চাঁদের জন্মরহস্য নিয়ে সামনে এল নতুন ব্যাখ্যা
নতুন গবেষণাটি প্রথমবারের মতো ইঙ্গিত দিচ্ছে, সংঘর্ষে থাকা বস্তুর শক্তি এবং তাপমাত্রা চাঁদ দ্রুত ও অক্ষত অবস্থায় তৈরি হবে কি না, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চাঁদের উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা রয়েছে। সেই ধারণা অনুযায়ী, পৃথিবীর সঙ্গে মঙ্গল গ্রহের আকারের একটি মহাজাগতিক বস্তু থেইয়ার ভয়াবহ সংঘর্ষের পর চাঁদের সৃষ্টি হয়। তবে নতুন গবেষণা বলছে, এই সংঘর্ষের সময় পৃথিবী ও থেইয়ার তাপমাত্রা এবং বস্তুগত শক্তির বিষয়টি এতদিন যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
চাঁদের উৎপত্তি নিয়ে নতুন গবেষণার এই ফলাফল নিয়ে ইন্ডিপেনডেন্ট-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, সংঘর্ষের সময় দুই মহাজাগতিক বস্তুর ভৌত বৈশিষ্ট্য উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে থাকতে পারে যে, এর ফলে চাঁদ কীভাবে তৈরি হবে।
আগের গবেষণাগুলোতে ধারণা করা হয়েছিল, পৃথিবী ও থেইয়ার ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রচণ্ড শক্তির সংঘর্ষের কারণে দুই বস্তুর উপাদানের শক্তি কতটা, সেটিও মূলত বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা সেই সংঘর্ষের নতুন কম্পিউটারভিত্তিক সিমুলেশন তৈরি করেছেন। এতে পৃথিবী ও থেইয়ার বস্তুগত শক্তি এবং তাপমাত্রার সঙ্গে সেই শক্তির পরিবর্তনের বিষয়টি হিসাবের মধ্যে নেওয়া হয়েছে।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দেওয়া সাউথওয়েস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী অ্যাডিন ডেন্টন বলেন, সংঘর্ষে থাকা বস্তুগুলোর শক্তি ও তাপমাত্রা ‘যথেষ্টই গুরুত্বপূর্ণ’।
সিমুলেশনে দেখা গেছে, সংঘর্ষের সময় পৃথিবী ও থেইয়া কতটা উত্তপ্ত ছিল, তার ওপর সংঘর্ষের ফল অনেকটাই নির্ভর করে। কারণ উত্তপ্ত বস্তু তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়, আর ঠান্ডা বস্তু বেশি শক্ত থাকে।
তাপমাত্রা ও বস্তুর শক্তির ওপর নির্ভর করে কিছু সংঘর্ষের সিমুলেশনে সংঘর্ষের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি অক্ষত চাঁদ তৈরি হতে দেখা গেছে। আবার অন্যগুলোয় পৃথিবীকে ঘিরে ধ্বংসাবশেষের একটি বলয় তৈরি হয়, যা পরে ধীরে ধীরে একসঙ্গে মিলে চাঁদে পরিণত হতে পারে।
অ্যাডিন ডেন্টন বলেন, “সংঘর্ষের আগে পৃথিবী ও থেইয়া কতটা উত্তপ্ত ছিল, তার ওপর নির্ভর করে সংঘর্ষটি থেইয়াকে ধ্বংস করে বিপুল ধ্বংসাবশেষের একটি বলয় তৈরি করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত চাঁদ তৈরি করে। কিন্তু মূল সংঘর্ষের সিমুলেশনে ব্যবহৃত একই বৈশিষ্ট্য, এমনকি দুই বস্তুর ভেতরের সমান তাপমাত্রার কাঠামো ব্যবহার করলে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে একটি অক্ষত চাঁদ তৈরি হতে দেখা যায়।”
আগের সিমুলেশনগুলোতেও দ্রুত তৈরি হওয়া অক্ষত চাঁদের সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল। তবে নতুন গবেষণাটি প্রথমবারের মতো ইঙ্গিত দিচ্ছে, সংঘর্ষে থাকা বস্তুর শক্তি এবং তাপমাত্রা চাঁদ দ্রুত ও অক্ষত অবস্থায় তৈরি হবে কি না, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২০০১ সালে বড় ধরনের সংঘর্ষের মাধ্যমে চাঁদ তৈরির তত্ত্ব বিকাশে সহায়তা করা বিজ্ঞানী রবিন ক্যানাপ নতুন গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না। তিনি বলেন, “এই বিস্ময় জাগানিয়া ও রোমাঞ্চকর নতুন ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, আজকের চাঁদের ভৌত বৈশিষ্ট্য, যার মধ্যে সম্ভবত এর উদ্বায়ী উপাদানও রয়েছে, এবং বৃহৎ সংঘর্ষের সময় পৃথিবী ও থেইয়ার তাপীয় অবস্থার মধ্যে সম্ভাব্য একটি যোগসূত্র থাকতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা চাঁদ সৃষ্টির ঘটনাটি কখন ঘটেছিল, সেই সময়সীমা আরও ভালোভাবে নির্ধারণ করতে পারেন।”
তবে পৃথিবী ও চাঁদ এতটা একই রকম কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। একটি ধারণা হলো, থেইয়া ও পৃথিবী কাছাকাছি পরিবেশে তৈরি হয়েছিল, আর মঙ্গল গ্রহ আরও দূরের এলাকায় তৈরি হয়।
অ্যাডিন ডেন্টন বলেন, “সৌরজগতের একই এলাকায় পৃথিবী ও মঙ্গল তৈরি হয়েছিল বলে তারা ভাইবোনের মতো। আর চাঁদ ও পৃথিবী অনেকটা একই বাবা-মায়ের দুই সন্তানের মতো।”
গবেষণাটি ‘কোলিশনাল ক্যাপচার অফ অ্যান ইনট্যাক্ট মুন ডিপেন্ডস অন স্ট্রেংথ’ শিরোনামে একটি গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স-এ।
