Published : 14 Nov 2025, 12:44 AM
পাকিস্তানের পার্লামেন্ট বুধবার বিতর্কিত ২৭তম সংবিধান সংশোধনী বিল অনুমোদন হওয়ার পরদিন সেটি সই করে আইনে পরিণত করেছেন প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি।
জারদারির সই করা বিলের একটি কপি পেয়েছে পাকিস্তানের পত্রিকা ‘দ্য ডন’। তাতে বলা হয়েছে, “৫ প্যারার সারসংক্ষেপে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে ২৭তম সংবিধান সংশোধনী বিলে সম্মতি দেওয়া হল।”
এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানে সেনা প্রধানের ক্ষমতা আরও বাড়ল। আর সীমিত হল সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা। সমালোচকরা বলছেন, এর ফলে পাকিস্তানে গণতন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি হল।
নতুন বিলটি নিয়ে বিরোধীদের ব্যাপক প্রতিবাদ-হট্টগোলের মধ্যেই এটি পার্লামেন্টে পাস হয়। ‘দ্য ডন’ জানায়, বিলটি প্রাথমিকভাবে গত সোমবার পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে তোলা হয়েছিল।
সেদিনই সিনেটে বিলটি পাস হয়ে যায়। এরপর বিলটি পাঠানো হয়েছিল নিম্নকক্ষ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে। সেখানে বুধবার পাস হয় এই বিল। তারপর বিলের সর্বশেষ পরিবর্তনগুলো বিচার-বিবেচনা করে দেখার জন্য বৃহস্পতিবার সেটি আবার পাঠানো হয় সিনেটে।
সেখানেই বিরোধীদের তুমুল হট্টগোলের মধ্যেও দুই-তৃতীয়ায়শ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিলটি পাস হয়। বিলের পক্ষে পড়ে ৬৪ ভোট এবং বিপক্ষে পড়ে ৪ টি। এরপর বৃহস্পতিবারেই প্রেসিডেন্ট বিলটিতে সই করলেন।
সাধারণত এ ধরনের সাংবিধানিক সংশোধনীর জন্য কয়েক সপ্তাহ বা মাসব্যাপী আলোচনা করার প্রয়োজন হয়। কিন্তু তাড়াহুড়া করে বিলটি পাস করে আইনে পরিণত করা হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, এই সংবিধানিক সংশোধনীর ফলে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব পাচ্ছেন। অর্থাৎ, সেনাবাহিনীর পাশাপাশি নৌ ও বিমানবাহিনীরও প্রধান হবেন তিনি।
মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তার পদমর্যাদা বহাল থাকবে। তিনি আজীবন কোনও অপরাধ বা অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনগত দিক থেকে দায়মুক্তি পাবেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এই সংশোধনীর প্রশংসা করে বলেছেন, এটি প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও জাতীয় ঐক্যের পথে এগিয়ে যাওয়ারই পদক্ষেপ।
তিনি বলেন, “আজ আমরা একে সংবিধানের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করলে কেবল ফিল্ড মার্শাল নয়, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীকেও স্বীকৃতি দেওয়া হবে।”
স্পিকারের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, “এতে সমস্যার কী আছে? জাতি তার বীরদের সম্মান করে... আমরা জানি, কীভাবে আমাদের বীরদেরকে সম্মান দেখাতে হয়।”
সমালোচকেরা বলছেন, সংবিধানিক এই শংসোধনী ক্ষমতাসীন জোট ও সামরিক বাহিনীর হাতে ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করবে।
নতুন সংশোধনীর ফলে সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়েছে। কারণ নতুন আইনানুযায়ী, সংবিধানসংক্রান্ত মামলাগুলো সুপ্রিম কোর্ট থেকে নতুন কেন্দ্রীয় সাংবিধানিক আদালতে চলে যাবে। নতুন এই আদালতের বিচারক নিয়োগ দেবে সরকার।
সম্প্রতি কয়েকবছরে সুপ্রিম কোর্ট সরকারের অনেক নীতিমালা আটকে দিয়েছে। কয়েকজন প্রধানমন্ত্রীকেও পদচ্যুত করেছে। নতুন আইনে সুপ্রিম কোর্টের সেই ক্ষমতা খর্ব হবে।
পাকিস্তানের বিরোধী দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) এমপি’রা নতুন বিল নিয়ে ভোটাভুটির আগে পার্লামেন্ট থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন এবং বিলের কপি ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
বিলটি নিয়ে পিটিআই-এর সঙ্গে কোনও পরামর্শ করা হয়নি বলে দাবি তাদের। পিটিআই এর মুখপাত্র জুলফিকার বুখারি বলেন, গণতন্ত্র ও বিচার বিভাগের ক্ষতি নিয়ে কোনও আইনপ্রণেতার মাথাব্যথা নেই।
তারা নীরব দর্শক হিসেবে ভোট দিয়ে দেশকে দুর্বল রাষ্ট্রে পরিণত করলেন। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের সংবিধানের মৃত্যু হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। ওদিকে, আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই সংশোধনী বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করতে পারে।
সংবিধানবিশেষজ্ঞ আসাদ রহিম খান বলেন, “বিচারব্যবস্থায় এমন ফাটল গত প্রায় ১০০ বছরেও দেখা যায়নি। যে আইনপ্রণেতারা এখন খুশিতে একে অপরের পিঠ চাপড়াচ্ছেন সেই তাদেরকেই একসময় রেহাই পেতে এই আদালতেরই শরানপন্ন হতে হবে, যেটিকে তারা আজ ধ্বংস এবং রাষ্ট্রের অধীন করলেন।”
ওদিকে, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন থেকেই দেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে আছে। নতুন সংশোধনীর ফলে তাদের সাংবিধানিক ভিত্তি আরও মজবুত হল। তাতে লাগাম দেওয়া দুঃসাধ্য হবে।
আইনজীবী মির্জা মোইজ বেগ বলেন, এই সংশোধনী অনুমোদন করে পার্লামেন্ট সেই কাজই করেছে, যা এর আগে কেবল স্বৈরশাসকরাই কল্পনা করতে পারত।