১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

খাশুগজি হত্যার পর সৌদি যুবরাজের প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর, নিবিড় সহযোগিতাই লক্ষ্য

হোয়াইট হাউজে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন সৌদি আরবের যুবরাজ বিন সালমান। তেল ও নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের সহযোগিতার সম্পর্ক নিবিড় করাই বৈঠকের লক্ষ্য।

খাশুগজি হত্যার পর সৌদি যুবরাজের প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর, নিবিড় সহযোগিতাই লক্ষ্য
ডনাল্ড ট্রাম্প ও মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 17 Nov 2025, 08:20 PM

Updated : 26 Aug 2026, 05:08 PM

সৌদি আরবের সাংবাদিক জামাল খাশুগজি হত্যাকান্ডের সাত বছর পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বিশ্ব মঞ্চে নিজের অবস্থান পুনরুদ্ধারের মিশনে প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন।

মঙ্গলবার হোয়াইট হাউজে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার বৈঠক করার কথা রয়েছে। বৈঠকের লক্ষ্য তেল ও নিরাপত্তা খাতে দুই দেশের বহু-দশকের সহযোগিতার সম্পর্ক আরও নিবিড় করা।

তাছাড়া, বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং সম্ভাব্য পারমাণবিক জ্বালানি খাতে সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করতেও আগ্রহী দুই দেশ।

২০১৮ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সাংবাদিক এবং সৌদি রাজপরিবারের কট্টর সমালোচক জামাল খাশুগজি হত্যাকাণ্ড নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি আরব সম্পর্ক টালমাটাল হয়েছিল। 

এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সন্দেহের আঙুল ছিল সৌদি যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমানের দিকে। সৌদি আরবের গোয়েন্দারা ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে খাশুগজিকে হত্যা করেছিলেন বলে অভিযোগ।

বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোড়ন তোলা এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনেকে অভিযোগ করেছিলেন, খাশুগজি হত্যার পেছনে যুবরাজ বিন সালমানের হাত রয়েছে।

পরে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে, যুবরাজ বিন সালমানই খাশুগজিকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

যুবরাজ বিন সালমান অবশ্য এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে তিনি সৌদি আরব সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে এ হত্যার দায় স্বীকার করেছিলেন।

৭ বছর আগের সে ঘটনার রেশ এখন কেটেছে। পুরনো সেই তিক্ততা থেকে সরে এসে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নে নজর দিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র এবং সবচেয়ে বেশি তেল উত্তোলনকারী দেশ সৌদি আরব।

যার ফলে আজ যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন যুবরাজ সালমান। মঙ্গলবার হোয়াইট হাউজে সৌদি আরবের এ কার্যত শাসকের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ককে আরও একবার সামনে নিয়ে আসতে চলেছে।

খাশুগজি হত্যার ৭ বছর পর সৌদি যুবরাজ এখন নিজেকে শান্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত, গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা এবং সিরিয়াকে আরব লীগের পরিসরে ফেরাতে ভূমিকা রাখার মধ্য দিয়ে।

দেশের ভেতরেও তিনি যে সামাজিক পরিবর্তন এনেছেন, তা আধুনিক সৌদি আরবের ইতিহাসে নজিরবিহীন। ধর্মীয় পুলিশের ক্ষমতা কমানো, রক্ষণশীল সামাজিক বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া,সব মিলিয়ে তিনি একদিকে সংস্কারক, অন্যদিকে কঠোর শাসক।

৪০ বছর বয়সী এই যুবরাজ সৌদি সমাজে এমন সব পরিবর্তন এনেছেন যা এক দশক আগেও অকল্পনীয় ছিল। নারীদের গাড়ি চালানো, কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় অংশগ্রহণ, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা,সবই এখন দেশে স্বাভাবিক চিত্র।

অন্যদিকে, বিরোধীদের উপর দমন-পীড়নও বেড়েছে। সমালোচকরা নিশ্চুপ, শক্তিধর পরিবারগুলো পাশ কাটিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্র এককভাবে যুবরাজের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। স্পষ্ট বার্তা,সংস্কার হবে, তবে শর্ত একটাই: পূর্ণ আনুগত্য।

২০১৮ সালের খাশুগজি হত্যায় যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা বিন সালমানের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত দিলেও তিনি নির্দেশ দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। ওয়াশিংটনও ধীরে ধীরে ঘটনাটি থেকে সরে আসে; কারণ জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি খাত,সবই যুক্ত রাখে দুই দেশকে।

ট্রাম্প ফের হোয়াইট হাউজে আসার পর সম্পর্ক আরও উষ্ণ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া সৌদি আরবের ৬০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি, প্রতিরক্ষা চুক্তির সম্ভাবনা,সবই এবার আলোচনায় থাকছে।

বিশ্লেষক ডগলাস সিলিমান বলেন, “খাশুগজি হত্যাকাণ্ড ভুলে যায়নি কেউ। কিন্তু দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ক কি কেবল একটি ঘটনার ওপর নির্ভর করবে, নাকি ভবিষ্যৎ স্বার্থই বড় হয়ে দাঁড়াবে?”

ওয়াশিংটনে সৌদি যুবরাজের আগমন তাই অনেকের কাছে ‘রাজ্যাভিষেকের আগ মুহূর্ত’।

গত মে মাসে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ সফরকালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সৌদি আরকের কাছ থেকে ৬০০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলেন।

এবার হোয়াইট হাউজের বৈঠকে সেই অঙ্গীকারকে সামনে রেখে বড় ধরনের বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা চুক্তি চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলবে বলে মনে করা হচ্ছে।

তাছাড়া, সৌদি আরবের মানবাধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করার সম্ভাবনাও এবার কম। এর আগে সৌদি আরব সফরকালেও বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছিলেন ট্রাম্প।

ওদিকে, যুবরাজ বিন সালমান আঞ্চলিক অস্থিরতার আবহে নিজ দেশের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চান। সেইসঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং বেসামরিক খাতে একটি পারমাণবিক প্রকল্প চুক্তিও চান তিনি।

দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে সস্তায় তেল সরবরাহ করে এসেছে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা দিয়ে এসেছে।

কিন্তু ২০১৯ সালে ইরানের হামলায় সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বল প্রতিক্রিয়া সম্পর্ককে নাজুক করেছিল।

২০২৫ সালে ইসরায়েল কাতারের দোহায় হামলার পর সেই উদ্বেগ আরও বাড়ে। ওই ঘটনার পর ট্রাম্প নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কাতারের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছিলেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, সৌদি আরবও এখন একই ধরনের চুক্তি করার উদ্যোগ নেবে।

সৌদি আরব সাম্প্রতিক আলোচনার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস–অনুমোদিত একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি চাইছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র শর্ত দিয়েছে যে, ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে।

তবে এ বিষয়ে সৌদি আরব বলছে, ইসরায়েলকে আগে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। তবেই তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে।

কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বরারবই এই দাবির বিরোধিতা করে আসছেন। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা মনে করছেন,

 ট্রাম্প কাতার–ধাঁচের প্রতিরক্ষা চুক্তির নির্বাহী আদেশ দিলেও সেটি সৌদি আরব যেমনটি চাইছে ঠিক তেমনটি হবে না। বরং সেটি হতে পারে পূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তির পথে একটি ধাপ কিংবা এই প্রক্রিয়ার একটি অংশ।