Published : 09 Aug 2026, 05:38 PM
ছোটদের সামাজিক মাধ্যম থেকে দূরে রাখতে বয়স যাচাইকরণের মতো নিয়মসহ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর সরকারের জোরদার তদারকির পক্ষে মত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলেরই সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক।
রয়টার্স ও ইপসোস-এর নতুন এক জরিপে এই চিত্র উঠে এসেছে। বিভিন্ন কোম্পানির তরুণ ব্যবহারকারীদের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলার অভিযোগ নিয়ে মেটা ও গুগলের ইউটিউবের ওপর আইনগত চাপ বাড়তে থাকার মুখেই ৩ অগাস্ট শেষ হওয়া ছয় দিনের মধ্যেই জরিপটি প্রকাশ পেল।
এদিকে, তরুণ ব্যবহারকারীদের আসক্ত করার উদ্দেশ্যে পণ্য তৈরির অভিযোগে মার্কিন অঙ্গরাজ্য প্রসিকিউটরদের দায়ের করা এক মামলায় শিগগিরই বিচার কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে মেটা বলেছে, অঙ্গরাজ্যগুলোর কাছে হেরে গেলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত জরিমানার মুখে পড়তে পারে।
শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতির অভিযোগে বৃহস্পতিবার নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের এক আদালত মেটাকে একটি তহবিল গঠনে ৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে।
পাশাপাশি, অল্পবয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য তাদের প্ল্যাটফর্ম কীভাবে কাজ করবে তাতে পরিবর্তন আনার আদেশও দিয়েছে আদালত।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়েই তরুণদের ওপর প্রভাব ফেলার কারণে আইন প্রণেতাদের কড়া নজরদারির মুখে পড়েছে বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি।
অনলাইনে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এরইমধ্যে ডজনখানেকেরও বেশি মার্কিন অঙ্গরাজ্য অপ্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আইন পাস করেছে।
তবে মেটা, টিকটক ও স্ন্যাপের মতো সামাজিক মাধ্যম জায়ান্টদের সমর্থিত বাণিজ্য সংগঠন ‘নেটচয়েস’ বয়স যাচাইয়ের এসব আইনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তাদের দাবি, এগুলো বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৬১ শতাংশ নাগরিক, যাদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের ৭১ শতাংশ ও রিপাবলিকানদের ৬২ শতাংশ রয়েছেন, তারা বলেছেন, সামাজিক মাধ্যম কোম্পানিগুলোর ওপর সরকারের আরও কঠোর তদারকি প্রয়োজন। স্বতন্ত্র বা নিরপেক্ষ ভোটারদের মধ্যে এই সমর্থনে কিছুটা দ্বিধা লক্ষ্য করা গেছে।
জরিপে উঠে এসেছে, ৬৬ শতাংশ উত্তরদাতা এমন আইনের পক্ষে মত দিয়েছেন, যা ১৬ বছরের কম বয়সি শিশুদের প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ ঠেকাতে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম কোম্পানিগুলোকে ‘বয়স যাচাইকরণ’ প্রযুক্তি ব্যবহারে বাধ্য করবে।
এ বিষয়ে রিপাবলিকানদের মধ্যে সমর্থনের হার সবচেয়ে বেশি, ৭৪ শতাংশ, যেখানে ৬৯ শতাংশ ডেমোক্র্যাট এতে সমর্থন জানিয়েছেন।
‘কাউকে না কাউকে তো করতেই হবে’
২০২৪ সালের নির্বাচন রিপাবলিকান প্রার্থী ডনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ৬০ বছর বয়সি যন্ত্রপ্রকৌশলী জেমস বোসারডেট বলেছেন, তিনি সাধারণত মার্কিন সরকারের হস্তক্ষেপ বা ভূমিকা কম রাখার পক্ষে। তবে সামাজিক মাধ্যম কোম্পানিগুলোর ওপর লাগাম টানার বিষয়টি তার কাছে ব্যতিক্রম।
শিশুদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, “কাউকে না কাউকে তো কাজটি করতেই হবে। এটা কি সরকারের কাজ? আমি চাই না এটা সরকারের কাজ হোক, তবে মনে হয় এখন হয়ত তাদেরই এটা করা উচিত।”
মার্কিন কংগ্রেস এখনপর্যন্ত শিশু সুরক্ষায় সামাজিক মাধ্যমকেন্দ্রিক কার্যকর কোনো আইন পাস করতে পারেনি, যেটি সব অঙ্গরাজ্যে কার্যকর হবে।
রয়টার্স ও ইপসোস-এর জরিপে উঠে এসেছে, ৮৫ শতাংশ আমেরিকানই মনে করেন সামাজিক মাধ্যম শিশুদের জন্য আসক্তিকর হতে পারে। ঠিক এমন সংখ্যক নাগরিক মনে করেন, সামজিক মাধ্যমে আসক্তি শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
ওয়াশিংটন ডিসির ৩৪ বছর বয়সি বাসিন্দা ক্রিস্টোফার চেন ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিসকে ভোট দিয়েছিলেন।
তিনি বলেছেন, তরুণদের ওপর এসব কোম্পানির অতিরিক্ত প্রভাব রয়েছে এবং ব্যবহারকারীরা কী দেখবেন তা এই প্রযুক্তি জায়ান্টরাই নিয়ন্ত্রণ করছে।
“আইন বা নিয়মকানুনের চেহারা কেমন হবে তা আমার জানা নেই, তবে জনগণকে রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে কিছু একটা করা জরুরি।”
ক্যানসাসের ৭৩ বছর বয়সি পওলা ডিক বলেছেন, শিশুদের অনুচিত বা আপত্তিকর কনটেন্ট থেকে দূরে রাখতে সামাজিক মাধ্যম কোম্পানিগুলো আরও ভূমিকা রাখতে পারত। ফলে এসব অ্যাপের ওপর সরকারের আরও তদারকি দরকার।
২০২৪ নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া পওলা বলেছেন, নাতি-নাতনিদের তিনি ইউটিউব দেখতে দেন না। তবে তা-ও তারা কোনো না কোনোভাবে তা দেখার পথ বের করে ফেলে।
“মা-বাবার দেওয়া ফোনের বিভিন্ন ব্লক বা বিধিনিষেধ কীভাবে এড়াতে হয় তা তারা ভালোই জানে। এসব কারিগরি ব্যাপারে শিশুরা বেশ বুদ্ধিমান।”
ব্যবহারকারীরা সামাজিক মাধ্যম পছন্দও করেন
আমেরিকানরা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার উপভোগও করেন। জরিপে অংশ নেওয়া ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, এসব প্ল্যাটফর্মে কাটানো সময় তাদের কাছে আনন্দদায়ক।
অন্যদিকে, কেবল ৩৫ শতাংশ বলেছেন, এতে তারা মানসিক চাপ বোধ করেন।
নিজেরা অতিরিক্ত সময় ব্যয় করছেন কি না এ বিষয়ে নাগরিকদের মতামত দুই ভাগে বিভক্ত। উত্তরদাতাদের ৫২ শতাংশ বলছেন, তারা প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছেন, অন্যদিকে ৪৩ শতাংশ এই মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন।
অনলাইনে পরিচালিত এ জরিপে ৪ হাজার ৫০৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক অংশ নিয়েছেন। জরিপটির ফলাফলে ভুলের সম্ভাবনা ২ শতাংশ পয়েন্ট।