০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ইউক্রেইনের সামরিক ডেটা ব্যবহৃত হবে যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তায়

এসব ডেটার মধ্যে ইউক্রেইনের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোগুলোতে বিভিন্ন সময়ে চালানো রাশিয়ার হামলা ও ধ্বংসাত্মক প্রচেষ্টার চিত্রও রয়েছে।

ইউক্রেইনের সামরিক ডেটা ব্যবহৃত হবে যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তায়
যুক্তরাজ্যে এ ধরনের চুক্তি এটাই প্রথম। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 26 Aug 2026, 02:26 PM

Updated : 19 Sep 2026, 02:25 PM

ইউক্রেইন রণাঙ্গন থেকে সংগৃহীত বড় তথ্য বা ডেটার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি এখন ব্যবহৃত হবে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা কেন্দ্র, রেলপথ ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো স্পর্শকাতর জাতীয় অবকাঠামোর সুরক্ষায়।

বিক্ষোভকারীদের অনুপ্রবেশ ও শত্রুভাবাপন্ন বিদেশি রাষ্ট্রের হামলা থেকে সামরিক ঘাঁটি, রেললাইন ও জ্বালানি কেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো রক্ষায় লন্ডন ও কিইভের মধ্যে এ নজিরবিহীন চুক্তি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।

যুক্তরাজ্যে এ ধরনের চুক্তি এটাই প্রথম।

চুক্তি অনুসারে, রণাঙ্গন থেকে কিইভের ‘অ্যাভেঞ্জার্স এআই ল্যাব’-এর সংগৃহীত ডেটা ব্যবহারের সুযোগ পাবে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অনুমোদিত বিভিন্ন এআই কোম্পানি, যা দিয়ে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট নতুন সব সিস্টেম তৈরি হবে।

প্রাথমিকভাবে যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটিতে এ প্রযুক্তির পাইলট পরীক্ষা চালানো হবে। এ সিস্টেমে মাটির নিচে থাকা ফাইবার-অপটিক কেবলে এআই-অপটিমাইজড সেন্সর যুক্ত থাকবে, যা বিভিন্ন ধরনের সন্দেহজনক গতিবিধি ও অস্বাভাবিক চলাফেরা নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে।

যুক্তরাজ্য সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রাথমিক এ পরীক্ষা সফল হলে বিমানবন্দর, কারাগার, গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ ও জ্বালানি কেন্দ্রের সার্বিক নিরাপত্তায় এ প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে মোতায়েন হবে।

জুনে যুক্তরাজ্যে তীব্র নিরাপত্তার ফাঁকফোকর ফাঁস হওয়ার পরই এ উদ্যোগ গতি পায়। ওই সময় ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নামের যুক্তরাজ্যে নিষিদ্ধ এক অধিকার সংগঠনের সদস্যরা স্কুটারে চড়ে সহজেই সুরক্ষিত ‘আরএএফ ব্রিজ নর্টন’ সামরিক ঘাঁটিতে ঢুকে পড়ে। সেখানে চরম নিরাপত্তা ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে দুটি সামরিক বিমানে স্প্রে পেইন্ট করে তারা কোনো বাধা ছাড়াই স্থান ত্যাগ করেছে।

বিবৃতিতে ঘটনার কথা স্বীকার করে সংস্থাটি বলেছে, “অ্যাক্টিভিস্টরা এ অভিযানের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাজ্যের সরাসরি গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের অংশগ্রহণে ব্যাঘাত ঘটাতে পেরেছে।”

এ ধরনের চরম বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতেই কড়া নজরদারির প্রযুক্তি আনছে দেশটির সরকার। তবে,  ইউক্রেইন রণাঙ্গনের ডেটা বিভিন্ন কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়টি ব্যক্তিগত প্রাইভেসি ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা কর্মীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এরইমধ্যে যুক্তরাজ্যের তিন এআই কোম্পানি সিনটেলা, মাইন্ড ফাউন্ড্রি ও স্কাইরাল’কে নিরাপদ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এ ডেটা ব্যবহারের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাজ্য।

এর মধ্যে ব্রিস্টলভিত্তিক প্রযুক্তি কোম্পানি ‘সিনটেলা’ ফাইবার-অপটিক সেন্সর প্রযুক্তিতে বিশেষভাবে পারদর্শী। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের চুক্তি করেছে কোম্পানিটি।

ইউক্রেইনীয় এআই ল্যাবের সঙ্গে নতুন এ চুক্তির ফলে যুক্তরাজ্য এখন তাদের নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলোকে সরাসরি ড্রোন পরিচালনার ডেটা সেট, স্ট্রাইক মিশন থেকে পাওয়া ভিডিও ফুটেজ ও ফ্লাইট প্রোফাইলের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে রূপ দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

এসব ডেটার মধ্যে ইউক্রেইনের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোগুলোতে রাশিয়ার বিভিন্ন সময়ে চালানো হামলা ও ধ্বংসাত্মক প্রচেষ্টার চিত্রও রয়েছে।

গেল চার বছরের সামরিক ডেটার এ বড় ভাণ্ডারে রয়েছে বাস্তব অভিজ্ঞতার এমন গভীর ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ, যা এতদিন ইউক্রেইনের বাইরের অন্যান্য মডেলের জন্য সহজলভ্য ছিল না। এতদিন ইন্টারনেটে উন্মুক্ত থাকা ওপেন-সোর্স তথ্যের ওপর নির্ভর করেই এসব প্রযুক্তি তৈরি হত।

যুক্তরাজ্য সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য, এসব শক্তিশালী এআই মডেল ব্যবহার করে রেললাইন, বিদ্যুৎ গ্রিড বা সামরিক ঘাঁটির মতো বিভিন্ন জাতীয় অবকাঠামো শত্রুভাবাপন্ন কোনো গোষ্ঠী বা শক্তির মাধ্যমে কখন ও কীভাবে ঝুঁকিতে পড়তে পারে তা আগেভাগেই নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দেওয়া।

এসব স্থানের আশপাশে ভূগর্ভস্থ ফাইবার-অপটিক কেবল বসিয়ে মানুষ বা গাড়ির সুনির্দিষ্ট যে কোনো অস্বাভাবিক চলাচল শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, প্রযুক্তিটি কেবল বিদেশি রাষ্ট্রের হামলা নয়, বরং আন্দোলনকারী ও বিক্ষোভকারীদের অনুপ্রবেশ বা হামলা থেকে সামরিক কেন্দ্রগুলো রক্ষাতেও কাজ করবে।

বিবৃতিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নাম বলেছেন, “এটা ব্রিটিশ বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির জন্য তাদের নিজস্ব এআই সক্ষমতার সঙ্গে ইউক্রেইনের রণাঙ্গনের অভিজ্ঞতাকে একত্র করার দারুণ সুযোগ।

“ফলে আমরা এমন সব প্রযুক্তির উন্মেষ ও দ্রুত বিকাশ ঘটাতে পারব, যা কেবল আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকেই জোরদার করবে না, বরং যুক্তরাজ্যের আনাচে-কানাচে বিস্তৃত সব ধরনের অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও সুরক্ষাবলয়ে নিয়ে আসবে।”

কেবল সেন্সর নজরদারিই নয়, এ চুক্তির আওতায় ভবিষ্যতে ড্রোন, রোবোটিক্স ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থার জন্য ব্যবহৃত বিশেষ ধরনের শক্তিশালী ‘এআই চিপ’ তৈরির সুবিধাও থাকছে।

তবে এ উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেছেন ‘ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন’-এর কম্পিউটার সায়েন্সের অধ্যাপক স্টিভেন মার্ডক।

অধ্যাপক মার্ডক বলেছেন, ফাইবার-অপটিক কেবলের সেন্সর ব্যবহার করে অস্বাভাবিক নড়াচড়া ও গতিবিধি শনাক্ত করার প্রযুক্তি কয়েক দশক ধরেই রয়েছে। ফলে ইউক্রেইন যুদ্ধের ডেটা বাস্তবিকভাবে এ সেন্সরের সক্ষমতা কতটুকু উন্নত করতে পারবে সে বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়।

অধ্যাপক বলছেন, “আমি এখনও পর্যন্ত খুব বেশি আকর্ষণীয় বা বিশ্বাসযোগ্য কিছু শুনিনি। তবে এমন সম্ভাবনা থেকেই যায় যে, যেখানে তারা হয়ত নতুন কোনো ধরন বা লক্ষণ দেখতে পাচ্ছেন, যা সহজেই পূর্বাভাসযোগ্য হলেও ইন্টারনেটের উন্মুক্ত তথ্যে তা মেলে না।”