Published : 09 Aug 2025, 01:19 PM
ইমেইল লিখতে সাহায্য করা থেকে শুরু করে আইনি নথিপত্র অনুবাদ পর্যন্ত এখন মানুষের জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই জড়িয়ে পড়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
এদিকে অত্যাধুনিক সফটওয়্যার বানাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করছে মাইক্রোসফট ও অ্যাপল থেকে শুরু করে এনএইচএস-এর মতো বড় বড় বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানিও।
এআইয়ের এই উত্থানের পেছনে থাকা কয়েকজন ব্যক্তির জন্যই বিশাল পরিমাণের মুনাফা অর্জন সম্ভব হয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ডেইলি মেইল।
ফোর্বসের ‘রিয়াল টাইম বিলিয়নেয়ার তালিকা’ অনুসারে, নতুন এআই বিলিয়নেয়ারদের মধ্যে শীর্ষে আছেন মার্কিন চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং। তার মোট সম্পদের পরিমাণ ১১ হাজার তিনশ কোটি ডলার।
এর মাধ্যমে বর্তমানে মেটা প্রধান মার্ক জাকারবার্গ ও মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের মতো প্রযুক্তি দুনিয়ার কয়েকজন বিশাল ব্যক্তিত্বের সঙ্গে জুড়েছে হুয়াংয়ের নাম। সম্প্রতি এআইতে বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগ করেছেন জাকারবার্গ ও মাস্ক।
চামড়ার জ্যাকেট ও নিজের রকস্টার স্টাইলে পরিচিত হুয়াং। ১৯ বছর বয়সে নিজের কোম্পানি ‘স্কেল এআই’ শুরু করেন আলেক্সান্ডার ওয়াং
তবে কেবল বড় ও প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির প্রধানরাই নন, বরং এআইয়ের মাধ্যমে বিস্ময়করভাবে ধনী হয়েছেন আরও অনেকেই।
নিজের এআই স্টার্টআপ ‘স্কেল এআই’-এর কারণে দুইশো ৭০ কোটি ডলার সম্পদ নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী বিলিয়নেয়ার হয়েছেন ২৬ বছর বয়সী আলেক্সান্ডার ওয়াং।
এ তালিকা থেকে জেনে নিন সেইসব বিলিয়নেয়ারের কথা, এআইয়ের উত্থান যাদের বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক করেছে।
জেনসেন হুয়াং
মার্কিন চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া’র সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও ৬২ বছর বয়সী জেনসেন হুয়াংয়ের মোট সম্পদের পরিমাণ ১৫ হাজার একশ কোটি ডলার। গোটা বিশ্বে এআই নিয়ে যত কাজ হচ্ছে এর হার্ডওয়্যার তৈরির জন্য সব কোম্পানিই এনভিডিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
এ ছাড়া চামড়ার জ্যাকেট ও নিজের রকস্টার স্টাইলের কারণে জনসাধারণের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত হুয়াং। তার নেতৃত্বে জুলাইয়ে প্রথমবারের মতো চার ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে এনভিডিয়া।
শুরুতে উন্নত গ্রাফিক্স কার্ড বানাতো কোম্পানিটি, যা ভিডিও চালানো ও উচ্চমানের গেইমিং কম্পিউটারের জন্য প্রয়োজনীয়। তবে খুব দ্রুতই এআই শিল্পের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠল এসব চিপ। কারণ এগুলো সেইসব গণনা বা হিসাব করতে পারে, যা চ্যাটজিপিটির মতো এআইকে চালায়।
যত বেশি কোম্পানি এআই ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগ করেছে ও নিজেদের এআই মডেল তৈরি করেছে বাজার মূল্য ততই বেড়ে চলেছে এনভিডিয়ার।
কোম্পানিটির তিন শতাংশ শেয়ারের মালিক হুয়াং, গত বছরে এই শেয়ারের মূল্য বেড়েছে দুইশ শতাংশ। বিশ্বজুড়ে এআই থেকে আয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের ২০ জন ধনী ব্যক্তির মধ্যে একজন হয়ে উঠেছেন হুয়াং।
আলেকজান্ডার ওয়াং
২০১৬ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে এমআইটি থেকে পড়াশোনা বাদ দিয়ে নিজের কোম্পানি ‘স্কেল এআই’ শুরু করেন আলেক্সান্ডার ওয়াং। বর্তমানে তার মোট সম্পদের মূল্য তিনশ ৬০ কোটি ডলার।
স্টার্টআপটি এমন পরিষেবা দিচ্ছে, যেখানে বিভিন্ন কোম্পানি স্কেল এআইয়ের তথ্যকে কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে।
বর্তমানে তিনশোরও বেশি গ্রাহক রয়েছে স্কেল এআইয়ের, যাদের মধ্যে রয়েছে জেনারেল মোটর্স, মার্কিন সার্চ জায়ান্ট গুগল ও মার্কিন যোগাযোগ মাধ্যম জায়ান্ট মেটার মতো বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিও।
এখন স্কেল এআইয়ের আনুমানিক ১৪ শতাংশের মালিক ২৮ বছর বয়সী ওয়াং। ২০২৪ সালে এই কোম্পানির মূল্য ছিল প্রায় এক হাজার চারশ কোটি ডলার।
কোনো উত্তরাধিকার সূত্রে বা পরিবারিকভাবে পাওয়া অর্থ ছাড়াই নিজের ব্যবসা শুরু করে এত সফল হন ওয়াং যে, ২০২১ সালে নিজের চেষ্টায় সবচেয়ে কম বয়সে বিলিয়নেয়ার হয়ে ওঠেন তিনি।
স্যাম অল্টম্যান
এআই দুনিয়ার সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে স্যাম অল্টম্যান। ৪০ বছর বয়সী অল্টম্যান চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইয়ের সিইও, যার মোট সম্পদের পরিমাণ এখন একশ ৯০ কোটি ডলার।
অল্টম্যানের ভাগ্য বদলাতে শুরু করে ২০১২ সালে। ওই সময় তিনি নিজের সোশাল-ম্যাপিং কোম্পানি ‘লুপ্ট’কে চার কোটি ২০ লাখ ডলারে বিক্রি করেন।
সেই অর্থ ব্যবহার করে নিজেই একটি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড বা বিনিয়োগ তহবিল চালু করেন অল্টম্যান।
এক সময় স্টার্টআপ অ্যাক্সেলেটর ‘ওয়াই কমবিনেটর’-এর সিইও হিসেবেও কাজ করেছেন অল্টম্যান। এরপর ২০১৯ সালে ওপেনএআইয়ের সিইও হিসেবে নিয়োগ পান তিনি।
সেই সময় ওপেনএআইয়ের মূল্য ছিল প্রায় আট হাজার কোটি ডলার। এখন সেই মূল্য দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৩০ হাজার কোটি ডলারে।
তবে ওপেনএআইতে কোনো শেয়ার নেই অল্টম্যানের এবং তার মোটা অংকের সম্পদ এসেছে অন্যান্য বিনিয়োগ থেকে।
বড় বড় বিভিন্ন কোম্পানি বিশেষ করে স্ট্রাইপ, রেডিট ও নিউক্লিয়ার ফিউশন কোম্পানি হেলিয়ন-এ বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজের বিশাল সম্পদ তৈরি করেছেন অল্টম্যান।
ফিল শাও
এআই অনুবাদ ও ভাষা কোম্পানি ‘ট্রান্সপারফেক্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সহ-সিইও ৫৫ বছর বয়সী ফিল শাও। বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ একশ ৮০ কোটি ডলার।
বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় অনুবাদ সেবা প্রদানকারী কোম্পানি ট্রান্সপারফেক্ট, যা গেইমিং, সিনেমা, আইন, স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন শিল্পের জন্য অনুবাদ এবং সেই ভাষাকে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে দেয়, যাতে ভাষা আরও সহজে বোঝা যায়।
কোম্পানির ৯৯ শতাংশের মালিক শাও এবং ২০২৪ সালে কোম্পানিটির আয় হয়েছে একশ ৩০ কোটি ডলার।
১৯৯২ সালে নিজের ওই সময়কার প্রেমিকার সঙ্গে ‘নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি’র ডর্ম রুম ঘর থেকে কোম্পানিটি শুরু করেছিলেন শাও।
তবে জটিল আইনি মামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়্যারে এক বিচারক শাওকে তার আগের অংশীদারকে সাত কোটি ৭০ লাখ ডলার দিয়ে নিজের অংশ কিনে নিতে অনুমোদন দিয়েছেন। কারণ এ জুটির মধ্যে ওই সময় ‘মতবিরোধ তুমুল পর্যায়ে পৌঁছেছিল’।
দারিও আমোদেই
২০২১ সালে অল্টম্যানের ওপেনএআই ছেড়ে যান গুরুত্বপূর্ণ সাতজন কর্মী, যারা পরবর্তীতে ‘অ্যানথ্রপিক’ নামের নতুন এক কোম্পানি শুরু করেছিলেন।
৪২ বছর বয়সী দারিও অ্যামোদেই নিজের বোন দানিয়েলা’র সঙ্গে মিলে এ কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা করেন, যার সিইও দারিও এবং বর্তমানে কোম্পানির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন দানিয়েলা।
অ্যানথ্রপিক প্রতিষ্ঠার আগে ওপেনএআইয়ের গবেষণা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বও পালন করেছিলেন দারিও।
ওপেনএআইতে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল ‘রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং’ তৈরি করা, যা এআইকে মানুষের ফিডব্যাক বা প্রতিক্রিয়া থেকে শেখার সুযোগ করে দিয়েছে।
এ বছরের মার্চ পর্যন্ত অ্যানথ্রপিকের মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার পাঁচশ কোটি ডলার, যা দারিওকে বিলিয়নেয়ার করে তুলেছে। বর্তমানে তার মোট সম্পদের মূল্য একশ ২০ কোটি ডলার।
লিয়াং ওয়েনফেং
৪০ বছর বয়সী চীনা উদ্যোক্তা লিয়াং ওয়েনফেং-এর নাম গত বছর পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্বের কেউ প্রায় জানতই না। তবে সবটা বদলে যায় যখন ‘ডিপসিক-আর১’ নামের লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল গোটা বিশ্বের প্রযুক্তি বাজারে আলোড়ন তোলে।
কিছু দিক থেকে চ্যাটজিপিটির চেয়েও ভালো করেছে ডিপসিকের এআই মডেল। কার্যকর হলেও চ্যাটজিপিটি চালাতে যে খরচ হয় তার তুলনায় ডিপসিকের খরচ মাত্র পাঁচ শতাংশ।
ডিপসিক বাজারে আসার পর এত বড় আলোড়ন তৈরি করে যে একদিনেই মার্কিন চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার শেয়ারের দাম ১৭ শতাংশ কমে যায়। ফলে প্রায় ৬০ হাজার কোটি ডলার ক্ষতি হয় কোম্পানিটির।
ডিপসিকের সিইও ও প্রতিষ্ঠাতা ওয়েনফেংয়ের বর্তমান সম্পদের আনুমানিক মূল্য একশ কোটি ডলার।
অনেক প্রযুক্তি বিলিয়নেয়ারই কম্পিউটার বা সফটওয়্যার নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। তবে, ওয়েনফেং সেদিক থেকে ব্যতিক্রম। বরং তিনি নিজের কর্মজীবন শুরু করেছিলেন ‘হাই-ফ্লাইয়ার’ নামের এক ফান্ডের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে।
ইয়াও রুনহাও
৩৭ বছর বয়সী ইয়াও রুনহাও ২০১৩ সালে গেইম ডেভেলপার কোম্পানি ‘পেপার গেইমস’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং বর্তমানে কোম্পানির চেয়ারম্যান ও সিইও হিসেবে কাজ করছেন। তার মোট সম্পদের পরিমাণ একশ ৩০ কোটি ডলার।
পশ্চিমা বিভিন্ন দেশে কম পরিচিত হলেও চীনে অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘পেপার গেইমস’।
প্রতি মাসে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ রুনহাওর এআই ডেটিং সিমুলেটর গেইম ‘লাভ অ্যান্ড ডিপস্পেস’ খেলেন, যা লন্ডনের মোট জনসংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশের সমান।
ভার্চুয়াল ডেটিং গেইমটি এআই ব্যবহার করে এমন ভার্চুয়াল প্রেমিক বা প্রেমিকা তৈরি করে, যারা গেইমারদের সঙ্গে ফোন কলের মাধ্যমে মজার ও রোমান্টিক আলাপচারিতা করতে পারে।
বর্তমানে ‘পেপার গেইমস’ প্রায় দুই হাজার কর্মী নিয়োগ করে এমন গেইম তৈরি করছে, যেগুলো মূলত চীনের নারীদের জন্য বাজারজাত করা হয়।