২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

নেপালে গাছে চড়ে বাঁচল ৮ বছরের জয়াল, অবশেষে ফিরল মায়ের কোলে

চারপাশে শুধু পানি, কাদা আর পাথর। চোখের সামনে ভেসে যাচ্ছে ঘরবাড়ি। সেই ভয়াবহ মুহূর্তে জঙ্গলের দিকে ছুটেছিল জয়াল ঘালে।

নেপালে গাছে চড়ে বাঁচল ৮ বছরের জয়াল, অবশেষে ফিরল মায়ের কোলে
ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Aug 2026, 04:05 PM

Updated : 16 Sep 2026, 05:11 PM

নেপালে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট প্রলয়ঙ্করী আকস্মিক বন্যায় একের পর এক লোকালয় যখন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, তখন সামনে এল এক ৮ বছরের শিশুর অলৌকিক বেঁচে ফেরার গল্প। 

স্কুলে পানি ও কাদার ঢল ধেয়ে আসার পর বন্ধুর সঙ্গে জঙ্গলে পালিয়ে গিয়ে গাছে চড়ে জীবন বাঁচিয়েছে শিশু জয়াল ঘালে।

অন্যদিকে, দুই সন্তানকেই হারিয়ে ফেলেছেন ভেবে যখন আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন ২৮ বছর বয়সী মা মাত্তি মায়া তামাং, তখন শুক্রবার কাঠমান্ডুর এক হাসপাতালে নিজের সন্তান জয়ালকে কাছে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরেন তিনি।

এর আগের দিন, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার উত্তর নেপালের পাহাড়ি জেলা রসুয়া থেকে ভাঙা পা ও মুখে চোট নিয়ে এয়ারলিফটে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় জোয়ালকে। 

অন্যদিকে, একের পর এক আশ্রয়কেন্দ্র ও ত্রাণ শিবিরে সন্তানদের হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন মা তামাং।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তামাং বলেন, “চতুর্থ আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েও যখন তালিকার কোথাও সন্তানদের নাম পেলাম না, আমি ধরে নিয়েছিলাম আমার দুই ছেলেই আর বেঁচে নেই। কান্না থামাতেই পারছিলাম না, নিজেকে কোনোভাবেই সামলাতে পারছিলাম না।”

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, রসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলায় অন্তত ১৭ হাজার শিশু এই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

নেপাল ও চীনের তিব্বত অংশ মিলিয়ে এই দুর্যোগে এ পর্যন্ত প্রায় ৫৮০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় আড়াই হাজার মানুষ।

তবে তামাং পরিবারের জন্য করুণ গল্পটি শেষ পর্যন্ত আনন্দে রূপ নেয়। সন্তানদের হারিয়ে কাঁদতে থাকা মা তামাং বৃহস্পতিবার এক রয়টার্স সাংবাদিক সহানা বজ্রাচার্যের ফোন নম্বর পান। 

তার কয়েক ঘণ্টা আগে প্রতিবেশী নুয়াকোট জেলার ১৫ শয্যার চক্র দেব হাসপাতালে জয়ালকে দেখে এসেছিলেন সেই সাংবাদিক। 

পরিবারকে খুঁজে পেতে সাহায্য করতে জয়ালকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র পাঠানোর আগে তার কথা ক্যামেরাবন্দী করে রেখেছিলেন সহানা।

হাসপাতালে নিজের নম্বর রেখে এসেছিলেন ওই সাংবাদিক। তামাং সেই নম্বরে ফোন করতেই জানতে পারেন জয়াল জীবিত এবং তাকে কাঠমান্ডুতে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর আগেই নিজের ছোট ছেলেকেও জীবিত পান তামাং। 

বড় ছেলেকেও পাওয়ার খবর শুনে তিনি বলেন, “আপনি যখন বললেন জয়াল কোথায় আছে আপনি জানেন, আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না। আমি তো আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। ওকে পাওয়ার পর মনে হলো যেন নতুন জীবন ফিরে পেলাম।”

গত বুধবার সকালে তামাংয়ের দুই ছেলে স্কুলে গিয়েছিল। বাড়িতে তাঁত বুননের কাজ করছিলেন তামাং। হঠাৎ ভূমিকম্পের মতো বিকট শব্দ শুনতে পান তিনি। 

ল্যাংটাং লিরুং পর্বতচূড়ার কাছের হিমবাহ ধসে পড়ার পর বরফ ও পাথরের বিরাট ধস পাহাড়জুড়ে নেমে আসে, যা মিনিটে পুরো এলাকা ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

তামাং তড়িঘড়ি ১৫-২০ মিনিট দূরে অবস্থিত স্কুলের দিকে রওনা হন, কিন্তু নদীর ঢলে পুরো এলাকা অচেনা হয়ে গিয়েছিল। স্কুল ভবন ধ্বংস হয়ে তৈরি হয়েছিল কাদা ও পাথরের স্তূপ।

অন্যদিকে, স্কুলে থাকা অবস্থায় বন্যার ঢল আসার বর্ণনা দিয়ে শিশু জয়াল বলে, “হঠাৎ সবকিছু একেবারে অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল।” 

জয়াল তার এক বন্ধুর সঙ্গে দৌড়ে পাশের জঙ্গলে চলে যায় এবং একটি গাছে চেপে বসে থাকে। তখন ভয় লেগেছিল কি না জিজ্ঞেস করা হলে শিশুটি কেবল মাথা নেড়ে জানায়, না, সে ভয় পায় নি।

উদ্ধারকারী পুলিশ সদস্যরা তাকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে আসার জন্য দুটি ১০ রুপির নোট (মোট ২০ রুপি) দিয়ে আশ্বস্ত করেছিলেন। নুয়াকোট থেকে যখন রয়টার্স টিম তাকে প্রথম দেখে, তখনো ভাঙা পা আর ক্ষতবিক্ষত মুখ নিয়ে বাঁ হাতে শক্ত করে সেই ২০ টাকার নোট দুটি চেপে ধরে ছিল জয়াল।

বাস চলাচল পুরোপুরি বন্ধ থাকায় সাংবাদিক সহানা বজ্রাচার্যের বন্দোবস্ত করা গাড়িতে করে শুক্রবার কাঠমান্ডুর হাসপাতালে পৌঁছান তামাং। সেখানে ছেলের বিছানার পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে চোখের পানি মোছেন মা তামাং। বন্যার খবর পেয়ে জাপানে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করা জয়ালের বাবাও নেপালের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

সব হারিয়েও বড় ছেলেকে পেয়ে স্বস্তির হাসি হেসে মা মায়া তামাং বলেন, “ও বড্ড দুষ্টু ছেলে! এমনিতেও হাড় ভাঙা ওর জন্য নতুন কিছু না।”