১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সিলিকন কার্বন প্রযুক্তিতে মিটবে স্মার্টফোনের ব্যাটারি সমস্যা?

সিলিকন কার্বন ব্যাটারি প্রচলিত লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির চেয়ে ধারণক্ষমতায় অনেক এগিয়ে। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা কিছু ফোনে অনায়াসে একটানা দুই দিন ব্যাটারি লাইফ পেতে পারে।

সিলিকন কার্বন প্রযুক্তিতে মিটবে স্মার্টফোনের ব্যাটারি সমস্যা?
সিলিকন সাশ্রয়ী, সহজলভ্য ও সহজে মেলে এমন উপাদান। ছবি: ম্যাগনিফিক

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 04 Aug 2026, 06:10 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:47 PM

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ববাজারে সিলিকন কার্বন ব্যাটারিওয়ালা স্মার্টফোনের আধিপত্য চোখে পড়ার মতো বাড়ছে। এ প্রযুক্তি বেশ আগেই গ্রহণ করেছে অনার, অপো ও শাওমির মতো শীর্ষস্থানীয় চীনা ব্র্যান্ডগুলো।

এবার সেই তালিকায় যোগ হয়ে নিজেদের ‘গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৮’ ও ‘৮ আল্ট্রা’ মডেলে সিলিকন-কার্বন প্রযুক্তির ব্যাটারি ব্যবহার শুরু করেছে স্যামসাং।

পদ্ধতিগত দিক থেকে সিলিকন কার্বন ব্যাটারি প্রচলিত লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির তুলনায় ধারণক্ষমতায় অনেক এগিয়ে। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা কিছু ফোনে অনায়াসে একটানা দুই দিন ব্যাটারি লাইফ পেতে পারে এমন দাবিও জোরালো হচ্ছে।

এশিয়ার ফোনে প্রযুক্তিটি মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পশ্চিমা স্মার্টফোনগুলোতেও এর ব্যবহার দেখা যাবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট।

এই সিলিকন কার্বন ব্যাটারি কেন এত বিশেষ, কীভাবে ব্যাটারির আয়ু এতটা বাড়িয়ে দেয় এবং কেন এই বাড়তি চার্জ ধরে রাখার সক্ষমতা ফোনের সার্বিক মেয়াদ কমিয়ে দিতে পারে তা জানা বেশ জরুরি।

ব্যাটারি যেভাবে কাজ করে

একটি ব্যাটারি তিনটি প্রধান অংশের সমন্বয়ে গঠিত। যেমন অ্যানোড, ক্যাথোড ও এই দুটির মাঝখানে থাকা ইলেকট্রোলাইট। ব্যাটারি পুরোপুরি চার্জড হলে সব ইলেকট্রন অ্যানোডে সঞ্চিত থাকে। পরে তা ধীরে ধীরে ক্যাথোডে যেতে চায়। ইলেকট্রোলাইটের মধ্য দিয়ে ইলেকট্রনের এই চলাচলের ফলে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে, যা বিদ্যুৎ শক্তি তৈরি করে।

ফোনের ব্যাটারিতে অ্যানোডে বহুবার নতুন ইলেকট্রন যোগ বা চার্জ করা সম্ভব। তবে সময় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রোলাইটে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক পদার্থের ঘাটতি দেখা দিলে ব্যাটারির শক্তি সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমতে থাকে।

ব্যাটারির এ পুরো প্রক্রিয়াটিকে একটি ওয়াটার পার্কের ‘ওয়াটার স্লাইড’-এর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। ধরা যাক, প্রচণ্ড গরমে শত শত শিশু (ইলেকট্রন) স্লাইডের একদম ওপরে (অ্যানোড) দাঁড়িয়ে নিচে (ক্যাথোড) নামার জন্য অপেক্ষা করছে।

স্লাইডের ওপর দিয়ে গড়িয়ে পড়া পানি (ইলেকট্রোলাইট) তাদের দ্রুত নিচে নামতে সাহায্য করছে। নিচে নেমে শিশুরা আবার ওপরে উঠে যায় (রিচার্জিং) ও এভাবে বারবার চলতে থাকে। একপর্যায়ে যদি পার্কের পানির মজুত শেষ হয়ে স্লাইডটি শুকিয়ে যায় তবে রাইডটি আর ব্যবহার করা যায় না।

লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি

বর্তমানে ব্যবহৃত বেশিরভাগ ভোক্তা ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসেই লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির ব্যবহার দেখা যায়। অন্যান্য প্রযুক্তির তুলনায় এগুলো হালকা, শক্তি সঞ্চয়ে সক্ষম এবং বহুবার চার্জড ও ডিসচার্জড হলেও সহজে কার্যসক্ষমতা হারায় না।

এগুলো নিখুঁত এমনটা বলা যাবে না। আমাদের ব্যবহৃত ফোন, ল্যাপটপ বা বিদ্যুচ্চালিত গাড়িতে এ ব্যাটারিকে নিরাপদ ও কার্যকর করতে বহু বছরের গবেষণা লেগেছে।

সাধারণত একটি লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারিতে গ্রাফাইট পাউডারের অ্যানোড, লিথিয়াম আয়ন ফসফেটের ক্যাথোড ও ইথিলিন কার্বোনেটের ইলেকট্রোলাইট থাকে।

ব্যাটারি রসায়ণ বিশেষজ্ঞ ও ‘অ্যাম্পলিএসআই’-এর প্রধান নির্বাহী ড. রুথ সেয়ার্স বলেছেন, “গেল দুই দশকে লিথিয়াম আয়ন সেলের ক্যাথোড ও ইলেকট্রোলাইটের মান সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে অ্যানোড অংশে এখনও সেই কয়েক দশকের পুরানো গ্রাফাইটই ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে গ্রাফাইট অ্যানোডটিই বর্তমানে ব্যাটারির পারফরম্যান্সের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানেই চ্যালেঞ্জার হিসেবে উঠে এসেছে সিলিকন।”

সিলিকন কার্বন ব্যাটারি যেভাবে আলাদা

নাম ‘সিলিকন কার্বন ব্যাটারি’ হলেও এর ক্যাথোডে এখনও লিথিয়ামভিত্তিক উপাদানই ব্যবহৃত হয়। পদার্থবিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে অ্যানোডের পুরোটাজুড়ে সিলিকন কার্বন ব্যবহার করা সম্ভব নয়, বরং গ্রাফাইটের সঙ্গে খুব সামান্য পরিমাণে সিলিকন কার্বন মিশিয়ে এটা তৈরি করা হয়।

স্যামসাং ও অন্যান্য মোবাইল নির্মাতারা এ পদ্ধতিই অনুসরণ করছে। সম্প্রতি উন্মোচিত ‘গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৮’ ও ‘ফোল্ড ৮ আল্ট্রা’র প্রডাক্ট পেইজে স্যামসাং ব্যাটারির ধরনকে ‘লিথিয়াম-আয়ন’ হিসেবেই উল্লেখ করেছে। তবে কোম্পানিটি বলেছে, ব্যাটারির শক্তি সঞ্চয়ের ঘনত্ব বাড়াতে তারা সিলিকন-কার্বন উপাদান যোগ করেছে।

ফিনল্যান্ডের ‘সেইনাযোকি ইউনিভার্সিটি অফ অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেস’-এর গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের প্রধান ড. জুহো হেইস্কা বলেছেন, “ব্যাটারিতে সিলিকন যোগের বিষয়টি নতুন নয়। টেসলা তাদের কিছু ব্যাটারি মডেলে অন্তত ৩ থেকে ৫ শতাংশ সিলিকন মিশ্রণ ব্যবহার করে আসছে।”

বর্তমান ম্যানুফ্যাকচারিং ও কেমিক্যাল প্রক্রিয়ার উন্নতির ফলে এখন সিলিকনের মিশ্রণ আরও বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে।

ড. হেইস্কা বলেছেন, প্রস্তুতকারকরা এমন এক উপাদান নিয়ে কাজ করছে, যা উৎপাদন লাইনেই যোগ করা যায়। যেমন, ৭৫ শতাংশ গ্রাফাইটের সঙ্গে ২৫ শতাংশ সিলিকন পাউডার মিশিয়ে আগের মতোই ব্যাটারি তৈরি করা।

তবে এ প্রক্রিয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। ইভির বড় ব্যাটারির তুলনায় ফোনের ব্যাটারি আকারে ছোট হওয়ায় এই খরচ মানিয়ে নেওয়া সহজ। ফলে নতুন এ প্রযুক্তি স্মার্টফোনেই প্রথম আত্মপ্রকাশ করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার জায়ান্ট স্যামসাং সতর্কতার সঙ্গে সিলিকন কার্বন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চীনা ফোনগুলোর মতো বড় ধারণসক্ষমতার ব্যাটারি বানানোর বদলে তারা সিলিকন ব্যবহার করে ব্যাটারির আকার ছোট ও ফোন পাতলা করায় মনোযোগ দিয়েছে।

স্যামসাংয়ের ধারণা, এ নতুন ব্যাটারি সাধারণ লিথিয়াম আয়নের তুলনায় কিছুটা দ্রুত অবক্ষয়ের মুখে পড়বে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে জমা দেওয়া তথ্যে কোম্পানিটি বলেছে, নতুন এসব ব্যাটারির লাইফসাইকেল হবে ১ হাজার ২০০ চার্জ সাইকেল, যা তাদের আগের প্রজন্মের ২ হাজার চার্জ সাইকেলের প্রতিশ্রুতি থেকে কিছুটা কম।

সিলিকন কার্বন ব্যাটারির সুবিধা

গ্রাফাইট অ্যানোডের সঙ্গে সিলিকন কার্বন যোগের ফলে ব্যাটারির ক্ষেত্রে বেশ কিছু বড় পরিবর্তন এসেছে।

ড. সায়ার্স বলেছেন, “প্রতি গ্রামে গ্রাফাইটের শক্তি ধারণসক্ষমতা যেখানে প্রায় ৩৩০ মিলিঅ্যাম্পিয়ার আওয়ার, সেখানে সিলিকনের ক্ষেত্রে এই সক্ষমতা প্রায় দশ গুণ। সিলিকন কার্বন ব্যাটারিতে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় লিথিয়াম ও সিলিকন মিলে সংকর ধাতু তৈরি করে, যা বেশি পরিমাণে লিথিয়াম জমা রাখতে সাহায্য করে। ফলে ব্যাটারির ধারণসক্ষমতা বেড়ে যায়।”

ওজন ও আকারে ছোট হয়েও বেশি বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের এ সক্ষমতার কারণেই আগের যুগের মতো ফোন মোটা না বানিয়েও ব্যাটারির সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে।

যেমন, ‘ওয়ানপ্লাস ১৫’ স্মার্টফোনটি আইফোন ১৭-এর চেয়ে কেবল এক বা দুই মিলিমিটার পুরু হলেও এতে রয়েছে সাত হাজার ৩০০ মিলিঅ্যাম্পিয়ার আওয়ারের শক্তিশালী ব্যাটারি, যা একটানা সাড়ে ৩৮ ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যাকআপ দিতে পারে।

ধারণসক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি এসব ব্যাটারি দ্রুত চার্জ নিতে পারে। ড. হেইস্কা বলেছেন, গ্রাফাইটের স্তরের ভেতরে লিথিয়াম আয়ন সহজে প্রবেশ করতে পারে না বলে গ্রাফাইট ব্যাটারি দ্রুত চার্জ করা কঠিন। তবে সিলিকন দ্রুত চার্জ গ্রহণ করতে পারে, যা দ্রুততম সময়ে ফোন ফুল চার্জড হতে সহায়তা করে।

এ ছাড়া, ব্যাটারির বাজারে আরেকটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে, সিলিকন সাশ্রয়ী, সহজলভ্য ও সহজে মেলে এমন উপাদান। বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক বা কাঁচামাল সংকট ঠেকাতে কম খরচে সহজলভ্য কাঁচামালের দিকেই ঝুঁকছে প্রযুক্তি খাত।

সিলিকন কার্বন ব্যাটারির সীমাবদ্ধতা

প্রতিটি নতুন প্রযুক্তির মতো সিলিকন কার্বনেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা এর ব্যাপক ব্যবহারে এত দিন বাধা হয়ে ছিল।

ড. হেইস্কা বলেছেন, “সিলিকন কার্বন ব্যাটারি দ্রুত চার্জিং ও অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি বা ধারণসক্ষমতা দিলেও এর ‘সাইকেল লাইফ’ বা স্থায়িত্বের মেয়াদ লিথিয়াম আয়নের চেয়ে কিছুটা কম।”

সহজভাবে বললে, কোনো উপাদানে বিদ্যুৎ পরিবাহিত হলে তা আকারে কিছুটা প্রসারিত বা বিকৃত হয়। একটি নির্দিষ্ট আকৃতির স্মার্টফোনের ভেতর ব্যাটারি ফিট করার ক্ষেত্রে এ প্রসারণ সমস্যা তৈরি করে।

সাধারণ ব্যাটারির গ্রাফাইট চার্জিংয়ের সময় কেবল ১০ শতাংশ প্রসারিত হয়। তবে সিলিকন প্রসারিত হয় প্রায় ৪০০ শতাংশ! এ কারণেই কেবল সিলিকন দিয়ে পুরোপুরি ব্যাটারি তৈরি করা সম্ভব নয়। কারণ এমনটা করলে ব্যাটারির স্থায়ীত্ব এতটাই কমে যাবে যে গ্রাহকরা তা কিনবেন না।

ড. সায়ার্স বলেছেন, “লিথিয়াম ও সিলিকনের সংকর তৈরির সময় কতটুকু লিথিয়াম ও সিলিকন ব্যবহৃত হবে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বর্তমানে নির্মাতারা এমন এক ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা করছেন, যেন ফোনের ব্যাটারি লাইফ ঠিক রেখে সর্বোচ্চ ধারণসক্ষমতা মেলে।

ব্যাটারির স্থায়িত্ব ও ধারণসক্ষমতার এ বোঝাপড়ার কারণেই স্মার্টফোনকে এ প্রযুক্তি বিকাশের আদর্শ জায়গা মনে করা হচ্ছে। কারণ বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও কয়েক বছর পর পর ব্যবহারকারীদের ফোন পরিবর্তনের প্রবণতা এখনও রয়েছে।”

এ ছাড়া একবার চার্জে যদি দুই দিন ফোন চালানো গেলে বারবার চার্জ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও কমে যাবে, যা ব্যাটারির ক্ষয় পুষিয়ে দিতে কিছুটা হলেও সাহায্য করবে।