৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩

ট্রাম্পের সঙ্গে প্রযুক্তি জায়ান্টদের চুক্তি, এআইয়ের নিরাপত্তায় কঠোর নিয়ন্ত্রণের অঙ্গীকার

ভবিষ্যতে এসব পদক্ষেপকে আইন বা আনুষ্ঠানিক বিধিবিধানের আওতায় আনা যুক্তিসংগত হতে পারে বলে চুক্তিতে একমত হয়েছেন প্রযুক্তি খাতের নির্বাহীরা।

ট্রাম্পের সঙ্গে প্রযুক্তি জায়ান্টদের চুক্তি, এআইয়ের নিরাপত্তায় কঠোর নিয়ন্ত্রণের অঙ্গীকার

হোয়াইট হাউজে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের নিয়ে মধ্যাহ্নভোজের পর ট্রাম্প চুক্তির ঘোষণা দেন। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 30 Sep 2026, 10:08 AM

Updated : 30 Sep 2026, 10:08 AM

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নিরাপত্তা জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একটি স্বেচ্ছামূলক চুক্তিতে সই করেছেন ছয়টি শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানির নির্বাহীরা।

দ্রুত বিকাশমান এই প্রযুক্তি মানবজাতির জন্য বিপর্যয়কর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এমন উদ্বেগের মধ্যে মঙ্গলবার হোয়াইট হাউজে এ চুক্তির ঘোষণা দেন ট্রাম্প।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘জয়েন্ট কমিটমেন্ট অন ফ্রন্টিয়ার রেসপনসিবিলিটিজ’ নামের এ চুক্তিতে এআইয়ের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ তদারকি দল গঠন এবং বাইরের স্বাধীন নিরীক্ষকদের মাধ্যমে নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাইয়ের অঙ্গীকার করা হয়েছে।

অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিও আমোদেই, ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান, গুগলের সিইও সুন্দর পিচাই, মেটার প্রধান মার্ক জাকারবার্গ, এক্সএআইয়ের প্রধান ইলন মাস্ক এবং এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং এই চুক্তিতে সই করেন।

হোয়াইট হাউজে প্রযুক্তি খাতের এই শীর্ষ নির্বাহীদের নিয়ে মধ্যাহ্নভোজের পর ট্রাম্প এই চুক্তির ঘোষণা দেন।

আল জাজিরা লিখেছে, এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে দ্রুত বিকাশমান এআই প্রযুক্তিতে সরকারি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সংশয়ের বিষয়টিও স্পষ্ট হল।

ট্রাম্প বলেন, “এমন একটি ধারণা রয়েছে যে ব্যাপক স্বনিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। আর আমাদের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ, এফবিআই—এসবের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।”

কী আছে চুক্তিতে

চুক্তি অনুযায়ী, এআই মডেলগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু করবে কোম্পানিগুলো। এসব নিয়ন্ত্রণ, পর্যবেক্ষণ ও ঝুঁকি শনাক্তকরণব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ দল থাকবে।

কোনো সমস্যা শনাক্ত হলে তা সমাধানের ব্যবস্থা রাখারও অঙ্গীকার করেছে কোম্পানিগুলো।

এ ছাড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথভাবে কাজ করছে কি না, তা যাচাইয়ে স্বাধীন নিরীক্ষকদের সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা।

নিজেদের এআই ব্যবস্থার নিরাপত্তা বাড়াতে মানদণ্ড ও উত্তম চর্চা নির্ধারণের জন্য নিয়মিত বৈঠকের কথাও বলা হয়েছে চুক্তিতে।

তবে তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়ন কারা করবে, সে বিষয়ে চুক্তিতে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা হয়নি।

ভবিষ্যতে এসব পদক্ষেপকে আইন বা আনুষ্ঠানিক বিধিবিধানের আওতায় আনা যুক্তিসংগত হতে পারে বলে চুক্তিতে একমত হয়েছেন প্রযুক্তি খাতের নির্বাহীরা।

সেখানে বলা হয়েছে, “কোম্পানিগুলোর জন্য এসব পদক্ষেপ বাধ্যতামূলক হোক বা না হোক, আমরা বিশ্বাস করি, সবার জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও নিরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রত্যেকটি কোম্পানি তা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতবিরোধ

আন্তর্জাতিক মহল এবং প্রযুক্তি খাতের একাংশ এআইয়ের বিকশা নিয়ন্ত্রণে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে এলেও তাদের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের দূরত্ব স্পষ্ট।

অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এআই নির্মাতাদের প্রযুক্তি বিকাশের গতি কমিয়ে আরও সতর্কভাবে এগোনোর আহ্বান জানিয়েছেন।

গত সপ্তাহে ২০টি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এআইকে মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখতে বৈশ্বিক সমন্বয়ের আহ্বান জানায়। সেজন্য মানদণ্ড নির্ধারণ ও তা কার্যকর করার দায়িত্বে একটি তদারকি সংস্থা গঠনের সম্ভাবনার কথাও উঠে আসে।

তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এআই নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করেছেন ট্রাম্প। গত সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তিনি বলেন, এআই নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক কোনো পরিকল্পনা তৈরির যে কোনো চেষ্টার বিরোধিতা করবে তার প্রশাসন।

মানব অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে—এমন ঝুঁকির সতর্কতার মধ্যেও এআইয়ের বিকাশের গতি কমানোর আহ্বান নাকচ করেছেন ট্রাম্প। তার বদলে তিনি চীনের চেয়ে প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকার ‘প্রয়োজনীয়তার’ কথা তুলে ধরেছেন।

সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ঘটনায় এআই এজেন্টের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থায় সাইবার হামলা চালানোর অভিযোগ সামনে এসেছে। তাতে এআইয়ের নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

সোমবার ওপেনএআই জানায়, অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় নিরাপত্তাঝুঁকি শনাক্ত হওয়ায় তাদের সর্বশেষ এআই মডেলটি তারা এখন বাজারে আনছে না।

চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি আলাদাভাবে একাধিক ঘটনার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমাও চেয়েছে।

তাদের এআই এজেন্ট হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া সরকারের বিভিন্ন ওয়েবসাইটে, এমনকি জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত একটি তথ্যভাণ্ডারেও ঢুকে পড়েছিল।

‘মন্দের ভালো’

আল জাজিরা লিখেছে, ট্রাম্পের ঘোষিত চুক্তি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সমালোচকরা বলেছেন, চুক্তিটি বাধ্যতামূলক নয় এবং এতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা নেই।

ট্রাম্পের সাবেক এআইবিষয়ক উপদেষ্টা ও সিলিকন ভ্যালির বিনিয়োগকারী ডেভিড স্যাকস বলেছেন, যে আন্তর্জাতিক চুক্তি ‘সম্ভবত কখনোই হবে না’ তারচেয়ে বরং এই স্বেচ্ছামূলক চুক্তি ভালো।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে স্যাকস বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকানদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে প্রযুক্তিগত নেতৃত্বে রাখার বিষয়টি অব্যাহতভাবে নিশ্চিত করছেন।”

অন্যদিকে, এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের সেন্টার ফর চায়না অ্যানালাইসিসের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যালভিন ওয়াং গ্রেলিন প্রযুক্তি নেতাদের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানালেও বলেছেন, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের তুলনায় এটি নিতান্তই অপ্রতুল।

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, “আমেরিকানদের জন্য সবচেয়ে গুরুতর ঝুঁকি চীনের কোনো অতিবুদ্ধিমান এআই নয়। বরং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ছোট আকারের কোনো মডেল, যা জৈবিক, রাসায়নিক বা সাইবার হামলায় ব্যবহার করা হতে পারে।”

গ্রেলিন বলেন, ‘চীন নিয়ন্ত্রণ করবে না, তাই আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না’—এমন যুক্তিতে আরও একটি বছর পার করার চেয়ে ছয় কোম্পানির এই স্বেচ্ছামূলক চুক্তি ভালো।

তবে এ চুক্তিতে স্বাধীনতার ঘাটতি রয়েছে এবং আন্তঃসীমান্ত ঝুঁকির বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গ্রেলিন বলেন, “কোম্পানিগুলোই নীতিমালাগুলো তৈরি করেছে, তারাই নিরীক্ষক নিয়োগ করবে, আর অঙ্গীকারটি স্বেচ্ছামূলক। অথচ একই দিনে হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, তারা নিরাপত্তাবিধি সমর্থন করবে না।”

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের এআই ইনস্টিটিউটের প্রধান টবি ওয়ালশের মতে, নিজেদের কার্যক্রম নিজেরাই পরিচালনার ক্ষেত্রে এআই কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে অদক্ষতা ও অসতর্কতার পরিচয় দিয়েছে।

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, “আর কোন ট্রিলিয়ন ডলারের শিল্প নিজের কাজের মূল্যায়ন নিজেই করে?”

ওয়ালশ বলেন, এআই পণ্য থেকে সৃষ্ট ক্ষতির জন্য শীর্ষ নির্বাহীদের দায়বদ্ধ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

“এসব (এআই এজেন্টের মাধ্যমে) সাইবার হামলা শনাক্ত ও সমাধানে যত সময় ব্যয় হচ্ছে, তার পুরো খরচ তাদের দেওয়া উচিত।”