০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

বিভি সংক্রমণ কেন বারবার ফিরে আসে? গবেষণায় মিলল উত্তর

যোনিতে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হলে এ সমস্যা দেখা দেয়। এতে যোনিতে ‘উপকারী’ ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ কমে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা বেড়ে যায়।

বিভি সংক্রমণ কেন বারবার ফিরে আসে? গবেষণায় মিলল উত্তর

দম্পতিদের একসঙ্গে বিভি চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে এটাই এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় গবেষণা। ছবি: ম্যাগনিফিক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 05 Oct 2026, 12:24 PM

Updated : 05 Oct 2026, 12:24 PM

বিশ্বজুড়ে নারীদের পরিচিত ও অস্বস্তিকর যৌন স্বাস্থ্য সমস্যা ব্যাকটেরিয়াল ভিনাজনোসিস বা বিভি সংক্রমণ। সমস্যাটি কেন বারবার ফিরে আসে ও এর মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন অস্ট্রেলিয়ার একদল গবেষক।

তাদের দাবি, নতুন এ গবেষণার ফল ভবিষ্যতে এই রোগের চিকিৎসা পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান প্রতিবেদনে লিখেছে, বিশ্বজুড়ে প্রতি চারজন নারীর মধ্যে অন্তত একজন ব্যাকটেরিয়াল ভিনাজনোসিস বা ‘বিভি’ সংক্রমণে ভোগেন। আর এ সংক্রমণ বারবার ফিরে আসার পেছনে দুটি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা।

যোনিতে প্রাকৃতিকভাবে উপস্থিত ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হলে এ সমস্যা দেখা দেয়। এ সময় যোনিতে ‘উপকারী’ ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ কমে অন্যান্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা বেড়ে যায়।

এর আগে, গেল বছরের মার্চে এক গবেষণায় গবেষকরা বলেছিলেন, পুরুষ সঙ্গীদের মাধ্যমেও নারীদের মধ্যে এই রোগ ছড়াতে পারে।

ওই গবেষণায় উঠে এসেছিল, সংক্রামিত নারী ও তাদের পুরুষ সঙ্গীদের একসঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করা হলে বিভি সংক্রমণ ফিরে আসার হার ৬০ শতাংশের বেশি কমে যায়।

এবার নতুন এক গবেষণায় একই গবেষক দলটি খতিয়ে দেখেছে, ওই গবেষণায় যাদের একসঙ্গে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ নারী কেন সুস্থ হলেন না।

নতুন গবেষণা প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘ল্যানসেট অবস্টেট্রিক্স, গাইনোকোলজি অ্যান্ড উইমেন্স হেলথ’-এ।

গবেষণায় ১৮৮ জোড়া দম্পতি অংশ নিয়েছেন। গবেষণায় নারীদের এক সপ্তাহ ধরে মুখে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিক ও পুরুষ সঙ্গীদের মুখে খাওয়ার পাশাপাশি ত্বকে ব্যবহারের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়।

গবেষণায় বিভি সংক্রমণ বারবার ফিরে আসার পেছনে দুটি ভিন্ন পথ বা কারণ চিহ্নিত হয়েছে। প্রথমত, এক সপ্তাহ অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স করার পরেও সংক্রমণ পুরোপুরি না সেরে যাওয়া ও দ্বিতীয়ত, পুনরায় নতুন করে সংক্রামিত হওয়া।

‘মোনাশ ইউনিভার্সিটি’ ও ‘মেলবোর্ন সেক্সুয়াল হেলথ সেন্টার’-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো এবং এ গবেষণার প্রধান লেখক ড. লঙ্কা ভোডস্ট্রসিল বলেছেন, “প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নারীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরের দিনই তারা ‘অনুকূল যোনি মাইক্রোবায়োম’-এ ফিরে আসেন”, যা স্বাস্থ্যকর ‘ল্যাকটোভ্যাসিলি ব্যাকটেরিয়া’কে চিহ্নিত করে।

বাকি এক-তৃতীয়াংশ নারীর মাইক্রোবায়োম বা অণুজীবের অবস্থা দেখে গবেষকরা বলছেন, চিকিৎসা শেষে দম্পতিরা পুনরায় যৌন সম্পর্ক তৈরির আগে ‘তারা সম্ভবত তাদের বিভি সংক্রমণ পুরোপুরি দূর করতে পারেননি’। ফলে চার সপ্তাহের মধ্যে তাদের এ রোগে পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ ছিল।

ড. ভোডস্ট্রসিল বলেছেন, “সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে পারলে তা আমাদের আরও বেশি নারীকে বিভি থেকে পুরোপুরি নিরাময় করার নতুন কৌশল তৈরিতে সাহায্য করবে।”

বিভি লক্ষণহীন হতে পারে আবার যোনিতে চুলকানি, জ্বালাপোড়া ও অস্বস্তির কারণ হতে পারে। এই রোগের চিকিৎসা করানো জরুরি। কারণ তা অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং গর্ভাবস্থা ও প্রসবকালীন বিভিন্ন জটিলতার সঙ্গেও এর যোগসূত্র রয়েছে।

গবেষকরা বলেছেন, দম্পতিদের একসঙ্গে বিভি চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে এটাই এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় গবেষণা।

গবেষণায় উঠে এসেছে, সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী হওয়া ও সঙ্গীদের মাধ্যমে পুনরায় সংক্রামিত হওয়া এ দুটি ‘আলাদা বিষয় হলেও একই সঙ্গে ঘটার সম্ভাবনা থাকে’।

অংশগ্রহণকারী নারীদের মধ্যে ৩০ শতাংশ ‘ইন্ট্রাইউটেরাইন ডিভাইস’ বা আইইউডি ব্যবহার করতেন। গবেষণা বলছে, এটা ‘কিছু নারীর ক্ষেত্রে চিকিৎসার পরেও ব্যাকটেরিয়াল ভিনাজনোসিসের স্থায়িত্ব বাড়িয়ে দিতে পারে’।

তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলেও উল্লেখ রয়েছে গবেষণায়।

বিজ্ঞানীরা এখন চিকিৎসার সময়সীমা বাড়ানোর ও একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের সমন্বয় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিকল্পনা করছেন।

ড. ভোডস্ট্রসিল বলেন, “আমাদের লক্ষ্য, নারীদের যেন সারা বছর ধরে দুই, তিন বা চারবার অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স করতে না হয়, যা আগে প্রায়ই ঘটত।”

‘মোনাশ ইউনিভার্সিটি’ ও ‘মেলবোর্ন সেক্সুয়াল হেলথ সেন্টার’-এর ‘রিসার্চ ট্রান্সলেশন অ্যান্ড মেন্টরশিপ’-এর প্রধান এবং এ গবেষণার লেখক অধ্যাপক ক্যাট্রিয়োনা ব্র্যাডশ বলেছেন, “পুনরায় সংক্রমণ ঠেকাতে সঙ্গীদের চিকিৎসাকে কাজে লাগিয়ে ও বিভি-ব্যাকটেরিয়ার স্থায়িত্ব ঠেকাতে আরও জোরালো কৌশল নিয়ে আমরা কার্যকর চিকিৎসাপদ্ধতি তৈরির আশা করছি।

“এসব পদ্ধতি প্রতিটি ব্যক্তির প্রয়োজন অনুসারে সাজানো যাবে ও এর মাধ্যমে আরও বেশি সংখ্যক নিরাময় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

“গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের জাতিগত পরিচয় ‘শহুরে অস্ট্রেলিয়ার’। ফলে গবেষণার ফলাফল অন্যান্য বৈশ্বিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রযোজ্য নাও হতে পারে, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বিভিন্ন দেশ ও ব্যাকটেরিয়াল ভিনাজনোসিসের উচ্চ প্রাদুর্ভাব রয়েছে এমন অন্যান্য এলাকার জন্য।”