস্টের পাওয়া নথিপত্রে দেখা যায়, ২০২৫ সালের বসন্তে এফবিআই, সিআইএ ও লেবাননের কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাসানের বৈঠকে তথ্যের বিনিময়ে তাকে থাকার অনুমতি (রেসিডেন্সি), সুরক্ষা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বহনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে হাসানকে নিয়মিত অর্থ পাঠায় মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
টাইসের মামলায় সহযোগিতা করে এফবিআইয়ের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন আসাদ সরকারের আরেক সাবেক কর্মকর্তা।
তিনি বিবিসিকে বলেন, “একবারে সব তথ্য না দিয়ে আস্তে আস্তে তথ্য দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ, যাতে দীর্ঘদিন ধরে তাদের কাছ থেকে টাকা পাওয়া যায়।”
গত বছর মার্কিন তদন্তকারীদের কাছে হাসান দাবি করেছিলেন যে সাবেক প্রেসিডেন্ট আসাদের নির্দেশে অস্টিন টাইসকে হত্যা করা হয়েছে এবং একটি স্থানের তথ্যও দেন। তবে সেখানে মাটি খুঁড়ে কিছুই পাওয়া যায়নি।
এদিকে সাক্ষাৎকারের জন্য বিবিসি সরাসরি ফোনে যোগাযোগ করলে হাসান তাদের বৈরুতের মার্কিন দূতাবাসের এফবিআই ও সিআইএ-র স্টেশন চিফের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার পরামর্শ দেন।
অস্টিন টাইস নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে যুক্ত আসাদ সরকারের আরও একাধিক কর্মকর্তা বিদেশে গোপনে নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছেন।
হাসানের অধীনস্থ কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাখলুফ বর্তমানে লেবাননে এবং টাইসকে আটকে রাখা কারাগারের দায়িত্বে থাকা সাবেক জেনারেল ঘাসান নাসুর সপরিবারে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) বসবাস করছেন।
এছাড়া টাইস অপহরণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হাসানের ভাগ্নে সাক্র রুস্তম বর্তমানে ইউএই ও লেবাননের মধ্যে যাতায়াত করছেন। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে রুস্তম বলেন, তিনি “অতীতের চেয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেই বেশি পছন্দ করেন।”
