০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

খুব গরম চা-কফি পানে ক্যান্সারের ঝুঁকি তিন গুণ: গবেষণা

পশ্চিম ইউরোপের মানুষের ওপর চালিত এ গবেষণার ফলাফল এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের আগের গবেষণার ফলাফলের সঙ্গেও মেলে।

খুব গরম চা-কফি পানে ক্যান্সারের ঝুঁকি তিন গুণ: গবেষণা
দীর্ঘমেয়াদী অভ্যাস ও স্বাস্থ্যের সঠিক চিত্র পেতে অংশগ্রহণকারীদের ১৪ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করেছেন গবেষকরা। ছবি: এআই

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 13 Sep 2026, 05:39 PM

Updated : 19 Sep 2026, 02:28 PM

অতিরিক্ত গরম চা ও কফি পানের ফলে খাদ্যনালীর ক্যান্সারের ঝুঁকি তিন গুণ হতে পারে বলে উঠে এসেছে এ সংক্রান্ত এ পর্যন্ত হওয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় গবেষণায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ রোগের ঝুঁকি কমাতে মানুষ যেন চা বা কফি পানের উপযোগী ও সহনীয় তাপমাত্রায় আসার পর তা পান করেন সে বিষয়েও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

গবেষণায় উঠে এসেছে, পানীয়র তাপমাত্রা ও খুব গরম পানীয় পানের পরিমাণ ‘খাদ্যনালীর স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা’ বা এসসিসি এক ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তবে গরম পানীয়ের কারণে খাদ্যনালীর আরেক ধরনের ক্যান্সার ‘অ্যাডিনোকার্সিনোমা’ বা এসি’র ঝুঁকি বাড়ে না।

বুধবার গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানিভিত্তিক জার্নাল ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্যান্সার জার্নাল’-এ।

গবেষণায় বলা হয়েছে, “পানের অভ্যাসের বিষয়টি সমন্বয় করার পর দেখা গেছে, ‘খুব গরম’ বনাম ‘কুসুম গরম’ পানীয় পানের সঙ্গে এসসিসি’র তিন গুণ ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। তবে এসির ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি দেখা যায়নি।”

গবেষকরা বলেছেন, “পানীয়ের তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার পরও দেখা গেছে, প্রতিদিন ছয় বা তার বেশি গরম পানীয় পানের অভ্যাস না করার তুলনায় দৈনিক ছয় বা তার বেশি গরম পানীয় পানের ফলে এসসিসি’র ঝুঁকি ৭১ শতাংশ বাড়ে, যেখানে এসি’র সঙ্গে এর তেমন কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।”

 এ গবেষণা পরিচালিত হয়েছে ‘ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ড’-এর পপুলেশন হেলথ বিভাগের সিনিয়র নিউট্রিশনাল এপিডেমিওলজিস্ট ড. কেরেন প্যাফিয়ারের নেতৃত্বে।

যুক্তরাজ্যের প্রায় ৯ লাখ ৮০ হাজার মানুষের গরম পানীয় পানের অভ্যাসের ওপর বিশ্লেষণ চালিয়ে গবেষণার এসব ফলাফল মিলেছে, যা এ সম্পর্কিত গবেষণায় বিশ্বজুড়ে সর্বোচ্চ অংশগ্রহণকারীর রেকর্ড।

গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদী অভ্যাস ও স্বাস্থ্যের সঠিক চিত্র পেতে অংশগ্রহণকারীদের ১৪ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করেছেন গবেষকরা।

অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তারা কীভাবে গরম পানীয় পান করতে পছন্দ করেন। এর সম্ভাব্য উত্তরগুলোর মধ্যে ছিল ‘খুব গরম’, ‘গরম’, ‘কুসুম গরম’ ও ‘গরম পানীয় পান করি না’।

এসব পানীয় নির্দিষ্ট তাপমাত্রার চেয়ে অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের অনুমানের ওপর ভিত্তি করেই গবেষণাটির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পশ্চিম ইউরোপের মানুষের ওপর চালিত এ গবেষণার ফলাফল এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের আগের গবেষণার ফলাফলের সঙ্গেও মেলে।

ওইসব গবেষণাতে দেখা গিয়েছিল, ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রায় চা বা দক্ষিণ আমেরিকায় জনপ্রিয় ক্যাফেইনওয়ালা ভেষজ পানীয় ‘মাতে’ পান করলে খাদ্যনালীর ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীন আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা ‘আইএআরসি’ ২০১৬ সালে বলেছিল, গরম পানীয় মানুষের দেহে ‘ক্যান্সার তৈরি করতে পারে’ এবং তা ‘খাদ্যনালীর ক্যান্সারের একটি সম্ভাব্য কারণ’।

ধারণা করা হয়, গরম পানীয় খাদ্যনালীর ভেতরের বিভিন্ন কোষে তাপের কারণে ক্ষতির মাধ্যমে এ রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অ্যালকোহল ও ধূমপানও এই ধরনের ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণ।

গবেষণা দলটি বলেছে, এ ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমাতে মানুষকে কিছুটা ঠান্ডা ও কম পরিমাণে খুব গরম পানীয় পানে উৎসাহিত করতে পারে বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।

গবেষণার অন্যতম অর্থায়নকারী সংগঠন ‘ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে’-এর স্বাস্থ্য তথ্য বিভাগের প্রধান ফিওনা ওসগান বলেছেন, “গরম পানীয়টি কতক্ষণ ঠান্ডা করার জন্য রাখা উচিত তার নির্দিষ্ট কোনো সময় বলা কঠিন। তবে আপনার যদি এ নিয়ে উদ্বেগ থাকে তবে খুব গরম অবস্থায় পান না করে তা পানের উপযোগী হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দেবো আমরা।”

তবে এসসিসি’র ঝুঁকি কমাতে ক্যাফে, কফি শপ ও রেস্তোরাঁগুলোর আরও কম তাপমাত্রায় চা ও কফি পরিবেশন শুরু করা উচিত বলে মনে করে না এ দাতব্য সংগঠনটি।

লন্ডনের ‘কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি’র ওরাল অনকোলজির অধ্যাপক মুয়-টেক তে বলেছেন, গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তাপমাত্রার হিসাব নেওয়ার বিষয়টি ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলে থাকতে পারে।

“গবেষণার বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে পানীয়ের তাপমাত্রা উপলব্ধির বিষয়টি সহজাতভাবেই একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম। যারা খুব গরম পানীয় পছন্দ করেন বা সহ্য করতে পারেন তাদের তাপমাত্রা অনুভূতির সক্ষমতায় কোনো পরিবর্তন আছে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়।

“এসব পরিবর্তন স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমার জৈবিক প্রবণতার পরিচায়ক হতে পারে ও তাদের অতিরিক্ত গরম পানীয় পানে উৎসাহিত করতে পারে। তবে গবেষণার ঝুঁকি বিষয়টিও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”