বাজার-সংবেদনশীল তথ্যের বেসাতি নিয়ে ট্রাম্প মিডিয়া
এ কোম্পানির সিংহভাগ শেয়ারের মালিক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরিবার, তারা ট্রাম্পের প্রকাশ্য বক্তব্যকে মূলধন করে বাণিজ্যিক মুনাফা তুলতে পারে কি না তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ডনাল্ড ট্রাম্প যখন কথা বলেন তখন অর্থবাজারের ট্রেডাররা কান খাড়া করে তার শোনেন। বাণিজ্যিক যুদ্ধ থেকে শুরু করে সামরিক সংঘাত মার্কিন প্রেসিডেন্টের যে কোনো মন্তব্যই রাতারাতি শেয়ারবাজার ও অর্থনৈতিক সূচকে প্রভাব ফেলে।
ফলে ট্রেডারদের বিভিন্ন দল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইওয়ালা স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটার সিস্টেমগুলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্যের ওপর নজর রাখে যাতে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লেনদেন সম্পন্ন করে মুনাফা তুলে নেওয়া যায়।
এবার বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সেই প্রভাবশালীদের তথ্য বিক্রি করে ‘ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি গ্রুপ’ বা টিএমটিজি আয় করতে চায় বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশাল’-এর সবচেয়ে প্রভাবশালী অ্যাকাউন্টগুলোর বার্তা যাতে ওয়াল স্ট্রিটের বাণিজ্যিক কোম্পানি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সবার আগে ও ‘দ্রুত সময়ে’ পেতে পারেন সে জন্য পেইড বা ফিভিত্তিক সেবা চালু করেছে কোম্পানিটি।
এ সেবার মধ্যে খোদ প্রেসিডেন্টের অ্যাকাউন্ট অন্তর্ভুক্ত থাকবে কি না তা বলেনি টিএমটিজি। তবে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ অনুসারী নিয়ে প্ল্যাটফর্মটির সবচেয়ে জনপ্রিয় অ্যাকাউন্ট যে তারই এবং তার পোস্টই বাজারের ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলে তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই।
কোম্পানির এ পদক্ষেপে আইনসংশ্লিষ্ট বেশ কিছু প্রশ্ন ও নীতিবিষয়ক বিতর্ক সামনে এসেছে, বিশেষ করে কোম্পানির সিংহভাগ শেয়ারের মালিক প্রেসিডেন্টের পরিবার, তারা প্রেসিডেন্টের নিজস্ব প্রকাশ্য বক্তব্যকে মূলধন করে বাণিজ্যিক মুনাফা তুলতে পারে কি না তা নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা।
কী এই নতুন সেবা?
টিএমটিজি চালু করা নতুন এ সেবার নাম ‘ট্রুথ এপিআই’। সেবাটি এক ধরনের তথ্যপ্রবাহ বা ডেটা ফিড, যার মাধ্যমে ট্রুথ সোশালের ‘শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের’ পোস্ট কেবল ‘মিলি-সেকেন্ডে’ বা সেকেন্ডের ভগ্নাংশে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে যাবে।
প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের জন্য অগাস্টের ১ তারিখ থেকে সেবাটি চালুর কথা থাকলেও ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস প্রতিবেদনে লিখেছে, অতি-গতির এ তথ্যের জন্য গ্রাহকদের প্রতি মাসে এক লাখ ডলার পর্যন্ত গুণতে হতে পারে। তবে টিএমটিজি এখনও নির্দিষ্ট অর্থের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
লোকসানে থাকা টিএমটিজি আশা করছে, এই সেবা চালু হলে তা কোম্পানির জন্য রাজস্ব আয়ের নিয়মিত একটি উৎস হয়ে উঠবে।
যে কেউ অর্থের বিনিময়ে এই সেবা নিতে পারবেন। তবে ‘হাই-ফ্রিকোয়েন্সি’ ও ‘অ্যালগোরিদমিক ট্রেডিং’ ফার্মগুলোকে লক্ষ্য করেই এ সেবা ডিজাইন করেছে ট্রুথ সোশাল।
টিএমটিজি বলেছে, ‘তথ্য পেতে সামান্য দেরি হলেও যে ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়’ তাদের জন্যই সেবাটি কার্যকর।
বিনিয়োগ ব্যাংক ‘চার্লস শোয়াব’-এর তথ্য অনুসারে, এ ধরনের আর্থিক কোম্পানিতে লেনদেন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়। মানুষের চেয়ে বহুগুণ দ্রুত ও বড় পরিসরে কেনাবেচার কাজ সম্পন্ন করে অ্যালগরিদম নির্ভর ইলেকট্রনিক সিস্টেম। বিষয়টি অনেকটা ‘চোখের পলক ফেলার আগেই মিস করার’ মতো।
“এ ধরনের সিস্টেম সাধারণত প্রতি লেনদেনে সামান্য লাভের জন্য তৈরি করা হয়। তবে বিস্ময়কর গতি ও বিপুল পরিমাণের লেনদেনের কারণে তারা দিনশেষে নিজেদের কোম্পানির জন্য বড় অংকের মুনাফা আনতে পারে।”
কারা কিনছে এই সেবা?
এখন পর্যন্ত ঠিক কারা এই সেবায় নিবন্ধন করেছে সে বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছে সংশ্লিষ্টরা।
টিএমটিজি বলেছে, সেবাটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর আগেই অনেক গ্রাহক আগাম নিবন্ধন করেছেন। তবে তাদের সংখ্যা ঠিক কত তা প্রকাশ করেনি কোম্পানিটি।
‘থেমিস ট্রেডিং’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা জো সালুজ্জি বলেছেন, নিজের কোম্পানিসহ অন্যান্য ট্রেডিং ফার্মের কাছেই ‘ট্রুথ এপিআই’ এক প্রকার ‘অর্থহীন’। কারণ, ন্যানোসেকেন্ড গতিতে লেনদেনের জন্য যে ধরনের জটিল ও আধুনিক ব্যবস্থা দরকার তা সবার থাকে না।
তার ভাষ্য, হাই-ফ্রিকোয়েন্সি ট্রেডিং ফার্মগুলোই এই সেবার প্রধান গ্রাহক হবে। যার কারণ কেবল মুনাফা পাওয়া নয়, বরং তাদের মধ্যে এই ভয়ও কাজ করবে যে, ‘আমি না নিলে অন্য কেউ ঠিকই এই সুবিধা বাগিয়ে নেবে’।
“এমনটা কোনো সাধারণ খুচরা বিনিয়োগকারী বা প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য নয়। এই ডেটা ফিড কেবল সেইসব উচ্চগতির ট্রেডারদের জন্য, যাদের এ ধরনের লেনদেনের জন্য এরইমধ্যে প্রস্তুত সিস্টেম রয়েছে ও যারা এর পেছনে লাখ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছে।”
গোল্ডম্যান স্যাকস, জেপি মরগান থেকে শুরু করে সিটাডেল সিকিউরিটিজ ও জেন স্ট্রিটের মতো যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগ ব্যাংক ও হাই-ফ্রিকোয়েন্সি ট্রেডিং ফার্মগুলো এই সেবা নেবে কি না তা জানতে যোগাযোগ করেছিল বিবিসি।
তবে তারা কেউই বিবিসির মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
সালুজ্জির ভাষায়, “এসব বিষয় নিয়ে আসলে কেউই কথা বলতে রাজি নয়।”
প্রশ্নটা আইন আর নৈতিকতার
ডনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিরোধীরা শুরু থেকেই এই সেবার তীব্র সমালোচনা করে আসছেন।
ডেমোক্রেটিক সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ও অ্যাডাম শিফ এরইমধ্যে মার্কিন ‘সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন’ বা এসইসি’র কাছে চিঠি দিয়ে জানতে চেয়েছেন, ‘ট্রুথ এপিআই’ আইন লঙ্ঘন করছে কি না তা তদন্ত করা হবে কি না।
চিঠি পাওয়ার কথা নিশ্চিত করলেও এ বিষয়ে কোনো তদন্ত শুরু করা হবে কি না তা নিয়ে মন্তব্য করেনি এসইসি।
একইসঙ্গে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘ইনসাইডার ট্রেডিং’ বা ভেতরের খবর ব্যবহার করে অবৈধ ব্যবসার ঝুঁকি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ইনসাইডার ট্রেডিং এমন এক বেআইনি প্রক্রিয়া, যেখানে সাধারণ জনগণের কাছে পৌঁছায়নি এমন গোপন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে শেয়ারবাজারে লেনদেন বা বাজি ধরা হয়।
এসইসি’কে পাঠানো চিঠির জবাবে টিএমটিজি’র একজন মুখপাত্র বলেছেন, “ডেমোক্র্যাট সিনেটররা ‘হয় মুক্তবাজারের প্রতি আদর্শগত বিরোধিতার কারণে, নয়ত সরকারি ও বেসরকারি তথ্যের পার্থক্য বুঝতে না পেরে বা সম্ভবত দুটির কারণেই ট্রুথ এপিআইকে ভুলভাবে উপস্থাপন করছেন।
“পাবলিক বা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে হয়ত ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের এক নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন সিনেটররা।”
তবে এ সেবার মাধ্যমে সরবরাহ করা তথ্যটি আসলে ‘পাবলিক’ নাকি ‘নন-পাবলিক’ তা-ই এখন মূল আইনি পরীক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সাবেক নীতিবিষয়ক আইনজীবী রিচার্ড পেন্টার বলেছেন, প্ল্যাটফর্মটিতে মার্কিন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও অফিশিয়াল তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগেই বিক্রি করা হলে সেটাকে ইনসাইডার ট্রেডিং হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
“আমি যদি এসইসির কমিশনার হতাম তবে এই পরিকল্পনা বন্ধ না করা পর্যন্ত বা মার্কিন সরকারের অভ্যন্তরীণ বিষয় সম্পর্কিত কোনো পোস্ট এতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না এমন নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত পদত্যাগের হুমকি দিতাম।”
অন্যদিকে সালুজ্জি মনে করিয়ে দিয়েছেন, বিশ্বের অনেক ডেটা সরবরাহকারী, সংবাদ সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জ বর্তমানে এই ধরনের সেবা চালু রেখেছে, যা টিএমটিজি’র জন্য ‘আগের নজির’ হিসেবে কাজ করছে।
তবে নীতিগত জায়গায় যে ভিন্নতা রয়েছে তা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, “নৈতিকতার প্রশ্নে এখানে নতুন আলোচনার সুযোগ রয়ে যায়।”
কারণ, ট্রাম্প পরিবারের ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত টিএমটিজি’র প্রায় ৪১ শতাংশ শেয়ারের মালিক খোদ ট্রাম্প, যা থেকে সরাসরি লাভবান হবেন তিনি নিজেই।
এসইসি’কে লেখা চিঠিতে সিনেটর ওয়ারেন ও শিফ বলেছেন, “এটি প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার চরম অপব্যবহার বলে মনে হচ্ছে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, বাজারের ন্যায্যতা নষ্ট হবে, আর লাভবান হবে শুধু ওয়াল স্ট্রিট, ধনী প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত স্বার্থ।”
