ইউক্রেইন যুদ্ধ: নতুন বছরে যা যা হতে পারে
পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে এই যুদ্ধের দিকে। আশা করছে দ্রুত একটি শান্তি চুক্তি হোক।
নতুন বছরে প্রবেশ করতে চলেছে ইউক্রেইন যুদ্ধ। ২০২৩ সালে এই যুদ্ধের অবসান হবে, নাকি যুদ্ধ পরিস্থিতি আরো ভয়ঙ্কর রূপ নেবে?
পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে এই যুদ্ধের দিকে। আশা করছে দ্রুত একটি শান্তি চুক্তি হোক। ১১ মাসেই এই যুদ্ধ বিশ্বকে মহামন্দার দিকে ঠেলে দিয়েছে। যদি দ্রুত এ যুদ্ধ শেষ না হয় তবে মহামন্দা বাস্তব রূপ নেবে। পৃথিবীর উপর নেমে আসবে নিদারুণ মানবিক বিপর্যয়।
কয়েকজন সামরিক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে বিবিসি ইউক্রেইন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ গতি-প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করেছে।
‘বসন্তে রাশিয়ার আক্রমণ ভাগ্য নির্ধারণ করবে’
মাইকেল ক্লার্ক, যুক্তরাজ্যের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের সহযোগী পরিচালক:
বৃহৎ ইউরেশিয়া অঞ্চলে যারাই অন্যদেশে আক্রমণ করেছে তাদের সবাইকেই শেষ পর্যন্ত শীতে সমালোচিত হতে হয়েছে। নেপোলিয়ন, হিটলার এবং স্ট্যালিন সবাইকেই ভয়াবহ শীতকালে নিজেদের সেনাদের বাঁচিয়ে রাখতে রক্ষণাত্মক কৌশল নিতে হয়েছে।
ভ্লাদিমির পুতিনও ঠিক সেটাই করছেন। শীতে তিনি তার বাহিনীকে কিছুটা রক্ষণাত্মক অবস্থায় রেখেছেন এবং বসন্তে নতুন গতিতে আক্রমণের অপেক্ষা করছেন।
উভয় পক্ষেরই শীতকালে বিরতি প্রয়োজন। কিন্তু এ সময়ে ইউক্রেইনের সেনারা বেশখানিকটা সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। তাদের হাতে রুশ বাহিনীর চেয়ে বেশি অস্ত্র ও রসদ রয়েছে এবং তাদের সামনে অগ্রসর হওয়ার অনুপ্রেরণাও বেশি।
আমরা আশা করতে পারি, তারা (ইউক্রেইন) এই চাপ অব্যাহত রাখতে পারবে; বিশেষ করে দনবাসে।
ইউক্রেইনের সেনারা ক্রেমিননা এবং সোয়াতোভের চারপাশে পৌঁছে গেছে এবং তারা সেখানে খুব বড় একটি বিজয়ের একেবারে কাছাকাছি রয়েছে।
যদি ইউক্রেইনের বাহিনী ওই দুই অঞ্চলের দখল নিতে পারে তবে তারা রুশ বাহিনীকে পরবর্তী প্রাকৃতি প্রতিরক্ষা লাইনের দিকে প্রায় ৪০ মাইল পেছনে ঠেলে দিতে পারবে। মূলত যেখান থেকে গত ফেব্রুয়ারিতে রুশ বাহিনী মূল আক্রমণ শুরু করেছিল।
যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার তাৎক্ষণিক পুরস্কার এত বড় হতে পারে, তাই কিইভ কোনোভাবেই এখন যুদ্ধ থামাতে রাজি না। খেরসন পুনরুদ্ধারের পর ইউক্রেইনের আক্রমণ এখন দক্ষিণ-পশ্চিমে গিয়ে থামতে পারে।
ক্রিমেয়ায় রাশিয়ার নাজুক সড়ক ও রেল সংযোগ ব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে ইউক্রেইনীয় সেনাদের কাছে এখন নিপ্রো নদীর পূর্ব দিক অতিক্রম করা হয়ত অতি জরুরি সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে হঠাৎ করেই নতুন কোথাও কিইভের আক্রমণ শুরু করার সম্ভাবনাকেও আমি উড়িয়ে দিতে পারছি না।
২০২৩ সালে, রাশিয়ার বসন্ত আক্রমণ যুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারণে মূল নির্ধারক হয়ে উঠবে।
পুতিন স্বীকার করেছেন, তাদের রিজার্ভ বাহিনীর প্রায় ৫০ হাজার সেনা এরইমধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করছে। পরবর্তী বছরের জন্য আরো আড়াই লাখ রিজার্ভ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তাই রাশিয়ার নতুন এই সেনাদের ভাগ্য যুদ্ধক্ষেত্রে নির্ধারণ হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো কিছু হওয়ার সুযোগ নেই।
সংক্ষিপ্ত এবং অস্থিতিশীল একটি যুদ্ধবিরতি শুধুমাত্র আরেকটি সম্ভাবনা হতে পারে। কারণ, পুতিন স্পষ্ট করেই বলেছেন তিনি থামবেন না। আর ইউক্রেইনও বলেছে, তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে এই যুদ্ধ করছে।
‘ইউক্রেইন তাদের ভূখণ্ড ফেরত নেবে’
আন্দ্রেই পিয়নটকভস্কি, ওয়াশিংটন ডিসি ভিত্তিক বিজ্ঞানী ও বিশ্লেষক
সর্বোচ্চ ২০২৩ সালের বসন্তের মধ্যে ইউক্রেইন সম্পূর্ণরূপে তার আঞ্চলিক অখণ্ডতা পুনরুদ্ধার করে জয়ী হবে।
ইউক্রেইনের জয়ী হওয়ার পেছনে দুইটি বিষয় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
প্রথমটি হল ইউক্রেইনের সেনাবাহিনী ও সর্বপোরি দেশটির জনগণের অনুপ্রেরণা, সংকল্প ও সাহস; যা আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
অন্য বিষয়টি হচ্ছে, বছরের পর বছর ধরে একজন রুশ একনায়কে সন্তুষ্ট করতে থাকা পশ্চিমা বিশ্ব শেষ পর্যন্ত জেগে উঠেছে এবং তারা যে ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি সেটা বুঝতে পেরেছে।
নেটো মহাসচিব জেন্স স্টলটেনবার্গের সাম্প্রতিক একটি বিবৃতিতে বিষয়টি সবচেয়ে ভালোভাবে ফুটে উঠেছে।
তিনি বলেছেন, ‘‘আমরা অর্থে (এই যুদ্ধের) মূল্য দিচ্ছি। যেখানে ইউক্রেইনীয়রা রক্ত দিয়ে এর মূল্য দিচ্ছে। যদি কর্তৃত্ববাদী শাসকরা দেখেন তাদের শক্তি পুরস্কৃত হচ্ছে তবে আমাদের সবাইকে আরও বড় মূল্য দিতে হবে। এবং এই বিশ্ব আমাদের সকলের জন্য আরো বিপজ্জনক বিশ্বে পরিণত হবে।”
এ যুদ্ধে ইউক্রেইনের জয় নির্ধারিত। তবে সেই জয় কতটা দ্রুত আসবে তা নির্ভর করছে নেটো কত তাড়াতাড়ি ইউক্রেইনের জন্য একটি নতুন সমরাস্ত্রের প্যাকেজ পাঠাতে পারবে। যা যুদ্ধের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দেবে।
‘আমি যুদ্ধের শেষ দেখতে পাচ্ছি না’
বারবারা জেনকেটা, লন্ডনের কিংস কলেজের ওয়ার স্ট্যাডিজ বিভাগ
শীতকালটা খুব কঠিন হবে। কারণ, রাশিয়া ইউক্রেইনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোতে হামলা করে এরই মধ্যে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দেশটির জনগণের মনোবল ও সহনশীলতাকে ভেঙে ফেলতে চাইছে। যদিও ইউক্রেইনীদের ধৈর্য ও সহ্য ক্ষমতা এরই মধ্যে অসাধারণ বলে প্রমাণিত হয়েছে। তারা দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তাই এই যুদ্ধ আরো চলবে এবং চলতেই থাকবে।
আলোচনার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। একটি সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা শুরু হতে অবশ্যই যেটা প্রয়োজন সেটা হলো অন্তত একটি পক্ষকে তার অবস্থান থেকে সরতে হবে। এখন পর্যন্ত যা বোঝা যাচ্ছে তাতে কোনো পক্ষ নিজেদের অবস্থান থেকে সরবে বলে মনে হচ্ছে না। শিগগির এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনাও দেখতে পাচ্ছি না।
‘রাশিয়ার হার ছাড়া আর কোনো পরিণতি নেই’
বেন হজস, ইউনাইটেড স্টেটস আর্মি ইউরোপ এর সাবেক কমান্ডিং জেনারেল
কিইভের বিজয় মিছিলের পরিকল্পনা করার সময় এখনও আসেনি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবকিছুই ইউক্রেইনের পক্ষে এবং আমার মনে ইউক্রেইনের বিজয় নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, খুব সম্ভবত আগামী বছরই বিজয় ধরা দেবে।
শীতকালে যুদ্ধ গতি হারাবে। তবে কোনো সন্দেহ নেই যে, শীতের সঙ্গে রুশ বাহিনীর তুলনায় ইউক্রেইনের সেনারা ভালোভাবে মানিয়ে নিতে সক্ষম হবে। কারণ, ইউক্রেইনের জন্য শীতে যুদ্ধের সব সরঞ্জাম যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জার্মানি থেকে আসছে।
আগামী জানুয়ারির মধ্যেই ক্রাইমিয়া দখলমুক্ত করার অভিযানের মাধ্যমে ইউক্রেইনের বাহিনী তাদের যুদ্ধের চূড়ান্ত অধ্যায়ে প্রবেশ করবে। আমরা সবাই জানি, ঐতিহাসিকভাবেই যুদ্ধ ইচ্ছা শক্তি ও রসদের পরীক্ষা।
আমি ইউক্রেইনের জনগণ ও তাদের সেনাবাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ জয়ের সংকল্প দেখতে পাচ্ছি। এবং ইউক্রেইনের রসদ পরিস্থিতিরও দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। তাই আমি রাশিয়ার হার ছাড়া আর কিছু দেখতে পাচ্ছি না।
‘পরিস্থিতি থাকতে পারে অনেকটা একইরকম’
ডেভিড গেন্ডেলম্যান, ইসরায়েল ভিত্তিক সামরিক বিশেষজ্ঞ:
ইউক্রেইন যুদ্ধ ‘কীভাবে শেষ হবে’ তার পরিবর্তে আগামী বছর যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে দুই পক্ষ কে কী অর্জন করতে চাইবে সেটি দেখার বিষয়।
লুহান্সক এবং দেনেৎস্ক অঞ্চলের দখলদারিত্ব চলতে থাকবে। কিন্তু দনবাসে ইউক্রেইনীয় বাহিনীকে ঘিরে ফেলার মতো বড় অগ্রগতি রাশিয়ার অর্জনের সম্ভাবনা কম।
ফলে ধীরে এগুনোর মতো যুদ্ধের চলমান কৌশলগুলোই চলতে থাকার সম্ভাবনা বেশি।
