১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩

ইমরান খানের ঘাঁটিতে জরুরি অবস্থা: পাকিস্তানের পদক্ষেপে উল্টো বিপদের ঝুঁকি

সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি মোকাবিলার নামে এই কঠোর পদক্ষেপ উল্টো পুরো দেশকে আরও বড় রাজনৈতিক সংকটে ফেলতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা।

ইমরান খানের ঘাঁটিতে জরুরি অবস্থা: পাকিস্তানের পদক্ষেপে উল্টো বিপদের ঝুঁকি

ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 14 Oct 2026, 02:11 PM

Updated : 14 Oct 2026, 02:11 PM

সড়কে কনটেইনারের ব্যারিকেড, শহরজুড়ে সেনাটহল আর বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যে কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) রাজনৈতিক দুর্গ হিসেবে পরিচিত খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা জারি করেছে কেন্দ্রীয় সরকার।

এর মাধ্যমে স্থগিত করা হয়েছে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা পিটিআইয়ের প্রাদেশিক সরকারও।

বিবিসি লিখেছে, রোববার জরুরি অবস্থা জারির পর শুরুতে স্কুল বন্ধ ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করা হলেও দুদিনের মাথায় তা সচল হয়। তবে পিটিআই নেতাদের ধরতে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রেখেছে পুলিশ।

মঙ্গলবারও খাইবার জেলায় দলটির কর্মীদের ওপর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়েছে। আটক হয়েছেন বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেওয়া প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি।

পিটিআইয়ের দাবি, মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; তবে সরকারের দাবি, তিনি ‘নিরাপত্তা হেফাজতে’ আছেন।

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, ‘সন্ত্রাসবাদের মারাত্মক হুমকি থেকে’ জনগণকে রক্ষা করতেই সাংবিধানিক এইপদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তথ্যমন্ত্রী আতা তারার অভিযোগ করেন, পিটিআইয়ের প্রাদেশিক সরকার ‘জঙ্গিদের সঙ্গে যোগসাজশে’ লিপ্ত ছিল। তবে এর কোনো প্রমাণ তিনি দেখাননি।

তিনি দাবি করেন, জরুরি অবস্থা জারির পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই এবং সরকার আগেই পিটিআইয়ের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করেছিল।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের এই পদক্ষেপের নেপথ্যে রয়েছে সাম্প্রতিক তীব্র চাপ ও বিক্ষোভ।

তিন বছরের বেশি সময় ধরে কারাবন্দি ইমরান খানের সঙ্গে গত এক বছরে পরিবার বা আইনজীবীদের কাউকেই দেখা করতে দেওয়া হয়নি।

সুপ্রিম কোর্ট উদ্বেগ জানানোর পর গত অগাস্টে এক বোন কারাগারে ও অন্য বোন হাসপাতালে চেকআপের সময় দেখা করতে পেরেছিলেন। এর বাইরে আর কাউকে সুযোগ দেওয়া হয়নি।

এর মধ্যে কর্মীদের সংগঠিত করার অভিযোগে সেপ্টেম্বরে ইমরানের তিন বোনকে গ্রেপ্তার করা হয়, তারা এখনো বন্দি।

সরকারের অভিযোগ, সাক্ষাতের সুযোগ নিয়ে ইমরান রাজনীতির আলোচনা করে জেল কোড ভাঙছিলেন।

নেতার মুক্তি ও তার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ থেকে গত এক সপ্তাহ ধরে খাইবার পাখতুনখোয়াজুড়ে হাজার হাজার সমর্থক নিয়ে বড় আকারে ‘লং মার্চ’ শুরু করেছিল পিটিআই।

আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, তৃণমূলের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের মুখে সরকারের ওপর চাপ তৈরির পথ বন্ধ করতেই জরুরি অবস্থার মত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ইসলামাবাদভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জাহিদ হুসেন বলেন, ক্ষমতার ভারসাম্য এখন পুরোপুরি সেনাবাহিনীর দিকে হেলে পড়েছে।

চ্যাথাম হাউজের ফারজানা শেখের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনায় ভূমিকা রেখে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি বাড়ায় পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এখন আত্মবিশ্বাসী যে তারা বৈশ্বিক চাপ অনায়াসেই সামাল দিতে পারবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, সরকারের ওই সিদ্ধান্ত বুমেরাং হতে পারে। ২০২৬ সালের ‘গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স’-এ সন্ত্রাসে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে পাকিস্তান।

এর মধ্যে জঙ্গি আস্তানা থাকার অভিযোগে প্রতিবেশী আফগানিস্তানে দফায় দফায় বিমান হামলা চালাচ্ছে ইসলামাবাদ, যদিও কাবুল ওই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে সীমান্তে বৈরিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে হুতিদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষায় সৌদি আরবকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাকিস্তান আগেই বহুমুখী আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে রয়েছে।

এমন নাজুক পরিস্থিতিতে দেশের ভেতরে নতুন সংকট তৈরি করাকে ‘আগুন নিয়ে খেলা’ হিসেবে দেখছেন কুগেলম্যান।

তিনি বলছেন, প্রাদেশিক সরকার না থাকায় স্থানীয়দের সব ক্ষোভের তীর এখন সরাসরি কেন্দ্রের দিকে যাবে।

এছাড়া নতুন করে সামরিক অভিযান চালালে সেনাদের বড় প্রাণহানি খোদ সামরিক বাহিনীর ভেতরেও ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে।

বিশ্লেষক আরিফা নূরের ভাষায়, জেনে-বুঝেই এক আত্মঘাতী রাজনৈতিক সংকটের গহ্বরে পা বাড়াচ্ছে উভয় পক্ষ।