০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

বিশ্বকাপের শেয়ার কিনতে মরিয়া কেন প্রযুক্তি বিনিয়োগকারীরা?

বিনিয়োগ আগ্রহ ও অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের কারণে ফুটবল ও সমর্থকদের অনেক সিদ্ধান্ত এখন ‘ওয়াল স্ট্রিট ও সিলিকন ভ্যালি’ থেকে নির্ধারিত হচ্ছে।

বিশ্বকাপের শেয়ার কিনতে মরিয়া কেন প্রযুক্তি বিনিয়োগকারীরা?
এ বছর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে আয়োজিত বিশ্বকাপ আসর ফিফার বাণিজ্যিকীকরণের চিত্র স্পষ্টভাবেই ফুটিয়ে তুলেছে। ছবি: এআই

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 10 Aug 2026, 11:46 AM

Updated : 19 Sep 2026, 02:28 PM

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ঝড়ে বিনোদন ও শিল্প খাত যখন টালমাটাল অবস্থায় তখন ফুটবলের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংবেদনশীলতাকে এ প্রযুক্তির সুরক্ষাকবচ মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিবিসি লিখেছে, এআই যুগেও ফুটবলের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বহুগুণ বাড়বে– এমন বিশ্বাস থেকেই প্রচণ্ড বিরোধিতার মুখেও বিশ্বকাপের মতো আসরে মোটা অংকের অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠেছে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ বিনিয়োগকারীরা।

তীব্র প্রতিবাদ, ভবিষ্যতে বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকি ও বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনোর পদত্যাগের জোরালো দাবির মুখে অবশেষে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে ফিফা। বিশ্বকাপের একটি অংশের শেয়ার বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনা থেকে শেষ পর্যন্ত সরে এসেছে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থাটি।

তবে মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে একদল প্রযুক্তি বিনিয়োগকারী হঠাৎ কেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ক্রীড়া আসরের প্রতি এত আগ্রহ দেখাল? আর ভবিষ্যতেও কি এ ধরনের বাণিজ্যিক উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা অনিবার্য হয়ে উঠবে?

এআই যখন বিশ্বজুড়ে মানুষের বিনোদন ও অবসরের প্রচলিত বিভিন্ন রূপকে আমূল বদলে দিচ্ছে ঠিক তখনই ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি ‘থ্রাইভ ক্যাপিটাল’-এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘থ্রাইভ ইটারনাল’-এর নীতি নির্ধারকরা ফুটবল বিশ্বকাপকে বড় অংকের অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

কোম্পানিটির নতুন কৌশলগত সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবেই ফুটবল বিশ্বকাপকে দেখা হচ্ছিল। তাদের ধারণা, চলমান এআই বিপ্লবের মধ্যেও খেলাধুলার জনপ্রিয়তা কেবল টিকেই থাকবে না, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর সার্বিক মূল্যায়ন ও আর্থিক মূল্য বহুগুণ বাড়বে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও সাবেক উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারের ভাই জোশুয়া কুশনার পরিচালিত ‘থ্রাইভ’ এআই উন্নয়নকারী বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে। তারা মার্কিন এআই কোম্পানি ওপেনএআইয়ের অন্যতম প্রধান অর্থায়নকারী।

তবে এ বছরের এপ্রিলে নিউ ইয়র্কভিত্তিক কোম্পানিটি ‘থ্রাইভ ইটারনাল’ নামে এক নতুন বিনিয়োগ শাখা গঠন করেছে। এ শাখার মূল লক্ষ্য, এমন সব খাতে পুঁজি খাটানো, যেগুলোর ‘মৌলিক বৈশিষ্ট্য বা মানবীয় উপাদান প্রযুক্তির মাধ্যমে কখনো হুবহু তৈরি বা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়’।

তাদের এ মূল কৌশলের একদম কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন। সেখান থেকেই উঠে আসে ফুটবল ও ফিফার প্রস্তাবিত ‘ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ বা এফএফই কাঠামোর অধীনে বিশ্বকাপের সংখ্যালঘু শেয়ার বা মালিকানার একটি অংশ নিজেদের ঝুলিতে নেওয়ার সুযোগ।

বিনিয়োগকারীরা বলছেন, চলচ্চিত্র বা সংগীতের মতো বিনোদনের অন্যান্য মাধ্যমে এরইমধ্যে মানুষের তৈরি সৃজনশীল কাজের জায়গা দখল করতে শুরু করেছে এআই প্রযুক্তি।

সে তুলনায় ফুটবলের দীর্ঘ ঐতিহ্য, নিজস্ব সংস্কৃতি ও কোটি কোটি মানুষের আবেগের যে পরিচয় জড়িয়ে রয়েছে তা এআইয়ের সম্ভাব্য যে কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন বা নেতিবাচক প্রভাব থেকে ফুটবলকে সুরক্ষিত রাখবে।

ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা, উয়েফা, বিভিন্ন ক্লাব ও সমর্থকগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈশ্বিক ক্রীড়া শিল্পে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে কাজ করছেন অধ্যাপক সায়মন চ্যাডউইক।

তার ভাষ্য, বিনিয়োগ আগ্রহ ও অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের কারণে ফুটবল ও সমর্থকদের অনেক সিদ্ধান্ত এখন নির্ধারিত হচ্ছে ‘ওয়াল স্ট্রিট ও সিলিকন ভ্যালি’ থেকে।

বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, “বিষয়টি যেন একদম আমাদের অজান্তেই চেপে বসেছে এবং এর ফলে বাস্তবে কী ঘটতে যাচ্ছে তা নিয়ে অনেকে সত্যিই ভেবে দেখেননি।”

ফিফার সুশাসন নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুললেও তিনি বলেছেন, “মানুষ পছন্দ করুক বা না করুক, ক্রীড়াঙ্গনে প্রাইভেট ইকুইটি বা মূলধন বিনিয়োগ এখন নিয়মিত ঘটনা।”

এ বছরের গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে আয়োজিত বিশ্বকাপ আসরটি ফিফার বাণিজ্যিকীকরণের চিত্র বেশ স্পষ্টভাবেই ফুটিয়ে তুলেছে।

বিবিসির তথ্য অনুসারে, থ্রাইভের সম্পৃক্ততায় ‘এফএফই’ সংক্রান্ত আলোচনা শুরু হয়েছিল গেল বছর থেকেই, যেখানে বাণিজ্যিক উপদেষ্টা হিসেবে যোগ হয়েছিল ‘ফর্মুলা ওয়ান’-এর মালিক কোম্পানি ‘লিবার্টি মিডিয়া’র সাবেক প্রধান গ্রেগ মাফেইকে।

এ ছাড়া এ কৌশলগত উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে ডিজনির সাবেক প্রধান নির্বাহী বব আইগারকেও যোগ করেছে থ্রাইভ।

থ্রাইভ ইটারনাল এরইমধ্যে বিভিন্ন ক্রীড়া খাতে তাদের অর্থ বিনিয়োগ শুরু করেছে। উদ্বোধনী চাল চালতেই তারা মেজর লিগ বেইসবলের জনপ্রিয় দল ‘স্যান ফ্রান্সিসকো জায়ান্টস’-এর একগুচ্ছ শেয়ার কেনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি লাস ভেগাসের নতুন ‘এনবিএ’ ফ্র্যাঞ্চাইজি কেনার দৌড়েও কোম্পানিটি চোখ রাখছে।

কোম্পানিটি নিজেদের ওয়েবসাইটে বলেছে, “ঐতিহ্য, সামাজিক পরিচয় ও যৌথ অনুভূতির গভীর শিকড়ে জড়িয়ে থাকা এসব ফ্র্যাঞ্চাইজি ও সাংস্কৃতিক কোম্পানি এআই বিপ্লবের তোড়ে কেবল টিকেই থাকবে না, বরং সময়ের পরিক্রমায় এগুলোর গুরুত্ব আরও বাড়বে।”

ফিফায় বিতর্কিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা ও পরবর্তীতে এর ফলে তৈরি হওয়া অচলাবস্থা নিয়ে কুশনার বা থ্রাইভ ইটারনাল আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খোলেনি।

তবে কোম্পানিটির ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, ফিফার সদস্য দেশগুলোর সম্মতি সাপেক্ষে নেওয়া এ কৌশলী উদ্যোগটি কোনো ‘সাধারণ বিনিয়োগ ফান্ড নয়, যা থেকে দ্রুত মুনাফা তুলে নেওয়ার তাগিদ থাকে’।

সূত্রটির দাবি, প্রায় ৪২০ কোটি ডলার প্রারম্ভিক মূলধন যোগাতে প্রস্তুত থাকা বিনিয়োগকারীরা ‘বহু বছর বা কয়েক দশক ধরে’ কোনো লাভের মুখ না দেখার মানসিকতা নিয়েই এগোচ্ছিলেন। কারণ থ্রাইভ ইটারনালকে দীর্ঘমেয়াদী হোল্ডিং কোম্পানি হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও সাবেক উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারের ভাই জোশুয়া কুশনার পরিচালনা করে ‘থ্রাইভ’ কোম্পানি। ছবি: রয়টার্স

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও সাবেক উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারের ভাই জোশুয়া কুশনার পরিচালনা করে ‘থ্রাইভ’ কোম্পানি

তারা আরও বলেছেন, এফএফই প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে ২ হাজার কোটি ডলার বাজারমূল্যের ওপর ভিত্তি করে ফিফার প্রতিটি সদস্য অ্যাসোসিয়েশন প্রায় ৯ কোটি ১০ লাখ ডলার সমপরিমাণ মূল্যমানের শেয়ারের অংশীদার হতে পারত।

তবে শেয়ারের মূল নিয়ন্ত্রণ থাকত ফিফার হাতেই, কোনো বিনিয়োগকারীর হাতে নয় এবং এ শেয়ার বিক্রি করা বা রাখা সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্পূর্ণ এখতিয়ার থাকত নিজ নিজ সদস্য দেশের।

উদ্যোগটির পক্ষে যুক্তি দিয়ে সূত্রটি বলেছে, “বাইরের দেশের বিনিয়োগ আনার মূল উদ্দেশ্য, এমন সব দেশকে এককালীন বড় আর্থিক তহবিল যোগানো যারা সাধারণত কোনো বৈদেশিক অর্থায়ন পায় না, যাতে তারা স্টেডিয়াম তৈরি ও ঘরোয়া ফুটবলের মানোন্নয়নে উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ গড়ে তুলতে পারে।”

অন্যদিকে, ফিফার দাবি, এই ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজের মূল লক্ষ্যই ছিল ‘ফুটবলের মূল খেলা পরিচালনা ও সুশাসন থেকে এর ব্যবসায়িক বিভিন্ন দিককে সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেলা।’

ইংল্যান্ডে ফুটবলের বাণিজ্যিক রূপ কতটা বড় হতে পারে তা প্রিমিয়ার লিগ চালুর পর থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। পরিস্থিতির এমন পরিবর্তন ঘটেছে যে, মাঠের ৯০ মিনিটের খেলা বা ট্যাকটিক্সের মতোই এখন ক্লাবগুলোর আর্থিক নিয়মকানুন, ট্রান্সফার উইন্ডোর কেনাবেচা আর বোর্ডের ভেতরে চলা গুঞ্জন সমর্থকদের আড্ডার মূল বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

ফুটবলে মার্কিন মূলধনের আগমন নতুন কিছু নয়। দুই দশকেরও বেশি সময় আগে ‘গ্লেজার’ পরিবার ‘ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড’ কেনার পর থেকেই ইংলিশ ও ইউরোপীয় ক্লাবগুলোতে আমেরিকান ডলারের প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা বা ফুটবল বিশ্বকাপের মতো মহাযজ্ঞের এ মুহূর্তে নতুন কোনো নগদ অর্থের তহবিল প্রয়োজন ছিল কি না তা নিয়ে ক্রীড়া বিশ্লেষকদের বড় অংশ তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন।

ফিফার দাবি, বিশ্বকাপ তার পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সম্ভাবনা অনুসারে ‘যথাযথ উপায়ে বাণিজ্যিকীকরণ’ করতে পারছে না, অথচ মাঝমাঠে পানিপানের বিরতির সময় বিজ্ঞাপন দেখানো, টিকিটের পরিবর্তনশীল দাম নির্ধারণ এবং সম্প্রচার ও স্পন্সরশিপের স্বত্ব বিক্রির রেকর্ড মূল্য ২০২৬ সালের আসরটিকে ইতিহাসের সর্বকালের সর্বাধিক আয়কারী ইভেন্টে পরিণত করার পথ সুগম করেছে।

৪৮ দেশের বর্ধিত দল নিয়ে আয়োজন ও ভবিষ্যতে পরিধি বাড়িয়ে ৬৪ দেশে উন্নীত করার গুঞ্জন সবই মূল বাণিজ্যিক চাহিদার অংশ। সরল সমীকরণটি হচ্ছে, যত বেশি দেশ অংশ নেবে, দর্শকসংখ্যা তত বাড়বে এবং সেখান থেকে অর্থ উপার্জনের পথও তত প্রসারিত হবে।

‘ইউনিভার্সিটি অফ পোর্টসমাউথ’-এর অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড স্পোর্টস ফাইন্যান্সের সহযোগী অধ্যাপক ক্রিস্টিনা ফিলিপু বলেছেন, বাইরের বিনিয়োগ ডেকে আনার এই প্রবণতা অন্যান্য খেলা বা ফুটবলের কিছু ক্লাবে তখন দেখা যায় যখন তারা তীব্র আর্থিক বা ক্যাশ-ফ্লো সংকটে পড়ে।

“ফিফা মোটেও এমন কোনো অর্থকষ্টে পড়ে নেই যে, তাদের মরিয়া হয়ে অর্থের পেছনে ছুটতে হবে। সত্যি বলতে, তাদের হাতে এই মুহূর্তে যা তহবিল আছে তা দিয়েই তারা খুব সহজে বিভিন্ন সদস্য অ্যাসোসিয়েশনকে অনুদানের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে বাইরের কোনো বিনিয়োগকারী কোম্পানিকে ডাকার কোনো আর্থিক প্রয়োজনীয়তাই এখানে ছিল না।”

ফিফা শেয়ার বিক্রির পুরো পরিকল্পনাটি বাতিল করায় বিষয়টিকে সম্মান জানিয়েছে প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগকারী কোম্পানি ‘থ্রাইভ ইটারনাল’। তবে এ জাতীয় নির্দিষ্ট কোনো বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী থাকুক বা না থাকুক বিশ্ব ফুটবলের দিকে বহুজাতিক পুঁজির লোলুপ নজর যে দীর্ঘমেয়াদে থাকছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।